একটি গৌরবময় ও অনুকরণীয় জীবন

বর্তমান আক্রমণের মোকাবিলা  জ্যোতি বসুর দেখানো পথেই 

প্রকাশ কারাত

জ্যোতি বসুর মতো একজন অসাধারণ কমিউনিস্ট নেতার জন্মশতবর্ষ, সারা জীবন ও কাজের মধ্যে দিয়ে তিনি যে উল্লেখ্যযোগ্য অবদানগুলি রেখে গেছেন, তার মূল‌্যায়ন করা এবং রাজনৈতিক জীবনে তিনি যে কৃতিত্ব অর্জন করেছেন ও যে শিক্ষা দিয়েছেন, তার হিসাব টানার একটি উপলক্ষ হতে পারে। নতুন প্রজন্মের কমিউনিস্ট ও প্রগতিশীলদের শিক্ষিত করতে এই মূল‌্যায়ন অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে, যাতে তাদের সামাজিক রূপান্তরের লক্ষ্যে নিরবচ্ছিন্নভাবে উদ্যমী হওয়ার ক্ষেত্রে এই শিক্ষা সাহায্য করতে পারে।

জ্যোতি বসু তাঁর জীবদ্দশাতেই একজন কিংবদন্তী কমিউনিস্ট নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। কমিউনিস্ট আন্দোলনে জ্যোতি বসুর মতো আর এমন কোনো নেতা নেই যাকে গোটা দেশের মানুষ জানতেন এবং  শ্রদ্ধা করতেন। কিভাবে এটা সম্ভব হলো?

জ্যোতি বসুর নাম বামপন্থী রাজনীতি ও সমস্ত মৌলিক আন্দোলনের মূল স্রোতের সঙ্গে সমার্থক হয়ে উঠেছিল। একজন কমিউনিস্ট হিসাবে তাঁর গোটা জীবনকাল জুড়েই তিনি শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ব্রিটেন থেকে ফেরার পরেই তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন এবং সরাসরি রেল শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নে কাজ শুরু করেন। জীবনের শেষ বছরগুলিতেও তিনি সি আই টি ইউ-র একজন নেতা হিসাবে থেকে গিয়েছিলেন।

জ্যোতি বসু কৃষক আন্দোলনেরও একজন প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন, যখন তিনি ১৯৬৭-৭০ সালের মধ্যে দুটি যুক্তফ্রন্ট সরকারকে জমির আন্দোলনকে বিকশিত করার কাজে ব্যবহার করেছিলেন। একইভাবে বামফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবেও তিনি ব্যাপক ভূমি সংস্কারের লক্ষ্যে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। সুতরাং, তাঁর রাজনৈতিক কার্যকলাপ শ্রমিক ও কৃষক, উভয় আন্দোলনের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল।

আইনসভার ভেতরে কাজের সঙ্গে বাইরের গণ-আন্দোলন ও শ্রমিক আন্দোলনের যেভাবে তিনি সম্পৃক্তি ঘটিয়েছিলেন, তা ছিল জ্যোতি বসুর স্বাতন্ত্র্যসূচক অবদানগুলির মধ্যে একটি।  স্বাধীনতার আগেই, ১৯৪৬ সালে বাংলার আইনসভায় জ্যোতি বসু নির্বাচিত হয়েছিলেন। তখন থেকে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি আইনসভায় তাঁর উপস্থিতিকে বাইরে গণ-আন্দোলন ও পার্টির প্রভাবকে শক্তিশালী  এবং আরও উন্নত করতে কাজে লাগিয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালে বাংলার কৃষকদের তেভাগা আন্দোলন যখন শুরু হলো, তখন প্রাথমিক রিপোর্ট সংগ্রহের জন্য জ্যোতি বসু সেই সব জেলাগুলিতে ব‌্যাপকভাবে ঘুরেছিলেন এবং বিধানসভায় তা কার্যকরীভাবে উত্থাপন করেছিলেন।

১৯৫৩সালে জ্যোতি বসু অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির প্রাদেশিক কমিটির সম্পাদক হন এবং ১৯৬১সাল পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বে ছিলেন। এই আট বছরে ১৯৫৯সালের খাদ্য আন্দোলনের মতো বড় বড় আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল, যেখানে পুলিসী আক্রমণে ৮০জনের মৃত্যু হয়েছিল। পার্টির সম্পাদক হিসাবে জ্যোতি বসু যেমন এই আন্দোলনের সম্মুখভাগে ছিলেন, তেমনি জনগণের খাদ্যের দাবিকে নিরলসভাবে বিধানসভার ভেতরে উত্থাপন করেছিলেন।

এর আগে, ১৯৫৪সালের ফেব্রুয়ারিতে যখন স্কুল শিক্ষকদের ধর্মঘট হলো, তখন পার্টি ও শিক্ষক সংগঠনের অনেক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। জ্যোতি বসুকেও গ্রেপ্তারের জন্য পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল এবং তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য বিধানসভার অধিবেশনের প্রথম দিন ভবনের বাইরে পুলিস কড়া নজর রেখেছিল। জ্যোতি বসু কৌশলে বিধানসভা ভবনের ভেতরে ঢুকে পড়েন এবং প্রায় এক সপ্তাহ ধরে এই ভবনের ভেতরেই থেকে যান, যেহেতু পুলিস এর ভেতরে ঢুকতে পারে না। বিধানসভার ভেতরে শিক্ষক ধর্মঘটের বিষয়টি তিনি সফলভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হন। পরে শিক্ষকদের সমাবেশে যোগ দেওয়ার জন্য তিনি বের হন এবং পুলিসের কাছে গ্রেপ্তার হন। একজন বিধায়ক হিসাবে, শ্রমজীবী জনগণের স্বার্থকে উর্ধ্বে তুলে ধরতে কিভাবে জ্যোতি বসু বিধানসভাকে ব্যবহার করেছিলেন, এটা তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

ব্যক্তিগতভাবেও জ্যোতি বসু অসীম সাহসের অধিকারী ছিলেন। ১৯৬৯সালের জুলাই মাসে, তিনি যখন রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন, একটি সংঘর্ষে একজন পুলিস নিহত হওয়ায় প্ররোচিত হয়ে এক দঙ্গল পুলিস বিধানসভা ভবন আক্রমণ করতে ভেতরে ঢুকে পড়ে।  তারা বিধানসভার আসবাবপত্র ভাঙচুর করতে করতে জ্যোতি বসুর ঘরে ঢুকে পড়ে। জ্যোতি বসু শান্তভাবে এই তান্ডবরত পুলিসবাহিনীকে মোকাবিলা করেন এবং অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে তাদের এধরণের আচরণ বন্ধ করতে বলেন। তাঁর স্থৈর্য দেখে হতচকিত হয়ে উত্তেজিত পুলিসের দলটি ধীরে ধীরে তাঁর ঘর ছেড়ে চলে যায়।

রাজ্য সরকারে কমিউনিস্টদের অংশগ্রহণের মধ্যে দিয়ে কিভাবে গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে শক্তিশালী করার কাজে ব্যবহার করা উচিত, তা জ্যোতি বসুই দেখিয়েছিলেন।  ১৯৬৭-৭০ সালের মধ্যে দু’টি স্বল্পকালস্থায়ী যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে তিনি পুলিসকে শ্রমিক ও কৃষকদের আন্দোলনে হস্তক্ষেপ করতে দেননি। জমির আন্দোলনে বাংলা যখন ভেসে গিয়েছিল, তখন জ্যোতি বসু ঘোষণা করেছিলেন যে সমস্ত কৃষক বেনাম জমি চিহ্নিত করছেন এবং তা দখল করছেন, তাদের কাজে সরকার বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। এই সব অভিজ্ঞতাই রাজ্য সরকারে কাজ করতে গিয়ে সি পি আই (এম)-র দৃষ্টিভঙ্গি ও কৌশল কী হবে, তা প্রণয়ন করতে সাহায্য করেছে।

জ্যোতি বসুর জীবনের সবচেয়ে বড় অবদান ১৯৭৭ সালে পশ্চিমবাংলায় বামফ্রন্ট সরকার গঠনের মধ্যে দিয়েই এসেছে, যার তিনি মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তিন দশকের বেশি সময় ধরে বামফ্রন্ট সরকার টিঁকে থাকার উল্লেখযোগ্য রেকর্ড গড়ার পিছনে এই সরকারের নেতৃত্বে একটানা ২৩ বছর জ্যোতি বসুর থাকার অবদানও অনেক। তাঁর নেতৃত্বেই ভূমি-সংস্কারের পরিকল্পনা তৈরি হয়েছিল এবং রূপায়িত হয়েছে। গোটা দেশে পথ-দেখানো এই সংস্কারের ফলে ১১লক্ষ একর জমি ২৫লক্ষ ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষকের মধ্যে বন্টন করা সম্ভব হয়েছে এবং ১৫ লক্ষ ৩০ হাজার বর্গাদার বা ভাগচাষী নথিভূক্ত হয়েছেন ও নির্দিষ্ট সময়ের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা হয়েছে।

ভূমি-সংস্কারের পাশাপাশি ত্রিস্তর পঞ্চায়েতী ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে। ৭৩তম ও ৭৪তম সংবিধান সংশোধনের অনেক আগেই পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েতী ব্যবস্থার গণতান্ত্রিকীকরণের পথ দেখিয়েছে। রাজ্যে ধর্মনিরপেক্ষ বাতাবরণ তৈরির মতো একটি কৃতিত্বকে আজকাল এমনিই হয়ে গেছে বলে ধরে নেওয়া হয়। অথচ, স্বাধীনতার আগে, বাংলা সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে প্রত্যক্ষ করেছে এবং দেশভাগের মধ্যে দিয়ে বিরাট আকারের সাম্প্রদায়িক হিংসার সাক্ষী থেকেছে। কিন্তু বামপন্থী রাজনীতির উত্থান এবং বামফ্রন্টের সরকার গঠন একটি বড় রকমের রূপান্তরের ভিত্তি স্থাপন করে। জ্যোতি বসু শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, গোটা দেশেই ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি দৃঢ় আনুগত্যকে প্রতীক হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন। সমস্ত অংশের সংখ‌্যালঘু মানুষ নিজেদের সুরক্ষিত এবং সাম্প্রদায়িক আক্রমণ থেকে মুক্ত জীবন উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী নিহত হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গে সংখ‌্যালঘু শিখদের ওপর যে কোনো ধরণের আক্রমণ প্রতিহত করতে তিনি যে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন তা সারা দেশে প্রশংসিত হয়েছিল।

সত্তরের দশকে পশ্চিমবঙ্গে আধা-ফ‌্যাসিবাদী সন্ত্রাস নামিয়ে আনা হয়েছিল। ১২০০-র বেশি কমরেড এই সময়ে খুন হন এবং আরো কয়েক হাজার কমরেডকে বলপূর্বক ঘর ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। কমিউনিস্ট আন্দোলন বিভিন্ন সময়ে শাসকশ্রেণীর দমন-নিপীড়নের মোকাবিলা করেছে। কতটা সাফল্যের সঙ্গে এই নিপীড়ন ও হিংসাকে মোকাবিলা করা হচ্ছে, তার ওপর আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়। জ্যোতি বসু ও প্রমোদ দাশগুপ্তের নেতৃত্বে পার্টি এই তীব্র আক্রমণকে প্রতিরোধ করেছিল এবং কখনো মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি। আজকে পশ্চিমবঙ্গে পার্টি ও বামফ্রন্ট যখন আবার ভয়াবহ আক্রমণের মুখে, তখন এই সন্ধিক্ষণে জ্যোতি বসুর পরিণত নেতৃত্বের উদাহরণ আমাদের সামনে পথের দিশা হওয়া উচিত।

দীর্ঘ সাত দশক ধরে, একজন কমিউনিস্ট হিসাবে জ্যোতি বসু আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের নানা ওঠাপড়াকে প্রত‌্যক্ষ করেছেন। কিন্তু মার্কসবাদের প্রতি তাঁর প্রত্যয় কখনো দোদুল্যমান হয়নি। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি বিশ্বাস করতেন যে সমাজতন্ত্রই মানব সভ‌্যতার সামনে একমাত্র বিকল্প।

ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনে প্রয়োগ ও বিকাশের বেশ কয়েকটি দৃষ্টিভঙ্গিগত প্রশ্নে জ্যোতি বসু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। যেমন, কিভাবে কমিউনিস্টরা আইনসভায় কাজ করবেন; ভূমি সংস্কার কর্মসূচীর রূপায়ণে; পঞ্চায়েতী রাজ ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের ক্ষেত্রে; ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রকে রক্ষা করার প্রশ্নে কমিউনিস্টদের দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার রক্ষায়, গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে জ্যোতি বসু যে অবদান রেখেছেন, স্বাধীন ভারতের খুব কম নেতাই সে দাবি করতে পারেন।

গোটা বছর ধরে জন্মশতবর্ষ উদ্‌যাপন করতে গিয়ে তাঁর এই গৌরবময় জীবন ও কর্মধারারই স্মৃতিচারণা করা উচিত।

গণশক্তি, ৭ই জুলাই, ২০১৩

Published in: on জুলাই 10, 2013 at 7:59 অপরাহ্ন  মন্তব্য করুন  

সংসদীয় গণতন্ত্র : অদ্বিতীয় জ্যোতি বসু

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য 

জ্যোতি বসুর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন কোনো স্বল্প পরিসরে আলোচনা করতে যাওয়া সম্ভব না। চল্লিশের দশক থেকে তিনি রাজনীতি শুরু করেছেন এবং তাঁর জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর সঙ্গে কাজ করতে পারা, তাঁর পাশে থেকে কাজ শেখা আমার জীবনের এক দুর্লভ অভিজ্ঞতা। এই প্রবন্ধে আমি মূলত সংসদীয় গণতন্ত্রে তাঁর অবদান সম্পর্কে সংক্ষেপে কয়েকটি কথা বলব।

তিনি বিধানসভার সদস্য হয়ে এসেছিলেন প্রথম ১৯৪৬ সালে। পরাধীন দেশে যুক্ত বাংলার বিধানসভায় তিনি রেলওয়ে শ্রমিক কনস্টিটিউয়েন্সির প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। সেই ১৯৪৬ সাল থেকে বিধানসভা তাঁর কণ্ঠস্বর শুনেছে। তখন বাংলাদেশে গ্রামে-গ্রামে চলছে তেভাগা আন্দোলন। তেভাগা সম্পর্কে বিধানসভায় বক্তৃতার মধ্য দিয়ে তিনি সারা দেশের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন — কিভাবে বাংলার গ্রামে-গ্রামে কৃষকদের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রাম চলেছে, তাদের ফসলের ভাগের জন্য এবং তৎকালীন সরকার কিভাবে সেই কৃষকদের আন্দোলনকে দমন করার জন্য পুলিস এবং মিলিটারি ব্যবহার করছে। পরবর্তীতে স্বাধীনতার পরেও তিনি এ‍‌ই সভায় রাজ্যের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধী নেতা হিসাবে কঠিন দায়িত্ব পালন করে গেছেন। ১৯৫২ সালে তিনি বরানগর বিধানসভা থেকে নির্বাচিত হয়ে পরে এই সভায় আসেন এবং আবার বিরোধী দলের নেতা হন। স্বাধীনতার পরবর্তীতে আমাদের রাজ্যে উদ্বাস্তু আন্দোলন, খাদ্য আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন — বহুমুখী আন্দোলনে তাঁর অনবদ্য ভূমিকা ছিল বিধানসভার ভিতরে এবং বিধানসভার বাইরেও। তিনি এই সমস্ত আন্দোলনকে সংগঠিত করতে প্রথম সারির নেতা হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিরোধী দলের যে ভূমিকা আছে সংসদীয় গণতন্ত্রে তা তিনি তাঁর জীবন দিয়ে, তাঁর কর্মপন্থা দিয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বিরোধী দলের নেতা হিসাবে তিনি সফলভাবে সেই দায়িত্ব পালন করেছেন।

পরবর্তীকালে আমরা তাঁকে দেখেছি তাকে দু’টি স্বল্পকালীন যুক্তফ্রন্ট সরকারের — (একটা ৯ মাস, একটা ১৩ মাস), উপমুখ্যমন্ত্রী হিসাবে। পরবর্তীতে বাম সরকার আসার পরে তিনি হলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং একটানা ২৩ বছর তিনি সাফল্যের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে গেছেন। সংসদীয় রাজনীতির তাঁর কয়েকটি মূল সাফল্য উল্লেখ করতে চাই। সমস্ত কর্মপন্থার মধ্য দিয়ে তিনি রাজ্যের, দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রকে সংহত করা, উন্নত করার চেষ্টা সর্বতোভাবে চালিয়ে গেছেন। তিনি আন্তরিকভাবে গণতন্ত্রকে বিশ্বাস করতেন। তাঁর নিজের জীবনে যদিও তিনি বিনাবিচারে জেল খেটেছেন কিন্তু তিনি কখনও অন্যকে বিনাবিচারে জেল খাটাননি — এটাই ছিল তাঁর বৈশিষ্ট্য। তিনি কোনো কালা আইন হাতে নেননি। তিনি সংবাদপত্রের স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ করেননি। তিনি আন্তরিকভাবে প্রচার মাধ্যমের স্বাধীনতা‌‌য় বিশ্বাস করতেন। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, গণতান্ত্রিক অধিকারগুলি, ব্যক্তি স্বাধীনতা, ট্রেড ইউনিয়নের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে তিনি আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করেছেন এবং সেটি প্রমাণ করেছেন। আমরা এটাও ভুলতে পারি না পশ্চিমবাংলা এমন একটা রাজ্য, যেখানে তাঁর নেতৃত্বে সারা দেশের মধ্যে প্রথম হিউম্যান রাইটস কমিশন গঠিত হয়। জাতীয় কমিশন তৈরি হওয়ার পর আমাদের রাজ্যে পশ্চিমবাংলায় সারা দেশের মধ্যে প্রথম। এই কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয় তাঁর নেতৃত্বে। কারণ তিনি আন্তরিকভাবে যা বিশ্বাস করতেন, সেই কাজ তিনি হাতে-কলমে প্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছেন। সারা জীবন ধরে তিনি সংসদীয় গণতন্ত্রকে এইভাবেই প্রস্ফুটিত করার চেষ্টা করেছেন।

তাঁর আর একটি দিক সম্পর্কে উল্লেখ করতেই হয় তাঁর জীবন চিন্তায়, তাঁর কর্মধারায়, তাঁর রাজনীতিতে তিনি সর্বাঙ্গীণভাবেই ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ। কোনো অবস্থাতেই কোনো ধার্মিক সাম্প্রদায়িক চিন্তা তাঁকে গ্রাস করতে পারেনি, স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি বড় বড় দু’টি ঘটনায় তার প্রমাণ রেখেছেন এই রাজ্যে। শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর সারা দেশে দুর্ভাগ্যজনকভাবে হলেও শিখ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে একটা সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা ছড়িয়ে পড়েছিল। আমাদের রাজ্যে সেই আগুনের উত্তেজনার আঁচ আমরা পেয়েছিলাম কিন্তু এই রাজ্যে কোনো অশান্তি হয়নি। তাঁর নেতৃত্বে আমাদের রাজ্য সেই অবস্থাটা পেরিয়ে আসতে পেরেছিল। ঠিক একইভাবে যখন বাবরি মসজিদ ধ্বংস হয় তখন সারা দেশে অনেক কাণ্ড হয়েছে, অবাঞ্ছিত কাণ্ড। আমাদের রাজ্যে সেই আগুনের হলকা এসেছে, কিন্তু শান্তির পরিবেশ রাখতে মূলত সক্ষম হয়েছে। নিশ্চয়ই এতে আমাদের রাজ্যের মানুষের কৃতিত্ব আছে। কিন্তু সবার উপরে ছিলেন জ্যোতি বসু, একজন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি সেই দায়িত্ব পালন করতে পেরেছিলেন বলে আমাদের রাজ্যে অশান্তি নেমে আসেনি। আজকে সারা দেশের মানুষ জানেন পশ্চিমবাংলায় ধর্মনিরপেক্ষতা সুরক্ষিত। পশ্চিমবাংলায় সাম্প্রদায়িক শক্তির জায়গা নেই। তিনি এই ঐতিহ্যকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন।

সংসদীয় রাজনীতিতে তাঁর বিশেষ ভূমিকা রাজনৈতিক নেতা হিসেবে কি? শ্রমিক আন্দোলন এবং কৃষক আন্দোলনকে তিনি রাজনৈতিক আন্দোলনের মঞ্চের মধ্যস্থলে দাঁড় করিয়েছিলেন। এই দুই শ্রেণী আমাদের দেশে বৈপ্লবিক শক্তি। তাদের চিন্তা, তাদের মুক্তি সেই রাজনীতিকেই তিনি সারা জীবন বিশ্বাস করেছিলেন। তাঁর মুখে শোনা তাঁর ভাষায় একটা ঘটনা এখনও মনে পড়ে জলপাইগুড়ি থেকে আসাম যাচ্ছিলাম ট্রেনে, গোটা ট্রেন অন্ধকার। কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে, জাপানিজরা বোমা ফেলতে পারে। অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে চলেছি জলপাইগুড়ি থেকে আসামে শ্রমিকদের মিটিং করার জন্য, অন্ধকার রাতে এই বিপদের মধ্যে যেতেই হবে। বিশ্বাস করেছি শ্রমিক‍‌শ্রেণীর মুক্তি। সেই কাজ করে গেছি, কেউ বাধা দিতে পারেনি। শ্রমিকদের এবং কৃষকদের তিনি রাজনৈতিক আন্দোলনের মাঝখানে দাঁড় করিয়েছিলেন।

(বিধানসভায় ১০ই মার্চ ২০১০ তারিখের বক্তৃতাকে ভিত্তি করে লিখিত) 

গণশক্তি, ৭ই জুলাই, ২০১৩ 

জ্যোতি বসুর জন্মশতবর্ষ

বিমান বসু 

কমরেড জ্যোতি বসুর আজ থেকে জন্ম শতবর্ষ শুরু হলো। তিনি ১৯১৪ সালের ৮ই জুলাই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আর আমা‍দের ছেড়ে চলে গেছেন ২০১০ সালের ১৭ই জানুয়ারি। জ্যোতি বসু দীর্ঘ সাত দশক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকে তাঁর জীবদ্দশায় আমাদের দে‍‌শের কমিউনিস্ট ও বামপন্থী আন্দোলনের সব থেকে বেশি পরিচিত নেতা ছিলেন। এমনকি ভারতের কমিউনিস্ট ও বামপন্থী নেতা হিসেবে বিদেশেও তিনি পরিচিত ছিলেন। জ্যোতিবাবু দেশে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন একজন কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী হিসেবে। ১৯৪০ সালে বিলেত থেকে দেশে ফিরে কমরেড মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের সঙ্গে দেখা করে পার্টিতে সর্বক্ষণের কর্মী হিসেবে কাজ করার ইচ্ছে প্রকাশ করলে তা তখন পূরণ করা হয়েছিলো।

শ্রমিক সংগঠনের কাজের মধ্য দিয়েই জ্যোতিবাবুর রাজনৈতিক কার্যকলাপ শুরু হয়েছিলো। কমরেড মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের নির্দেশে তিনি বন্দর (পোর্ট) শ্রমিকদের মধ্যে এবং রেল শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে সংগঠন গড়ার কাজে যুক্ত হন। কিন্তু জ্যোতিবাবু রেল শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে কাজ করায় বেশি স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করতেন। তাই ধীরে ধীরে রেলওয়ে ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের নেতা হয়ে উঠেছিলেন। উল্লেখ্য, ১৯৪৬ সালে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভায় রেল কেন্দ্র থেকে কমিউনিস্ট প্রার্থী হিসেবে জ্যোতিবাবু কংগ্রেসের ড. হুমায়ুন কবীরকে পরাস্ত করে জয়ী হয়ে‍‌ছিলেন।

শ্রমিক সংগঠনে কাজের সঙ্গে জ্যোতিবাবু ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হয়ে গেলেও দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মানবতার শত্রু ফ্যাসিবাসী আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে অন্যান্যদের সঙ্গে সমানভাবে সোচ্চার হয়েছিলেন। তাই সবাই মিলে ১৯৪১ সালে ‘সো‍ভিয়েত সুহৃদ সমিতির’ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত করেছিলেন কমরেড জ্যোতি বসুকে। ধীরে ধীরে জ্যোতিবাবু সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষের জীবন-যন্ত্রণা লাঘব করার আন্দোলন সংগ্রামে একজন বিশিষ্ট প্রচারক ও সংগঠক হিসেবে গড়ে ওঠেন। জ্যোতিবাবু বিধায়ক হিসেবে প্রাদেশিক আইনসভার ভিতরে শ্রমিক-কৃষক আন্দোলন, খাদ্য সমস্যা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, বন্দীমুক্তি, ব্রিটিশ পুলিসের নির্যাতন প্রভৃতি বিষয় নিয়ে আলোচনা করে আইনসভার বাইরে আলোড়ন সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন। এইভা‍‌বে নানা কাজে যুক্ত থাকার ফলে ’৪৬ সালের ১৬ই আগস্ট কলকাতায় ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা শুরু হলে তা বন্ধ করতে রাস্তায় নেমে ইতিবাচক ভূমিকা পালন ক‍‌রেছিলেন।আবার বাংলার কৃষকসমাজ ‘তেভাগা আন্দোলন’ শুরু করলে তাঁদের ন্যায্য দাবি আদায়ের কথা বারবার আইনসভার অভ্যন্তরে জোরালো ভাষায় পেশ করেছেন। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৬ মাসের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ করা হয়। যেদিন নিষিদ্ধ করা হলো অর্থাৎ ২৬শে মার্চ, সেইদিনই জ্যোতিবাবুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো। এটাই তাঁর প্রথম কারাজীবন। এরপর অনেকবারই তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন, মুক্ত হয়েছেন। আবার একবার গ্রেপ্তার থাকাকালীন সময়ে ‘হেবিয়াস কর্পাস’-এ আবেদন করে হাইকোর্টের আদেশে তিনি ১৯৫১ সালে মুক্তি পান। এরপর পার্টি আবার বৈধ হয়।

১৯৫২ সালে প্রথম সাধারণ নির্বাচনে জ্যোতিবাবু পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় কমিউনিস্ট সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত টানা তিনি বিধানসভার সদস্য ছিলেন। ব্যতিক্রম ছিলো ১৯৭২ সালে জাল-জোচ্চুরি করে সাজানো বিধানসভা তৈরি করার সময়। কমিউনিস্ট পার্টির কাজে দক্ষতা অর্জন করার ফলশ্রুতিতে ১৯৫৩-৫৪ সালে জ্যোতিবাবু পার্টির পশ্চিমবঙ্গ প্রাদেশিক কমিটির সম্পাদক নির্বাচিত হন। এই পদে তিনি ছিলেন ১৯৬০-৬১ সাল পর্যন্ত। তখনকার দিনে প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে জ্যোতিবাবু বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন। যেমন ১৯৫৩ সালে ট্রামভাড়া বৃদ্ধির বিরুদ্ধে আন্দোলন, ১৯৫৪ সালে দুর্ভিক্ষ-বিরোধী আন্দোলন, ১৯৫৬ সালে বঙ্গ-বিহার সংযুক্তি বিরোধী আন্দোলন, ১৯৫৯ সালে ঐতিহাসিক খাদ্য আন্দোলন, ১৯৬৫-৬৬ সালের আন্দোলন সহ সমস্ত আন্দোলনে জ্যোতিবাবু সামনের সারিতে থেকে লড়াই সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৬৫ সালে জ্যোতিবাবু গ্রেপ্তার হয়ে পরে ১৯৬৬ সালে মুক্ত হন, কিন্তু জ্যোতিবাবু কোনো কো‍নো সময়ে গ্রেপ্তারী এড়ানোর জন্য আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

জ্যোতিবাবু আন্দোলন সংগ্রামে যেমন যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন, ঠিক তেমন প্রশাসনের যখন যেখানে যে পদে আসীন ছিলেন, সেখানেও তিনি তাঁর দক্ষতার ছাপ ফেলেছিলেন। যেমন ১৯৬৭-৬৯-এর স্বল্পস্থায়ী যুক্তফ্রন্ট সরকারের উপ-মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করলেও রাজ্যের জনগণের কাছে মুখ্য আকর্ষণ ছিলেন আবার জ্যোতিবাবু। এ-রাজ্যে জ্যোতিবাবুই প্রথম ঘোষণা করেছিলেন যে ন্যায়সঙ্গত শ্রমিক-কৃষক আন্দোলন দমন করতে পুলিসকে ব্যবহার করা হবে না। যদিও সেই সময়ে মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বাংলা কংগ্রেসের অজয় মুখোপাধ্যায়। এরপর কংগ্রেস রাজত্বে নৈরাজ্য, সন্ত্রাস, আধা-ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসের রাজত্বের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন বিকাশের ক্ষেত্রে ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার লড়াইতে জ্যোতিবাবু মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। দেশব্যাপী জরুরী অবস্থার বিরুদ্ধে জনমত সংগঠিত করার কাজেও জ্যোতিবাবু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আর জরুরী অবস্থা অবসানের পর লোকসভা নির্বাচন ঘোষিত হলে রাজ্যে সমস্ত বামপন্থী দলসমূহকে নিয়ে বামফ্রন্ট গড়ে তোলার কাজে কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্তর সহযোগী হিসেবে কমরেড জ্যোতি বসু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

১৯৭৭ সালে প্রথমে সারা ‍‌দেশে লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং কেন্দ্রে কংগ্রেসের পরাজয়ে প্রথম অকংগ্রেসী সরকার গড়ে ওঠে। পরে রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বামফ্রন্ট জয়ী হয় এবং কমরেড জ্যোতি বসু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেই তিনি রাজ্যে নৈরাজ্যের অবসান ঘটিয়ে শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন। প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে সিদ্ধান্ত করেন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সর্বত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং সমস্ত রাজবন্দীদের মুক্তি দিতে হবে। তাই অল্প কয়েকমাসের মধ্যে ১৭০০ রাজবন্দী মুক্তি পান। এবং ১০,০০০ মিথ্যা ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহৃত হয়। এই রাজবন্দী ও মিথ্যা মামলার আসামীদের মধ্যে প্রায় সব রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা যুক্ত ছিলেন।

নির্বাচনী ইশ্‌তেহারে ৩৬ দফা কর্মসূচীর প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবে রূপায়িত করার লক্ষ্যে জ্যোতি বসু ঐকান্তিক ছিলেন। তাই সম্ভব হয়েছিলো এক বছরের কম সময়তে ত্রিস্তর পঞ্চায়েতী নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে এই নতুন পঞ্চায়েতী ব্যবস্থা নির্বাচনের মাধ্যমে সারা ভারতে প্রথম পশ্চিমবঙ্গে বাস্তবায়িত করা। ধীরে ধীরে নির্বাচনের মাধ্যমে পৌরসভা ও সমবায় সমিতি গড়ে ওঠার কাজ শুরু হলো। আসলে জ্যোতিবাবু বামফ্রন্টের ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের নীতিকে সরকারী ব্যবস্থাপনায় কার্যকরীভাবে রূপায়ণ করার কাজে একশ’ ভাগ আন্তরিক ছিলেন। গণতন্ত্রকে গ্রাসরুট লেভেলে পৌঁছে দিয়ে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেছেন।

শপথ গ্রহণ করেই জ্যোতিবাবু ঘোষণা করেছিলেন ন্যায়সঙ্গত গণ-আন্দোলন দমন করতে পুলিস ব্যবহার করা হবে না। ঘোষণা করেছিলেন সমাজের সব অংশের মানুষ, যাঁরা বিভিন্ন পেশায় যুক্ত রয়েছেন তাঁদের সকলেরই নিজের নিজের ক্ষেত্রে সংগঠিত হওয়া ও ইউনিয়ন করার অধিকার থাকবে। ফলে, রাজ্য সরকারী কর্মচারী যাঁদের কংগ্রেস আমলে চাকরি থেকে অন্যায়ভাবে বরখাস্ত করা হয়েছিলো বা সাসপেন্ড করা হয়েছিলো তাঁদের সবাইকে নিজের নিজের কর্মক্ষেত্রে পুনর্বহাল করা হয়। কলে-কারখানায় শ্রমিকদের ইউনিয়ন করার অধিকারের ওপর যে বিধিনিষেধ ছিলো তা প্রত্যাহার করা হয়। ছাত্রসংসদ নির্বাচন যা আগে বন্ধ করা হয়েছিলো, তা পুনরায় চালু করা হয়। একইসঙ্গে ভূমিসংস্কারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। ফলে ভূমিহীন চাষীদের মধ্যে সরকার অধিকৃত জমি বিলিবণ্টন করা শুরু হয়ে যায়। পরবর্তীতে পুরোনো জমিদার-জোতদারদের সিলিং বহির্ভূত জমি অধিগ্রহণ করে গরিব কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। এমনকি বর্গাচাষীর স্বার্থরক্ষা করতে ‘অপারেশন বর্গা’ চালু করা হয়।

শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে একবছরের মধ্যে এক হাজার নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয় এবং শিক্ষাকে ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত অবৈতনিক ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীসময়ে সমগ্র স্কুলশিক্ষা অবৈতনিক হয়েছে। পরিকল্পনা করে প্রাথমিক, জুনিয়র, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, কলেজের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফলে ব্যাপক ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষার অঙ্গনে এসে শিক্ষালাভের সুযোগ পেয়েছে। জ্যোতিবাবু সবসময়ে শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে উৎসাহ দিতেন। নিচের ক্লাসগুলোতে বিনামূল্যে পাঠ্যবই সরবরাহ করার নিয়মও চালু করা হয়। ফলশ্রুতিতে প্রথম প্রজন্মের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে শিক্ষালাভের সুযোগ বৃদ্ধি পেল। স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রসারিত করে প্রতিষেধকমূলক থেকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা শ্রেয় তা প্রচারে গুরুত্ব পেয়েছিলো। এইসব কাজে জ্যোতিবাবুর তদারকি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং জ্যোতিবাবুকে একজন দক্ষ প্রশাসকের আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করেছে। আবার সব দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রিসভার সদস্যদের জ্যোতিবাবু স্বাধীনভাবে কাজ করতে উৎসাহিত করতেন।

আমি লক্ষ্য করেছি, জ্যোতিবাবু রাজনৈতিক দিক থেকে প্রতিকূল পরিস্থিতি গড়ে উঠলেও আন্দোলন-সংগ্রাম ও সংগঠনের কাজ করতে কখনো দিশেহারা হতেন না। আবার প্রশাসন পরিচালনা করার সময়ও দৃঢ় মনোভাব নিয়ে তা মোকাবিলা করতেন। ১৯৬৯ সালে দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময়ে পুলিসে অসন্তোষ দেখা দিলে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে তাঁর কাছে পুলিসী পোশাকে বিক্ষোভ দেখাতে গেলে ধীরস্থিরভাবে বলেছিলেন — আপনারা বাইরে যান, পরে কথা বলবো। তিনি বিশ্বাস করতেন রাজনৈতিক কাজ করলে সমস্যা দেখা দিতে পারে কিন্তু তা ধীরস্থিরভাবে সমাধা করতে হবে। আবার তিনি মানুষের উপর আস্থা রাখতেন এবং বলতেন ‘মানুষ, একমাত্র মানুষই ইতিহাস রচনা করে। এটা ঠিকই যে মানুষ কখনো কখনো ভুলও করে। কিন্তু নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে শেষপর্যন্ত মানুষের জয়ই অবশ্যম্ভাবী।’

রাজ্যে নৈরাজ্যের অবসান ঘটিয়ে শান্তি—শৃঙ্খলার প্রতিষ্ঠা ও গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার কাজসহ নানা উন্নয়নমূলক কাজ করেই জ্যোতিবাবু সন্তুষ্ট হয়ে বসে থাকতেন না। তাই ভারতের মতো যুক্তরাষ্ট্রীয় রাষ্ট্র কাঠামোতে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক যুক্তিসঙ্গত পুনর্বিন্যাসের দাবিতে আন্দোলন পরিচালনা করার ক্ষেত্রে জ্যোতিবাবু ভারতের যে কোন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর থেকে একটু অগ্রণী অবস্থানে ছিলেন। কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক নিয়ে নানা জায়গায় অসংখ্য আলোচনাসভা হয়েছে। শ্রীনগর কনক্লেভ, কলকাতা কনক্লেভ, দিল্লি কনক্লেভ প্রভৃতি সফলভাবে আয়োজিত হয়েছে। জাতীয় বিভিন্ন বিষয়ের ওপর জ্যোতিবাবুর যুক্তিশীল বক্তব্য তাঁকে সর্বভারতীয় নেতার আসনে বসিয়েছে। স্বাভাবিকভাবে, প্রবাদপ্রতিম এই কমিউনিস্ট নেতার শতবর্ষে তাঁর কর্ম ও জীবনের নানা শিক্ষণীয় দিক বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে আমাদের পার্টির পক্ষ থেকে একবছর ধরে নানা কর্মসূচীর রূপায়ণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

কমরেড জ্যোতি বসু কমিউনিস্ট আন্দোলন ও বামপন্থী আন্দোলনের নেতা ও কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করে বিকল্পের সন্ধানে অনেক পথ হেঁটেছেন। রাজ্যে বহুবছর ধরে কোয়ালিশন সরকার চালিয়ে বর্তমান সময় যে কোয়ালিশনের সময় তা নিজের কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে জ্যোতিবাবু মূর্ত করে তুলেছেন। স্বাভাবিকভাবে ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জ্যোতিবাবুর কমিউনিস্ট ও বাম আন্দোলন সংগ্রাম ‍‌থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে তাকে বাস্তবে রূপায়িত করার অঙ্গীকার আমাদের নিতে হবে। 

গণশক্তি, ৮ই জুলাই, ২০১৩

মানুষের প্রতি অবিচল আস্থাই ছিল তাঁর শক্তির উৎস

সীতারাম ইয়েচুরি 

আগামী ৮ই জুলাই কমরেড জ্যোতি বসুর জন্মশতবর্ষের সূচনা হবে।

যদিও আমরা সবাই জানি প্রকৃতির নিয়মেই জন্ম হলে একদিন মৃত্যু আসবেই। কিন্তু এই অনিবার্য ঘটনাকে মেনে নেওয়াটা সবার পক্ষেই অত্যন্ত কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যখন বর্তমান পরিস্থিতির প্রতিটি বাঁক ও মোড়ে কমরেড জ্যোতি বসুর অনুপস্থিতি আমরা অনুভব করছি। সারাজীবন তিনি ভারতে এবং অবশ্যই সারা বিশ্বে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করেছেন। তাঁর সেই অসমাপ্ত কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব তাঁর অনুপস্থিতিতে আমাদের ওপর বর্তেছে।

ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার 

জ্যোতি বসুর সাত দশকের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন এবং আধুনিক ভারতের বিবর্তন একই গতিতে চলেছে। এই বিশেষ কারণে, তিনি সবসময়ই অনুপ্রেরণার উৎস এবং নবীন প্রজন্মের কাছে আদর্শস্থানীয়। তাঁর উত্তরাধিকার একইভাবে এই প্রেরণার উৎস হয়েই থাকবে। প্রকৃতপক্ষে শুধুই কমিউনিস্ট আন্দোলনের নয়, তিনি আধুনিক ভারতের একজন অন্যতম প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব। ইংল্যান্ডে গিয়ে ব্যারিস্টার হওয়ার সময় তিনি কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রতি আকৃষ্ট হন ও এই মতাদর্শকে বরণ করেন। ১৯৪০ সালে ভারতে ফিরে আইনজীবীর কালো কোট না পরে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করে সরাসরি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কার্ল মার্কস একসময় বলেছিলেন যে যখন একটি ভাবনা জনগণের মনকে আলোড়িত করে, তখন তা এক বাস্তব শক্তি হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনতার ইচ্ছা যখন ভারতের মানুষকে আলোড়িত করছে, তখন জ্যোতি বসু কমিউনিস্ট আন্দোলনে যোগদান করেছিলেন। যদিও স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্র চরিত্র এবং তার উপাদান কী হবে তা নিয়ে তাঁর চিন্তা আরও অগ্রসর ছিল। তাঁরা মনে করতেন, যে রাজনৈতিক স্বাধীনতা আসবে তাকে প্রতিটি ভারতবাসীর সত্যিকারের অর্থনৈতিক স্বাধীনতাতে রূপান্তরিত করা প্রয়োজন। এর অর্থ হচ্ছে একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজ তৈরি করা যেখানে মানুষের উপর মানুষের শোষণ বিলুপ্ত হবে। তাঁর এই ইচ্ছা-আবেগ কখনও লঘু হয়ে যায়নি। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি ভারতের জনগণের জন্য কাজ করে গেছেন। তাঁর দীর্ঘ ও বর্ণময় জীবনে তিনি বহু ঝড়-ঝঞ্ঝার সম্মুখীন হয়েছেন, কিন্তু আদর্শের প্রতি তিনি ছিলেন অবিচল। মতাদর্শের সঙ্গে দায়বদ্ধতার মেলবন্ধনের কারণেই জ্যোতি বসু একজন ‘আদর্শ মানুষ’ হয়ে উঠেছেন।

স্বাধীনোত্তর ভারত বড় বড় সংগ্রামের মধ্যে আবর্তিত হচ্ছিল, যার ফলশ্রুতিতে সামন্তবাদী রাজশক্তি শাসিত রাজ্যগুলি ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়। কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে সংগ্রামগুলি ভূমি সংস্কারের দাবিতে এবং সামন্ততান্ত্রিক জমিদারব্যবস্থাগুলি বিলোপ করার বিষয়টিকে সামনে নিয়ে আসে। এই সময়েই ভারতের বিভিন্ন ভাষাভাষী জাতি, যারা স্বাধীনতা সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন, তারা নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় পেতে চাইছিলেন। এই প্রক্রিয়ায় শেষপর্যন্ত ১৯৫৬ সালে ভারতের রাজ্যগুলির ভাষাভিত্তিক পুনর্গঠন হয়।

আমাদের দেশের ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক চরিত্র এবং প্রশাসনিক কাঠামোর প্রতি জ্যোতি বসুর দৃঢ় প্রত্যয় তাঁর কর্মপদ্ধতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত থেকেছে। সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলি সর্বদাই আধুনিক ভারতের বিবর্তনের বিরোধী শক্তির প্রতিভূ হয়ে থেকেছে। জ্যোতি বসু এই সাম্প্রদায়িক শক্তিকে বিচ্ছিন্ন এবং পরাস্ত করা ও ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিকে শক্তিশালী করার জন্য কাজ করে গেছেন। পাশাপাশি, ভারতের রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে জনগণের অর্থনৈতিক স্বাধীনতায় রূপান্তরিত করার জন্য, সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে তিনি সম্পূর্ণভাবে মনোনিবেশ করেছিলেন। কীভাবে তা অর্জিত হবে এই বিষয়ে ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ভেতরে এক তীব্র মতাদর্শগত লড়াই শুরু হয়। বাম ও দক্ষিণপন্থী এই দুই বিচ্যুতির বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই করে অন্যান্য কমরেডদের সাথে জ্যোতি বসু সি পি আই (এম) গঠন করেছিলেন। যাঁরা লক্ষ্যপূরণে সংসদীয় এবং সংসদ- বহির্ভূত কার্যক্রমকে একত্রিত করে লড়াই করার সঠিক পথ গ্রহণ করেছিলেন। সংসদীয় গণতন্ত্র, তার প্রতিষ্ঠান এবং মঞ্চগুলিকে ব্যবহার করে আন্দোলন এবং একইসাথে জনগণের কাছে আরও বেশি সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার সংগ্রামে জ্যোতি বসু ছিলেন অনবদ্য। আধুনিক ভারতের সংহতির লক্ষ্যে ভূমি সংস্কার রূপায়ণ, পঞ্চায়েতীরাজ প্রতিষ্ঠানগুলির উন্নতিসাধন করে গণতন্ত্রকে শিকড়ের গভীরে পৌঁছে দেওয়া, ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে শক্তিশালী করার জন্য কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি বিষয়গুলি জ্যোতি বসুর বিশেষ অবদান হিসাবে স্বীকৃত। এই সমস্ত বিষয়গুলি ছাড়া, জ্যোতি বসুর ব্যক্তিত্বের প্রধান দিক যা জনগণকে আকৃষ্ট করতো তা হলো মানুষের প্রতি তাঁর অবিচল আস্থা। তিনি সবসময় পার্টি ও কর্মীদের মানুষের কাছে যাওয়ার কথা বলতেন, আমরা কি করছি তা ব্যাখ্যা করতে বলতেন এবং মানুষের প্রতি বিশ্বাস রাখতে বলতেন। মানুষের প্রতি  এই বিশ্বাসই ছিল তাঁর শক্তি। মানুষ তাই তাঁর সততা নিয়ে কোনোদিন প্রশ্ন তোলেননি, এমনকি সন্দেহ প্রকাশও করেননি। 

মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু 

একটানা ২৩ বছর ধরে মুখ্যমন্ত্রী থাকার পর ২০০০ সালে স্বেচ্ছায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে সরে আসেন জ্যোতি বসু, যা ভারতের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং নৈতিকতায় এক নতুন মাত্রা যোগ করে। আগের মতো প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে সক্ষম হচ্ছিলেন না বলে তাঁর নিজের মধ্যেই অসন্তুষ্টি ছিল এবং তাই মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে তাঁর সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছায় সি পি আই (এম) পলিট ব্যুরো সম্মতি দিয়েছিল।

১৯৭৭ সালে যখন জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন তখন পশ্চিমবঙ্গের দারিদ্র্যের অনুপাত ছিল প্রায় ৫২ শতাংশ। ১৯৯৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২৬ শতাংশ, প্রতি বছর ৪.২ শতাংশ হারে হ্রাস। এভাবে ভারতের রাজ্যগুলির মধ্যে দারিদ্র্য দূরীকরণে পশ্চিমবঙ্গ প্রথম স্থান লাভ করে। কেরালা ছিল দ্বিতীয় স্থানে প্রতি বছর ৩.৭ শতাংশ দারিদ্র্য হারে হ্রাস করে (সূত্র: ভারত-দারিদ্র্য হ্রাসের নীতিগুলি—বিশ্বব্যাঙ্ক, ২০০০)। তুলনামূলকভাবে, মহারাষ্ট্রে ১৯৯৪ সালে দারিদ্র্যের অনুপাত ছিল ৪৩.৫ শতাংশ। কৃষিক্ষেত্রে একইভাবে উন্নতি ঘটে। খাদ্যে ঘাটতি রাজ্য থেকে এই সময়েই পশ্চিমবঙ্গ উদ্বৃত্ত রাজ্যে পরিণত হয়। ধান উৎপাদনে শীর্ষস্থানে পৌঁছায় এই রাজ্য। অপারেশন বর্গার সাফল্যের ফলশ্রুতিতে রাজ্যের ৯০ শতাংশ কৃষিজমির মালিক হন প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষীরা। জ্যোতি বসুর মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়ে ভূমিহীনদের মধ্যে ১৩ লক্ষ একর জমি বণ্টন করা হয়েছে। অতীতে কায়েমী স্বার্থ বেআইনীভাবে এই জমি দখলে রেখেছিল।

জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে বামফ্রন্ট সরকার অন্ধভাবে উদারনৈতিক অর্থনীতিকে আঁকড়ে ধরে থাকেনি। বরং উদারনীতির প্রবক্তা যারা অর্থনীতির পরিধি থেকে রাষ্ট্রকে সরিয়ে রাখার কথা বলেছিলেন এবং রাষ্ট্রের সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি বিসর্জন দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন—তাদের বিরুদ্ধে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার অর্থনৈতিক উন্নয়নে এবং ভূমিসংস্কারের ক্ষেত্রে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছে।

অনবদ্য ব্যক্তিগত গুণাবলী 

২৫ বছরের বেশি সময় আমাদের পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে জ্যোতি বসুর সাথে কাজ করতে গিয়ে তাঁর অনেক প্রশংসনীয় গুণ দেখেছি যা অনুসরণযোগ্য। একটি হলো, মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে যুক্তির শক্তির উপর তাঁর অবিচল আস্থা। আবেগের আশ্রয় নিয়ে কোনোদিন কোনো তর্কেই তাঁকে হারানো যায়নি। বসুর ব্যক্তিত্বের একটি প্রধান দিক হলো তাঁর মানসিকতা। তাঁর মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন আমি কয়েকবার তাঁর সাথে বিদেশ ভ্রমণ করেছি। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে স্বাভাবিকভাবেই তিনি কিছু বিশেষ সুবিধা পাওয়ার অধিকারী ছিলেন। কিন্তু ‍‌তিনি সবসময়ই অন্য কমরেডদের সাথে ভ্রমণ করতে পছন্দ করতেন এবং মুখ্যমন্ত্রী থাকার শেষদিন পর্যন্ত তিনি ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের ‘ইকনমি ক্লাস’-এই ভ্রমণ করেছেন। এই সময়গুলিতে তিনি কিন্তু তাঁর সঙ্গী কমরেডদের বিষয়ে সজাগ থাকতেন, তাঁদের সুবিধা এবং প্রয়োজন সম্বন্ধে খবর রাখতেন। আমি একবারও তাঁকে ধৈর্য হারাতে দে‍খিনি।

জ্যোতি বসুর আর একটি গুণ হলো স্বেচ্ছাপ্রণোদিত শৃঙ্খলা, যা তাঁর ব্যক্তি ও রাজনৈতিক জীবনে তিনি সর্বদা মেনে চলেছেন। ১৯৯৬ সালে সংযুক্ত ফ্রন্ট সরকারের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাবের সপক্ষে তিনি মত দেন কিন্তু কেন্দ্রীয় কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠের মতে প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যায়। সেই সময় তিনি শৃঙ্খলাবদ্ধ সৈনিকের মতো মনোভাব দেখিয়েছিলেন। ১৯৯৮ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত পার্টি কংগ্রেসে কেন্দ্রীয় কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠের মত গৃহীত হয়। তাঁর ব্যক্তিগত মতামত যাই থাকুক তিনি শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠের মতকেই তুলে ধরেছেন এবং তাঁর দায়িত্ব পালন করে গেছেন। কমিউনিস্ট পার্টির লৌহদৃঢ় শৃঙ্খলা এবং সাংগঠনিক নীতিগুলির প্রতি তাঁর আনুগত্য অনুসরণযোগ্য। তরুণ প্রজন্মের কাছে এগুলি শিক্ষণীয় গুণাবলী।

১৯৯৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমরা দুজনে কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে ফিদেল কাস্ত্রো এবং পার্টি নেতাদের সাথে আলোচনার জন্য কিউবা যাই। স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদ হয়ে ফেরার সময় আমাদের প্রায় একদিন মাদ্রিদে থাকতে হয় দেশে ফেরার বিমানের জন্য। স্পেনে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত কিউবা যাওয়ার পথে আমাদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, আমরা কোনো বিশেষ দ্রষ্টব্য স্থানে যেতে চাই কি না। জ্যোতি বসু আমার দিকে তাকান। আমি বলি পিকাসোর ‘গুয়ের্নিকা’-র মূল ছবিটি যেহেতু মাদ্রিদের একটি মিউজিয়ামে আছে, তা দেখা যেতে পারে। কিন্তু কিউবা থেকে ফেরার সময় জ্যোতি বসু ঐ মিউজিয়ামে আর যেতে চাইলেন না শারীরিক কারণেই। তিনি আমাকে যেতে বললেন। এই কথায় ভারতের রাষ্ট্রদূত বললেন, মিউজিয়ামটি ঐদিন বন্ধ থাকার কথা। কিন্তু জ্যোতি বসুর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করে তা খোলা রাখা হয়েছে। এই কথা শুনে জ্যোতি বসু বললেন, ‘ওরা জ্যোতি বসুকে কোনোদিন দেখেননি, তাই চিনবেন কি করে কে জ্যোতি বসু। সীতারাম যাক, ওরা বুঝবেন না কে গেছেন।’ শেষ পর্যন্ত আমি গেলাম, মিউজিয়াম খোলা ছিল এবং আমি ‘গুয়ের্নিকা’ দেখলাম।

সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে চলো 

আধুনিক ভারতের সংহতি, রাজনৈতিক নৈতিকতা জ্যোতি বসুর জীবন এবং কাজের মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে এবং এই গুণাবলী অর্জিত হতে পারে তাঁর জীবনধারাকে অনুসরণ করার মধ্যে দিয়ে। ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করা, রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে জনগণের প্রকৃত অর্থনৈতিক উন্নয়নে রূপান্তরিত করার অসমাপ্ত কাজ এই সংহতির রূপরেখাকে সূত্রায়িত করবে। দেশ এবং জনগণের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করার মর্মবাণীকে আমাদের শক্তিশালী করতে হবে।

২০০৩ সালের ৪ঠা এপ্রিল চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য তাঁর মরণোত্তর দেহদানের অঙ্গীকারপত্রে সই করতে গিয়ে জ্যোতি বসু লিখেছিলেন, ‘একজন কমিউনিস্ট হিসাবে, জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত মানবজাতির সেবায় নিয়োজিত থাকার জন্য আমি অঙ্গীকারবদ্ধ। আমি খুশি যে এখন এমনকি মৃত্যুর পরেও আমি এই সেবা করতে পারবো।’

লড়াই করার অদম্য ক্ষমতা সারা জীবন ধরে দেখিয়েছেন জ্যোতি বসু। মৃত্যুর সময়ও তিনি লড়াই চালিয়ে গেছেন। তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করার পর সবাই যখন আশা ছেড়ে দিয়েছেন, তখনও সবাইকে অবাক করে তিনি ১৭ দিন লড়াই চালিয়ে গেছেন। ‘কখনও ছেড়ে দাও বলবে না’ এই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত।

তিনি পলিট ব্যুরোর প্রথম ৯ জন সদস্যের অন্যতম এবং ঐ ঝোড়ো দিনগুলিতে সি পি আই (এম) প্রতিষ্ঠার সময় নবরত্নের শেষ ব্যক্তি হিসাবে তিনি বিদায় নিয়েছেন। মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে আমাদের সংগ্রামকে আরও শক্তিশালী করার মাধ্যমে আমরা জ্যোতি বসুর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারবো।

গণশক্তি, ৭ই জুলাই, ২০১৩

Published in: on জুলাই 10, 2013 at 7:48 অপরাহ্ন  মন্তব্য করুন  

জ্যোতি বসু, আমার কমরেড

অশোক ঘোষ

কমরেড জ্যোতি বসুর সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৪৮ সালে। বলা যায় এক দুর্যোগের সময়ে। তখন তিনি অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি, সি পি আই-এর প্রথম সারির নেতা। তখন ফরওয়ার্ড ব্লক এবং সি পি আই, দুই দলই খুব ঝড়-ঝাপটার মধ্য দিয়ে চলেছে। আমাদের পার্টি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছিল কিছুকালের জন্য, নিষিদ্ধ হয়েছিল সি পি আই-ও। ১৯৫২ সালের প্রথম বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনে তিনটি ইস্যু উঠে এসেছিল : রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তির জন্য আন্দোলন, উদ্বাস্তু আন্দোলন ও খাদ্য আন্দোলন। পরিস্থিতি এমনই যে আমরা বিরোধীরা প্রয়োজন অনুভব করছিলাম যে বামপন্থী দলগুলির মধ্যে কংগ্রেস-বিরোধী ঐক্য গড়ে তোলা দরকার। আর এই ঐক্যের বিষয়টিই পারস্পরিক সংগ্রামী বন্ধন গড়ে তুলল আমার এবং জ্যোতি বসুর মধ্যে। আমি তখন ফরওয়ার্ড ব্লকের বাংলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক। জ্যোতিবাবু তখন তাঁর পার্টির ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনের নেতা এবং পার্টির প্রধান মুখ। সেই সময়ে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর দাদা শরৎচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে বিভিন্ন ছোট ছোট বামপন্থী শক্তিকে নিয়ে গড়ে উঠেছিল ইউনাইটেড সোস্যালিস্ট অর্গানাইজেশন বা ইউ এস ও। আমাদের চেষ্টা ছিল তাদেরও সঙ্গে নেওয়া। শরৎচন্দ্র বসুর কাছে জ্যোতিবাবু এবং আমি গিয়েছিলাম। কিন্তু পুরোপুরি বাম ঐক্য হয়নি। আর এস পি সেই সংযুক্ত ফ্রন্টে যোগ দেয়নি। যাইহোক, ১৯৫১ সালের ২৩শে নভেম্বর আমাদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া হয় এবং একটি ঘোষণা প্রকাশ করা হয়। সেখানে সি পি আই-এর পক্ষে জ্যোতিবাবু এবং ফরওয়ার্ড ব্লকের পক্ষে আমার সই ছিল। সেই বিধানসভা নির্বাচনে সি পি আই ২৮টি আসনে জয়লাভ করে, ফরওয়ার্ড ব্লকের শক্তি দাঁড়ায় ১৪। স্পিকার পদে ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা জ্যোতিষ ঘোষের নাম প্রস্তাব করেছিলেন জ্যোতিবাবু স্বয়ং। এইভাবে গড়ে উঠেছিল কংগ্রেস-বিরোধী সংযুক্ত ফ্রন্ট।

তারপর অনেক ঘটনা, অনেক আন্দোলন। উদ্বাস্তু আন্দোলন, খাদ্য আন্দোলন ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত হয় ট্রামভাড়া বৃদ্ধি‍রোধ আন্দোলন। পরবর্তীতে আরও। যতদূর মনে পড়ে ১৯৫৩ সালে জ্যোতিবাবু তাঁর পার্টির প্রাদেশিক সম্পাদকের দায়িত্ব পান। তারপর ওঁর মূল ক্ষেত্র হয়ে ওঠে ‘সংসদীয় রাজনীতি’, অন্যদিকে আমি আমাদের পার্টির সাংগঠনিক কাজেই ব্যাপৃত থাকি। ১৯৬৭ সাল আমাদের আরও কাছাকাছি এনেছিল। নির্বাচনের আগে সার্বিক বাম ঐক্য না হলেও নির্বাচনের পরে বামপন্থীরা একজোট হন এবং রাজ্যে প্রথম অকংগ্রেসী যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হয়। এই পরিবর্তনে জ্যোতি বসুর ভূমিকা ছিল বিরাট। এই ভূমিকা আরও পরিব্যাপ্ত হয় দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠনের সময় ১৯৬৯ সালে, প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকারকে খারিজ করে দেওয়ার প্রেক্ষিতে, যদিও সকলেই জানেন দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকার স্থায়িত্ব লাভ করেনি। কেন করেনি, সে কথাও কারোর অজানা নয়।

এরপর পশ্চিমবঙ্গের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে ঝড়। তারপর জরুরী অবস্থা। এই পরিস্থিতি বামপন্থীদের কাছাকাছি আসতে বাধ্য করেছে, বলা যায় জ্যোতিবাবুর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতাও বেড়ে ওঠে এই সময়েই। ১৯৭৭ সালের উল্লেখের প্রয়োজন নেই। শুধু বলতে পারি, জ্যোতি বসু, সি পি আই (এম) রাজ্য সম্পাদক প্রমোদ দাশগুপ্ত, আর এস পি-র রাজ্য সম্পাদক মাখন পাল, আর আমি—আমাদের চারজনের সেই সময়ের প্রতিটি দিনের উত্তেজনাময় প্রবাহের কথা, যখন আমরা ভালোভাবেই বুঝতে পারছিলাম, জনগণই শেষ কথা এবং বামপন্থী ঐক্যই পারে জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়িত করতে। এছাড়া কোনোও পথ নেই। পরবর্তীকালে বামফ্রন্টের বিভিন্ন বৈঠকেও দেখেছি, মতের ভিন্নতা নিয়ে যখন কথা চালাচালি হচ্ছে, জ্যোতিবাবু বলে উঠেছেন, বামঐক্যকে রক্ষা করতে হবে সবার আগে, তারপর অন্য কথা। প্রশাসনিক দক্ষতার ক্ষেত্রে ক্রমশ অনন্য এক স্তরে চলে গিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু কোনো বিষয়ে যখন কিছু বলেছি, অপরিসীম গুরুত্ব দিয়েছেন। কাজে দক্ষতার জন্য, ব্যক্তিত্বের কারণে তাঁর আচরণে কিছু রাশভারী প্রকাশ এসেছে; কিন্তু আমি বহুবার প্রত্যক্ষ করেছি, সেই রাশভারী আচরণের পিছনে নিহিত থাকা এক সমব্যথী মানুষকে, যিনি দেশের মানুষের কথা বুঝতে পারতেন, বুঝতে চাইতেন। শুধু রাজ্যে নয়, জাতীয় স্তরেও বামঐক্য গড়ে তোলার ব্যাপারে তিনি যে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন, তা-ও মনে রাখার মতো।

অসুস্থ হওয়ার পর দেখা সাক্ষাৎ একেবারেই কমে যায়। জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানাতে যেতাম। আর কখনও কখনও হয়তো টেলিফোন। একটি মানুষের কণ্ঠস্বর শুনতে পেতাম, যাঁকে বন্ধু বলে, কমরেড বলে মানি। শতবর্ষে সেই বন্ধুজনকে প্রণাম জানাই।

গণশক্তি, ৭ই জুলাই, ২০১৩

 

 

Published in: on জুলাই 10, 2013 at 7:38 অপরাহ্ন  মন্তব্য করুন  

কমরেড মণি সিংহকে স্মরণ করা জরুরীঃ জ্যোতি বসু

বিশিষ্ট কমিউনিসট নেতা মণি সিংহ স্মরণে গ্রন্থ প্রকাশিত হচ্ছে জেনে খুশি হলাম। এই উপমহাদেশে একেবারে গোড়ার যুগ থেকে যারা কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, মণি সিংহ তাদের অন্যতম। কৈশোরেই তিনি অনুশীলন সমিতির বিপ্লববাদী কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন। পরবর্তী কালে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদেন। বিশের দশকের শেষের দিকে তিনি কলকাতার মেটিয়াবুরুজ অঞ্চলে শ্রমিকদের সংগঠিত করার কাজে নেমে পড়েন। ঐ সময়ে কলকাতা ও তার আশপাশে বেশ কিছু শ্রমিক ধর্মঘটে তিনি সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন। ১৯২৮ সাল থেকে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী হন। সেই সময় মুজফ্ফর আহমদ, বঙ্কিম মুখার্জি, ধরণী গোস্বামী, আবদুর রেজ্জাক খাঁ, আবদুল মোমিন, রাধারমণ মিত্র, গোপেন চক্রবর্তী প্রমুখের সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন।

তখন কমিউনিস্ট পার্টি অব গ্রেট ব্রিটেনের (সিপিজিবি) পক্ষ থেকে যেসব নেতাকে ফিলিপ স্প্রোট, বেন ব্রাডলি ভারতে পাঠানো হয়েছিল তাদের সঙ্গেও মণি সিংহ শ্রমিকদের সংগঠিত করার কাজে যুক্ত ছিলেন। ১৯২৯ সালে মীরাট ষড়যন্ত্র মামলায় মণি সিংহ গ্রেফতার না হলেও পুলিশ তার বাসস্থান ও ইউনিয়ন অফিস দীর্ঘক্ষণ তল্লাশি করেছিল। ১৯৩০ সালে চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ সংগঠিত হওয়ার পর বাছবিচার না করে ব্রিটিশ সরকার শত শত রাজনৈতিক কর্মীকে গ্রেফতার করে এবং মণি সিংহও ঐ বছর গ্রেফতার হন। বিভিন্ন জেল, ক্যাম্প ঘুরিয়ে এনে ১৯৫৩ সালে ময়মনসিংহ জেলার সুসং-এ তার নিজের বাড়িতে তাকে নজরবন্দী করে রাখা হয়।

এই সময় থেকে মণি সিংহ কৃষক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়তে থাকেন। ১৯৩৭ সালে বাঁকুড়ার পত্রসায়রে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কৃষক সভায় প্রথম রাজ্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং কয়েক বছরের মধ্যেই কৃষক সভার সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পায় উল্লেযোগ্য হারে। এই অবস্থায় ময়মনসিংহের হাজং ও অন্যান্য দরিদ্র কৃষকরা শোষণমূলক টংক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হওয়ার সুযোগ পায় এবং সমগ্র জেলায় দীর্ঘস্থায়ী কৃষক আন্দোলনের সুত্রপাত ঘটে। সুসং ও সন্নিহিত অঞ্চলের হাজং ও মুসলমান কৃষকদের যে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল তার অন্যতম শীর্ষ নেতা ছিলেন মণি সিংহ।

এ প্রসঙ্গে স্মরণীয়, আমি ১৯৪০ সালে বিলেত থেকে দেশে ফিরি ও তখন থেকে কমিউনিস্ট পার্টির হয়ে কাজ করতে শুরু করি। ১৯৪২ সালে ময়মনসিংহের নেত্রকোনা শহরে ফ্যাসিবিরোধী সম্মেলন হয়। সেই সম্মেলনে বঙ্কিম মুখার্জি, ভুপেশ গুপ্ত, মণিকুন্তলা সেনের সঙ্গে আমিও নেত্রকোনায় গিয়েছিলাম। যতদূর মনে পড়ছে ঐ রকম সময়েই মণি সিংহের সঙ্গে আমার আলাপ হয়। তারপরেও আমি পূর্ববঙ্গে ও বিশেষত ময়মনসিংহে বেশ কয়েকবার গিয়েছি। তা’ছাড়া আমার দুই সহকর্মী ভুপেশ গুপ্ত ও স্নেহাংশু আচার্য-দু’জনেরই বাড়ি ছিল ময়মনসিংহে। তাঁদের বাড়িতে আমি গিয়েছি। সুসং যখন মুক্ত এলাকা ঘোষিত হয়, তখন মণি সিংহ সেই মুক্ত এলাকায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। স্নেহাংশু আমাকে নিয়ে খেত-মাঠ ভেঙ্গে জিপ চালিয়ে সেখানে গেল। যথার্থই মুক্ত এলাকা। চারদিকে লাল পতাকা উড়ছে। সেখান থেকে বক্তৃতা দিয়ে ফেরার সময়ে গাড়িতে আমাদের সঙ্গে আত্মগোপনকারী দু’জন কর্মী ছিলেন। ফেরার পথে মিলিটারি আমাদের ধরল। তাদের আলো দেখেই দু’জন কর্মী গাড়ি থেকে নেমে গা-ঢাকা দিলেন। আমাদের ধরে মিলিটারিরা থানায় নিয়ে গেল। স্নেহাংশু ময়মনসিংহ মহারাজার ছেলে বলে নিজের পরিচয় দেয়াতে আমাদের ছেড়ে দিল। আমি তখন বিধান সভার সদস্য। অবশ্য ময়মনসিংহে ফিরে আসার পরই তারা আমাকে এক ‘এক্সটার্নমেন্ট অর্ডার’ ধরিয়ে দিল। অগ্যতা আমাকে সেখান থেকে চলে আসতে হলো। 

যতদূর মনে পড়ছে তখন জনৈক মিস্টার বাস্টিন ছিলেন মৈমনসিংহের জেলাশাসক। তিনি ছিলেন অক্সফোর্ড থেকে পাস করে আসা ছাত্র। তিনিই আমাকে এক্সটার্নমেন্ট অর্ডার ধরিয়ে দেন। আমি কলকাতায় এসে বিধান সভায় পয়েন্ট অব অর্ডার তুলি। তখন সোহরাওয়ার্দী বাংলার প্রধান মন্ত্রী। তাকে বলি, ঐ জেলাশাসক কী করে আমাকে ময়মনসিংহ থেকে বহিষ্কার করলেন? তিনি নাকি আবার অক্সফোর্ডের পন্ডিত। তাই শুনে সোহরাওয়ার্দী বললেন, উনি আপনার প্রতি অন্যায় করেছেন। যাকগে যা হয়ে গেছে তা ভুলে যান আপনি। এ ঘটনা আমার পুঙ্খানুপুঙ্খ মনে নেই। তবে দেখলাম মণি সিংহ তার জীবন সংগ্রাম বইতে এ বিষয়ে লিখেছেন। তিনি লিখছেন, ” জ্যোতি বসু ও স্নেহাংশু আচার্য তার ময়মনসিংহ পৌঁছে জিপযোগে নালিতাবাড়ি যান। নালিতাবাড়ির প্যারামিলিটারির কমান্ডার তাদের আটক করেন এবং তাদের নিকট থেকে ক্যামেরা কেড়ে নেয়া হয়। কমান্ডার ছিলেন অবাঙালী। তাদের বলা হয়, তোমরা এখানে এসেছ কেন? তোমাদের আগামী কাল ময়মনসিংহ জেলে পাঠানো হবে। জ্যোতি বসু তখন একজন এমএলএ-আইন পরিষদের সদস্য, ব্যারিস্টারও বটে। জ্যোতি বসু ও স্নেহাংশু আচার্য দু’জনই ব্যারিস্টার। তারা দুই ঘণ্টা তর্ক-বিতর্ক করলেন, কিন্তু কাজ হলো না। তখন স্নেহাংশু আচার্য অন্য উপায় না দেখে শেষ অস্ত্র নিক্ষেপ করলেন। স্নেহাংশু বললেন, জান আমি কে? আমি ময়মনসিংহের রাজকুমার। একথা বলার পর ভোল পালটে গেল। ‘তুমি মহারাজকুমার!’ কমান্ডার বললেন, তোমাদের জন্য কি করতে পারি? চা প্রভৃতি এসে গেল, ক্যামেরা ফেরত দেয়া হলো। কমান্ডার বললেন, ‘জিপ লাগলে আর একটা জিপ নিয়ে যাও।’ সেখান থেকে ফিরে স্নেহাংশু আচার্য আমাকে বলেছিলেন, ‘দেখুন আপনারা সামন্ততন্ত্র উচ্ছেদের জন্য লড়াই করছেন কিন্তু মানুষের মধ্যে সামন্ততন্ত্রের উপর কি শ্রদ্ধা! এই তো দেশের অবস্থা।’ 

এ প্রসঙ্গে বলি, হাজং অঞ্চলে কৃষকদের উপর যে অত্যাচার হয়েছিল সে বিষয়ে ১৯৪৭ সালে আমি ও স্নেহাংশু আচার্য কমিউনিস্ট পার্টির তরফে রিপোর্ট সংগ্রহ করেছিলাম। রেইন অব টেরর ওভার দি হাজংস-এ ‘রিপোর্ট অব দি এনকোয়ারি কমিটি’ নামে ঐ দলিলটি জওহরলাল নেহরুর কাছে পাঠানো হয়েছিল। 

দেশ ভাগের পর যে অল্প কয়জন কমিউনিস্ট নেতা পূর্ব পাকিস্তানে থেকে যান মণি সিংহ তাদের অন্যতম। তারপর থেকে মণি সিংহের সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ আর ছিল না। যদিও পূর্ব পাকিস্তান তথা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের কৃষক, শ্রমিকসহ অজস্র গণ-আন্দোলনে, বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে মণি সিংহ নেতৃত্ব দিয়েছেন। কমিউনিস্ট আন্দোলনকে প্রসারিত করার কাজে তার প্রচেষ্টা, আত্মত্যাগ, ভোলার নয়। আজ তাকে স্মরণ করার মধ্যে দিয়ে আমাদের বুঝতে হবে ফেলে আসা দিনগুলিতে কমিউনিস্ট আন্দোলনে সাফল্য কি, তার ব্যর্থতাইবা কোথায়। এটা বুঝতে পারলে আমাদের ভবিষ্যত চলার পথ আমরা ঠিক করতে পারব। শুধু বাংলাদেশেই নয়, এই গোটা উপমহাদেশে খেটে-খাওয়া মানুষের জীবন যন্ত্রণার উপশম হয়নি বরং তা আরও বেড়েছে। 

সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমাদের এখনও অনেক পথ চলা বাকি। মণি সিংহদের মতো নেতাদের অবদানকে স্মরণ করা জরুরী। কত অসুবিধার মধ্যে কত অত্যাচারের মুখোমুখি হয়ে যে তাদের কাজ করতে হয়েছে তা আজকের প্রজন্মের অনেকের পক্ষে হয়তো আন্দাজ করাই সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা যদি তাদের কাছে মণি সিংহদের কথা তুলে ধরতে পারি তবে তারা লড়াই করার নতুন প্রেরণা পাবেন। গ্রন্থ প্রণয়নের উদ্যোক্তাদের আমি ধন্যবাদ জানাচিছ। 

www.sangbad.com.bd

ঢাকা বুধবার, ১৪ মাঘ ১৪১৬, ১০ সফর ১৪৩১, ২৭ জানুয়ারি ২০১০

Published in: on জুন 30, 2010 at 4:36 অপরাহ্ন  মন্তব্য করুন  

স্মৃতির পাতা থেকে কিছু কথা : জ্যোতি বসু

আমার বয়স এখন ৯৪ চলছে। পুরনো অনেককিছুই এখন মনে পড়ে না। গত ৬৭ বছর ধরে আমি কমিউনিষ্ট পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী। ১৯৪০ সালে বিলেত থেকে ফিরে আসার পর কমরেড মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ আমাকে পার্টি সদস্যপদ দেন। তখন থেকেই সবসময়ের রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে কাজ করা শুরু করেছি।

অবশ্য তার আগে বিলেতে থাকতেই আমি মার্কসবাদে আকৃষ্ট হই এবং গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিষ্ট পার্টির পরিচালনায় কাজ করা শুরু করেছিলাম। সেখানে প্রবাসী ভারতীয় ছাত্রদের সংগঠিত করার কাজ আমরা করতাম। গড়ে উঠেছিল লন্ডন মজলিস, যার প্রথম সম্পাদক ছিলাম আমি। ভারতীয় ছাত্রদের নিয়ে তৈরি হয়েছিল কমিউনিষ্ট গ্রুপ। সকলের নাম আমার মনে নেই। তবে ভূপেশ গুপ্ত, স্নেহাংশু আচার্য, ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত, পি এন হাক্‌সার, মোহন কুমারমঙ্গলম, রজনী প‌্যাটেল, এন কে কৃষ্ণান, নিখিল চক্রবর্তী, অরুণ বোস প্রমুখ এতে ছিলেন বলে মনে পড়ছে। লন্ডনে থাকতেই আমরা কয়েকজন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে দেশে ফেরার পর সর্বক্ষণের পার্টিকর্মী হিসাবে কাজ করবো। ১৯৪০ সালে বিলেত থেকে জাহাজে করে প্রথমে বোম্বাইতে এসে নামলাম। নেমেই যোগাযোগ করলাম কমিউনিষ্ট পার্টির নেতাদের সঙ্গে।

আমার বাড়ির কেউ অবশ্য এই সিদ্ধান্তে খুশি হননি। বাবা চেয়েছিলেন ছেলে বিলেত থেকে যখন ব‌্যারিস্টারি পাশ করে এসেছে, তখন প্র্যাকটিস্‌ শুরু করুক, রোজগার করুক। আসলে রাজনীতির সঙ্গে আমাদের পরিবারের কোনও যোগাযোগ ছিল না। বাবা ডাক্তারি করতেন, দুই জ‌্যাঠামশাই করতেন ওকালতি। আমাদের পৈত্রিক বাড়ি ছিল বাংলাদেশের ঢাকা জেলার বারদিতে। যদিও আমার জন্ম কলকাতার হ‌্যারিসন রোডের একটি বাড়িতে, এখন যার নাম মহাত্মা গান্ধী রোড। তবে আমাদের পরিবারে স্বাধীনতা সংগ্রামী, বিপ্লবীদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা ছিল, যার পরিচয় নানাভাবে পেয়েছি।

দেশে ফিরে সর্বক্ষণের কর্মী হিসাবে কাজ শুরু করার পর থেকে পার্টির ডাকা বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিয়েছি। বিধানসভার ভেতরে এবং বাইরে পার্টি যখন যে দায়িত্ব দিয়েছে, তা পালন করার চেষ্টা করেছি। পার্টির কাজ করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হতে হয়েছে, জেল খাটতে হয়েছে, এমনকি বেশ কয়েকবার আত্মগোপনেও থাকতে হয়েছে। স্বাধীনতার আগে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের নিপীড়ন যেরকম কমিউনিষ্ট পার্টিকে সহ্য করতে হয়েছে, তেমনি স্বাধীনতার পরেও আমরা বারেবারে অত‌্যাচার-নিপীড়নের মুখোমুখি হয়েছি।

আমি দেশে ফিরে যখন কাজ শুরু করি, তখনও পার্টি বেআইনী ছিলো। ব্রিটিশ শাসনে বেআইনী ঘোষিত পার্টির সারাক্ষণের কর্মী হিসাবে আমার একটি অন্যতম কাজ ছিল আত্মগোপনকারী পার্টিনেতা ও কর্মীদের গোপন বৈঠকের স্থান,আশ্রয় ঠিক করা, বাইরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা, অর্থসংগ্রহ ইত‌্যাদি। আমাকে বিভিন্ন সভায় বক্তৃতা দিতে এবং পার্টি ক্লাস নিতেও পাঠানো হতো। সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি (এফ এস ইউ) ও ফ‌্যাসিবিরোধী লেখক সঙ্ঘের কাজেও আমাকে বিভিন্ন জায়গায় যেতে হতো। আমিই ছিলাম এফ এস ইউ-র প্রথম সম্পাদক।

১৯৪২ সালের শেষদিকে পার্টিকে আইনী করতে বাধ্য হলো ব্রিটিশরা। আমাদের পার্টির প্রথম কংগ্রেস এরপরেই অনুষ্ঠিত হলো। ১৯৪৩ সালে বোম্বাইতে হওয়া প্রথম কংগ্রেসে অবশ্য আমি প্রতিনিধি ছিলাম না। আমার যতদূর মনে পড়ছে, এরপরের বছর থেকেই আমাকে শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করতে পাঠানো হলো। প্রথমে বন্দর ও ডক শ্রমিক, পরে রেলশ্রমিকদের মধ্যে আমি কাজ শুরু করলাম। হাওড়া, শিয়ালদহ ছাড়াও পূর্ববঙ্গ, আসামের বিভিন্ন জায়গায় এই কাজে যেতে হতো। রেলে আমরা ভালোই সংগঠন গড়ে তুলতে পেরেছিলাম। পরে ১৯৪৬ সালে এই রেলশ্রমিক কেন্দ্র থেকেই আমি প্রথমবার বিধায়ক নির্বাচিত হই।সেবার দার্জিলিঙ থেকে রতনলাল ব্রাহ্মণ এবং দিনাজপুর থেকে রূপনারায়ণ রায়ও কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী হিসাবে নির্বাচিত হন।

 তখন তেভাগা আন্দোলন চলছে। এজন্য সভা করতে আমার জেলায় জেলায় ডাক পড়তো। আমার মনে আছে, একবার আমি আর স্নেহাংশু (আচার্য) ময়মনসিংহ জেলায় গেলাম। হাজং এলাকায় ঢোকামাত্র দু’জন ব্রিটিশ পুলিশ অফিসার এসে আমাদের গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে গেলো। স্নেহাংশু ছিল ময়মনসিংহ মুক্তাগাছার মহারাজার ছেলে। ফলে থানায় আমাদের বেশিক্ষণ রাখতে সাহস করলো না। ডি এম মিঃ বাস্তিন আমাদের জেলা থেকে বহিস্কারের নির্দেশ দিলো। তখন মুসলিম লিগের সরকার, মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন শহীদ সুরাবর্দি। আমি পরে তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তেভাগার বিলটা ধামাচাপা দিলেন কেন? সুরাবর্দি আমায় বলেছিলেন, আমার দলে যে এতো জোতদার আছে, তা আমি জানতাম না।

এর কিছুদিন বাদে দেশ স্বাধীন হলো। কিন্তু আমাদের লড়াই শেষ হলো না। আমার মনে পড়ছে, স্বাধীনতার অল্পদিনের মধ্যেই কংগ্রেস সরকার কমিউনিষ্ট পার্টিকে বেআইনী ঘোষণা করলো। আমাদের নেতাদের গ্রেপ্তার করা হলো। আমার বাড়িতে তখন সবাই গভীর ঘুমে, খুব ভোরে পুলিস এলো, আমাকে গ্রেপ্তার করে প্রথমে নিয়ে গেলো ইলিসিয়াম রো’তে এস বি অফিসে, তারপর প্রেসিডেন্সি জেলে নিয়ে রাখলো। আমার বিরুদ্ধে হাস্যকর সব অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল। আমাকে নাকি বার্মার কৃষকসভা আমন্ত্রণ জানিয়েছে (যে আমন্ত্রণপত্র আমি আদৌ পাইনি), আমি ট্রেড ইউনিয়ন করি ইত‌্যাদি। তখন হেবিয়াস কর্পাস মামলা করা যেত না। হাইকোর্টের তিনজন বিচারপতিকে নিয়ে একটা কমিটি ছিল। তাঁদের কাছে আপীল করলাম। তিন মাস বাদে আমায় ছেড়ে দিতে হলো। অবশ্য পরে অন্য অভিযোগে আবার গ্রেপ্তার করলো আমাকে। কংগ্রেস সরকার নিজে থেকে কমিউনিষ্ট পার্টিকে আইনী করেনি। দেশের সংবিধান ঘোষিত হলে তার ধারা অনুসারে আমরা মামলা করলাম। ভারত সরকার কমিউনিষ্ট পার্টির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে বাধ্য হলো।আমরাও হেবিয়াস কর্পাসে আবেদন করলে ১৯৫১ সালে জেল থেকে মুক্তি পেলাম। সে বছরই কলকাতায় পার্টির গোপন সর্বভারতীয় সম্মেলন হলো। আমি সেখানে প্রতিনিধি ছিলাম। সম্মেলন থেকে অজয় ঘোষ সাধারণ সম্পাদক হলেন।

পার্টি আইনী হওয়ার ‍সুযোগ নিয়ে আমরা সংগঠনকে ব্যাপকভাবে প্রসারিত করার জন্য ঝ‌াঁপিয়ে পড়লাম। বন্দীমুক্তি আন্দোলন, উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের দাবিতে আন্দোলন প্রভৃতির মধ্যে দিয়ে পার্টি বেড়ে উঠলো, গণসংগঠনগুলিতেও অনেক মানুষ এলেন। এর মধ্যেই প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। ১৯৫২ সালের সেই নির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টিই পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সবচেয়ে বড় বিরোধী দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করলো। আমরা ২৮টা আসন পেলাম, আমাদের সমর্থনে আরো ২ জন নির্দল সদস্য জিতলেন। কিন্তু আমাদের পার্টিকে বিধানসভায় বিরোধীপক্ষ হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হলো না। অনেক টালবাহানার পর আমাদের ‘প্রধান’ বিরোধী পার্টি এবং পার্টির পরিষদীয় দলের নেতাকে ‘প্রধান’ বিরোধী পার্টির নেতা হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হলো। আসলে ওরা আমাদের প্রভাব যাতে না বাড়ে, তার জন্য যে কোনভাবে আটকাতে চাইছিল। যাই হোক, যে পার্টিকে স্বাধীনতার পরেই কয়েক বছর ধরে কংগ্রেস সরকার বেআইনী করে রেখেছিল, সেই পার্টিরই প্রধান বিরোধী দল হিসাবে স্বীকৃতি পাওয়া একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।

১৯৫৪ সালে মাদুরাইয়ে পার্টির তৃতীয় কংগ্রেসে আমাকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে নেওয়া হলো। তার আগে অবশ্য প্রাদেশিক সম্মেলন থেকে আমাকে সর্বসম্মতিক্রমে রাজ্য সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। একদিকে, প্রধান বিরোধী দলের নেতা হিসাবে বিধানসভায় পরিষদীয় কাজ এবং অন্যদিকে পার্টির রাজ্য সম্পাদকের কাজ, বিরাট দায়িত্ব এসে পড়লো আমার কাঁধে। এই সময় ট্রাম ভাড়া বৃদ্ধির বিরুদ্ধে আন্দোলন, শিক্ষক আন্দোলনের মতো কয়েকটি বড় আন্দোলন সংগঠিত হয়। ১৯৫৬ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে যৌথভাবে হঠাৎ বঙ্গ-বিহার সংযুক্তিকরণের একটি প্রস্তাব নিয়ে আসেন, যা নিয়ে সারা রাজ্যে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হলো। ওই সময়ই কেরালার পালঘাটে পার্টির চতুর্থ কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু আমি, কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্তসহ আরো অনেকেই চতুর্থ কংগ্রেসে এজন্য যেতে পারিনি। অনেকে গ্রেপ্তার হলেন। অবশেষে কলকাতা উত্তর-পশ্চিম লোকসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে কংগ্রেস প্রার্থী পরাজিত হলে বিধান রায় পিছু হঠলেন।

এদিকে, পার্টির ভেতরে মতাদর্শগত বিতর্ক তখন ক্রমশ মাথাচাড়া  দিচ্ছিল। ১৯৬১ সালে বিজয়ওয়াদা কংগ্রেসে সেটা চরম আকার ধারণ করে। সেবারে ভাঙন কোনমতে আটকানো গেলেও পরে তা বাড়তে লাগলো। অবশেষে আমরা ৩২ জন জাতীয় পরিষদের সদস্য বের হয়ে এলাম। রাষ্ট্রের শ্রেণীচরিত্র, বিপ্লবের স্তর ইত্যাদি নিয়ে আমাদের মতের ফারাক ছিল, সেকথা সবাই জানেন। কলকাতাতে সপ্তম পার্টি কংগ্রেস থেকে আমরা স্বাধীন কর্মপন্থা নিলাম, নতুন পার্টি কর্মসূচী গৃহীত হলো। তারপরে তো দেখা গেলো আমরাই প্রধান বামপন্থী হয়ে গেলাম। মানুষের সমর্থনও আমাদের দিকেই বেশি ছিল। ১৯৬৭ এবং ১৯৬৯ সালে এরাজ্যে যুক্তফ্রন্ট সরকার গড়ার ক্ষেত্রেও জোটের মধ্যে একক বৃহত্তম দল আমরাই ছিলাম। ১৯৭১ সালে আমরা আলাদাভাবেই একক বৃহত্তম দল হলাম, কিন্তু আমাদের সরকার গড়তে দেওয়া হলো না। এরপরে এলো বাহাত্তরের রিগিং নির্বাচন। সকাল ১১টার মধ্যে সমস্ত বুথে ভোট পড়ে গেলো। আমরা এই নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে গঠিত বিধানসভা বয়কট করেছিলাম। তারপরে আধা-ফ্যাসিস্ত সন্ত্রাসের কথা জরুরী অবস্থার অন্ধকারাচ্ছন্ন দিনগুলির কথা সবারই মনে আছে।

কিন্তু মানুষ যে কংগ্রেসকে ক্ষমা করেনি, তা ১৯৭৭ সালে প্রথম সুযোগেই প্রমাণিত হলো। কংগ্রেস গোটা দেশে ধরাশায়ী হলো, এরাজ্যে তো বটেই। এরাজ্যে প্রথম বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হলো। তারপর থেকে টানা সাতবার এরাজ্যের মানুষ বামফ্রন্টকে জয়ী করে সংসদী‌য় গণতন্ত্রের ইতিহাসে ন‍‌জির তৈরি করেছেন। আজ এটা প্রতিষ্ঠিত, এই সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার মানুষের স্বার্থে অনেক কাজ করতে পেরেছে। আমরা যে এতদিন সরকারে রয়েছি, তা মানুষের ইতিবাচক রায়েই রয়েছি। পাশাপাশি, বামফ্রন্ট সরকার গোটা দেশের সামনে মানুষের স্বার্থে বিকল্প কর্মসূচীর একটা নজির তুলে ধরতে পেরেছে। জাতীয় রাজনীতিতেও বিভিন্নভাবে আমাদের সাফল্যের ছাপ পড়েছে। দেশ এখন জোট রাজনীতির যুগে প্রবেশ করেছে। পশ্চিমবঙ্গে একটানা ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ৯ দলের একটি দৃঢ় জোট হিসাবে বামফ্রন্ট সরকারের প্রভাব এক্ষেত্রে অস্বীকার করা যায় না। কারণ জোট সরকার মানেই যখন অস্থিতিশীল, বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বলে প্রমাণ হচ্ছিলো, তখন এরাজ্যে এই জোট স্থিতিশীল, শান্তির পরিবেশ এবং জনমুখী উন্নয়নের নজির তৈরি করে  গোটা দেশের সামনে একটি উজ্জ্বল ব্যাতিক্রম তুলে ধরেছে।

শুধু জোট রাজনীতির প্রশ্নই নয়, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকেও সামনে তুলে এনেছিল বামফ্রন্ট সরকারই। আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং তৃণমূলস্তরে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটানোর ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ গোটা দেশের সামনে মডেল হিসাবে স্বীকৃত। একথা আজ সকলেরই জানা যে এরাজ্যের ত্রিস্তর পঞ্চায়েতী ব্যবস্থাকে অনুকরণ করেই গোটা দেশে তা রূপায়ণের জন্য আইন তৈরি করা হয়েছে। ভূমি সংস্কার, কৃষি ও গ্রামোন্নয়নের ক্ষেত্রেও এই সরকারের সাফল্য সর্বজনস্বীকৃত। পাশাপাশি, গণতান্ত্রিক পরিবেশ, শান্তি-সুস্থিতি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিরবচ্ছিন্নভাবে বজায় ক্ষেত্রেও দেশের সামনে এরাজ্য উদাহরণ।                                                             

শিল্পবিকাশের প্রশ্নেও আমরা বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই কাজ করছি। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গ আর্থিক ও অন্যান্য ক্ষেত্রে কেন্দ্রের চরম বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হয়েছে। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার তৈরি হওয়ার পরে কেন্দ্রের এইসব বাধা অতিক্রম করেই আমরা শিল্পস্হাপনের নীতি নিই। নয়ের দশকের গোড়ায় যখন মাসুল সমীকরণ নীতি ও লাইসেন্স প্রথা তুলে নেওয়া হলো, তখন আমাদের সামনে আরও সুযোগ এলো। আমরা যখন বণিকসভাগুলিতে গিয়ে এরাজ্যে বিনিয়োগের আবেদন জানাচ্ছিলাম, তখন তাঁরা আমাদের বললেন, আপনারা যে নীতির ভিত্তিতে এখানে শিল্প গড়ার কথা বলছেন, সেটা লিখিতভাবে দিলে সুবিধা হয়। তখন ১৯৯৪ সালে আমরা বিধানসভায় বর্তমান শিল্পনীতি ঘোষণা করি। পরে ১৯৯৫ সালে চন্ডীগড়ে অনুষ্ঠিত আমাদের পার্টির পঞ্চদশ কংগ্রেসেও এটা অনুমোদিত হয়েছে।

তবে এটাও মনে রাখা দরকার, পশ্চিমবঙ্গ,‍ কেরালা, ত্রিপুরায় আমরা যে বাম সরকারগুলি চালাচ্ছি তা এই বুর্জোয়া সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই। আমরা এই পুঁজিবাদী সাংবিধানিক কাঠামোতে কখনও বলতে পারি না, এই সরকারগুলি সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচী রূপায়ণ করবে। সাম্যবাদ, সমাজতন্ত্র আমাদের লক্ষ্য; শ্রেণীহীন, শোষণহীন সমাজব্যবস্থা আমরা গড়তে চাই। সেটা আমাদের লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যে আমাদের পৌঁছোতে হবে।

একটা জটিল রাজনৈতিক অবস্থার মধ্যে দিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি। আমাদের ১৯তম পার্টি কংগ্রেস সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হলো। প্রতিনিধিরা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে পার্টিকে, গণ-সংগঠনগুলিকে আরো প্রসারিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমি শুধু একটা কথাই বলবো, মানুষের ওপরে আমরা যেন বিশ্বাস না হারাই। মানুষের কাছে বারবার যেতে হবে, ত‌াঁদের ভালোবাসা আমাদের পেতে হবে। এই পুঁজিবাদী শোষণের ব্যবস্থা কখনও টিকতে পারে না, এটা দৃঢ়তার সঙ্গে আমরা বলতে পারি। তবে তাতে সময় লাগ‍‌বে। কিন্তু লক্ষ্যে আমরা পৌঁছবোই।

Published in: on জুন 26, 2010 at 5:18 অপরাহ্ন  মন্তব্য করুন  

জ্যোতি বসুর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘যতদূর মনে পড়ে’ থেকে কিছু অংশ

“ফেলে আসা দিনগুলোর কথা ভাবলে অনেক কথাই মনে আসে। যতদূর মনে এসেছে, এ লেখা ততটাই। এই সময়কালে বহু মানুষের সাহচর্য পেয়েছি, তাঁদের সকলের কথা উল্লেখ করা তো সম্ভব নয়। শুধু এইটুকু বলতে পারি, এদেশের সাধারণ মানুষের জন্য লড়াই করেছি, ইতিহাসের বহু বাঁক ও মোড় পেরোতে হয়েছে। এ ব্যাপারে সাধারণ মানুষই আমার প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছেন। অতীতের কথা লেখা খুব কঠিন। দিন সন ঘটনা পরম্পরা মনে থাকে না। তা ছাড়া নিজের কথা এসে যাবে। যে কথা বলতে আমি দ্বিধা বোধ করি।

জন্মেছিলাম ১৯১৪ সালের ৮ জুলাই। কলকাতার হ্যারিসন রোডের একটি বাড়িতে। এখন নাম বদলে গেছে মহাত্মা গান্ধী রোড। আমার বাবা-কাকা জ্যাঠামশাই এঁরা থাকতেন আসামের ধুবলিতে। ঠাকুরদা ওখানে চাকরি করতেন। সেই সূত্রেই আসামে প্রবাস। দুই জ্যাঠামশাই ওকালতি করতেন। রাজনীতির সঙ্গে আমাদের পরিবারের তেমন সংযোগ ছিল না বললেই চলে।
পৈত্রিক বাড়ি বাংলাদেশের ঢাকা জেলার বারদিতে। মার দিক থেকে দাদুর বাড়িও বারদি। মায়ের পরিবার ছিল অবস্থাপন্ন তালুকদার। সে তুলনায় বাবা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের। মা তাদের পরিবারের একমাত্র কন্যা। আমার বাবা, নিশিকান্ত বসু, ডিব্রুগড় মেডিকেল স্কুল থেকে ডাক্তারি পাস করেছিলেন। তারপর ঢাকায় কিছুদিন প্র্যাকটিস। তারপর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য চলে যান আমেরিকায়। ছয় বছর ছিলেন সেখানে। আমেরিকায় কিছুদিন চাকরি করে ফিরে এলেন দেশে, বিদেশি ডিগ্রি নিয়ে। বাবা ও-দেশে থাকতে এক কাকাকে নিয়ে গিয়েছিলেন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াতে। কাকা ইঞ্জিনিয়ার হয়ে কিছুদিন ওখানে চাকরি করে বছর তেরো বাদে দেশে ফিরলেন।

আগেই বলেছি, রাজনীতির সঙ্গে আমাদের পরিবারের যোগ ছিল না বললেও চলে। কিন্তু বিপ্লবীদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সহমর্মিতা ছিল। সেটা উচ্চৈঃস্বরে ঘোষিত হতো না। মার কাছে শুনেছি মদনমোহন ভৌমিক নামে এক বিপ্লবী আমাদের বারদির বাড়িতে বেশ কিছুদিন আত্মগোপন করেছিলেন। তাঁর বাড়ি ছিল ঢাকা জেলার ডুমনিতে। ১৯০৫ সালে তিনি অনুশীলন সমিতিতে যোগ দেন। ১৯১৩ সালে প্রথম গ্রেপ্তার। তখন তিনি ঢাকা মেডিকেল স্কুলের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। সাক্ষ্য সাবুদ যোগাড় করতে না পেরে পুলিশ শেষ পর্যন্ত মামলা তুলে নেয়। এরপর তিনি আত্মগোপন করলেন। ১৯১৪ সালে অসুস্থ অবস্থায় আবার গ্রেপ্তার হলেন। দ্বিতীয় বরিশাল ষড়যন্ত্র মামলায় তাঁর দশ বছর সাজা হয়। আন্দামানে দ্বীপান্তরে থাকার সময় তাঁর ওপর অকথ্য অত্যাচার হয়। জেল থেকে ছাড়া পেয়েও তিনি বিপ্লবীদের সান্নিধ্যে কাটান। ১৯৫৫ সালে তাঁর জীবনাবসান হয়।

এই মদনমোহন ভৌমিক ১৯১৩-১৪ সালে যখন আত্মগোপন করেছিলেন, তখন প্রায়ই আমাদের বাড়িতে আসতেন। আমার মাকে মা বলে ডাকতেন। ওঁর কাছে সব সময় অস্ত্র থাকত। আমাদের বাড়িতে মাঝে মধ্যে লুকিয়ে রাখতেন। একদিন আমাদের বাড়িতে পুলিশ খানাতল্লাশি চালাল। মা তখন অস্ত্রটিকে নিজের শাড়ির মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিলেন।

আমার যখন ছয় বছর বয়েস, আমাকে ভর্তি করা হলো লরেটোতে। লরেটো কিন্ডার গার্টেনে আমার পাঠ্যক্রম ছিল চার বছর। একটা ডাবল প্রমোশন পেয়েছিলাম। সময়টা দাঁড়াল তিন বছর। ওই স্কুলে ফার্স্ট স্ট্যান্ডার্ড থেকে কোনো ছেলেকে ভর্তি করে না। তখন ওটা সম্পূর্ণ মেয়েদের স্কুল। বাবা চেষ্টা করলেন সেন্ট জেভিয়ার্সে ভর্তি করাতে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ জানালেন সে বছরের মতো অ্যাডমিশন কমপ্লিট। নামটা লেখা থাক পরের বছরের জন্য। বাবা এবার চেষ্টা করলেন মিডলটন রোডের লরেটোতে। ওই স্কুলে মাদার ইনচার্জ জানালেন, ফাস্ট স্ট্যান্ডার্ডে ওরা ছেলেদের ভর্তি করেন না। এবার ফিরে গেলাম ধর্মতলার লরেটোতে। মাদার ইনচার্জ অবস্থাটা বুঝে আমাকে নিয়ে নিলেন। ওই ক্লাসে আমিই একমাত্র ছেলে। বাকি সব পড়ুয়া মেয়ে। বাবা বললেন, শুধু শুধু একটা বছর নষ্ট করবে কেন? ওখানেই পড়। পরের বছর ভর্তি হলাম সেন্ট জেভিয়ার্সে সেকেন্ড স্ট্যান্ডার্ডে।

 
সেন্ট জেভিয়ার্সে অনেক সময় কাটল। সিনিয়র কেমব্রিজ(নাইনথ্ স্ট্যান্ডার্ড) পাস করলাম। ইন্টার মিডিয়েটেও ওই কলেজে। তারপর ইংরেজি অনার্স নিয়ে ভর্তি হলাম প্রেসিডেন্সি কলেজে। ইন্টার মিডিয়েট এবং বিএ পড়ার সময় আমাকে বাংলাটা বেশি পড়তে হতো। শিখতে হতো। কেননা তার আগে বাংলা পড়ার সুযোগ ছিল না পাঠ্যক্রমে।

১৯৩০-৩১ সালে আমি সেন্ট জেভিয়ার্সে এইটথ স্ট্যান্ডার্ডের ছাত্র। তখন গোটা বাংলাজুড়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের বৈপ্লবিক জোয়ার। খবর পাচ্ছি চট্টগ্রামে বিপ্লবীরা অস্ত্রাগার দখল করেছেন। দেশপ্রেমিকদের বিরুদ্ধে অত্যাচারের বদলা হিসেবে খুন হচ্ছে ব্রিটিশ রাজপুরুষরা। সে এক অসম যুদ্ধ চলছে। একদিকে সশস্ত্র ব্রিটিশ রাজশক্তি, আরেকদিকে সহায় সম্বলহীন দেশপ্রেমিক। তাদের শক্তি কেবল দেশপ্রেম এবং মৃত্যুকে জয় করার ইচ্ছা। এই যে ঘটনা, এর থেকে আমাদের মতো পরিবারও মুক্ত থাকতে পারেনি। দেশপ্রেমের চোরাস্রোত ক্রমশ প্রকাশ্য অবয়ব নিতে শুরু করেছে। তারিখটা মনে নেই, তবে ১৯৩০ সালের শুরু। একদিন শুনলাম গান্ধীজী অনশন শুরু করেছেন। মনটা কেমন ভার লাগল। বাবাকে বললাম, আজ স্কুলে যাব না। বাবা আপত্তি করলেন না। বাবার সঙ্গে চলে গেলাম তাঁর চেম্বারে।

ওই ১৯৩০ সালেই একদিন শুনলাম সুভাষ বসু অক্টারলোনি মনুমেন্টে (শহীদ মিনার ময়দান) ভাষণ দেবেন। আমি আর আমার এক জেঠতুতো ভাই ঠিক করলাম যাব। আমরা তখন খদ্দর পরতাম না। কিন্তু সেদিন একটা আবেগ পেয়ে বসল। দু’ভাই খদ্দর পরে গেলাম। গিয়ে দেখি ঘোড়সওয়ার পুলিশ, লাঠিধারী পুলিশ, সার্জেন্টে গোটা তল্লাট যেন রণক্ষেত্র। সার্জেন্টরা যখন তাড়া করল, আমরা ঠিক করলাম পালাব কেন? পালাব না। পালানো মানে ভয় পেয়েছি। আমাদের গায়ে দু-এক ঘা লাঠি পড়ল। আমরা দ্রুত হাঁটতে লাগলাম। চলে এলাম বাবার চেম্বারে। আমাদের এক জেঠতুতো দাদা আমেরিকায় জয় প্রকাশের সঙ্গে ছিলেন। ডেন্টিস্ট হয়ে তখন ফিরে এসেছেন। কাউকে না, এমনকি ওই দাদাকেও না কিছু বললাম না। বাড়িতে এসে মাকে বলতে মা চুন হলুদ লাগিয়ে দিলেন। সেটাই বোধহয় রাজশক্তির বিরুদ্ধে প্রথম প্রকাশ্য প্রতিবাদ।

আমাদের আত্মীয়া ইন্দুসুধা ঘোষ ছিলেন শান্তি নিকেতনে আচার্য নন্দলাল বসুর ছাত্রী। ইন্দুদি প্রায়ই আসতেন আমাদের বাড়িতে। পুঁটুদির(সুহাসিনী গাঙ্গুলির) বান্ধবী। ইন্দুদির পিসিমার ছেলে ছিলেন বেঙ্গল ল্যাম্পের কিরণ রায়। কিরণ রায়ই ইন্দুদিকে বিপ্লববাদে আকৃষ্ট করেছিলেন। পরে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যা হয়েছিলেন। পার্টি ভাগ হওয়ার পরে ইন্দুদি যোগ দিয়েছিলেন আমাদের সঙ্গে। নারী শিক্ষা মন্দিরে অধ্যক্ষ ছিলেন বহুদিন। আমার তরুণ বয়সে ইন্দুদিও ছিলেন ব্যতিক্রমী মানুষ।

 
ক্ষুব্ধ স্বদেশ, বিপ্লবীদের মরণপণ সংগ্রাম, ইংরেজ রাজপুরুষদের নৃশংস অমানবিকতা, বাবার নিরুচ্চার স্বদেশ অনুভূতি, ইন্দুদি এই সব মিলিয়ে আমার তরুণ বয়স যেন ডিসট্যান্ট সিগনালের মতো দেখতে পেতাম ভবিষ্যতের পথ-নির্দেশ। যদিও তা খুব স্পষ্ট ছিল না তখন।

বাবার যে দাদা মারা গিয়েছিলেন, তাঁর স্ত্রী অর্থাৎ আমাদের জ্যাঠাইমা এবং তাঁর তিন ছেলে দুই মেয়ে আমাদের সঙ্গে থাকতেন। এই জ্যাঠাইমা ছিলেন স্বদেশী মানসিকতার। তাঁর কাছে মাঝে মধ্যে আসতেন কিরণ রায়, বিজয় মোদক প্রমুখ। এঁরা যাদবপুর টেকনিক্যাল স্কুলে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তেন। এঁদের দেখতাম। কিন্তু তখনো কিছু সচেতনভাবে বুঝতাম না।

 
আমার জ্যাঠামশাই নলিনীকান্ত বসু তখন হাইকোর্টের বিচারপতি পদ থেকে অবসর নিয়েছেন। তিনি ভুগছিলেন ডায়াবেটিসে। ওই সময় মেছুয়াবাজার বোমার মামলা বিচারের জন্য সরকার একটি স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিলেন। মূল অভিযুক্ত ছিলেন নিরঞ্জনদা (নিরঞ্জন সেন) এবং অন্যরা। জ্যাঠামশাইকে বলা হলো ওই স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের জজ হতে। বাবার তীব্র আপত্তি ছিল। বললেন, কেন এই সমস্ত গোলমালের মধ্যে আপনি যাচ্ছেন? তা ছাড়া আপনার শরীরও সুস্থ নয়। কিন্তু চিফ সেক্রেটারি নিজে আমাদের বাড়িতে এসে জ্যাঠামশাইয়ের সম্মতি আদায় করলেন। আমরা যখন শুনলাম, খুব খারাপ লাগল। বিপ্লবীদের পথ ও মত সম্পর্কে আমার তখন স্পষ্ট কোনো ধারণা ছিল না। কিন্তু এটা তো বুঝতাম ওরা দেশের জন্য প্রাণ দিচ্ছেন। বহু বাঙালি পরিবার হয়ত সরাসরি সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ছিল না, কিন্তু হৃদয়ের মধ্যে তারা রেখে দিয়েছিল এই সমর্পিত প্রাণ বিপ্লবীদের জন্য শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা। যাই হোক জ্যাঠামশাই ট্রাইব্যুনালের জজ হলেন। পুলিশ সেই সময় তল্লাশি চালিয়ে বহু বই বাজেয়াপ্ত করত। সেই সমস্ত বই জ্যাঠামশাইয়ের টেবিলে সাজানো থাকত। উনি যখন কোর্টে যেতেন, আমরা গোপনে বইগুলো দেখতাম। আবার ফেরার আগে যথাস্থানে সাজিয়ে রাখতাম। এভাবেই আমার নিষিদ্ধ রাজদ্রোহী সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় এবং পরিণয় ঘটেছে।

 
১৯২৬ সালের আগস্ট মাসে প্রকাশিত হলো শরৎচন্দ্রের ‘পথের দাবী’। ওই বছরই সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে বইটি নিষিদ্ধ হয়ে গেল। গোপনে সংগ্রহ করে বইটি আমি পড়েছিলাম।

আমার জ্যাঠতুতো দাদারা এসব ব্যাপারে খুব উৎসাহী ছিলেন। আমার এক জ্যাঠতুতো দাদা ছিলেন পবিত্রকুমার বসু। এক সময়ে লন্ডনে ছিলেন। ওঁর ছিল খুব আগ্রহ। পরে মারা যান। একদিন বিজয় মোদক ও আরো কয়েকজন পবিত্রদার কাছে একটা রিভলবার জমা রাখেন। আমাদের বাড়িটা বিবেচিত হয়েছিল নিরাপদ স্থান। কেননা জ্যাঠামশাই তখন স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের জজ। পবিত্রদা কাপড়ে মুড়ে একটা বাক্সের মধ্যে রিভলবারটা রেখে দিতেন। আর প্রতিদিন কাপড় মোড়া রিভলবারটা নিয়ে একবার স্নান ঘরে যেতেন। হয়ত বিজয় বাবুরা বলেছিলেন দৈনিক ওটা পরিষ্কার করতে হবে। পবিত্রদার পরের ভাই একদিন ব্যাপারটা দেখে ফেলল। খুব কৌতূহল হলো তার। পবিত্রদা একদিন কলকাতার বাইরে বেড়াতে গেছেন। ভাই তখন বাক্স খুলে দেখে রিভলবার। বাবা-মা আমরা সবাই জেনে গেলাম। জ্যাঠামশাই তো ঘাবড়ে একশেষ। উনি রোজ প্রাতঃভ্রমণে বেরোতেন। সঙ্গে থাকত পুলিশ। বাবাও যেতেন সঙ্গে। জ্যাঠামশাই এক ভোর বেলা এক ডোবার মধ্যে রিভলবারটার সদ্গতি করে মুক্ত হলেন। পবিত্রদা যখন ফিরে এলেন আমরা জিজ্ঞাসা করলাম ব্যাপারটা কি? সে তো খুব রেগে গেল। ‘আমার বাক্স খুলেছ কেন?’ কিন্তু বেশি উচ্চবাচ্য করা সম্ভব নয়। পরে জানলাম রিভলবারটা বিজয় মোদকরা রাখতে দিয়েছেন। এদিকে তখন জ্যাঠামশাইয়ের বাড়ির সামনে আর্মড পুলিশ ক্যাম্প বসে গেছে। ওদিকে আমাদের খুব উৎসাহ। মনে হলো যেন ক্রমে আমরাও দেশমুক্তির সংগ্রামে অংশ নিয়ে ফেলেছি।

 
জ্যাঠামশাই যে ট্রাইব্যুনালের জজ হয়ে স্বদেশীদের বিচার করতে বসেছেন সেটা আমরা ভাইরা কখনো মেনে নিতে পারিনি। আমার আর এক জ্যাঠতুতো দাদা দেবপ্রিয় বসু আর আমি একদিন বাড়ির বাইরে একটা জায়গায় গেলাম। সেখানে দু’জনে মিলে একটা ইংরেজি চিঠির মুসাবিদা করলাম। নিজেরাই চিঠিটা টাইপ করলাম। ‘আপনি অন্যায় করেছেন। আপনি বাঙালি হয়ে যাঁরা দেশভুক্ত তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করছেন। এটা গুরুতর অন্যায়। আপনার জীবন বিপন্ন হবে।’ জ্যাঠামশাই যে দিন চিঠিটা পেলেন সেদিনই আমরা জানতে পারলাম। আমরা একসঙ্গে সবাই খেতে বসেছি। দেখি বাবা-মা সবাই কেমন চিন্তিত। বাবা খুব নিচু গলায় আস্তে আস্তে মাকে বলেছেন, ‘দাদাকে বারণ করেছিলাম স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের জজ হতে। শুনলেন না। এদিকে আজ চিঠি পেয়েছেন ওর জীবন বিপন্ন।’ বাড়িতে গার্ড বেড়ে গেল। প্রাতঃভ্রমণ বন্ধ। বাবা এবং জ্যাঠামশাই দু’জনেরই বাজার করার খুব শখ। একসঙ্গেই যেতেন। তাও বন্ধ হয়ে গেল। আমরা তো মনে মনে হাসছি।

 
বিলেতে 

১৯৩৫ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিএ অনার্স নিয়ে পাস করলাম। বাবা ঠিক করে রেখেছিলেন এর পর আমি বিলেতে যাব এবং ব্যারিস্টার হয়ে ফিরব। আমারও আপত্তি ছিল না। বাবা বললেন, ‘যখন বিলেত যাচ্ছ তখন আই সি এস-টাও একবার চেষ্টা কর।’ ১৯৩৫-এ পরীক্ষার ফলাফল বেরুবার পর বিলেতে রওনা দিলাম। ওই বছরের শেষাশেষি পৌঁছেও গেলাম। সেখানে ব্যারিস্টারির পাঠ নয়, অন্য কোনো মহত্তর উপলব্ধি অপেক্ষা করে ছিল আমার জন্য।

অবশেষে লন্ডনে পৌঁছলাম। আমার নিকট আত্মীয়রা চেয়েছিলেন পুরোদস্তুর ব্যারিস্টার হয়ে দেশে ফিরব। আমি নিজেও তাই ভেবেছি। তবে বাবা চেয়েছিলেন আমি আই সি এস পরীক্ষাটায় বসি। পরের বছর পরীক্ষায় বসলাম, কিন্তু সাফল্য পেলাম না। ব্যারিস্টারি পড়তে থাকি। লন্ডনে গিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতির পট আমার চোখে বেশ স্পষ্ট করে উন্মোচিত হলো। গোটা ইউরোপে অস্থির আলোড়ন। ১৯৩৬-এ ভূপেশ গুপ্ত পড়তে এলেন লন্ডনে। ভূপেশ যখন বহরমপুর জেলে, তখন কারাবন্দি থেকেই বি এ পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হলো। ভূপেশ ছাত্র হিসেবে ছিলেন খুব মেধাবী। লন্ডনে এলেন ব্যারিস্টারি পড়তে।

লন্ডনের একটি বাড়িতে ভূপেশের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। কথা বলে বেশ উৎসাহিত বোধ করি। দেশ থেকে ভূপেশ গ্রেট ব্রিটেন কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বের উদ্দেশ্যে লিখিত একটি চিঠি সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। প্রায় একই সময়ে স্নেহাংশু আচার্য এসে উপস্থিত লন্ডনে। দেখা করলাম ব্রিটেনের বিখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা হ্যারি পলিট, রজনী পাম দত্ত, বেন ব্র্যাডলে প্রমুখের সঙ্গে। ব্রিটিশ কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দ ইন্ডিয়া লীগ এবং ভারতীয় ছাত্রদের সক্রিয় সমর্থন করছিলেন।

আমি ব্রিটিশ পার্টির দুজন নেতার কথা বিশেষ করে বলব। বেন ব্র্যাডলে এবং মাইকেল ক্যারিট। বে ব্র্যাডলে ভারতে এসেছিলেন এদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনে সাহায্য করতে। শ্রমিক আন্দোলনেও তিনি বিশেষ ছাপ রেখেছিলেন। তিনি একজন ইংরেজ। কিন্তু ইংরেজ রাজশক্তি তাঁকে গ্রেপ্তার করে, মীরাট ষড়যন্ত্র মামলায় বেশ কিছু দিন কাটিয়েছেন ভারতের কারাগারে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস, সাম্যবাদী আন্দোলনের সম্প্রসারণে এই ব্রিটিশ কমিউনিস্ট নেতার কথা ভুলতে পারি না। মাইকেল ক্যারিট, আর একজন নেতা, ইনি ইমপিরিয়াল সিভিল সার্ভিসের (আইসিএস) বড় রকম অফিসার। অবিভক্ত বাংলাদেশে তিনি গবর্নরের সচিব হিসেবে কিছুদিন কাজ করেছিলেন। পরে তাঁর সত্যিকারের পরিচয় উদ্ঘাটিত হলে গেলে তিনি ইস্তফা দেন। এ দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনে তিনি কি ভূমিকা পালন করেছিলেন, তাঁর আংশিক পরিচয় মিলবে ওঁর লেখা ‘মোল ইন দ্য ক্রাউন’ পড়লে।
এঁদের কাছে বিলেত প্রবাসী ভারতীয় ছাত্ররা পেয়েছেন অকৃপণ সাহায্য।

ব্রিটেন থেকে ইতোমধ্যে দেশে ফিরে গেছেন হীরেন মুখার্জি, সাজ্জাদ জাহির, ড. জেড এ আহ্‌মেদ, নীহারেন্দু দত্ত মজুমদার প্রমুখ। এঁরা চলে যেতে বিলেতে ভারতীয় ছাত্রদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে বেশ অভাব অনুভূত হচ্ছিল। কর্মতৎপরতায় পড়েছিল ভাটা। আমরা উদ্যোগী হলাম শূন্যতা পূরণে। লন্ডন, কেমব্রিজ, অক্সফোর্ড এই সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় ছাত্ররা কমিউনিস্ট গ্রুপ গড়ে তুললেন। ব্রিটিশ পার্টি নেতারা আমাদের জানালেন প্রকাশ্য সভা না করতে। কেননা ভারতে ইংরেজ রাজশক্তি তখন কমিউনিস্ট পার্টিকে বেআইনি ঘোষণা করেছে। আমরা মার্কসবাদী পাঠচক্রে যেতে শুরু করলাম। আমাদের পড়াতেন হ্যারি পলিট, রজনী পাম দত্ত, ক্লিমেন্স দত্ত এবং ব্র্যাডলের মতো নেতারা। গোটা বিশ্ব তখন তপ্ত থেকে তপ্ততর। স্পেনে শুরু হয়েছে গৃহযুদ্ধ। ফ্রাঙ্কোর স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রীদের সংগ্রাম নজর কাড়ছে সমস্ত প্রগতিশীল মানুষের। ফ্যাসিস্তদের বিরুদ্ধে স্বাধীন চিন্তার এই যুদ্ধে শামিল হতে গড়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক ব্রিগেড। রালফ ফকস্, ক্রিস্টোফার কডওয়েলের মতো বিখ্যাত কমিউনিস্ট বুদ্ধিজীবীরা স্পেনে যেতে শুরু করেছেন। আর্নস্ট হেমিংওয়ের উপন্যাস ‘ফর হুম দি বেল টোলস’ এই সংগ্রাম নিয়েই লেখা। আমি ভেতরে ভেতরে প্রবল আলোড়িত। মার্কসবাদী সাহিত্য পাঠ আর সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ আমাকে দ্রুত রাজনীতির মূল প্রবাহে টেনে নিচ্ছে।

 
লন্ডন মজলিস
এই সময় ভারতীয় ছাত্রদের নিয়ে গড়ে ওঠে লন্ডন মজলিস। আমিই ছিলাম তার প্রথম সম্পাদক। ভারতের স্বাধীনতার সপক্ষে মত গঠন করা এবং চাঁদা সংগ্রহ ছিল আমার কাজ।
পুনর্গঠিত হলো ব্রিটেনের ভারতীয় ছাত্রদের ফেডারেশন। তারই মুখপত্র ‘ভারতীয় ছাত্র ও সমাজতন্ত্র’ প্রকাশ পেতে থাকে।

আগে উল্লেখ করেছি লন্ডন, কেমব্রিজ এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় ছাত্রদের কমিউনিস্ট গ্রুপ গঠিত হয়েছিল। সব সদস্যদের নাম স্মরণে নেই। তবে মনে করতে পারছি রজনী প্যাটেল, পি এন হাকসার, মোহন কুমারমঙ্গলম, ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত, রেণু চক্রবর্তী, এন কে কৃষ্ণাণ, পার্বতী মঙ্গলম(পরে পার্বতী কৃষ্ণান), নিখিল চক্রবর্তী, অরুণ বোসের নাম।
তিনটি গোষ্ঠী মাঝে মধ্যে যুক্ত সভায় মিলিত হতো। ইন্ডিয়া লীগের সক্রিয় নেতা ছিলেন ফিরোজ গান্ধী। লন্ডন মজলিসেও ফিরোজকে আমরা সক্রিয় সদস্য হিসেবে দেখেছি। ফিরোজ অবশ্যই ভারতীয় ছাত্র ফেডারেশনের প্রতিটি সভায় উপস্থিত হতেন। স্নেহাংশুও এই সব সভায় আসত। আগেই ভূপেশ এবং স্নেহাংশুর বন্ধুত্ব হয়ে গেছে।

লন্ডন মজলিসের অন্যতম একটি কাজ ছিল ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দ লন্ডনে এলে তাঁদের সংবর্ধনা জানানো। এভাবেই আমরা জওহরলাল নেহরু, সুভাষচন্দ্র বসু, শ্রীমতী বিজয়লক্ষ্মী পন্ডিত, কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দলের(সি এস পি) নেতা ইউসুফ মেহের আলি প্রমুখকে সংবর্ধনা জানিয়েছি।

ইন্ডিয়া লীগের নেতা কৃষ্ণ মেননই নেহরুর সঙ্গে আমাকে প্রথম পরিচয় করিয়ে দেন। লন্ডনে নেহরুর বাসস্থানে কৃষ্ণ মেনন আমাকে নিয়ে যান। আমি নেহরুকে বলি, ‘আমরা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী।’ নেহরু উত্তরে বলেন, ‘আমাদের সামনে এখন প্রধান কাজ ভারতের জন্য স্বাধীনতা অর্জন। এ বিষয়ে তোমরা আমার সঙ্গে একমত কি?’ আমি বলি, ‘আমরা একমত।’ আমি নেহরুকে সংবর্ধনা সভায় উপস্থিত হওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাই।

লন্ডনে থাকার সময় ভারতের যে নেতাদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ছিল, জওহরলাল নেহরু তাঁদের অন্যতম। হিটলার মুসোলিনি প্রমুখ ফ্যাসিস্ত নেতাদের সঙ্গে দেখা করার প্রস্তাব নেহরু প্রত্যাখ্যান করেছেন। এবং ফ্যাসিস্ত ফ্রাংকোর বিরুদ্ধে সাধারণতন্ত্রী স্পেনে চলে গেছেন এই ঘটনা লন্ডনে বসবাসকারী ভারতীয় ছাত্রদের মধ্যে প্রভুত উৎসাহের সৃষ্টি করে।
শ্রীমতী বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত সম্পর্কেও ছিল আমাদের ভারতীয় ছাত্রদের একটা গর্ববোধ। হিটলার ও তার নাৎসি পার্টি যখন ফতোয়া জারি করছে, নারীদের স্থান রান্নাঘরে, তখন শ্রীমতী সরোজিনী নাইডু সমেত আরো অনেক ভারতীয় মহিলার সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ সত্যি সত্যিই গর্বের বিষয় ছিল।

লন্ডনে পড়াশোনা করার সময়েই আমরা কয়েকজন মনস্থির করে ফেলি যে, ভারতে ফিরে গিয়ে সারাক্ষণ পার্টিকর্মী হিসাবে কাজ করব।

একবার জাতীয় কংগ্রেসের একজন শীর্ষনেতা সুবক্তা ভুলাভাই দেশাই লন্ডনে এলে আমরা তাঁকে সংবর্ধনা জানাই। ভুলাভাই দেশাইকে আমরা বুর্জোয়াদের প্রতিনিধি হিসেবেই গণ্য করতাম। সে সময় ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন চালু হয়েছে এবং ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে ভারতের বেশিরভাগ প্রদেশে জাতীয় কংগ্রেস মন্ত্রিসভা গঠন করেছে। কৃষকদের ওপর গুলি চলেছে। আলোচনাকালে এ কথা ভুলাভাই দেশাইয়ের কাছে আমরা উল্লেখ করি। উত্তরে ভুলাভাই দেশাই বলেন, ‘কৃষকরা কংগ্রেসকেই সমর্থন করেন।’

সুভাষচন্দ্র বসুকে আমরা বাম আন্দোলনের নেতা হিসেবে গণ্য করতাম। তিনি যখন ১৯৩৯ সালে ত্রিপুরি কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হলেন, তখন আমরা লন্ডন মজলিস থেকে তাঁকে এক অভিনন্দনবার্তা পাঠাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। স্থির হলো, লন্ডনের একটি হলে সমাবেশ করা হবে। আমরা এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে ফিরোজ গান্ধীকে আমন্ত্রণ জানাই। ফিরোজ গান্ধী বলেন, তাঁর সমর্থন আছে, তিনি সমাবেশে উপস্থিত থাকবেন, কিন্তু কোনো ভাষণ দেবেন না। সমাবেশে তিনি এলেও ভাষণ দেননি। দু’জন বক্তা ছিলাম। এন কে কৃষ্ণাণ আর আমি। সমাবেশ থেকে সুভাষচন্দ্র বসুকে অভিনন্দন জানিয়ে বার্তা পাঠানো হলো।
আমরা লন্ডন মজলিসের উদ্যোগে সভা-সমাবেশ সংগঠিত করেছি এবং তাতে বামশক্তিগুলো জোরদার হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত ১৯৩৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ব্রিটেন যুদ্ধ ঘোষণা করল।
আমরা লন্ডনে থাকতেই হিটলারের বিমানবাহিনী বোমাবর্ষণ শুরু করে দিল। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে আমাদের সবাইকে গ্যাস-মুখোশ পরতে হতো। নির্দেশ ছিল প্রত্যেককে সব সময় গ্যাস-মুখোশ নিয়ে চলতে হবে।

আমাদের কয়েকজন ভূমধ্যসাগর দিয়ে জাহাজে করে ফিরে আসার পরই ভূমধ্যসাগারে হিটলারের নৌবাহিনী র্টপেডো ব্যবহার করতে শুরু করে ফলে এই পথ বন্ধ হয়ে যায়। ভূপেশ গুপ্ত, ইন্দিরা (নেহরু) গান্ধী, ফিরোজ গান্ধী প্রমুখরা আটকে পড়েন। পরে তাঁরা ঘুর পথে ভারতে ফেরেন।

ব্রিটেনের স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের গোয়েন্দারা আমাদের ওয়াচ করছে ফলে সন্দেহ হয়। তাই আমরা সতর্ক হয়ে যাই। ‘সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাস’ বইখানা এক মহিলার কাছে গচ্ছিত রাখা হলো। এই মহিলাও আমাদের সঙ্গে ভারতে ফিরছিলেন। বাকি বইগুলো আমাদের সঙ্গেই রইল। আমাদের সন্দেহ যে অমূলক নয়, তার প্রমাণ পাওয়া গেল। জাহাজ বোম্বাইয়ে পৌঁছলে গোয়েন্দারা খানাতল্লাশি করে অন্য বইগুলো আটক করল, তবে সিপিএসইউ-র ইতিহাসটি রক্ষা পেল।

আমরা কয়েকজন লন্ডনে থাকতেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, ভারতে ফিরে গিয়ে সারাক্ষণ পার্টিকর্মী হিসেবে কাজ করব। আমরা কয়েকজন (আমি, ভূপেশ গুপ্ত, মোহন কুমারমঙ্গলম, অরুণ বোস প্রমুখ) ১৯৪০ সালে বোম্বাইতে গিয়ে আমাদের সেই সময়কার পার্টি-নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। আমাকে তাঁরা বললেন, কৃষক নেতা স্বামী সহজানন্দের এক জনসভায় যেতে। আমি গেলাম। সেটা ছিল এক বিশাল সমাবেশ।

 
দেশে ফিরলাম
১৯৪০ সালেই কলকাতা ফিরে আমি এখানকার পার্টি-নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। পার্টির নির্দেশ অনুযায়ী আমি আন্ডার গ্রাউন্ডে গেলাম না, তবে আন্ডার গ্রাউন্ড সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা ছিল আমার অন্যতম একটি প্রধান কাজ।
আমি ব্যারিস্টার হিসেবে কলকাতা হাইকোর্টেও নাম লিখিয়েছিলাম। কিন্তু প্র্যাকটিস করিনি কোনোদিনই। কারণ আমরা(ভূপেশ, আমি এবং অপর কয়েকজন) লন্ডনে থাকতেই পার্টির সারাক্ষণের কর্মী হিসেবে কাজ করার জন্য মনস্থির করে ফেলেছিলাম। তবে এতে বাবা খুশি হলেন না; তিনি চেয়েছিলেন আমি প্র্যাকটিস শুরু করি, রোজগার করি। বাবার অবশ্য মনোভাব উদার ছিল। তিনি বুঝতে পারছিলেন না, প্র্যাকটিস করে রাজনীতি করা যাবে না কেন? দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস যদি ব্যারিস্টারি আর রাজনীতি এক সঙ্গেই করতে পারেন, তাহলে আমি কেন পারব না?

 
এই সময় একটা ঘটনার কথা আমার মনে পড়ে গেল। হঠাৎ একদিন তিন আত্মগোপনকারী নেতা, কাকাবাবু, সরোজবাবু ও পাঁচুগোপাল ভাদুড়ি আমার হিন্দুস্থান পার্কের বাড়িতে এক মিটিংয়ে এসে বললেন, তাঁদের ডেরাতে ওয়াচার বসেছে, তাই এখনই ওখান থেকে সরতে হবে। তখনই আমি তাঁদের নিয়ে ডোভার লেনে আমাদের এক বন্ধুর(যিনি পরে কেন্দ্রীয় সরকারের একাধিক সংস্থার চেয়ারম্যান নিযুক্ত হয়েছিলেন) বাড়িতে নিয়ে গেলাম। তাঁকে ঘুম থেকে ডেকে তুললাম। তিনি ভালোই ব্যবহার করলেন, আত্মগোপনকারীদের অতিথি হিসেবে রেখেছিলেন। পরে নিরাপদ স্থান স্থির করার পর তাঁদের সরিয়ে নেয়া হয়।

বাবা ইতোমধ্যে আমার বিবাহের জন্য আলোচনা করে রেখেছিলেন। আমি বিবাহের কথা গুরুত্ব দিয়ে তখন ভাবতাম না। কেননা আমি মনে করতাম যে আমাদের কঠিন সংগ্রামের সম্মুখীন হতে হবে। যাই হোক না কেন, আমি বিবাহ করলাম। আমার শ্বশুরের নাম ছিল শ্রীঅনুকূল ঘোষ, এই পরিবারেরই একজন ছিলেন অধ্যাপক প্রফুল্ল ঘোষ; ইনি প্রেসিডেন্সি কলেজের ইংরেজির অধ্যাপক ছিলেন। বিবাহের অল্পদিন বাদেই আমার স্ত্রীর মৃত্যু হয়। ১৯৪১ সালে আমার মায়ের মৃত্যু হয়। আমি সেই সময় হাইকোর্ট বার লাইব্রেরিতে বসে আছি। বাবা টেলিফোনে আমাকে খবর দিলেন। শ্রাদ্ধের কাজ আমার দাদাই করলেন। বাবাই আমাকে বললেন, আমাকে নিরামিষ খেতে হবে না, তার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি অবশ্য ওসব কিছুই করতাম না। বাবা এটা বলাতে আমি জোর পেলাম।

লন্ডন থেকে ফেরার কিছুদিন বাদেই সারাক্ষণের কর্মী হিসেবে আমার পার্টি জীবন শুরু হলো। বেআইনি যুগে(ব্রিটিশ শাসনকালে) আমাদের হিন্দুস্থান রোডের বাড়িতেও পার্টির গোপন বৈঠক হতো, আত্মগোপনকারী পার্টি-নেতাদের আশ্রয় দেয়া হতো। বাবা ও মা সব কিছুই বুঝতেন, কিন্তু কিছু মনে করতেন না।

ব্রিটিশ শাসনে বেআইনি ঘোষিত পার্টির সারাক্ষণের কর্মী হিসেবে আমার অন্যতম একটি দায়িত্ব ছিল আত্মগোপনকারী পার্টি-নেতাদের ও কর্মীদের জন্য আশ্রয় স্থান ঠিক করা, পার্টির গোপন বৈঠকের স্থান ঠিক করা, বাইরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা ইত্যাদি।
লন্ডনবাসের শেষের দিকে কমিউনিস্ট মনোভাবাপন্ন একজন ব্যারিস্টারের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হয়। কলকাতায় ফেরার পর সেই যোগাযোগ আরো ঘনিষ্ঠ হয়। ইনি বেআইনি যুগে ঝুঁকি নিয়ে কয়েকজন আত্মগোপনকারী পার্টি-নেতাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। ইনি পার্টির বাইরের যোগাযোগও রাখতেন। এঁদের নামে দক্ষিণ কলকাতায় একটি বাড়ি নেয়া হয়েছিল; এই বাড়িটি ছিল পার্টির একটি গোপন কেন্দ্র। কিন্তু মাস কয়েক বাদে আমাদের এই ব্যারিস্টার বন্ধু ঘাবড়ে গেলেন। আমরা বুঝলাম, ইনি আর ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। এঁকে আমরা সরিয়ে দিলাম; যে বাড়িটি এঁর নামে নেয়া হয়েছিল, তা আমরা ছেড়ে দিলাম। তার পর এই ব্যারিস্টার বন্ধু আর রাজনীতিতে থাকেননি।

এই সময় আমার একটি দায়িত্ব ছিল পার্টির জন্য চাঁদা সংগ্রহ করা। কয়েকজন পার্টি-দরদি, যাদের মধ্যে দু-একজন উচ্চপদস্থ সরকারি অফিসারও ছিলেন। আমার মাধ্যমে গোপনে পার্টির তহবিলে চাঁদা দিতেন। পার্টি-নেতৃত্ব আমাকে পার্টি-ক্লাস নিতে এবং বিভিন্ন সভায় বক্তৃতা দিতেও পাঠাতেন।

শ্রমিক সংগঠনে

আমার যতদূর মনে পড়ে, ১৯৪৪ সালে পার্টির নেতারা আমাকে শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করার জন্য পাঠান। প্রথম দিকে আমি বন্দর ও ডক শ্রমিকদের সংগঠিত করার জন্য যাতায়াত শুরু করি। বন্দর ও ডক শ্রমিকদের মধ্যে আমাদের বিশেষ কোনো সংগঠন ছিল না। এদের মধ্যে আমরা ঢুকতে পারিনি।

অল ইন্ডিয়া রেলওয়ে মেনস ফেডারেশন তখন সংস্কারপন্থী নেতৃত্বের দখলে। আমরা দাবি জানালাম আমাদের ইউনিয়নকে ফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত করা হোক। ওরা প্রাণপণ চেষ্টা করে আমাদের উপেক্ষা করতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা সফল হলাম। এর আগেই পার্টির নেতৃত্বে পরিচালিত এসআইআর ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন এআইআরএফ-এর অন্তর্ভুক্তি হয়েছিল। আমি আরো কয়েকটি ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে এর পরে জড়িয়ে পড়ি।

মাঝে মধ্যে মুখোমুখি হই অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটনার। সংগ্রামের কঠিন কঠোর দিনলিপিতে নথিবদ্ধ হয়ে যায় কিছু সজল স্মৃতি। তখন ইস্টবেঙ্গল রেলওয়ের জেনারেল ম্যানেজার ছিলেন শ্রী ভাস্করকর। ওঁর ছেলে ছিলেন কমিউনিস্ট মনোভাবাপন্ন। ক্যামব্রিজে শিক্ষা শেষ করে দেশে ফিরে একটি মার্কেন্টাইল ফার্মে বড় চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্ত অকালে চলে যান। মৃত্যুর সময় তাঁর সঞ্চয় ছিল ১০,০০০ টাকা। ওঁর বাবা ভা-ারকর সে টাকা আমাদের হাতে তুলে দিলেন। বললেন, ছেলের রাজনৈতিক মতবাদ তিনি জানতেন। তাই মনে করেছেন পুত্রের সঞ্চয় আমাদের হাতে তুলে দেয়াই শ্রেয়।

রেলওয়ে শ্রমিকদের মধ্যে আমাদের সংগঠন শুধু অর্থনৈতিক প্রশ্নেই শ্রমিকদের সংগঠিত করেনি। প্রয়াস চালিয়েছে, নিরন্তর রাজনৈতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে। সেই সময় রেলওয়ে শ্রমিকরা রাজনৈতিক বিষয়ে ধর্মঘট ও সংগ্রামে শামিল হয়েছেন।

বাংলাদেশ সফরে

পুরনো স্মৃতির কথা বলতে গিয়েই সাতাশির জানুয়ারি বাংলাদেশ সফরের কথা বিশেষভাবে মনে পড়ছে। বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণেই সস্ত্রীক সেখানে গিয়েছিলাম। সফর ছিল দিন পাঁচেকের। ২৯ জানুয়ারি বিকালে ঢাকায় যাই। কলকাতায় ফিরে আসি ফেব্রুয়ারির ২ তারিখে। একচল্লিশ বছর পর ঢাকায়। হাজার হাজার মানুষের সোচ্চার অভ্যর্থনায় আমি অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম।

ঢাকায় যাওয়ার পরদিন গিয়েছিলাম আমার পৈত্রিক বাড়ি নারায়ণগঞ্জের বারদিতে। হেলিকপ্টারে মেঘনা নদী পেরিয়ে। সকালে হেলিকপ্টার নামার পরই সে এক আশ্চর্য দৃশ্য। হাজার হাজার মানুষ এসেছেন, আমাকে দেখতে। তাঁরা আমাকে মনে রেখেছেন! গাঁদা ফুলের পাশাপাশি গোলাপ ফুলের তোড়ায় চাপা পড়ে যাওয়ার যোগাড়।

বুক ভরা ভালোবাসা আমাকে যেন শৈশবে পৌঁছে দিয়েছিল। ওখানে আমাদের পুরনো দোতলা বাড়ি। ছোটবেলায় ছুটির সময় বাবার সঙ্গে বারদির বাড়িতে যেতাম। সেই বাড়ি, ঘর, বারান্দা। পাল্টে যাওয়া চারপাশ। সে এক আলাদা অনুভূতি। আমি আর আমার স্ত্রী দোতলায় উঠি। বারদির বাড়িতে দেখা হয় হবিবুল্লাহ আর তাঁর নব্বই বছরের মা আয়াতুন্নেসার সঙ্গে। উনি আমাকে ছোট বেলায় দেখেছেন। বারদিতে ইউনিয়ন অফিসে আমরা দুপুরের খাবার খেয়েছিলাম। বিকালে ঢাকায় ফিরে আসি।

ঢাকায় রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদের সঙ্গে সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎকার তো ছিলই। মনে আছে, বৈঠক হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী মিজানুর রহমান, উপরাষ্ট্রপতি এ কে এস নুরুল ইসলাম, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে। কথা হয়েছিল আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে। বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে। পরে আরো একবার বাংলাদেশ গিয়েছি। কিন্তু সাতাশির বাংলাদেশ সফর সেবার ভীষণভাবে দাগ কেটেছিল। দেশ ভাগের আগের স্মৃতি যাঁদের আছে তাঁদের সকলেই বোধহয় আমার মতো অবস্থা।

আবার বাংলাদেশে

১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ওঁরা আমায় বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। ওঁদের বিদেশমন্ত্রীও কলকাতায় এসে আমাকে অনুরোধ করেন। কিন্তু বেশ কিছুদিন সময় করা যাচ্ছিল না। অবশেষে ২৭ নভেম্বর আমি ঢাকায় গেলাম। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং অসীম দাশগুপ্ত গিয়েছিলেন আমার সঙ্গে। সরকারিভাবে ওদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। বাংলাদেশ সরকারের আতিথ্যের কথা নতুন করে বলার নয়। সে দেশের মানুষ আমার প্রতি, আমাদের রাজ্য সরকারের প্রতি যে শ্রদ্ধা ভালোবাসা দেখিয়েছেন তাতে আমি অভিভূত। এবারো আমি বারদিতে গিয়েছিলাম। ছোট বেলার স্মৃতি জড়িয়ে আছে যেখানে তার টানই আলাদা। ওই বাড়িটাকে আমি অবশ্য বাংলাদেশ সরকারের হাতেই তুলে দিয়েছি। আমি বলেছিলাম, সাধারণ মানুষের কাজে লাগে এমন কোনোভাবে বাড়িটাকে ব্যবহার করা হোক। ওঁরা কথা দিয়েছেন, তাই হবে।

বাংলাদেশ সফরে স্বাভাবিকভাবেই জলবণ্টন নিয়ে আমাকে হাজারো প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। সাংবাদিকরা তো ছাড়তেই চান না। আমি বললাম, চুক্তি করতে হবে তো দিল্লির সঙ্গে, কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে। আমি চাই, পারস্পরিক স্বার্থ বজায় রেখে জলবণ্টন চুক্তি করা হোক। আমাদের স্বার্থ দেখতে হবে। ওদের ব্যাপারটাও দেখতে হবে। দু’দেশের সুসম্পর্ক গড়তে হবে। জনগণ তাই চান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও তাই বললাম।

জলবণ্টন চুক্তি

বাংলাদেশ থেকে ফিরে ডিসেম্বরের গোড়ায় আমি দিল্লি গেলাম। সেখানে প্রধানমন্ত্রী দেবগৌড়ার সঙ্গে কথা হলো। বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন আলোচনা হলো। তার পরদিনই শেখ হাসিনা দিল্লিতে এলেন। প্রধানমন্ত্রী দেবগৌড়ার সঙ্গে ওনার কথা হলো। আমার সঙ্গে হলো। তারপরই ১২ ডিসেম্বর (১৯৯৬) স্বাক্ষরিত হলো জলবণ্টন নিয়ে সেই ঐতিহাসিক চুক্তি”।

(জ্যোতি বসুর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ থেকে)

%d bloggers like this: