একটি গৌরবময় ও অনুকরণীয় জীবন

বর্তমান আক্রমণের মোকাবিলা  জ্যোতি বসুর দেখানো পথেই 

প্রকাশ কারাত

জ্যোতি বসুর মতো একজন অসাধারণ কমিউনিস্ট নেতার জন্মশতবর্ষ, সারা জীবন ও কাজের মধ্যে দিয়ে তিনি যে উল্লেখ্যযোগ্য অবদানগুলি রেখে গেছেন, তার মূল‌্যায়ন করা এবং রাজনৈতিক জীবনে তিনি যে কৃতিত্ব অর্জন করেছেন ও যে শিক্ষা দিয়েছেন, তার হিসাব টানার একটি উপলক্ষ হতে পারে। নতুন প্রজন্মের কমিউনিস্ট ও প্রগতিশীলদের শিক্ষিত করতে এই মূল‌্যায়ন অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে, যাতে তাদের সামাজিক রূপান্তরের লক্ষ্যে নিরবচ্ছিন্নভাবে উদ্যমী হওয়ার ক্ষেত্রে এই শিক্ষা সাহায্য করতে পারে।

জ্যোতি বসু তাঁর জীবদ্দশাতেই একজন কিংবদন্তী কমিউনিস্ট নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। কমিউনিস্ট আন্দোলনে জ্যোতি বসুর মতো আর এমন কোনো নেতা নেই যাকে গোটা দেশের মানুষ জানতেন এবং  শ্রদ্ধা করতেন। কিভাবে এটা সম্ভব হলো?

জ্যোতি বসুর নাম বামপন্থী রাজনীতি ও সমস্ত মৌলিক আন্দোলনের মূল স্রোতের সঙ্গে সমার্থক হয়ে উঠেছিল। একজন কমিউনিস্ট হিসাবে তাঁর গোটা জীবনকাল জুড়েই তিনি শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ব্রিটেন থেকে ফেরার পরেই তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন এবং সরাসরি রেল শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নে কাজ শুরু করেন। জীবনের শেষ বছরগুলিতেও তিনি সি আই টি ইউ-র একজন নেতা হিসাবে থেকে গিয়েছিলেন।

জ্যোতি বসু কৃষক আন্দোলনেরও একজন প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন, যখন তিনি ১৯৬৭-৭০ সালের মধ্যে দুটি যুক্তফ্রন্ট সরকারকে জমির আন্দোলনকে বিকশিত করার কাজে ব্যবহার করেছিলেন। একইভাবে বামফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবেও তিনি ব্যাপক ভূমি সংস্কারের লক্ষ্যে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। সুতরাং, তাঁর রাজনৈতিক কার্যকলাপ শ্রমিক ও কৃষক, উভয় আন্দোলনের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল।

আইনসভার ভেতরে কাজের সঙ্গে বাইরের গণ-আন্দোলন ও শ্রমিক আন্দোলনের যেভাবে তিনি সম্পৃক্তি ঘটিয়েছিলেন, তা ছিল জ্যোতি বসুর স্বাতন্ত্র্যসূচক অবদানগুলির মধ্যে একটি।  স্বাধীনতার আগেই, ১৯৪৬ সালে বাংলার আইনসভায় জ্যোতি বসু নির্বাচিত হয়েছিলেন। তখন থেকে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি আইনসভায় তাঁর উপস্থিতিকে বাইরে গণ-আন্দোলন ও পার্টির প্রভাবকে শক্তিশালী  এবং আরও উন্নত করতে কাজে লাগিয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালে বাংলার কৃষকদের তেভাগা আন্দোলন যখন শুরু হলো, তখন প্রাথমিক রিপোর্ট সংগ্রহের জন্য জ্যোতি বসু সেই সব জেলাগুলিতে ব‌্যাপকভাবে ঘুরেছিলেন এবং বিধানসভায় তা কার্যকরীভাবে উত্থাপন করেছিলেন।

১৯৫৩সালে জ্যোতি বসু অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির প্রাদেশিক কমিটির সম্পাদক হন এবং ১৯৬১সাল পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বে ছিলেন। এই আট বছরে ১৯৫৯সালের খাদ্য আন্দোলনের মতো বড় বড় আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল, যেখানে পুলিসী আক্রমণে ৮০জনের মৃত্যু হয়েছিল। পার্টির সম্পাদক হিসাবে জ্যোতি বসু যেমন এই আন্দোলনের সম্মুখভাগে ছিলেন, তেমনি জনগণের খাদ্যের দাবিকে নিরলসভাবে বিধানসভার ভেতরে উত্থাপন করেছিলেন।

এর আগে, ১৯৫৪সালের ফেব্রুয়ারিতে যখন স্কুল শিক্ষকদের ধর্মঘট হলো, তখন পার্টি ও শিক্ষক সংগঠনের অনেক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। জ্যোতি বসুকেও গ্রেপ্তারের জন্য পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল এবং তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য বিধানসভার অধিবেশনের প্রথম দিন ভবনের বাইরে পুলিস কড়া নজর রেখেছিল। জ্যোতি বসু কৌশলে বিধানসভা ভবনের ভেতরে ঢুকে পড়েন এবং প্রায় এক সপ্তাহ ধরে এই ভবনের ভেতরেই থেকে যান, যেহেতু পুলিস এর ভেতরে ঢুকতে পারে না। বিধানসভার ভেতরে শিক্ষক ধর্মঘটের বিষয়টি তিনি সফলভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হন। পরে শিক্ষকদের সমাবেশে যোগ দেওয়ার জন্য তিনি বের হন এবং পুলিসের কাছে গ্রেপ্তার হন। একজন বিধায়ক হিসাবে, শ্রমজীবী জনগণের স্বার্থকে উর্ধ্বে তুলে ধরতে কিভাবে জ্যোতি বসু বিধানসভাকে ব্যবহার করেছিলেন, এটা তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

ব্যক্তিগতভাবেও জ্যোতি বসু অসীম সাহসের অধিকারী ছিলেন। ১৯৬৯সালের জুলাই মাসে, তিনি যখন রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন, একটি সংঘর্ষে একজন পুলিস নিহত হওয়ায় প্ররোচিত হয়ে এক দঙ্গল পুলিস বিধানসভা ভবন আক্রমণ করতে ভেতরে ঢুকে পড়ে।  তারা বিধানসভার আসবাবপত্র ভাঙচুর করতে করতে জ্যোতি বসুর ঘরে ঢুকে পড়ে। জ্যোতি বসু শান্তভাবে এই তান্ডবরত পুলিসবাহিনীকে মোকাবিলা করেন এবং অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে তাদের এধরণের আচরণ বন্ধ করতে বলেন। তাঁর স্থৈর্য দেখে হতচকিত হয়ে উত্তেজিত পুলিসের দলটি ধীরে ধীরে তাঁর ঘর ছেড়ে চলে যায়।

রাজ্য সরকারে কমিউনিস্টদের অংশগ্রহণের মধ্যে দিয়ে কিভাবে গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে শক্তিশালী করার কাজে ব্যবহার করা উচিত, তা জ্যোতি বসুই দেখিয়েছিলেন।  ১৯৬৭-৭০ সালের মধ্যে দু’টি স্বল্পকালস্থায়ী যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে তিনি পুলিসকে শ্রমিক ও কৃষকদের আন্দোলনে হস্তক্ষেপ করতে দেননি। জমির আন্দোলনে বাংলা যখন ভেসে গিয়েছিল, তখন জ্যোতি বসু ঘোষণা করেছিলেন যে সমস্ত কৃষক বেনাম জমি চিহ্নিত করছেন এবং তা দখল করছেন, তাদের কাজে সরকার বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। এই সব অভিজ্ঞতাই রাজ্য সরকারে কাজ করতে গিয়ে সি পি আই (এম)-র দৃষ্টিভঙ্গি ও কৌশল কী হবে, তা প্রণয়ন করতে সাহায্য করেছে।

জ্যোতি বসুর জীবনের সবচেয়ে বড় অবদান ১৯৭৭ সালে পশ্চিমবাংলায় বামফ্রন্ট সরকার গঠনের মধ্যে দিয়েই এসেছে, যার তিনি মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তিন দশকের বেশি সময় ধরে বামফ্রন্ট সরকার টিঁকে থাকার উল্লেখযোগ্য রেকর্ড গড়ার পিছনে এই সরকারের নেতৃত্বে একটানা ২৩ বছর জ্যোতি বসুর থাকার অবদানও অনেক। তাঁর নেতৃত্বেই ভূমি-সংস্কারের পরিকল্পনা তৈরি হয়েছিল এবং রূপায়িত হয়েছে। গোটা দেশে পথ-দেখানো এই সংস্কারের ফলে ১১লক্ষ একর জমি ২৫লক্ষ ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষকের মধ্যে বন্টন করা সম্ভব হয়েছে এবং ১৫ লক্ষ ৩০ হাজার বর্গাদার বা ভাগচাষী নথিভূক্ত হয়েছেন ও নির্দিষ্ট সময়ের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা হয়েছে।

ভূমি-সংস্কারের পাশাপাশি ত্রিস্তর পঞ্চায়েতী ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে। ৭৩তম ও ৭৪তম সংবিধান সংশোধনের অনেক আগেই পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েতী ব্যবস্থার গণতান্ত্রিকীকরণের পথ দেখিয়েছে। রাজ্যে ধর্মনিরপেক্ষ বাতাবরণ তৈরির মতো একটি কৃতিত্বকে আজকাল এমনিই হয়ে গেছে বলে ধরে নেওয়া হয়। অথচ, স্বাধীনতার আগে, বাংলা সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে প্রত্যক্ষ করেছে এবং দেশভাগের মধ্যে দিয়ে বিরাট আকারের সাম্প্রদায়িক হিংসার সাক্ষী থেকেছে। কিন্তু বামপন্থী রাজনীতির উত্থান এবং বামফ্রন্টের সরকার গঠন একটি বড় রকমের রূপান্তরের ভিত্তি স্থাপন করে। জ্যোতি বসু শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, গোটা দেশেই ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি দৃঢ় আনুগত্যকে প্রতীক হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন। সমস্ত অংশের সংখ‌্যালঘু মানুষ নিজেদের সুরক্ষিত এবং সাম্প্রদায়িক আক্রমণ থেকে মুক্ত জীবন উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী নিহত হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গে সংখ‌্যালঘু শিখদের ওপর যে কোনো ধরণের আক্রমণ প্রতিহত করতে তিনি যে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন তা সারা দেশে প্রশংসিত হয়েছিল।

সত্তরের দশকে পশ্চিমবঙ্গে আধা-ফ‌্যাসিবাদী সন্ত্রাস নামিয়ে আনা হয়েছিল। ১২০০-র বেশি কমরেড এই সময়ে খুন হন এবং আরো কয়েক হাজার কমরেডকে বলপূর্বক ঘর ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। কমিউনিস্ট আন্দোলন বিভিন্ন সময়ে শাসকশ্রেণীর দমন-নিপীড়নের মোকাবিলা করেছে। কতটা সাফল্যের সঙ্গে এই নিপীড়ন ও হিংসাকে মোকাবিলা করা হচ্ছে, তার ওপর আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়। জ্যোতি বসু ও প্রমোদ দাশগুপ্তের নেতৃত্বে পার্টি এই তীব্র আক্রমণকে প্রতিরোধ করেছিল এবং কখনো মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি। আজকে পশ্চিমবঙ্গে পার্টি ও বামফ্রন্ট যখন আবার ভয়াবহ আক্রমণের মুখে, তখন এই সন্ধিক্ষণে জ্যোতি বসুর পরিণত নেতৃত্বের উদাহরণ আমাদের সামনে পথের দিশা হওয়া উচিত।

দীর্ঘ সাত দশক ধরে, একজন কমিউনিস্ট হিসাবে জ্যোতি বসু আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের নানা ওঠাপড়াকে প্রত‌্যক্ষ করেছেন। কিন্তু মার্কসবাদের প্রতি তাঁর প্রত্যয় কখনো দোদুল্যমান হয়নি। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি বিশ্বাস করতেন যে সমাজতন্ত্রই মানব সভ‌্যতার সামনে একমাত্র বিকল্প।

ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনে প্রয়োগ ও বিকাশের বেশ কয়েকটি দৃষ্টিভঙ্গিগত প্রশ্নে জ্যোতি বসু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। যেমন, কিভাবে কমিউনিস্টরা আইনসভায় কাজ করবেন; ভূমি সংস্কার কর্মসূচীর রূপায়ণে; পঞ্চায়েতী রাজ ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের ক্ষেত্রে; ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রকে রক্ষা করার প্রশ্নে কমিউনিস্টদের দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার রক্ষায়, গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে জ্যোতি বসু যে অবদান রেখেছেন, স্বাধীন ভারতের খুব কম নেতাই সে দাবি করতে পারেন।

গোটা বছর ধরে জন্মশতবর্ষ উদ্‌যাপন করতে গিয়ে তাঁর এই গৌরবময় জীবন ও কর্মধারারই স্মৃতিচারণা করা উচিত।

গণশক্তি, ৭ই জুলাই, ২০১৩

Advertisements
Published in: on জুলাই 10, 2013 at 7:59 অপরাহ্ন  মন্তব্য করুন  

সংসদীয় গণতন্ত্র : অদ্বিতীয় জ্যোতি বসু

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য 

জ্যোতি বসুর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন কোনো স্বল্প পরিসরে আলোচনা করতে যাওয়া সম্ভব না। চল্লিশের দশক থেকে তিনি রাজনীতি শুরু করেছেন এবং তাঁর জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর সঙ্গে কাজ করতে পারা, তাঁর পাশে থেকে কাজ শেখা আমার জীবনের এক দুর্লভ অভিজ্ঞতা। এই প্রবন্ধে আমি মূলত সংসদীয় গণতন্ত্রে তাঁর অবদান সম্পর্কে সংক্ষেপে কয়েকটি কথা বলব।

তিনি বিধানসভার সদস্য হয়ে এসেছিলেন প্রথম ১৯৪৬ সালে। পরাধীন দেশে যুক্ত বাংলার বিধানসভায় তিনি রেলওয়ে শ্রমিক কনস্টিটিউয়েন্সির প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। সেই ১৯৪৬ সাল থেকে বিধানসভা তাঁর কণ্ঠস্বর শুনেছে। তখন বাংলাদেশে গ্রামে-গ্রামে চলছে তেভাগা আন্দোলন। তেভাগা সম্পর্কে বিধানসভায় বক্তৃতার মধ্য দিয়ে তিনি সারা দেশের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন — কিভাবে বাংলার গ্রামে-গ্রামে কৃষকদের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রাম চলেছে, তাদের ফসলের ভাগের জন্য এবং তৎকালীন সরকার কিভাবে সেই কৃষকদের আন্দোলনকে দমন করার জন্য পুলিস এবং মিলিটারি ব্যবহার করছে। পরবর্তীতে স্বাধীনতার পরেও তিনি এ‍‌ই সভায় রাজ্যের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধী নেতা হিসাবে কঠিন দায়িত্ব পালন করে গেছেন। ১৯৫২ সালে তিনি বরানগর বিধানসভা থেকে নির্বাচিত হয়ে পরে এই সভায় আসেন এবং আবার বিরোধী দলের নেতা হন। স্বাধীনতার পরবর্তীতে আমাদের রাজ্যে উদ্বাস্তু আন্দোলন, খাদ্য আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন — বহুমুখী আন্দোলনে তাঁর অনবদ্য ভূমিকা ছিল বিধানসভার ভিতরে এবং বিধানসভার বাইরেও। তিনি এই সমস্ত আন্দোলনকে সংগঠিত করতে প্রথম সারির নেতা হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিরোধী দলের যে ভূমিকা আছে সংসদীয় গণতন্ত্রে তা তিনি তাঁর জীবন দিয়ে, তাঁর কর্মপন্থা দিয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বিরোধী দলের নেতা হিসাবে তিনি সফলভাবে সেই দায়িত্ব পালন করেছেন।

পরবর্তীকালে আমরা তাঁকে দেখেছি তাকে দু’টি স্বল্পকালীন যুক্তফ্রন্ট সরকারের — (একটা ৯ মাস, একটা ১৩ মাস), উপমুখ্যমন্ত্রী হিসাবে। পরবর্তীতে বাম সরকার আসার পরে তিনি হলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং একটানা ২৩ বছর তিনি সাফল্যের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে গেছেন। সংসদীয় রাজনীতির তাঁর কয়েকটি মূল সাফল্য উল্লেখ করতে চাই। সমস্ত কর্মপন্থার মধ্য দিয়ে তিনি রাজ্যের, দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রকে সংহত করা, উন্নত করার চেষ্টা সর্বতোভাবে চালিয়ে গেছেন। তিনি আন্তরিকভাবে গণতন্ত্রকে বিশ্বাস করতেন। তাঁর নিজের জীবনে যদিও তিনি বিনাবিচারে জেল খেটেছেন কিন্তু তিনি কখনও অন্যকে বিনাবিচারে জেল খাটাননি — এটাই ছিল তাঁর বৈশিষ্ট্য। তিনি কোনো কালা আইন হাতে নেননি। তিনি সংবাদপত্রের স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ করেননি। তিনি আন্তরিকভাবে প্রচার মাধ্যমের স্বাধীনতা‌‌য় বিশ্বাস করতেন। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, গণতান্ত্রিক অধিকারগুলি, ব্যক্তি স্বাধীনতা, ট্রেড ইউনিয়নের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে তিনি আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করেছেন এবং সেটি প্রমাণ করেছেন। আমরা এটাও ভুলতে পারি না পশ্চিমবাংলা এমন একটা রাজ্য, যেখানে তাঁর নেতৃত্বে সারা দেশের মধ্যে প্রথম হিউম্যান রাইটস কমিশন গঠিত হয়। জাতীয় কমিশন তৈরি হওয়ার পর আমাদের রাজ্যে পশ্চিমবাংলায় সারা দেশের মধ্যে প্রথম। এই কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয় তাঁর নেতৃত্বে। কারণ তিনি আন্তরিকভাবে যা বিশ্বাস করতেন, সেই কাজ তিনি হাতে-কলমে প্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছেন। সারা জীবন ধরে তিনি সংসদীয় গণতন্ত্রকে এইভাবেই প্রস্ফুটিত করার চেষ্টা করেছেন।

তাঁর আর একটি দিক সম্পর্কে উল্লেখ করতেই হয় তাঁর জীবন চিন্তায়, তাঁর কর্মধারায়, তাঁর রাজনীতিতে তিনি সর্বাঙ্গীণভাবেই ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ। কোনো অবস্থাতেই কোনো ধার্মিক সাম্প্রদায়িক চিন্তা তাঁকে গ্রাস করতে পারেনি, স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি বড় বড় দু’টি ঘটনায় তার প্রমাণ রেখেছেন এই রাজ্যে। শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর সারা দেশে দুর্ভাগ্যজনকভাবে হলেও শিখ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে একটা সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা ছড়িয়ে পড়েছিল। আমাদের রাজ্যে সেই আগুনের উত্তেজনার আঁচ আমরা পেয়েছিলাম কিন্তু এই রাজ্যে কোনো অশান্তি হয়নি। তাঁর নেতৃত্বে আমাদের রাজ্য সেই অবস্থাটা পেরিয়ে আসতে পেরেছিল। ঠিক একইভাবে যখন বাবরি মসজিদ ধ্বংস হয় তখন সারা দেশে অনেক কাণ্ড হয়েছে, অবাঞ্ছিত কাণ্ড। আমাদের রাজ্যে সেই আগুনের হলকা এসেছে, কিন্তু শান্তির পরিবেশ রাখতে মূলত সক্ষম হয়েছে। নিশ্চয়ই এতে আমাদের রাজ্যের মানুষের কৃতিত্ব আছে। কিন্তু সবার উপরে ছিলেন জ্যোতি বসু, একজন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি সেই দায়িত্ব পালন করতে পেরেছিলেন বলে আমাদের রাজ্যে অশান্তি নেমে আসেনি। আজকে সারা দেশের মানুষ জানেন পশ্চিমবাংলায় ধর্মনিরপেক্ষতা সুরক্ষিত। পশ্চিমবাংলায় সাম্প্রদায়িক শক্তির জায়গা নেই। তিনি এই ঐতিহ্যকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন।

সংসদীয় রাজনীতিতে তাঁর বিশেষ ভূমিকা রাজনৈতিক নেতা হিসেবে কি? শ্রমিক আন্দোলন এবং কৃষক আন্দোলনকে তিনি রাজনৈতিক আন্দোলনের মঞ্চের মধ্যস্থলে দাঁড় করিয়েছিলেন। এই দুই শ্রেণী আমাদের দেশে বৈপ্লবিক শক্তি। তাদের চিন্তা, তাদের মুক্তি সেই রাজনীতিকেই তিনি সারা জীবন বিশ্বাস করেছিলেন। তাঁর মুখে শোনা তাঁর ভাষায় একটা ঘটনা এখনও মনে পড়ে জলপাইগুড়ি থেকে আসাম যাচ্ছিলাম ট্রেনে, গোটা ট্রেন অন্ধকার। কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে, জাপানিজরা বোমা ফেলতে পারে। অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে চলেছি জলপাইগুড়ি থেকে আসামে শ্রমিকদের মিটিং করার জন্য, অন্ধকার রাতে এই বিপদের মধ্যে যেতেই হবে। বিশ্বাস করেছি শ্রমিক‍‌শ্রেণীর মুক্তি। সেই কাজ করে গেছি, কেউ বাধা দিতে পারেনি। শ্রমিকদের এবং কৃষকদের তিনি রাজনৈতিক আন্দোলনের মাঝখানে দাঁড় করিয়েছিলেন।

(বিধানসভায় ১০ই মার্চ ২০১০ তারিখের বক্তৃতাকে ভিত্তি করে লিখিত) 

গণশক্তি, ৭ই জুলাই, ২০১৩ 

জ্যোতি বসুর জন্মশতবর্ষ

বিমান বসু 

কমরেড জ্যোতি বসুর আজ থেকে জন্ম শতবর্ষ শুরু হলো। তিনি ১৯১৪ সালের ৮ই জুলাই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আর আমা‍দের ছেড়ে চলে গেছেন ২০১০ সালের ১৭ই জানুয়ারি। জ্যোতি বসু দীর্ঘ সাত দশক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকে তাঁর জীবদ্দশায় আমাদের দে‍‌শের কমিউনিস্ট ও বামপন্থী আন্দোলনের সব থেকে বেশি পরিচিত নেতা ছিলেন। এমনকি ভারতের কমিউনিস্ট ও বামপন্থী নেতা হিসেবে বিদেশেও তিনি পরিচিত ছিলেন। জ্যোতিবাবু দেশে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন একজন কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী হিসেবে। ১৯৪০ সালে বিলেত থেকে দেশে ফিরে কমরেড মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের সঙ্গে দেখা করে পার্টিতে সর্বক্ষণের কর্মী হিসেবে কাজ করার ইচ্ছে প্রকাশ করলে তা তখন পূরণ করা হয়েছিলো।

শ্রমিক সংগঠনের কাজের মধ্য দিয়েই জ্যোতিবাবুর রাজনৈতিক কার্যকলাপ শুরু হয়েছিলো। কমরেড মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের নির্দেশে তিনি বন্দর (পোর্ট) শ্রমিকদের মধ্যে এবং রেল শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে সংগঠন গড়ার কাজে যুক্ত হন। কিন্তু জ্যোতিবাবু রেল শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে কাজ করায় বেশি স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করতেন। তাই ধীরে ধীরে রেলওয়ে ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের নেতা হয়ে উঠেছিলেন। উল্লেখ্য, ১৯৪৬ সালে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভায় রেল কেন্দ্র থেকে কমিউনিস্ট প্রার্থী হিসেবে জ্যোতিবাবু কংগ্রেসের ড. হুমায়ুন কবীরকে পরাস্ত করে জয়ী হয়ে‍‌ছিলেন।

শ্রমিক সংগঠনে কাজের সঙ্গে জ্যোতিবাবু ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হয়ে গেলেও দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মানবতার শত্রু ফ্যাসিবাসী আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে অন্যান্যদের সঙ্গে সমানভাবে সোচ্চার হয়েছিলেন। তাই সবাই মিলে ১৯৪১ সালে ‘সো‍ভিয়েত সুহৃদ সমিতির’ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত করেছিলেন কমরেড জ্যোতি বসুকে। ধীরে ধীরে জ্যোতিবাবু সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষের জীবন-যন্ত্রণা লাঘব করার আন্দোলন সংগ্রামে একজন বিশিষ্ট প্রচারক ও সংগঠক হিসেবে গড়ে ওঠেন। জ্যোতিবাবু বিধায়ক হিসেবে প্রাদেশিক আইনসভার ভিতরে শ্রমিক-কৃষক আন্দোলন, খাদ্য সমস্যা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, বন্দীমুক্তি, ব্রিটিশ পুলিসের নির্যাতন প্রভৃতি বিষয় নিয়ে আলোচনা করে আইনসভার বাইরে আলোড়ন সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন। এইভা‍‌বে নানা কাজে যুক্ত থাকার ফলে ’৪৬ সালের ১৬ই আগস্ট কলকাতায় ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা শুরু হলে তা বন্ধ করতে রাস্তায় নেমে ইতিবাচক ভূমিকা পালন ক‍‌রেছিলেন।আবার বাংলার কৃষকসমাজ ‘তেভাগা আন্দোলন’ শুরু করলে তাঁদের ন্যায্য দাবি আদায়ের কথা বারবার আইনসভার অভ্যন্তরে জোরালো ভাষায় পেশ করেছেন। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৬ মাসের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ করা হয়। যেদিন নিষিদ্ধ করা হলো অর্থাৎ ২৬শে মার্চ, সেইদিনই জ্যোতিবাবুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো। এটাই তাঁর প্রথম কারাজীবন। এরপর অনেকবারই তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন, মুক্ত হয়েছেন। আবার একবার গ্রেপ্তার থাকাকালীন সময়ে ‘হেবিয়াস কর্পাস’-এ আবেদন করে হাইকোর্টের আদেশে তিনি ১৯৫১ সালে মুক্তি পান। এরপর পার্টি আবার বৈধ হয়।

১৯৫২ সালে প্রথম সাধারণ নির্বাচনে জ্যোতিবাবু পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় কমিউনিস্ট সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত টানা তিনি বিধানসভার সদস্য ছিলেন। ব্যতিক্রম ছিলো ১৯৭২ সালে জাল-জোচ্চুরি করে সাজানো বিধানসভা তৈরি করার সময়। কমিউনিস্ট পার্টির কাজে দক্ষতা অর্জন করার ফলশ্রুতিতে ১৯৫৩-৫৪ সালে জ্যোতিবাবু পার্টির পশ্চিমবঙ্গ প্রাদেশিক কমিটির সম্পাদক নির্বাচিত হন। এই পদে তিনি ছিলেন ১৯৬০-৬১ সাল পর্যন্ত। তখনকার দিনে প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে জ্যোতিবাবু বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন। যেমন ১৯৫৩ সালে ট্রামভাড়া বৃদ্ধির বিরুদ্ধে আন্দোলন, ১৯৫৪ সালে দুর্ভিক্ষ-বিরোধী আন্দোলন, ১৯৫৬ সালে বঙ্গ-বিহার সংযুক্তি বিরোধী আন্দোলন, ১৯৫৯ সালে ঐতিহাসিক খাদ্য আন্দোলন, ১৯৬৫-৬৬ সালের আন্দোলন সহ সমস্ত আন্দোলনে জ্যোতিবাবু সামনের সারিতে থেকে লড়াই সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৬৫ সালে জ্যোতিবাবু গ্রেপ্তার হয়ে পরে ১৯৬৬ সালে মুক্ত হন, কিন্তু জ্যোতিবাবু কোনো কো‍নো সময়ে গ্রেপ্তারী এড়ানোর জন্য আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

জ্যোতিবাবু আন্দোলন সংগ্রামে যেমন যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন, ঠিক তেমন প্রশাসনের যখন যেখানে যে পদে আসীন ছিলেন, সেখানেও তিনি তাঁর দক্ষতার ছাপ ফেলেছিলেন। যেমন ১৯৬৭-৬৯-এর স্বল্পস্থায়ী যুক্তফ্রন্ট সরকারের উপ-মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করলেও রাজ্যের জনগণের কাছে মুখ্য আকর্ষণ ছিলেন আবার জ্যোতিবাবু। এ-রাজ্যে জ্যোতিবাবুই প্রথম ঘোষণা করেছিলেন যে ন্যায়সঙ্গত শ্রমিক-কৃষক আন্দোলন দমন করতে পুলিসকে ব্যবহার করা হবে না। যদিও সেই সময়ে মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বাংলা কংগ্রেসের অজয় মুখোপাধ্যায়। এরপর কংগ্রেস রাজত্বে নৈরাজ্য, সন্ত্রাস, আধা-ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসের রাজত্বের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন বিকাশের ক্ষেত্রে ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার লড়াইতে জ্যোতিবাবু মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। দেশব্যাপী জরুরী অবস্থার বিরুদ্ধে জনমত সংগঠিত করার কাজেও জ্যোতিবাবু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আর জরুরী অবস্থা অবসানের পর লোকসভা নির্বাচন ঘোষিত হলে রাজ্যে সমস্ত বামপন্থী দলসমূহকে নিয়ে বামফ্রন্ট গড়ে তোলার কাজে কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্তর সহযোগী হিসেবে কমরেড জ্যোতি বসু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

১৯৭৭ সালে প্রথমে সারা ‍‌দেশে লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং কেন্দ্রে কংগ্রেসের পরাজয়ে প্রথম অকংগ্রেসী সরকার গড়ে ওঠে। পরে রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বামফ্রন্ট জয়ী হয় এবং কমরেড জ্যোতি বসু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেই তিনি রাজ্যে নৈরাজ্যের অবসান ঘটিয়ে শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন। প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে সিদ্ধান্ত করেন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সর্বত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং সমস্ত রাজবন্দীদের মুক্তি দিতে হবে। তাই অল্প কয়েকমাসের মধ্যে ১৭০০ রাজবন্দী মুক্তি পান। এবং ১০,০০০ মিথ্যা ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহৃত হয়। এই রাজবন্দী ও মিথ্যা মামলার আসামীদের মধ্যে প্রায় সব রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা যুক্ত ছিলেন।

নির্বাচনী ইশ্‌তেহারে ৩৬ দফা কর্মসূচীর প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবে রূপায়িত করার লক্ষ্যে জ্যোতি বসু ঐকান্তিক ছিলেন। তাই সম্ভব হয়েছিলো এক বছরের কম সময়তে ত্রিস্তর পঞ্চায়েতী নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে এই নতুন পঞ্চায়েতী ব্যবস্থা নির্বাচনের মাধ্যমে সারা ভারতে প্রথম পশ্চিমবঙ্গে বাস্তবায়িত করা। ধীরে ধীরে নির্বাচনের মাধ্যমে পৌরসভা ও সমবায় সমিতি গড়ে ওঠার কাজ শুরু হলো। আসলে জ্যোতিবাবু বামফ্রন্টের ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের নীতিকে সরকারী ব্যবস্থাপনায় কার্যকরীভাবে রূপায়ণ করার কাজে একশ’ ভাগ আন্তরিক ছিলেন। গণতন্ত্রকে গ্রাসরুট লেভেলে পৌঁছে দিয়ে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেছেন।

শপথ গ্রহণ করেই জ্যোতিবাবু ঘোষণা করেছিলেন ন্যায়সঙ্গত গণ-আন্দোলন দমন করতে পুলিস ব্যবহার করা হবে না। ঘোষণা করেছিলেন সমাজের সব অংশের মানুষ, যাঁরা বিভিন্ন পেশায় যুক্ত রয়েছেন তাঁদের সকলেরই নিজের নিজের ক্ষেত্রে সংগঠিত হওয়া ও ইউনিয়ন করার অধিকার থাকবে। ফলে, রাজ্য সরকারী কর্মচারী যাঁদের কংগ্রেস আমলে চাকরি থেকে অন্যায়ভাবে বরখাস্ত করা হয়েছিলো বা সাসপেন্ড করা হয়েছিলো তাঁদের সবাইকে নিজের নিজের কর্মক্ষেত্রে পুনর্বহাল করা হয়। কলে-কারখানায় শ্রমিকদের ইউনিয়ন করার অধিকারের ওপর যে বিধিনিষেধ ছিলো তা প্রত্যাহার করা হয়। ছাত্রসংসদ নির্বাচন যা আগে বন্ধ করা হয়েছিলো, তা পুনরায় চালু করা হয়। একইসঙ্গে ভূমিসংস্কারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। ফলে ভূমিহীন চাষীদের মধ্যে সরকার অধিকৃত জমি বিলিবণ্টন করা শুরু হয়ে যায়। পরবর্তীতে পুরোনো জমিদার-জোতদারদের সিলিং বহির্ভূত জমি অধিগ্রহণ করে গরিব কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। এমনকি বর্গাচাষীর স্বার্থরক্ষা করতে ‘অপারেশন বর্গা’ চালু করা হয়।

শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে একবছরের মধ্যে এক হাজার নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয় এবং শিক্ষাকে ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত অবৈতনিক ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীসময়ে সমগ্র স্কুলশিক্ষা অবৈতনিক হয়েছে। পরিকল্পনা করে প্রাথমিক, জুনিয়র, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, কলেজের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফলে ব্যাপক ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষার অঙ্গনে এসে শিক্ষালাভের সুযোগ পেয়েছে। জ্যোতিবাবু সবসময়ে শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে উৎসাহ দিতেন। নিচের ক্লাসগুলোতে বিনামূল্যে পাঠ্যবই সরবরাহ করার নিয়মও চালু করা হয়। ফলশ্রুতিতে প্রথম প্রজন্মের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে শিক্ষালাভের সুযোগ বৃদ্ধি পেল। স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রসারিত করে প্রতিষেধকমূলক থেকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা শ্রেয় তা প্রচারে গুরুত্ব পেয়েছিলো। এইসব কাজে জ্যোতিবাবুর তদারকি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং জ্যোতিবাবুকে একজন দক্ষ প্রশাসকের আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করেছে। আবার সব দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রিসভার সদস্যদের জ্যোতিবাবু স্বাধীনভাবে কাজ করতে উৎসাহিত করতেন।

আমি লক্ষ্য করেছি, জ্যোতিবাবু রাজনৈতিক দিক থেকে প্রতিকূল পরিস্থিতি গড়ে উঠলেও আন্দোলন-সংগ্রাম ও সংগঠনের কাজ করতে কখনো দিশেহারা হতেন না। আবার প্রশাসন পরিচালনা করার সময়ও দৃঢ় মনোভাব নিয়ে তা মোকাবিলা করতেন। ১৯৬৯ সালে দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময়ে পুলিসে অসন্তোষ দেখা দিলে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে তাঁর কাছে পুলিসী পোশাকে বিক্ষোভ দেখাতে গেলে ধীরস্থিরভাবে বলেছিলেন — আপনারা বাইরে যান, পরে কথা বলবো। তিনি বিশ্বাস করতেন রাজনৈতিক কাজ করলে সমস্যা দেখা দিতে পারে কিন্তু তা ধীরস্থিরভাবে সমাধা করতে হবে। আবার তিনি মানুষের উপর আস্থা রাখতেন এবং বলতেন ‘মানুষ, একমাত্র মানুষই ইতিহাস রচনা করে। এটা ঠিকই যে মানুষ কখনো কখনো ভুলও করে। কিন্তু নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে শেষপর্যন্ত মানুষের জয়ই অবশ্যম্ভাবী।’

রাজ্যে নৈরাজ্যের অবসান ঘটিয়ে শান্তি—শৃঙ্খলার প্রতিষ্ঠা ও গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার কাজসহ নানা উন্নয়নমূলক কাজ করেই জ্যোতিবাবু সন্তুষ্ট হয়ে বসে থাকতেন না। তাই ভারতের মতো যুক্তরাষ্ট্রীয় রাষ্ট্র কাঠামোতে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক যুক্তিসঙ্গত পুনর্বিন্যাসের দাবিতে আন্দোলন পরিচালনা করার ক্ষেত্রে জ্যোতিবাবু ভারতের যে কোন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর থেকে একটু অগ্রণী অবস্থানে ছিলেন। কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক নিয়ে নানা জায়গায় অসংখ্য আলোচনাসভা হয়েছে। শ্রীনগর কনক্লেভ, কলকাতা কনক্লেভ, দিল্লি কনক্লেভ প্রভৃতি সফলভাবে আয়োজিত হয়েছে। জাতীয় বিভিন্ন বিষয়ের ওপর জ্যোতিবাবুর যুক্তিশীল বক্তব্য তাঁকে সর্বভারতীয় নেতার আসনে বসিয়েছে। স্বাভাবিকভাবে, প্রবাদপ্রতিম এই কমিউনিস্ট নেতার শতবর্ষে তাঁর কর্ম ও জীবনের নানা শিক্ষণীয় দিক বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে আমাদের পার্টির পক্ষ থেকে একবছর ধরে নানা কর্মসূচীর রূপায়ণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

কমরেড জ্যোতি বসু কমিউনিস্ট আন্দোলন ও বামপন্থী আন্দোলনের নেতা ও কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করে বিকল্পের সন্ধানে অনেক পথ হেঁটেছেন। রাজ্যে বহুবছর ধরে কোয়ালিশন সরকার চালিয়ে বর্তমান সময় যে কোয়ালিশনের সময় তা নিজের কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে জ্যোতিবাবু মূর্ত করে তুলেছেন। স্বাভাবিকভাবে ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জ্যোতিবাবুর কমিউনিস্ট ও বাম আন্দোলন সংগ্রাম ‍‌থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে তাকে বাস্তবে রূপায়িত করার অঙ্গীকার আমাদের নিতে হবে। 

গণশক্তি, ৮ই জুলাই, ২০১৩

মানুষের প্রতি অবিচল আস্থাই ছিল তাঁর শক্তির উৎস

সীতারাম ইয়েচুরি 

আগামী ৮ই জুলাই কমরেড জ্যোতি বসুর জন্মশতবর্ষের সূচনা হবে।

যদিও আমরা সবাই জানি প্রকৃতির নিয়মেই জন্ম হলে একদিন মৃত্যু আসবেই। কিন্তু এই অনিবার্য ঘটনাকে মেনে নেওয়াটা সবার পক্ষেই অত্যন্ত কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যখন বর্তমান পরিস্থিতির প্রতিটি বাঁক ও মোড়ে কমরেড জ্যোতি বসুর অনুপস্থিতি আমরা অনুভব করছি। সারাজীবন তিনি ভারতে এবং অবশ্যই সারা বিশ্বে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করেছেন। তাঁর সেই অসমাপ্ত কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব তাঁর অনুপস্থিতিতে আমাদের ওপর বর্তেছে।

ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার 

জ্যোতি বসুর সাত দশকের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন এবং আধুনিক ভারতের বিবর্তন একই গতিতে চলেছে। এই বিশেষ কারণে, তিনি সবসময়ই অনুপ্রেরণার উৎস এবং নবীন প্রজন্মের কাছে আদর্শস্থানীয়। তাঁর উত্তরাধিকার একইভাবে এই প্রেরণার উৎস হয়েই থাকবে। প্রকৃতপক্ষে শুধুই কমিউনিস্ট আন্দোলনের নয়, তিনি আধুনিক ভারতের একজন অন্যতম প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব। ইংল্যান্ডে গিয়ে ব্যারিস্টার হওয়ার সময় তিনি কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রতি আকৃষ্ট হন ও এই মতাদর্শকে বরণ করেন। ১৯৪০ সালে ভারতে ফিরে আইনজীবীর কালো কোট না পরে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করে সরাসরি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কার্ল মার্কস একসময় বলেছিলেন যে যখন একটি ভাবনা জনগণের মনকে আলোড়িত করে, তখন তা এক বাস্তব শক্তি হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনতার ইচ্ছা যখন ভারতের মানুষকে আলোড়িত করছে, তখন জ্যোতি বসু কমিউনিস্ট আন্দোলনে যোগদান করেছিলেন। যদিও স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্র চরিত্র এবং তার উপাদান কী হবে তা নিয়ে তাঁর চিন্তা আরও অগ্রসর ছিল। তাঁরা মনে করতেন, যে রাজনৈতিক স্বাধীনতা আসবে তাকে প্রতিটি ভারতবাসীর সত্যিকারের অর্থনৈতিক স্বাধীনতাতে রূপান্তরিত করা প্রয়োজন। এর অর্থ হচ্ছে একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজ তৈরি করা যেখানে মানুষের উপর মানুষের শোষণ বিলুপ্ত হবে। তাঁর এই ইচ্ছা-আবেগ কখনও লঘু হয়ে যায়নি। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি ভারতের জনগণের জন্য কাজ করে গেছেন। তাঁর দীর্ঘ ও বর্ণময় জীবনে তিনি বহু ঝড়-ঝঞ্ঝার সম্মুখীন হয়েছেন, কিন্তু আদর্শের প্রতি তিনি ছিলেন অবিচল। মতাদর্শের সঙ্গে দায়বদ্ধতার মেলবন্ধনের কারণেই জ্যোতি বসু একজন ‘আদর্শ মানুষ’ হয়ে উঠেছেন।

স্বাধীনোত্তর ভারত বড় বড় সংগ্রামের মধ্যে আবর্তিত হচ্ছিল, যার ফলশ্রুতিতে সামন্তবাদী রাজশক্তি শাসিত রাজ্যগুলি ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়। কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে সংগ্রামগুলি ভূমি সংস্কারের দাবিতে এবং সামন্ততান্ত্রিক জমিদারব্যবস্থাগুলি বিলোপ করার বিষয়টিকে সামনে নিয়ে আসে। এই সময়েই ভারতের বিভিন্ন ভাষাভাষী জাতি, যারা স্বাধীনতা সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন, তারা নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় পেতে চাইছিলেন। এই প্রক্রিয়ায় শেষপর্যন্ত ১৯৫৬ সালে ভারতের রাজ্যগুলির ভাষাভিত্তিক পুনর্গঠন হয়।

আমাদের দেশের ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক চরিত্র এবং প্রশাসনিক কাঠামোর প্রতি জ্যোতি বসুর দৃঢ় প্রত্যয় তাঁর কর্মপদ্ধতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত থেকেছে। সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলি সর্বদাই আধুনিক ভারতের বিবর্তনের বিরোধী শক্তির প্রতিভূ হয়ে থেকেছে। জ্যোতি বসু এই সাম্প্রদায়িক শক্তিকে বিচ্ছিন্ন এবং পরাস্ত করা ও ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিকে শক্তিশালী করার জন্য কাজ করে গেছেন। পাশাপাশি, ভারতের রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে জনগণের অর্থনৈতিক স্বাধীনতায় রূপান্তরিত করার জন্য, সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে তিনি সম্পূর্ণভাবে মনোনিবেশ করেছিলেন। কীভাবে তা অর্জিত হবে এই বিষয়ে ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ভেতরে এক তীব্র মতাদর্শগত লড়াই শুরু হয়। বাম ও দক্ষিণপন্থী এই দুই বিচ্যুতির বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই করে অন্যান্য কমরেডদের সাথে জ্যোতি বসু সি পি আই (এম) গঠন করেছিলেন। যাঁরা লক্ষ্যপূরণে সংসদীয় এবং সংসদ- বহির্ভূত কার্যক্রমকে একত্রিত করে লড়াই করার সঠিক পথ গ্রহণ করেছিলেন। সংসদীয় গণতন্ত্র, তার প্রতিষ্ঠান এবং মঞ্চগুলিকে ব্যবহার করে আন্দোলন এবং একইসাথে জনগণের কাছে আরও বেশি সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার সংগ্রামে জ্যোতি বসু ছিলেন অনবদ্য। আধুনিক ভারতের সংহতির লক্ষ্যে ভূমি সংস্কার রূপায়ণ, পঞ্চায়েতীরাজ প্রতিষ্ঠানগুলির উন্নতিসাধন করে গণতন্ত্রকে শিকড়ের গভীরে পৌঁছে দেওয়া, ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে শক্তিশালী করার জন্য কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি বিষয়গুলি জ্যোতি বসুর বিশেষ অবদান হিসাবে স্বীকৃত। এই সমস্ত বিষয়গুলি ছাড়া, জ্যোতি বসুর ব্যক্তিত্বের প্রধান দিক যা জনগণকে আকৃষ্ট করতো তা হলো মানুষের প্রতি তাঁর অবিচল আস্থা। তিনি সবসময় পার্টি ও কর্মীদের মানুষের কাছে যাওয়ার কথা বলতেন, আমরা কি করছি তা ব্যাখ্যা করতে বলতেন এবং মানুষের প্রতি বিশ্বাস রাখতে বলতেন। মানুষের প্রতি  এই বিশ্বাসই ছিল তাঁর শক্তি। মানুষ তাই তাঁর সততা নিয়ে কোনোদিন প্রশ্ন তোলেননি, এমনকি সন্দেহ প্রকাশও করেননি। 

মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু 

একটানা ২৩ বছর ধরে মুখ্যমন্ত্রী থাকার পর ২০০০ সালে স্বেচ্ছায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে সরে আসেন জ্যোতি বসু, যা ভারতের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং নৈতিকতায় এক নতুন মাত্রা যোগ করে। আগের মতো প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে সক্ষম হচ্ছিলেন না বলে তাঁর নিজের মধ্যেই অসন্তুষ্টি ছিল এবং তাই মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে তাঁর সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছায় সি পি আই (এম) পলিট ব্যুরো সম্মতি দিয়েছিল।

১৯৭৭ সালে যখন জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন তখন পশ্চিমবঙ্গের দারিদ্র্যের অনুপাত ছিল প্রায় ৫২ শতাংশ। ১৯৯৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২৬ শতাংশ, প্রতি বছর ৪.২ শতাংশ হারে হ্রাস। এভাবে ভারতের রাজ্যগুলির মধ্যে দারিদ্র্য দূরীকরণে পশ্চিমবঙ্গ প্রথম স্থান লাভ করে। কেরালা ছিল দ্বিতীয় স্থানে প্রতি বছর ৩.৭ শতাংশ দারিদ্র্য হারে হ্রাস করে (সূত্র: ভারত-দারিদ্র্য হ্রাসের নীতিগুলি—বিশ্বব্যাঙ্ক, ২০০০)। তুলনামূলকভাবে, মহারাষ্ট্রে ১৯৯৪ সালে দারিদ্র্যের অনুপাত ছিল ৪৩.৫ শতাংশ। কৃষিক্ষেত্রে একইভাবে উন্নতি ঘটে। খাদ্যে ঘাটতি রাজ্য থেকে এই সময়েই পশ্চিমবঙ্গ উদ্বৃত্ত রাজ্যে পরিণত হয়। ধান উৎপাদনে শীর্ষস্থানে পৌঁছায় এই রাজ্য। অপারেশন বর্গার সাফল্যের ফলশ্রুতিতে রাজ্যের ৯০ শতাংশ কৃষিজমির মালিক হন প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষীরা। জ্যোতি বসুর মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়ে ভূমিহীনদের মধ্যে ১৩ লক্ষ একর জমি বণ্টন করা হয়েছে। অতীতে কায়েমী স্বার্থ বেআইনীভাবে এই জমি দখলে রেখেছিল।

জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে বামফ্রন্ট সরকার অন্ধভাবে উদারনৈতিক অর্থনীতিকে আঁকড়ে ধরে থাকেনি। বরং উদারনীতির প্রবক্তা যারা অর্থনীতির পরিধি থেকে রাষ্ট্রকে সরিয়ে রাখার কথা বলেছিলেন এবং রাষ্ট্রের সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি বিসর্জন দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন—তাদের বিরুদ্ধে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার অর্থনৈতিক উন্নয়নে এবং ভূমিসংস্কারের ক্ষেত্রে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছে।

অনবদ্য ব্যক্তিগত গুণাবলী 

২৫ বছরের বেশি সময় আমাদের পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে জ্যোতি বসুর সাথে কাজ করতে গিয়ে তাঁর অনেক প্রশংসনীয় গুণ দেখেছি যা অনুসরণযোগ্য। একটি হলো, মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে যুক্তির শক্তির উপর তাঁর অবিচল আস্থা। আবেগের আশ্রয় নিয়ে কোনোদিন কোনো তর্কেই তাঁকে হারানো যায়নি। বসুর ব্যক্তিত্বের একটি প্রধান দিক হলো তাঁর মানসিকতা। তাঁর মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন আমি কয়েকবার তাঁর সাথে বিদেশ ভ্রমণ করেছি। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে স্বাভাবিকভাবেই তিনি কিছু বিশেষ সুবিধা পাওয়ার অধিকারী ছিলেন। কিন্তু ‍‌তিনি সবসময়ই অন্য কমরেডদের সাথে ভ্রমণ করতে পছন্দ করতেন এবং মুখ্যমন্ত্রী থাকার শেষদিন পর্যন্ত তিনি ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের ‘ইকনমি ক্লাস’-এই ভ্রমণ করেছেন। এই সময়গুলিতে তিনি কিন্তু তাঁর সঙ্গী কমরেডদের বিষয়ে সজাগ থাকতেন, তাঁদের সুবিধা এবং প্রয়োজন সম্বন্ধে খবর রাখতেন। আমি একবারও তাঁকে ধৈর্য হারাতে দে‍খিনি।

জ্যোতি বসুর আর একটি গুণ হলো স্বেচ্ছাপ্রণোদিত শৃঙ্খলা, যা তাঁর ব্যক্তি ও রাজনৈতিক জীবনে তিনি সর্বদা মেনে চলেছেন। ১৯৯৬ সালে সংযুক্ত ফ্রন্ট সরকারের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাবের সপক্ষে তিনি মত দেন কিন্তু কেন্দ্রীয় কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠের মতে প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যায়। সেই সময় তিনি শৃঙ্খলাবদ্ধ সৈনিকের মতো মনোভাব দেখিয়েছিলেন। ১৯৯৮ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত পার্টি কংগ্রেসে কেন্দ্রীয় কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠের মত গৃহীত হয়। তাঁর ব্যক্তিগত মতামত যাই থাকুক তিনি শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠের মতকেই তুলে ধরেছেন এবং তাঁর দায়িত্ব পালন করে গেছেন। কমিউনিস্ট পার্টির লৌহদৃঢ় শৃঙ্খলা এবং সাংগঠনিক নীতিগুলির প্রতি তাঁর আনুগত্য অনুসরণযোগ্য। তরুণ প্রজন্মের কাছে এগুলি শিক্ষণীয় গুণাবলী।

১৯৯৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমরা দুজনে কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে ফিদেল কাস্ত্রো এবং পার্টি নেতাদের সাথে আলোচনার জন্য কিউবা যাই। স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদ হয়ে ফেরার সময় আমাদের প্রায় একদিন মাদ্রিদে থাকতে হয় দেশে ফেরার বিমানের জন্য। স্পেনে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত কিউবা যাওয়ার পথে আমাদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, আমরা কোনো বিশেষ দ্রষ্টব্য স্থানে যেতে চাই কি না। জ্যোতি বসু আমার দিকে তাকান। আমি বলি পিকাসোর ‘গুয়ের্নিকা’-র মূল ছবিটি যেহেতু মাদ্রিদের একটি মিউজিয়ামে আছে, তা দেখা যেতে পারে। কিন্তু কিউবা থেকে ফেরার সময় জ্যোতি বসু ঐ মিউজিয়ামে আর যেতে চাইলেন না শারীরিক কারণেই। তিনি আমাকে যেতে বললেন। এই কথায় ভারতের রাষ্ট্রদূত বললেন, মিউজিয়ামটি ঐদিন বন্ধ থাকার কথা। কিন্তু জ্যোতি বসুর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করে তা খোলা রাখা হয়েছে। এই কথা শুনে জ্যোতি বসু বললেন, ‘ওরা জ্যোতি বসুকে কোনোদিন দেখেননি, তাই চিনবেন কি করে কে জ্যোতি বসু। সীতারাম যাক, ওরা বুঝবেন না কে গেছেন।’ শেষ পর্যন্ত আমি গেলাম, মিউজিয়াম খোলা ছিল এবং আমি ‘গুয়ের্নিকা’ দেখলাম।

সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে চলো 

আধুনিক ভারতের সংহতি, রাজনৈতিক নৈতিকতা জ্যোতি বসুর জীবন এবং কাজের মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে এবং এই গুণাবলী অর্জিত হতে পারে তাঁর জীবনধারাকে অনুসরণ করার মধ্যে দিয়ে। ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করা, রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে জনগণের প্রকৃত অর্থনৈতিক উন্নয়নে রূপান্তরিত করার অসমাপ্ত কাজ এই সংহতির রূপরেখাকে সূত্রায়িত করবে। দেশ এবং জনগণের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করার মর্মবাণীকে আমাদের শক্তিশালী করতে হবে।

২০০৩ সালের ৪ঠা এপ্রিল চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য তাঁর মরণোত্তর দেহদানের অঙ্গীকারপত্রে সই করতে গিয়ে জ্যোতি বসু লিখেছিলেন, ‘একজন কমিউনিস্ট হিসাবে, জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত মানবজাতির সেবায় নিয়োজিত থাকার জন্য আমি অঙ্গীকারবদ্ধ। আমি খুশি যে এখন এমনকি মৃত্যুর পরেও আমি এই সেবা করতে পারবো।’

লড়াই করার অদম্য ক্ষমতা সারা জীবন ধরে দেখিয়েছেন জ্যোতি বসু। মৃত্যুর সময়ও তিনি লড়াই চালিয়ে গেছেন। তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করার পর সবাই যখন আশা ছেড়ে দিয়েছেন, তখনও সবাইকে অবাক করে তিনি ১৭ দিন লড়াই চালিয়ে গেছেন। ‘কখনও ছেড়ে দাও বলবে না’ এই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত।

তিনি পলিট ব্যুরোর প্রথম ৯ জন সদস্যের অন্যতম এবং ঐ ঝোড়ো দিনগুলিতে সি পি আই (এম) প্রতিষ্ঠার সময় নবরত্নের শেষ ব্যক্তি হিসাবে তিনি বিদায় নিয়েছেন। মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে আমাদের সংগ্রামকে আরও শক্তিশালী করার মাধ্যমে আমরা জ্যোতি বসুর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারবো।

গণশক্তি, ৭ই জুলাই, ২০১৩

Published in: on জুলাই 10, 2013 at 7:48 অপরাহ্ন  মন্তব্য করুন  

উদ্যত প্রতিকূলতার সফল মোকাবিলারই অন্য নাম জ্যোতি বসু

অঞ্জন বেরা

জন্মশতবর্ষ পালন অনেক সময়ই দূর-স্মৃতিচারণার রকমফের । কিন্তু কমরেড জ্যোতি বসুর শতবর্ষ  তেমন নয়। মাত্র সাড়ে তিন বছর আগে তাঁকে আমরা হারিয়েছি । মৃত্যুর ঠিক আগে পর্যন্ত জনজীবনে ও রাজনৈতিক পরিসরে তিনি  প্রখরভাবে ব্যাপ্ত ছিলেন । অতি-দৃশ্যময়তার এই যুগেও সাড়ে তিন বছরের অনুপস্থিতি  ম্লান করতে পারেনি তাঁর স্মৃতি । শুধু আমাদের কাছেই সেই স্মৃতি অমলিন নয়,  তাঁর স্মৃতির দীপ্তিতে ভয় পেয়ে কমিউনিস্ট-বিরোধী স্বৈরশাসক অশ্লীল দ্রুততায় পাল্টে দেয় উপনগরীর নাম ।

শুধু কমিউনিস্ট ও বাম আন্দোলনের কাছেই নয়, তাঁর প্রায় সাড়ে সাত দশকের রাজনৈতিক জীবন, সাধারণ ভাবে এদেশের সমকালীন রাজনীতি ও সমাজ জীবনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে গেছে । ইতিহাসে এক একটা ক্ষেত্রে এমন হয় । সময় ব্যক্তিকে গড়ে পিটে নেয় । ব্যক্তি গড়ে পিটে নেয় সময়কে । প্রাক-দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ  পর্ব থেকে একুশ শতকের প্রথম দশক —- রাজনৈতিক-সামাজিক জীবনে এতগুলি সন্ধিক্ষণের সওয়ার হওয়া ইতিহাসে বিরল । কমরেড জ্যোতি বসু সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের অন্যতম ।

কমরেড জ্যোতি বসুর স্মৃতি আজকের প্রজন্মের বিরাট অংশের কাছেই হয়তো তাঁর তেইশ বছরের মুখ্যমন্ত্রিত্বের সময় ।  ১৯৭৭ থেকে ২০০০ সাল । এরকম আর কোনো নজির গণতন্ত্রে নেই । কিন্তু জ্যোতি বসু শুধু মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন না । তিনি যখন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তখন তিনি একই সঙ্গে জাতীয় রাজনীতিতে অন্যতম প্রধান বিরোধী নেতাও । দু’দফার যুক্তফ্রন্ট সরকারের কুড়ি মাস বাদ দিলে, ১৯৪৬ থেকে  ১৯৭২ পর্যন্ত  রাজ্যে তিনিই বিরোধী পক্ষের প্রধান কন্ঠ । স্বাধীনতা-উত্তর পশ্চিমবঙ্গে  ১৯৫৩ থেকে ১৯৬১ তিনি অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির রাজ্য সম্পাদক। বিধানসভায় বিরোধী নেতা । কমরেড জ্যোতি বসুর রাজনৈতিক জীবন তাই সামগ্রিক গণআন্দোলনের বিকাশের মধ্যেই বিস্তৃত ও বিন্যস্ত ।

১৯৪৩ সালের নিদারুণ দুর্ভিক্ষে অসংখ্য মানুষের অসহায় মৃত্যুর পর তেভাগা আন্দোলনের মধ্যে মানুষ যখন নতুন জীবন খুঁজছিল ঠিক তখনই কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী হিসেবে  অবিভক্ত বাংলার আইনসভায় পা দিয়েছিলেন  জ্যোতি বসু । ভবিষ্যতে কোন মানুষের জন্য কোন কন্ঠ তিনি হতে চলেছেন,  যেন সেদিনই ইতিহাস তাঁর ভবিষ্যৎ ভূমিকা নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল ।

আইন যখন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পরিসর প্রত্যাখ্যান করছে, আইনসভায় জ্যোতি বসু তখন সেই  বিকাশোন্মুখ গণআন্দোলনের মুখ । তিনি রুদ্ধকন্ঠের কন্ঠস্বর । গণআন্দোলনের কন্ঠস্বরের ক্রমব্যাপ্তিতে  প্রসারিত হয়েছে জ্যোতি বসুর ভূমিকা । তাঁর জীবনীপঞ্জীই পশ্চিমবঙ্গে গণতান্ত্রিক  অগ্রগতির গতিপথ ।

একজন কমিউনিস্ট কীভাবে বুর্জোয়া সংসদীয় রাজনীতিতে শ্রেণী রাজনীতির লক্ষ্য নিয়ে  হস্তক্ষেপ করবে , তা সে  বিরোধী পক্ষ বা   এবং সরকার পরিচালনা , যাই হোক না কেন, কমরেড জ্যোতি বসুর জীবন  তাঁর এক অনন্য উদাহরণ। খুব নির্দিষ্টভাবে বললে, একটি বুর্জোয়া আইনসভায় শ্রমজীবী মানুষের দাবিদাওয়া, এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কমরেড জ্যোতি বসুর ভূমিকা ইতিহাসকে বহুদিন মনে রাখতে হবে । গণতান্ত্রিক অধিকারের আন্দোলন, ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন, সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন, খাদ্য আন্দোলন, মধ্যবিত্ত কর্মচারী আন্দোলন, শরণার্থী আন্দোলন, স্বাধীন অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য আন্দোলন, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কে গণতান্ত্রিক পুনর্বিন্যাসের দাবিতে আন্দোলন—প্রতিটি গণতান্ত্রিক আকাঙ্খার যেন তিনি মূর্ত প্রতীক । একই সঙ্গে তিনি আন্দোলনের নেতা, সংগঠক, প্রোপাগান্ডিস্ট, অ্যাজিটেটর। প্লেখানভ ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকা প্রসঙ্গে চমৎকার বলেছেন, মহান ব্যক্তিমাত্রই পথিকৃৎ । জ্যোতি বসু তাঁর বহু ভূমিকাতেই পথিকৃৎ ।

জ্যোতি বসু সবসময়ই ইতিবাচক । কি বিরোধী, কি সরকারে, দুটো  ভূমিকাতেই জ্যোতি বসু স্পষ্ট, নির্দ্বিধ । বিরোধী নেতা হিসেবে সরকারের তীব্র সমালোচক । কিন্তু নেতিবাচক, ধ্বংসাত্মক নয় । রাজনীতির লক্ষ্য যেহেতু মানুষ  তাই সরকার-বিরোধিতার নামে আলোচনা বন্ধ করে শিল্পপ্রকল্প আটকে উদ্বাহু হতে হয়নি জ্যোতি বসুকে, বামপন্থীদের ।

গণতন্ত্রে  গভীর আস্থার চমৎকার প্রতিফলন পড়েছে তাঁর ভাষণের বয়ানেও । সাত দশক ধরে তাঁর রাজনৈতিক ভাষণগুলি দেখুন, তথ্য ও যুক্তিবিহীন কোনো মতামত নেই ।  নেই  কোনো আস্ফালন। কথোপকথোনই তাই তাঁর বাচনভঙ্গী । শ্রোতার প্রতি  শ্রদ্ধার ভিত্তি  প্রোথিত  তাঁর রাজনৈতিক দর্শনেই ।  উল্টোদিকে গণতন্ত্রে অবিশ্বাসের কারণেই  স্বৈরাচারীর ভাষণ  অগোছালো বাগাড়ম্বর ।

বিরোধী নেতা জ্যোতি বসুকে বিনা বিচারে আটক করা হয়েছে বার বার । তীব্রভাবে প্রতিবাদ করেছেন, আইন অমান্য করেছেন । কিন্তু নিজে মুখ্যমন্ত্রী হয়ে মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সব রাজনৈতিক বন্দীর মুক্তির । বিনা বিচারে আটকের সরকারী অভ্যাস ইতিহাসের আস্তাকুঁড়েতে স্থান পেয়েছে বামফ্রন্ট সরকারের ৩৪ বছরেই  ।

চীন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষের সময় ভারত রক্ষা আইনে জ্যোতি বসুকে গ্রেপ্তার করেছিল কংগ্রেস সরকার । আবার ১৯৮৮ সালে প্রধানমন্ত্রী রাজীব  গান্ধী চীনে সরকারী  সফরের আগে তাঁর সঙ্গে আলোচনা করতে চাইলে  জ্যোতি বসু অনায়াসে আলোচনায় বসেছেন । কোনো রাজনৈতিক ভূমিকাই তাঁর কাছে ব্যক্তিসর্বস্ব ছিলনা । কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাম্মানিক ডক্টর অফ ল উপাধি নেওয়ার সময় তাঁর সেই অসামান্য ভাষণের কথা মনে আছে ? পার্টি, আন্দোলন এবং মানুষের মাঝখানে নিজের অবস্থানটুকু  নির্দিষ্ট করার বিনীত নৈর্ব্যক্তিকতা – তাঁর মজ্জায়।

অন্তত তিনটি  বিষয়ে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার  সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে  নীতি নির্ধারণে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছে । প্রভাব ফেলেছে বিকল্প মডেল তুলে ধরে ।  প্রথমেই বলতে হবে  ভূমিসংস্কারের কথা । যুক্তফ্রন্ট সরকার জোতদারদের লুকিয়ে রাখা জমি চিহ্নিত করা ও দখল করার প্রাথমিক কাজ শুরু করেছিল । বামফ্রন্ট সরকারের আমলে যা রূপ নিল সুনির্দিষ্ট স্থায়ী কর্মসূচীর ।  উদ্বৃত্ত জমি উদ্ধার, ভূমিহীনদের মধ্যে জমির পুনর্বন্টন এবং বর্গাদারের অধিকার রক্ষার কাজ পশ্চিমবঙ্গে যা হয়েছে তার তুলনা নেই । ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকের হাতেই কৃষিজমির ৯০ শতাংশের মালিকানা । গোটা দেশে যদি এর ভগ্নাংশও হতো তাহলে সত্তর শতাংশ ভারতবাসীর দিনে খরচের সামর্থ্য ২০টাকা থাকতো না । অর্থনৈতিক অগ্রগতির লক্ষে ভূমিসংস্কারের গুরুত্ব মৌলিক । ভূমিসংস্কারের উপর ভিত্তি করেই কৃষিফসল উৎপাদনে বিপুল সাফল্য পেয়েছে আমাদের রাজ্য । খাদ্যে ঘাটতি রাজ্য থেকে দেশের সেরা চাল উৎপাদনে । সবজি উৎপাদনে । গ্রামীণ উন্নয়নে, গ্রামীণ দারিদ্র মোচনে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গের তুলনাহীন সাফল্যের কোনো পূর্ব নজির ছিল ? ছিলনা । এটাই একটা নতুন মডেল । সময় পার হবার সঙ্গে সঙ্গে ভুমিসংস্কার কর্মসূচীকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজেও বামফ্রন্ট সরকার ঢিলে দেয় নি । নারী-পুরুষ যৌথ পাট্টা, মহিলাদের পাট্টা, চাষ ও বসবাসের জন্য ভূমিদান প্রকল্প, দেশের মধ্যে প্রথম বনাধিকার আইন কার্যকর করা বা শহরেও গরীব মানুষকে মাথা গোঁজার ঠাঁই দেওয়ার উদ্যোগ – এসব কেউ আগে ভেবেছিল নাকি?

ভূমিসংস্কার যদি রাজ্যের গ্রামীন মানুষের আর্থিক উন্নয়নে অবদান রেখে থাকে তাহলে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার পত্তন সেই মানুষের সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে নজিরবিহীন অবদান রেখেছে । গণতন্ত্রের নতুন আঙিনা হয়ে উঠল ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত । মুখ্যন্ত্রীর  দায়িত্ব নিয়েই বলেছিলেন, বামফ্রন্ট সরকার শুধুমাত্র মহাকরণ থেকে কাজ করবে না । চাই গ্রামের সরকার । এর চেয়ে সহজ করে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মোদ্দা কথাটা ,মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব ছিল না । যে পঞ্চায়েত আইন হাতে ছিল তার উপর দাঁড়িয়েই কাজ শুরু করলেন । কংগ্রেস সরকার আইন করেছিল  । কিন্তু ,স্বৈরাচার আর ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ যেহেতু একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ , তাই কাজটা শুরু করার রাজনৈতিক সদিচ্ছা  তাদের ছিলনা। প্রথম পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে বামফ্রন্ট ডাক দিয়েছিল — ‘বাস্তুঘুঘুর বাসা ভাঙো’ । কারণ সেটাই ছিল গণতন্ত্রকে মানুষের মাঝে প্রসারিত করার প্রথম ধাপ । কাজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই বামফ্রন্ট সরকার পঞ্চায়েত আইনকে সংশোধন করেছে বারবার । শুধু গ্রাম নয়, ক্রমশ স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন বিধিকে পোক্ত করেছে শহরাঞ্চলে । নির্বাচিত পৌরব্যবস্থার প্রকৃত স্বাদ রাজ্যবাসী বামফ্রন্ট সরকারের আমলেই পেয়েছেন । পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েতের অভিজ্ঞতাই  সংবিধান সংশোধন করে জাতীয়স্তরে  পঞ্চায়েত ব্যবস্থা গড়ে তোলার অনুপ্রেরণা যোগায় । বামফ্রন্টের বিরোধী হলেও প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী একথা স্বীকার করেছিলেন ।

নির্বাচিত পঞ্চায়েত ও পুরসভা শুধু কী বামপন্থী সমর্থদের নতুন মর্যাদা ও ক্ষমতায় অভিষিক্ত করেছিল ? না-সব মানুষকে করেছিল । এমন কি বিরোধী দলের কর্মী সমর্থকদেরও । তৃণমূলের টিকিটে জেতা পঞ্চায়েত প্রধানও  যে ক্ষমতা ভোগ করছেন তা বামফ্রন্ট সরকারেরই দেওয়া । কংগ্রেস শাসনে তা ছিলনা ।  তৃণমূল রাজ্য সরকার সেই অধিকার কাড়তে উদ্যত । নতুন বাস্তুঘুঘুরা মাথা তুলতে চাইছে তৃণমূলের কন্ঠলগ্ন হয়ে ।

খুব বেশি আলোচনা হয় না , কিন্তু ১৯৭৮-র সর্বনাশা  বন্যার সফল মোকাবিলা জ্যোতি বসুর নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকার করতে পেরেছিল নতুন অধিকারবোধে উদ্দীপ্ত জনতার মুখরিত সখ্যের সূত্রেই । সরকারী প্রশাসনের সঙ্গে জনতার  অনবদ্য সংযোগ অসাধ্যসাধন করেছিল । ভেঙে যাওয়া স্কুলবাড়ি আবার মাথা তুলেছিল, ভেসে যাওয়া বসতবাটি উঠলো গড়ে । বাঁধ হলো নতুন করে । সরল খেতের বালি । গ্রামের সাধারণ মানুষের সুবিপুল উদ্ভাবনী ক্ষমতা  সেই প্রথম প্রত্যক্ষ করলো গোটা রাজ্য ।

বন্যার পর কেন্দ্রীয় সাহায্য চেয়েছিলেন জ্যোতি বসু, কিন্তু কোনো আকুতি নয়, কোনো হতাশা নয় । মানুষের প্রতি অকপট আস্থা । তাঁর আত্মবিশ্বাসের মর্মকথা । যে সাহস নিয়ে তিনি দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকারের উপমুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে বিধানসভায় নিজের অফিস ঘরে লেলিয়া দেওয়া উন্মত্ত পুলিশ বাহিনীর সামনে অচঞ্চল, সেই আত্মবিশ্বাসেরই অন্য মাত্রা তাঁর মধ্যে দেখেছেন পশ্চিমবঙ্গের মানুষ  পুনর্গঠনের সেই মহান গণঅভিযানে ।

গণতান্ত্রিক অধিকারের বহুমাত্রিক বিস্তার বামফ্রন্ট সরকারের সময়কে বিশিষ্টতা দিয়েছে । বামপন্থী আন্দোলনের কাছে এটা একটা বড় অভিজ্ঞতা । মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারবোধই সুরক্ষিত করেছে বামপন্থীদের । প্রতিটি নির্বাচনী জয়ের পর তিনি  নিয়ম করে  বলতেন, ‘‘আমাদের দায়িত্ব বাড়লো’’ । একবারের জন্যও মনে করাতে ভোলেননি, মানুষই শেষ কথা বলবেন । গণতন্ত্র  মানে মানুষের শেষ কথা বলার অধিকার । আজ কামদুনির সেই ভদ্রমহিলাদের নিজের কথা বলার আকুতি আদতে বামফ্রন্ট সরকারের আমলে গড়ে উঠা নতুন পশ্চিমবঙ্গের অভিজ্ঞতাজাত । তাঁরা কোন দলের ভোটার বড় কথা নয় । বিকেন্দ্রীকৃত ক্ষমতার  গণতান্ত্রিক পরিসরই জন্ম দিয়েছে নতুনতর চেতনার, দাবির ।

গণতন্ত্রই  সাধারণ মানুষের উদ্ভাবনী ক্ষমতার উৎসমুখ খুলে দিয়েছিল । উৎসারিত হচ্ছিল নতুন জীবনের চাহিদা, সংস্কৃতির চাহিদা, নতুন শিক্ষার চাহিদা, সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও পরিকাঠামোগত পুণর্বিন্যাসের নতুন পৃষ্ঠপট ।  পুলিস দিয়ে নাটকের স্ক্রিপ্ট অনুমোদনের দিন শেষ হয়েছিল বামফ্রন্ট সরকারী প্রশাসনে আসতেই । লোকসংস্কৃতি চর্চার পৃথক প্রতিষ্ঠানের পরিকাঠামো রাজ্য সরকার করছে, তা  ১৯৭৭ সালের আগে কেউ কখনো ভাবেনি, করা তো দূরের কথা । নতুন নতুন স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয়েছিল নতুন পরিস্থিতির চাহিদায় সাড়া দিয়েই । সপ্তম বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে ৯৯.২৭ শতাংশেরও বেশি বাচ্ছা স্কুলে নাম লেখাতো । মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর সংখ্যা শুধু ১০ লাখ ছাড়ায়নি, তাদের অর্ধেকেরও বেশি ছাত্রী । কী ছিল ১৯৭৭ সালের আগে, কী হয়েছিল ? এই মেলানোতেই বাম-বিরোধীদের আপত্তি ।

পশ্চিমবঙ্গে বিকাশের এই মডেলের উপর দাঁড়িয়েই কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের  গণতান্ত্রিক পুণর্বিন্যাসের দাবিতে বসু সরব হয়েছিলেন । শুধু সরব হননি, একদিকে জনগণকে সচেতন করতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, অন্যদিকে গোটা দেশে সমস্ত রাজনৈতিক শক্তিকে সমবেত করার চেষ্টা করেছিলেন তাঁর ব্যক্তিত্ব এবং সঠিক সময়ে সঠিক ইস্যুতে সর্বাধিক শক্তিকে সমবেত করার দক্ষতা দিয়ে । জাতীয় রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক চেতনাকে গভীরতা দিতে সেই উদ্যোগের তাৎপর্য অপরিসীম। ইন্দিরা গান্ধীর সরকার বাধ্য হয়েছিল সারকারিয়া কমিশন গঠন করতে । কমিশন খুব ভালো কিছু রিপোর্ট না দিলেও রাজনৈতিক পরিসরে অপরিবর্তনীয় কিছু পরিবর্তন ঘটে যায় ।  কিছু গণতান্ত্রিক মানদন্ড এখন অস্বীকার করতে পারবেনা কেউই ।

ভারতীয় রাজনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতার এবং জাতীয় ঐক্য ও সংহতির প্রশ্নেও দৃঢ় নীতিনিষ্ঠ অবস্থান নেওয়ার একটি মানদন্ড তৈরি করেছিলেন কমরেড  জ্যোতি বসু । । অ-বামপন্থী দল বা জোট পরিচালিত রাজ্য সরকারগুলি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যখন রাজনৈতিক সুবিধাবাদকে প্রশ্রয় দিয়েছে ,তখন বামফ্রন্ট সরকারের  অবস্থান ছিল একেবারে বিপরীত মেরুতে । প্রশাসনিক কাঠামো থেকে  সাম্প্রদায়িক প্রবণতা দূর করা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও আর্থিক সামাজিক উন্নয়নে পদক্ষেপ গ্রহণ — কাজটা সহজ ছিলনা মোটেই । রাজ্যের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার  রূপান্তরে তাঁর দূরদৃষ্টি রাজনৈতিক বিরোধীদের শত কুৎসাতেও চাপা পড়েনা । সংখ্যালঘু কল্যাণে ধারাবাহিক পদক্ষেপের  সূত্র ধরেই সপ্তম বামফ্রন্ট সরকার চাকরির ক্ষেত্রে সংরক্ষণের মতো ঐতিহাসিক ব্যবস্থা চালু করে । ঠিক একাজেই এখন গুরুত্ব দিচ্ছেনা তৃণমূল সরকার । পশ্চিমবঙ্গ সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও বিত্ত নিগম মাত্র দুবছরেই হাঁটু মুড়ে বসে পড়েছে । তৎকালীন পরিস্থিতিতে গোটা দেশের প্রেক্ষাপটে বিচার করলে বোঝা যায় দার্জিলিঙে গোর্খা হিল কাউন্সিল গঠনের পদক্ষেপের গুরুত্ব।  স্বভাবতই জাতীয় স্তরেও এই পদক্ষেপগুলি প্রভাব ফেলেছে । বামফ্রন্ট সরকার  বিকল্পের কী লক্ষ্য নিয়ে চলেছে তা স্পষ্ট হয়েছে তার কাজের মধ্য দিয়েই ।

রাজনৈতিক বিরোধীদের অনেকে ভুলতে ভালোবাসেন , কিন্তু, রাজ্যবাসী কী করে ভুলবেন, পশ্চিমবঙ্গে শিল্পের বিকাশে বিশেষত বড় শিল্পের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের কী চরম  বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হয়েছিল জ্যোতি বসুর নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকারকে । বক্রেশ্বর তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ার বা হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসের অনুমতি দিতে দশক পার করে দিয়েছিল কেন্দ্র। শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণে । সল্টলেকে ইলেকট্রনিক্স শিল্প স্থাপনে অনুমতি না দেওয়ার কী অজুহাত দিয়েছিল কেন্দ্র ? আজ হাস্যকর মনে হতে পারে , কিন্তু এটাই সত্যি যে ইন্দিরা গান্ধীর সরকার বলেছিল , অনুমতি হবেনা,কারণ, সল্টলেক সীমান্তবর্তী ! রাজনৈতিক কারণেই পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রে নতুন করে বিনিয়োগ করেনি কেন্দ্রীয় সরকার । একদিকে জ্যোতি বসু এর বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত করার উপর জোর দিয়েছেন , অন্যদিকে হাতে যে সুযোগ আছে তা কাজে লাগানোর উপর জোর দিয়েছেন । ক্ষুদ্র শিল্পে পশ্চিমবঙ্গ এক নম্বর হয়েছে । নয়া অর্থনীতি চালু হওয়ার পর শত সমস্যার মধ্যেও শিল্প বিনিয়োগে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ কাজে লাগানোর নির্দিষ্ট পদক্ষেপ  গ্রহণ করতে তিনি উদ্যোগ নিয়েছিলেন । সেখানেও জোর দিয়েছেন সাধারণ মানুষকে নতুন উদ্যোগ সম্পর্কে সচেতন করতে । কিন্তু কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতেই হবে এবং তা বিদ্যমান বাস্তবতার উপর দাঁড়িয়েই শিল্পের নানাবিধ  উদ্যোগের মাধ্যমেই করতে হবে । কৃষির সাফল্যের উপর দাঁড়িয়ে এবং সেই সাফল্য ধরে রেখে কর্মসংস্থানমুখী শিল্পায়নের পথ যে অপরিহার্য তা কমরেড জ্যোতি বসু স্পষ্ট করেই বলেছিলেন । বামবিরোধী রাজনীতির যেহেতু একটা স্বভাব নৈরাজ্য আছে  তাই সাধারণ মানুষের স্বার্থ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার দায়িত্বজ্ঞানহীনতায় তারা দ্বিধাহীন । রাজ্যে ‘পরিবর্তন’-র দুবছর বুঝিয়ে দিয়েছে শিল্পায়ন নিয়ে রাজনৈতিক মিথ্যাচার  রাজ্যবাসীর ভবিষ্যৎকে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে এক  অন্ধগলির সামনে । বামফ্রন্ট সরকার সব সমস্যার সমাধান করে দিতে পেরেছিল এমন কথা জ্যোতি বসু বা বামফ্রন্ট কখনও  বলেননি । কারণ সেটা  সম্ভব নয় । কিন্তু বিদ্যমান পরিস্থির সামনে জনমুখী উন্নয়নের  বিকল্প একটা মডেল  তুলে ধরতে পেরেছিল বামফ্রন্ট সরকার। যার তাৎপর্য শুধু এরাজ্যে নয় , গোটা দেশে।

আশ্চর্য নয় যে, সীমাবদ্ধ ক্ষমতার মধ্যেও বামফ্রন্ট সরকারের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কাজগুলির উপরই সবচেয়ে বেশি আক্রমণ নামিয়ে আনছে তৃণমূল সরকার । প্রতিটি গণতান্ত্রিক বিধি ও প্রতিষ্ঠান এই সরকারের চক্ষুশূল । পঞ্চায়েত নির্বাচন করতে তারা বাধ্য হলো বহু চাপে পড়ে । পুরসভা নির্বাচনেও তাদের আপত্তি । সমবায়গুলির গণতান্ত্রিক পরচালনবিধি তারা মানছেনা । শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে নির্বাচিত ব্যবস্থা,নির্বাচিত ছাত্র ইউনিয়ন,  তাদের ভীষণ অপছন্দ । কারণ, মনোনয়ন মানেই ‘রাজনীতি–মুক্তি’র অজুহাতে  তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের নিরুঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ  এ-কদিনেই স্পষ্ট । জনগণের অধিকারবোধে যারা বিপন্ন , গণতান্ত্রিক কাঠামো তাদের কাছেই বোঝা । সেকারণেই ‘পরিবর্তন’ আসলে গণতন্ত্রের অজস্র সৌধের উপর কালাপাহাড়ী অভিযানের রূপ নিয়েছে । ‘চৌত্রিশ’ বছরের উপর ওদের এত ক্রোধ কি এমনি !

ঘটনাক্রমে কমরেড জ্যোতি বসুর জন্মশতবর্ষ এসেছে  এমন একটা সময়ে যখন রাজ্যে বামপন্থীরা এক প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি । তিনি যখন জীবিত ছিলেন তখনও তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে প্রতিকূলতার মোকাবিলা করতে হয়, এখন জন্মশতবর্ষে  তাঁর জীবন ও কর্ম  বামপন্থী আন্দোলন ও গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষের  কাছে শিক্ষনীয় বহু উপাদান নিয়ে উপস্থিত হয়েছে । কারণ, উদ্যত প্রতিকূলতার সফল মোকাবিলারই অন্য নাম জ্যোতি বসু ।

গণশক্তি, ৭ই জুলাই, ২০১৩

Published in: on জুলাই 10, 2013 at 7:44 অপরাহ্ন  মন্তব্য করুন  

ইতিহাসের মহানায়ক কমরেড জ্যোতি বসুঃ হায়দার আকবর খান রনো

জানুয়ারি ১৮, ২০১০

ভারতের মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির নেতা জীবন্ত কিংবদন্তী কমরেড জ্যোতি বসুর জীবনাবসানের খবর পেয়ে আমার মনে হলো এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন ঘটেছে। যে নক্ষত্রটি কয়েক দশক ধরে জ্বলজ্বল করে জ্বলছিল তা আর আলো দেবে না। সত্যি কি তাই! কথাটা বোধহয় আংশিক সত্য। যে আলো তিনি জ্বালিয়ে গেছেন তা বহুদিন পর্যন্ত ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনই শুধু নয়, গণতান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনকেও পথ দেখাবে। তবু এই মৃত্যু বড়ই বেদনাদায়ক। বাংলাদেশ হারালো এক অকৃত্রিম বন্ধুকে আর ভারতবাসী হারালো তাদের প্রিয় নেতাকে।

এক শিক্ষিত উচ্চবিত্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। তিনি লেখাপড়া করেছেন কলকাতার অভিজাত স্কুল ও কলেজে। ইংরেজী সাহিত্যে অনার্স নিয়ে বিএ পাশ করেছেন প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে। তখনো তিনি মার্কসবাদের সংস্পর্শে আসেননি। তাঁর পরিবারের মধ্যে স্বদেশী ও বৃটিশ বিরোধী চেতনাবোধ ছিল, যা স্বাভাবিক কারণেই বালক ও তরুণ জ্যোতি বসুর মধ্যে সঞ্চায়িত হয়েছিল। তাঁর পিতার সঙ্গে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল। সশস্ত্র জাতীয়তাবাদী অনুশীলন সমিতির সদস্যদের সঙ্গে তাঁর পৈত্রিক পরিবারের যোগাযোগ ছিল। একবার কোলকাতায় সুভাষ চন্দ্র বসুর সভায় গিয়ে তিনি পুলিশের লাঠি চার্জে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলেন।

কোলকাতার পড়াশোনা শেষে তিনি লন্ডন গিয়েছিলেন ব্যরিস্টারি পড়তে। বিলাত থেকে ব্যরিস্টার হয়ে তিনি দেশে ফিরে আসলেন, কিন্তু ব্যরিস্টারী করলেন না। তিনি হলেন কমিউনিস্ট পার্টির সার্বক্ষনিক কর্মী। বিলাতে থাকাকালীন তিনি ব্যরিস্টারী পাশ করার পাশাপাশি আরেকটি অনেক বড় অর্জন করেছিলেন। তা হলো মার্কসবাদে দীক্ষাগ্রহণ। গ্রেট বৃটেনের কমিউনিস্ট পার্টির হ্যারি পাল্টি, রজনীপাম দত্ত, বেন ব্রেডলি প্রমুখ তাঁকে সাহায্য করেছিলেন মার্কসবাদে শিক্ষিত করে তুলতে। উচ্চবিত্ত ঘরের সন্তান ব্যরিস্টার জ্যোতি বসু দেশে ফিরে আসলেন কমিউনিস্ট হয়ে। কমরেড মোজাফফর আহমদ তাঁকে কমিউনিস্ট হিসাবে কাজ করার পথ দেখালেন। প্রথমে তিনি শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। রেলওয়ে শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নে কাজ শুরু করেন। জ্যোতি বসুর আত্মজীবনীমূলক “জনগণের সঙ্গে” গ্রন্থটির প্রথম খন্ডের ভূমিকায় আরেক কমিউনিস্ট নেতা প্রয়াত কমরেড সরোজ মুখার্জি লিখেছিলেন।

“তাঁর (জ্যোতি বসুর) লেখাগুলির মধ্য দিয়ে বিশেষভাবে স্বচ্ছ হয়ে ফুটেছে, কীভাবে একজন ব্যারিস্টার ব্যক্তিগত জীবনে স্বাচ্ছন্দের কথা উপেক্ষা করে কমিউনিস্ট পার্টির কর্মতৎপরতার সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। মার্কসবাদের জ্ঞান ও আদর্শের প্রতি নিষ্ঠা কত গভীর হলে একজন মধ্যবিত্ত ঘরের যুবক বাড়ি-ঘর-সংসার সম্পর্কে নিষ্পৃহ থেকে সব সময়ের জন্য কমিউনিস্ট কর্মী হিসাবে কাজ করতে পারেন তা জ্যোতি বসুর কর্মজীবনের কাহিনীর মধ্যে পরিস্ফুট। পার্টির নির্দেশ পালন করে কীভাবে ধীরে ধীরে নিজেকে শ্রমিক নেতা হিসাবে এবং পরবর্তী যুগে একজন জননেতা হিসাবে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন তা-ও তার লেখার মধ্যে পরিস্ফুট হয়েছে।”

কমিউনিস্ট হয়ে যাওয়া ব্যরিস্টার জ্যোতি বসু ট্রামে বাসে রাস্তায় পার্টির পত্রিকা বিক্রি করেছেন, রেলওয়ে শ্রমিকদের সংগঠিত করতে নানা জায়গায় ঘুরেছেন, শ্রমিক বস্তিতে থেকেছেন। এইভাবে তিনি নিজেকে শ্রেণীচ্যুত করেছিলেন। কমরেড জ্যোতিবসুর রাজনৈতিক জীবনকে কয়েকটি পর্বে ভাগ করা যায়। প্রথম পর্বে বৃটিশ আমলে শ্রমিক আন্দোলন। দ্বিতীয় পর্বে সংসদীয় রাজনীতিতে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন। এই পার্টি শুরু হয়েছিল ১৯৪৬ সাল থেকে। সংসদীয় সংগ্রামের পাশাপাশি তিনি রাস্তায় সংগ্রামও করেছেন। বিশেষ করে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে কংগ্রেস সরকার বিরোধী গণ আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব প্রদান করেছিলেন। এই সময় খাদ্য আন্দোলন খুবই ব্যাপক ও জঙ্গী রূপ নিয়েছিল যার পুরোভাগে যারা ছিলেন তাদের অন্যতম কমরেড জ্যোতি বসু। তৃতীয় পর্বটি হচ্ছে পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে একটি রাজ্য পরিচালনা করা। টানা ২৪ বছর ধরে বার বার নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। পরে বার্ধক্যের কারণে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বটি তুলে দেন তারই দলের কমরেড বুদ্ধদেব ভট্টচার্য্যেের হাতে।

১৯৪৬ সালে রেলওয়ে শ্রমিক কর্মচারীদের জন্য নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকা থেকে তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর এই বিজয়টি তখন বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছিল। কারণ তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন কংগ্রেসের নেতা হুমায়ুন কবীর যার তখন ছিল ব্যাপক নাম ডাক। সেই তুলনায় জ্যোতি বসু তখনো স্বল্প পরিচিত। কমিউনিস্ট পার্টির কাজ ও জ্যোতি বসুর নিজস্ব গুণাবলীর কারণেই তিনি বিজয়ী হতে পেরেছিলেন। সেই নির্বাচনে বঙ্গীয় পরিষদে (তখন বাংলা বিভক্ত হয়নি, দুই বাংলা মিলে বৃটিশ ভারতে একটি প্রদেশ হিসাবে ছিল) আর দুইজন কমিউনিস্ট পার্টি থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেনÑ দার্জিলিং-এর চা শ্রমিক নেতা রতনলাল ব্রাক্ষণ এবং দিনাজপুরের কৃষক নেতা রূপ নারায়ণ রায়। বঙ্গীয় পরিষদে মাত্র তিনজন সদস্য নিয়ে ছিল কমিউনিস্টদের এক এই ছোট গ্র“প যার নেতা ছিলেন জ্যোতিবসু। রেলশ্রমিক নেতা জ্যোতিবসু এই ছোট গ্র“প নিয়েও সংসদীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। মনে রাখতে হবে যে, কমিনউনিস্টরা হলেন সর্বহারা বিপ্লবী। কিন্তু ভবিষ্যতের বিপ্লবের স্বার্থে প্রয়োজনে সংসদীয় সংগ্রামকেও যোগ্যতার সঙ্গে ব্যবহার করা হচ্ছে লেখিনীয় কৌশলের অন্যতম নীতি। জ্যোতি বসু সংসদীয় রাজনীতির মোহে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েননি। সুখ সুবিধা ইত্যাদি তাঁকে গ্রাস করতে পারেনি। বরং শাসক শ্রেণীর চরিত্র উম্মোচিত করা এবং মেহনতী জনগণের স্বার্থের কথা তুলে ধরার কাজটি তিনি যোগ্যতার সঙ্গে করতে পেরেছিলেন। স্বাধীনতা পরবর্তী যুগে প্রথম দিকে ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি বেআইনী ছিল এবং পার্টির উপর কংগ্রেসী সরকারের অত্যাচারও ছিল চরম। উপরন্ত গান্ধী, সুভাষ, নেহেরুর কংগ্রেস তখনো যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিল। ১৯৫২ সালে স্বাধীন ভারতে প্রথম নির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টি বঙ্গীয় পরিষদে (বিধানসভা) তিনজনের গ্র“প থেকে প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা পেয়েছিল। তখনও জ্যোতি বসু প্রধান বিরোধদলীয় নেতা। পঞ্চাশের দশকে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গে বড় রকমের কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলন, শিক্ষক আন্দোলন, রিফিইজি সমস্যা নিয়ে আন্দোলন ও খাদ্য আন্দোলন হয়েছিল। জ্যোতি বসু বাইরের গণ আন্দোলনের সঙ্গে সংসদীয় আন্দোলনকে সমন্বিত করতে পেরেছিলেন অত্যন্ত যোগ্যতার সঙ্গে। এইভাবে তিনি শ্রমিক নেতা থেকে পার্লামেন্টেরিয়ান এবং কমিউনিস্ট পার্টির নেতা থেকে গণনেতায় পরিণত হন। সংসদীয় সংগ্রামে তার কি ধরণের যোগ্যতা ছিল সে সম্পর্কে কৃষ্ণ ধরের এক রচনা থেকে জানা যায়, “তিন সদস্য নিয়ে গঠিত কমিউনিস্ট গোষ্ঠীর নেতা হিসাবে তখনই তিনি আইনসভার মুসলিম লিগ, কংগ্রেস ও কৃষক প্রজা পার্টির দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। স্পিকার ছিলেন সৈয়দ নওশের আলী। তিনিও জ্যোতিবসুর সংসদীয় রীতিনীতি সম্পর্কে জ্ঞান এবং পয়েন্ট অফ অর্ডার তুলে অত্যন্ত প্রশাসনিক বক্তব্য  সভায় পেশ করার দক্ষতার প্রশংসা করেন। ….. অত্যন্ত ছোট কমিউনিস্ট গোষ্ঠীর নেতা হিসাবে তরুণ ও স্বল্প পরিচিত জ্যোতি বসুর দক্ষতা ও সংসদে প্রশ্ন উত্থাপন করার ভঙ্গি ও ভাষা অল্প সময়ের মধ্যেই সভার ভিতরে ও বাইরে, সংবাদপত্র ও সর্বত্র আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।”

১৯৬৪ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে বিভক্তি আসে। ভারতের বিপ্লবের রণনীতি, রাষ্ট্রের চরিত্র, কংগ্রেস দল ও সরকারের চরিত্র বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক মহাবিতর্ক এতগুলি বিষয়ে গুরুতর মত পার্থক্যের কারণে পার্টি বিভক্ত হয়েছিল। ১৯৬৪ সালে নতুন করে যে মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়েছিল জ্যোতি বসু প্রথম থেকেই ছিলেন তাঁর পলিব্যুরোর সদস্য। জ্যোতি বসুকে অনেকে গণ আন্দোলনের নেতা বা পার্লামেন্টেরিয়ান বা সফল মুখ্যমন্ত্রীরূপে দেখেন। এটা খন্ডিত দেখা। তিনি ছিলেন প্রধানতঃ ও মূলত কমিউনিস্ট বিপ্লবী। মতাদর্শের ক্ষেত্রে তাঁর অবস্থান ছিল খুবই স্বচ্ছ। মার্কসীয় মতাদর্শের মর্মবস্তুকে তিনি বুঝতেন এবং সার্থকভাবে প্রয়োগ করতে পারতেন। মার্কসবাদে তাঁর দখল ছিল আর সেই সঙ্গে ছিল প্রখর বাস্তব জ্ঞান। সবটা মিলিয়েই তিনি ছিলেন কমিউনিস্ট গণ নেতা, যাঁর জনপ্রিয়তা ছিল প্রায় আকাশ ছোঁয়া।

১৯৬২ চীন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষ হয়। তখন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির যে অংশ তথাকথিত চীনপন্থী বলে পরিচিত ছিল তাদেরকে সরকার গ্রেপ্তার করেছিল। জ্যোতি বসুও গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তখন সরকার চীনকে আক্রমনকারী বলে ঘোষণা দিয়ে সমাজতান্ত্রিক চীন বিরোধী প্রচার তুঙ্গে তুলেছিল। সেই সময় জ্যোতিবসু ও অন্যান্য কমিউনিস্টরা প্রকাশ্যে বলেছিলেন যে, এটা সরকারের মিথ্যা প্রচার এবং মার্কিন ষড়যন্ত্রের ফসল। তিনি বললেন, সমাজতান্ত্রিক দেশ আগ্রাসী হতে পারে না। ঐ রকম যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিজ দেশের উগ্র জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সত্য কথা বলতে যে হিম্মত লাগে তা জ্যোতি বসুর ছিল। তখন চীন বিরোধীরা প্রচার দেশকে এমন ভাবে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল যে,  মাকর্সবাদী কমিউনিস্ট পার্টি (জ্যোত্যি বসু যার অন্যতম নেতা) সাময়িকভাবে গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু মাত্র কিছুদিনের জন্যই। আবার প্রবল গণ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সিপিআই (এম) পশ্চিমবঙ্গে বৃহত্তম রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছিল, যার ফল পাওয়া গেল ১৯৬৭ সালের নির্বাচনে।

জ্যোতি বসু সর্ম্পকে কিছু লিখতে হলে অবশ্যই ১৯৭১ সালে তাঁর এবং তাঁর পার্টির ভূমিকার কথা স্মরণ করতেই হবে। সেই সময় ১ ও ২ জুন কলকাতার বেলেঘাটার এক স্কুলে কয়েকটি বামসংগঠন এক সম্মেলনের মাধ্যমে গঠন করেছিল “ বাংলাদেশ জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম সমন্বয় কমিটি।” এই সংগঠনটি বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারকে মেনে নিয়েই দেশের অভ্যন্তরে স্বতন্ত্রভাবে যুদ্ধ করেছিল (ছোট বড় ১৪টি সশস্ত্র গেরিলা ঘাঁটি যাদের ছিল) এবং ভারতে অবস্থিত মুক্তিফৌজের ভেতরে থেকেও যুদ্ধ করেছিল। সিপিআই (এম) তাদের সংগৃহীত অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছিল। প্রধানত সাহায্য করেছিল বামপন্থী মুক্তিযোদ্ধাদের। তখন বামপন্থীদের বিশেষ করে যারা চীনপন্থী বলে পরিচিত ছিলেন, তাদের ভারতে চলাফেরা বেশ অসুবিধাজনক ছিল। এক্ষেত্রে সিপিআই (এম) এবং তার নেতা জ্যোতি বসু বাংলাদেশের বামকর্মীদের নিরাপত্তা প্রদান ও অন্যান্য সহয়তা প্রদান করেছিলেন।

প্রসঙ্গক্রমে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি। ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে একবার আমাকে ভারতীয় সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার লোক আগরতলা থেকে ধরে নিয়ে শিলং এ নিয়ে যান। সেখানে ভারতের সামরিক বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান জেনারেল সুব্রাহ্মনিয়াম আমাকে দুদিন ইন্টারোগেট করে পরে সসম্মানেই প্লেনে করে কলকাতায় পাঠিয়ে দেন। ঘটনাটি আমাকে বেশ বিচলিত করেছিল। কারণ কোন ধরনের গোয়েন্দা সংস্থার সংস্পর্শ আমার পছন্দীয় নয়। কোলকাতায় এসে বিষয়টি কমরেড প্রমোদ দাসগুপ্ত ও কমরেড জ্যোতি বসুর কাছে বিবৃত করলাম। আমার মানসিক অবস্থা থেকে জ্যোতি বসু একটু হেসে øেহসুলভ ভঙ্গিতে বললেন “বিপ্লব করতে হলে তো কত রকম সংস্পর্শে আসতে হবে। এতে ঘাবড়ানোর কি আছে।” তিনি বলেছিলেন যে, “আমরা বাংলাদেশের বামপন্থীদের একমাত্র অস্ত্র দেয়া ছাড়া সবরকম সাহায্য করবো। কারণ অস্ত্রের বিষয়টি কেন্দ্রীয় সরকারের।”

অবশ্য একথা মনে করার কোন কারণ নেই যে, জ্যোতি বসু সংকীর্ণতাবাদী ছিলেন। তিনি সর্বপ্রথমে চাইতেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সফল হোক। একই সঙ্গে অবশ্যই তিনি কামনা করতেন সঠিক লাইন গ্রহণের মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধের মাধ্যমে কমিউনিস্টরা সামনে আসুক। এটাই তো স্বাভাবিক।

জ্যোতি বসু এক সময় সোভিয়েত লাইনকে সংশোধনবাদ বলে প্রত্যাখান করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি এবং তাঁর পার্টি চীনের অনেক বিষয়ে সমালোচনা করেছিলেন। চীনের পার্টির সংকীর্ণতা ও কতিপয় ভুল তত্ত্ব (যেমন ত্রি-বিশ্ব তত্ত্ব) তাঁরা কখনই গ্রহণ করেননি। অর্থাৎ অনুকরণ নয় বরং স্বাধীনভাবে মাকর্সবাদী তত্ত্বের ভিত্তিতে নীতি গ্রহণ করা ছিল তাঁর ও তাঁর দলের লাইন।

সত্তরের দশকে ইন্দিরা গান্ধী ইমার্জেন্সী জারি করলে ভারতের মার্কবাদী কমিউনিস্ট পার্টি দারুন আক্রমণের মুখে পড়ে। সেই সময় জ্যোতি বসু ও তাঁর পার্টি প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে কাজের সমন্বয় করতে শিখিয়েছিলেন সমগ্র পার্টিকে। যারা জ্যোতি বসুকে একজন ভালো প্রশাসক এবং “বিপ্লব বিরোধী সংস্কারবাদী শান্তিপূর্ণ পথে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী” বলে মনে করেন তারা পরিপূর্ণরূপে ভ্রান্ত। বস্তুতঃ জ্যোতিবসু আগাগোড়া বিপ্লবী এবং মাকর্সবাদের বিপ্লবী সত্ত্বায় আস্থাশীল নেতা ছিলেন।

১৯৭৭ সাল থেকে টানা ২৪ বছর জ্যোতিবসু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। বারবার নির্বাচনে তাঁর দল বিজয়ী হয়েছিল। এমন ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে আরেকটি আছে বলে আমার মনে হয় জানা নেই। প্রশাসক হিসাবে জ্যোতিবসু আসাধারণ দক্ষতার ও প্রখর বাস্তব বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন। ২৪ বছর মুখ্যমন্ত্রীত্ব করার পর তিনি ঐ দায়িত্বটি তুলে দেন তাঁরই দলের কমরেড বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্যরে হাতে। এই যে বিরাট সাফল্য তার পেছনে জ্যোতি বসুর ব্যক্তিগত যোগ্যতাও যেমন ছিল, তেমনি ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত, সুশৃঙ্খল ও আদর্শনিষ্ঠ পার্টির ভূমিকা। এই সময়কালে তিনি পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যের ক্ষেত্রে তিনি যা করছেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ভূমি সংস্কার, বর্গা অপারেশন, শিল্পায়ন এবং পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। ফলে গরিব জনগণ কিছুটা ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছিল। গরীব সীমিত আকারে হলেও গরীব জনগণের যে ক্ষমতায়নের কাজটি করতে পেরেছিলেন সেটাই ছিল তাঁর দলের এবং তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার মূল কারণ। আরও উল্লেখ্য যে পশ্চিমবঙ্গে অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় জাতপাত ও সা¤প্রদায়িকতার বিষয়টি খুবই কম ছিল।

জ্যোতি বসুর বাংলাদেশের প্রতি দুর্বলতা ছিল সবসময়। তিনি ছিলেন আসলেই বাংলাদেশের জনগণের অকৃত্রিম বন্ধু। ১৯৯৬ সালে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন মূলত গঙ্গার পানি বন্টন বিষয়ে আলোচনা করতে, যদিও তিনি কেন্দ্রীয় সরকারে ছিলেন না। তখনি লক্ষ্য করা গেছে যে বাংলাদেশের স্বার্থরক্ষা করার ব্যাপারে তাঁর ছিল আন্তরিক প্রচেষ্টা। সম্ভবতঃ নাড়ির টানে তাঁর এই বিশেষ দুর্বলতা ছিল।

জ্যোতি বসু ব্যক্তি হিসাবে ছিলেন সন্দেহাতীতভাবে সৎ ও আর্দশনিষ্ঠ। তাঁর মধ্যে ছিল এক দরদী মন। মানুষ হিসাবে তিনি ছিলেন অতি উঁচু এবং কঠিন বিষয়কে সহজে ব্যাখ্যা করার অসাধারণ যোগ্যতা তাঁর ছিল। তাঁর মাঠের বক্তৃতাও আমি শুনেছি। আমাদের দেশে যে ধরনের জ্বালাময়ী বা আবেগপ্রবণ বক্তৃতা করার অথবা নাটকীয় ঢং এ বক্তৃতা করার প্রবণতা আছে অধিকাংশ রাজনীতিবিদদের মধ্যে, জ্যোতি বসুর বক্তৃতায় তা পাওয়া যাবে না। তাঁর বক্তৃতা শুনলে মনে হয় যেন তিনি লক্ষ লক্ষ মানুষের সঙ্গে সহজভাবে আলাপ করছেন। তবে তাঁর বক্তৃতায় এক ভিন্ন ধরনের সম্মোহনী ক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যায়।

পাঠক নিশ্চয় জানেন যে, একবার জ্যোতি বসুর ভারতের প্রধানমন্ত্রী হবার কথা উঠেছিল। ভারতের লোকসভায় সিপিআই (এম) এর সদস্যসংখ্যা ছিল বেশ নগণ্য। তারপরও অধিকাংশ দল তাকেই প্রধানমন্ত্রী করতে চেয়েছিলেন। এটা খুব সাধারণ ব্যাপার নয়। অর্থাৎ সর্বভারতীয় পর্যায়েও তিনি ছিলেন জনগণের আস্থাভাজন নেতা। তাঁর পার্টি সিপিআই (এম) এই প্রস্তাবে রাজী হয়নি। তিনি পার্টি সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে এমন আপাত লোভনীয় প্রস্তাব প্রত্যাখান করেছিলেন। আমাদের দেশের ক্ষেত্রে এমনটা ভাবাই যায় না। আর এর থেকেই বোঝা যায় যে, জ্যোতি বসু ছিলেন আসলেই এক ব্যতিক্রমী নেতা।

৯৫ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। এটা স্বাভাবিক বলেই মেনে নেয়া উচিত। তবু মন মানতে চায় না। মনে হয়, তাঁর আরও কিছুদিন বাঁচা উচিত ছিল। বাংলাদেশের স্বার্থে। ভারতের জনগণের স্বার্থে। সর্বোপরি ভারতবর্ষ ও উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলন বিকাশের স্বার্থে। যে আদর্শ তিনি রেখে গেছেন কাস্তে হাতুড়ি খচিত যে লাল পতাকা তিনি তুলে ধরেছিলেন, তাকে আরও উঁচুতে তুলে ধরে আমরা যেন তাঁকে যুগ যুগ বাঁচিয়ে রাখি।

হায়দার আকবর খান রনো বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা

জ্যোতি বসুকে খুনের চেষ্টাও হয়েছিলো

প্রবাদপ্রতিম কমিউনিস্ট নেতা, জনগণের নেতা জ্যোতি বসুকে সারা জীবন ধরেই নানা আক্রমণের মোকাবিলা করতে হয়েছে। এমনকি তাঁকে খুনেরও চেষ্টা হয়েছিলো। পাটনায়।

সেটা ১৯৭০ সাল। ৩১শে মার্চ। আততায়ীর গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে জ্যোতি বসুর আঙুল ছুঁয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলো। আততায়ীর লক্ষ্যভ্রষ্ট গুলি তাঁর বদলে প্রাণ কেড়ে নিয়েছিলো তাঁরই পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা কমরেড আলি ইমামের। পাটনায় এই আলি ইমামের বাড়িতেই সেদিন থাকার কথা ছিলো জ্যোতি বসুর। এর ঠিক একদিন বাদে কলকাতার শহীদ মিনার ময়দানে এক বিশাল সমাবেশে জ্যোতি বসু বলেছিলেন, মানব মুক্তির সংগ্রামে জীবন পণ করতে হবে। জয় আমাদের সুনিশ্চিত।

এই হামলার প্রেক্ষাপটের গুরুত্ব বুঝতে হলে যে সময়ে এই ঘটনা ঘটেছিলো সেই সময় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। পাটনায় জ্যোতি বসুর উপরে এই হামলার কিছুদিন আগেই সি পি আই (এম)-র বিরুদ্ধে এক হীন চক্রান্তের মধ্যে দিয়ে দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতন ঘটানো হয়েছিলো। সেই যুক্তফ্রন্ট সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ছিলেন জ্যোতি বসু। সি পি আই(এম) বিরোধী চক্রান্তের অঙ্গ হিসাবে সেই সময় যুক্তফ্রন্ট সরকারের এই স্বরাষ্ট্র দপ্তর এবং ওই দপ্তরের মন্ত্রী জ্যোতি বসুই ছিলেন আক্রমণের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিলো । এরকম পরিস্থিতিতে বিশ্বাসঘতকতার এক প্রেক্ষাপটে ১৯৭০ সালের ১৬ই মার্চ যুক্তফ্রন্টের মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখার্জি পদত্যাগ করেন। ২৯শে মার্চ রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়। জ্যোতি বসু তাঁর লেখা যতদূর মনে পড়ে বইটিতে লিখেছিলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে এইভাবে ঘৃণ্য উপায়ে ১৩ মাস শাসনকালেই দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতন ঘটানো হলো।’’

পাটনার হামলা সম্পর্কে এই বইটিতেই জ্যোতি বসু লিখেছেন, ‘‘এর দুই দিন পর আমার উপর আক্রমণ হলো। এবার একেবারে হত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে। এটা অবশ্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ও কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিহত্যার যে রাজনীতি কায়েমী স্বার্থবাহী মহলের থেকে শুরু হয়েছিলো, এটা তারই আরেকটি ঘটনা।’’

সেই হামলার ঘটনা স্মরণ করে জ্যোতি বসু লিখেছেন, ‘‘আমি পাটনা গিয়েছিলাম এক কর্মসূচী উপলক্ষে। দিনটি ছিলো, ১৯৭০ সালের ৩১শে মার্চ। পাটনা স্টেশনে নেমে দেখি, হাজার হাজার মানুষ লাল ঝান্ডা এবং ফেস্টুন হাতে স্টেশনে এসেছেন অভর্থ্যনা জানাতে। তখন সকাল আটটা মতো হবে। অত সকালে এত জমায়েত দেখে বেশ ভালো লাগলো। মনে হলো, বিহারে আমাদের পার্টির প্রভাব বাড়ছে। তাঁদের প্রবল স্লোগানের মধ্যে হেঁটে এসে স্টেশনের বাইরে সবে দাঁড়িয়েছি। হটাৎ ফুট দশেক দূরে বাঁদিক থেকে এক ঝলক আগুনের হলকা দেখি। মুহূর্তে মনে হলো, কী একটা যেন তীর বেগে আমার হাতের আঙ্গুল ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল। কিছু বুঝবার আগেই একটা আর্তনাদ। দেখি আমার একটু পেছনে একজনের জামা রক্তে লাল হয়ে গেছে। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে পড়েছিলাম। সেই রক্তাল্পুত ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। পরমুহূর্তে ঘোর কাটলো প্রচন্ড চিৎকারের মধ্যে। চারদিকে তখন ‘ধর্‌ ধর্‌’ আওয়াজ। কিন্তু ওই প্রবল ভিড়ের মধ্যে আততায়ী তখন মিলিয়ে গেছে।

জানলাম গুলিবিদ্ধ ব্যক্তির নাম আলি ইমাম। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। আরো জানলাম কমরেড আলি ইমাম আমাদের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সমর্থক। জীবন বীমা কর্পোরেশনে চাকরী করতেন। কিছুদিন আগে ই এম এস নাম্বুদিরিপাদ পাটনায় এসে তাঁর বাড়িতে উঠেছিলেন। আমারও সেদিন ওঁর বাড়িতেই ওঠার কথা ছিলো। আমাকে নিতেই তিনি পাটনা স্টেশনে এসেছিলেন। কিন্তু তাঁর বদলে নিজের জীবন দিয়ে গেলেন। আমার আঙ্গুলে শুধুমাত্র একটা ক্ষত সৃষ্টি হলো।’’

এই হামলার প্রতিবাদে সেদিন উত্তাল হয়ে উঠেছিলো পাটনা শহর। হামলার পরেই প্রায় ২০ হাজার মানুষের এক বিশাল ধিক্কার মিছিল স্লোগান দিতে দিতে বিহার বিধানসভার সামনে গিয়ে বিক্ষোভ দেখায়। বিকেলে পাটনা শহরে অনুষ্ঠিত হয় এক বিশাল সমাবেশ। সেই সমাবেশে ভাষণও দেন জ্যোতি বসু। তিনি বসু কমরেড আলি ইমামের বাড়িতেও যান। পরবর্তী সময়েও তিনি কমরেড আলি ইমামের পরিবারের খোঁজখবর নিতেন।

পাটনায় এই আক্রমণের তীব্র নিন্দা করে সেইদিনই সি পি আই(এম) পলিটব্যুরো পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, জ্যোতি বসুকে হত্যার এই নিষ্ঠুর ও কাপুরুষোচিত চেষ্টা একটা ভয়ঙ্কর রাজনৈতিক অপরাধ। এই অপরাধের জন্য সম্পূর্ণ দায়ী আমাদের পার্টির ঘৃণ্য শ্রেণী শত্রু। এরা আমাদের পার্টি ও পার্টি নেতাদের বিরুদ্ধে অবিশ্রান্ত বিদ্বেষমূলক এবং হিংসাত্মক প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের পার্টির বিরুদ্ধে জঘন্যতম প্রচার চালাতে এবং নেতাদের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক উত্তেজনা ছড়াতে বৃহৎ ব্যবসায়ের কুক্ষিগত তথাকথিত মুক্ত সংবাদপত্রগুলির ভূমিকাও মোটেই কম নয়। আমাদের পার্টির অন্যতম বিশিষ্ট নেতা, পশ্চিমবাংলার লক্ষ লক্ষ মেহনতী জনগনের প্রিয় ও শ্রদ্ধাভাজন জ্যোতি বসুকে হত্যার এই চেষ্টার জন্য দায়িত্বের ভাগ কোনমতেই তারা এড়াতে পারে না।

জ্যোতি বসুর উপর গুলি চালানোর খবর কলকাতায় পৌঁছানোর সাথে সাথেই বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছিলো এই মহানগর। রাজ্যের অন্যান্য প্রান্তেও হাজার হাজার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে পথে নেমে বিক্ষোভে দেখান। ৩১শে মার্চ সকাল ৯টা থেকে জ্যোতি বসুর উপর হামলার খবর প্রচারিত হওয়ার সাথে সাথেই কলকাতা এবং শহরতলীর যানবাহন, হাটবাজার বন্ধ হয়ে যায়। পাড়ায় পাড়ায় হাজার হাজার মানুষ পথে নেমে বিক্ষোভ মিছিল করেন। বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে গোটা ডালহৌসি চত্বর। ট্রাম, বাস কর্মীরাও ট্রাম-বাস প্রত্যহার করে বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ মিছিলে যোগ দেন। শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলি বন্ধ হয়ে যায়। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলি ফাঁকা করে দিয়ে বেরিয়ে আসেন ছাত্র-ছাত্রীরা। এমনকি কয়েকটি জায়গায় উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়। কলকাতাসহ রাজ্যের প্রায় সর্বত্র পালিত হয় অঘোষিত হরতাল।

সেই ঘটনার কথা উল্লেখ করে জ্যোতি বসু যত দূর মনে পড়ে বইয়ে তাঁর স্মৃতি চারণায় বলেছেন, ‘‘দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতন ঘটানোর জন্য আমাদের বিরুদ্ধে যা নয় তাই বলা হয়েছে। পার্টির ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে আটকানোর জন্য আমাদের বিরুদ্ধে কুৎসা, মিথ্যা, ব্যক্তিগত চরিত্রহননের বেপরোয়া ন্যক্কারজনক প্রচার চালানো হয়েছে। দিনের পর দিন আমাদের পার্টির বিরুদ্ধে হেট ক্যাম্পেন চালানো হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার নামে সি পি আই(এম)-কে নিষিদ্ধ করার, খতম করার চেষ্টা হয়েছে। বিভিন্ন বুর্জোয়া কাগজ ও অন্যান্য কমিউনিস্ট বিরোধী শক্তিগুলি মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রনোদিত হয়ে উচ্চ পর্যায়ের কুৎসার পরিবেশ তৈরি করেছে। সেই পরিবেশের মধ্যেই আমাদের জন্য সাধারণ মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত উৎকন্ঠা ও ভালবাসার প্রকাশ দেখে আমরা যেন নতুনভাবে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম। মানুষের ভালবাসা পাওয়ার চেয়ে বড় সম্পদ আর কিছু নেই।’’

পাটনায় হামলার প্রতিবাদে ১৯৭০ সালের ১লা এপ্রিল শহীদ মিনারে কেন্দ্রীয়ভাবে এক সুবিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। প্রমোদ দাসগুপ্তের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেই সমাবেশে জ্যোতি বসু বলেন, ‘‘জীবন দেওয়ার জন্য আমাদের প্রস্তুৎ থাকতে হবে প্রতি মুহূর্তে। কিন্তু মৃত্যু যখন আসবে তখন যেন জীবনের বৃথা অপচয়ের জন্য আমাদের অনুতাপ না করতে হয়। যেন বলতে পারি, পৃথিবীর মহত্তর সংগ্রাম, মানব মুক্তির জন্য আমার জীবন দিয়ে গেলাম।’’

Published in: on জুন 26, 2010 at 5:52 অপরাহ্ন  মন্তব্য করুন  

জনআন্দোলনের তরঙ্গেই জনপ্রিয়তম জননেতা জ্যোতি বসু

ইতিহাস কীভাবে তাঁকে মনে রাখবে তা নিয়ে চিরকালই তিনি ছিলেন নিষ্পৃহ। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে, তথা ভারতে, উথালপাতাল করা গণ-আন্দোলনের তরঙ্গে শীর্ষেই তিনি উদ্ভাসিত। কমরেড জ্যোতি বসু শুধু এক ঐতিহাসিক চরিত্র নন — এক চলমান ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা। কমরেড জ্যোতি বসু মানে ট্রেড ইউনিয়ন কর্মীর প্রত্যয়ের পরীক্ষা। কমরেড জ্যোতি বসু মানে চা বাগানের আন্দোলনরত মদেশীয় মজুর রেলওয়ে শ্রমিকের রুখে দাঁড়ানো। কমরেড জ্যোতি বসু মানে কাজের দাবিতে এগিয়ে চলো দৃপ্ত যুব মিছিল। কমরেড জ্যোতি বসু মানে খাদ্য আন্দোলনের দৃপ্ত জনতা। কমরেড জ্যোতি বসু মানে আধা ফ্যাসিস্ত সন্ত্রাসের মোকাবিলায় গণতন্ত্র রক্ষার লড়াইয়ে হার না মানা শহীদের স্মৃতি। ফসলের অধিকার পেতে সংগঠিত কৃষক আন্দোলন। কমরেড জ্যোতি বসু মানে সাম্রাজ্যবাদী হুকুমদারির বিরুদ্ধে আমাদের ঘাড় সোজা করে এগোনো। কমরেড জ্যোতি বসু মানে সাম্প্রদায়িকতা, বিচ্ছিন্নতাবাদ আর বিভেদকামিতার বিরুদ্ধে লাগাতার লড়াই। জ্যোতি বসু মানে এদেশে সমাজবদলের লড়াইয়ের চড়াই উৎরাই। আনতশির লাল পতাকা হাতে সময়ের সারথী।

বিশ শতকের চারের দশক থেকে নতুন সহস্রাব্দের প্রথম দশক বিশেষত এ বাংলায় গরিব মেহনতী মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযুদ্ধ যেন বাঁধা তাঁর স্মৃতির গ্রন্থিতেই।

রাজনীতিতে তিনি যুক্ত হয়েছিলেন বিলেতে ছাত্র থাকাকালেই। ফ্যাসিবিরোধী আন্দোলন যখন ইউরোপ জুড়ে দীপ্ত হয়ে উঠছে। লন্ডন মজলিশের সম্পাদক ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উদভ্রান্ত সময়েই তিনি চিনে নিয়েছিলেন সাম্যবাদী লড়াইয়ের ধ্রুবপদ। ব্যারিস্টারি পাসের বিলেতী সিলমোহরকে পাশে সরিয়ে রেখেই কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী।

প্রথমেই যুক্ত হয়েছিলেন ফ্যাসিবিরোধী আন্দোলনে। অবিভক্ত বাংলাদেশে সোভিয়েত সুহৃদ সমিতির সম্পাদক ১৯৪১ সালে যুদ্ধচলাকালীনই ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগ। প্রথমে বন্দর ও ডক শ্রমিকদের সংগঠিত করার কাজে। তারপরই রেল শ্রমিকদের সংগঠনে — ১৯৪৪ সালে বি এন রেলওয়ে ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক। সভাপতি বঙ্কিম মুখার্জি। আসাম, পূর্ববঙ্গ উত্তরবঙ্গ, পশ্চিমবঙ্গ চষে বেড়িয়েছেন।তাঁর নেতৃত্বেই রেলওয়ে, শ্রমিকদের সংগঠন শুধু অর্থনৈতিক প্রশ্নেই শ্রমিকদের সংগঠিত করেনি। চেষ্টা চালিয়েছে নিরন্তর তাঁদের রাজনৈতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে। বোম্বাইয়ে নৌ-বিদ্রোহের সময় বাংলার রেল শ্রমিকরা শামিল হয়েছিলেন ধর্মঘটে। নেতা কমরেড জ্যোতি বসু। তখনকার নিয়মে রেলওয়ে কেন্দ্রের প্রার্থী হিসেবেই বসু নির্বাচিত হয়েছিলেন বিধানসভায়। ১৯৪৬ সালে। কি আজাদ হিন্দ বাহিনীর মুক্তির দাবিতে উদ্বেলিত রাজপথে, কি মজুতদারি-বিরোধী সংগ্রামে কি সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী লড়াইয়ে, বন্দীমুক্তি আন্দোলনে, কি তেভাগার দাবিতে লড়াকু কৃষকের পাশে — এদেশে আইনসভায় মেহনতী মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবেই তাঁর ভূমিকা অনন্য তেভাগা আন্দোলনের দাবি বিধানসভার ভিতরে প্রতিধ্বনিত করতে তাঁর অসামান্য ভূমিকা অবিস্মরণীয়। তেভাগা আন্দোলনের সময় গোটা বাংলাদেশে গেছেন। কৃষক আন্দোলনের মাঝখানে দাঁড়িয়েছেন।

চল্লিশের দশকের শেষদিকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দৌড়ে গেছেন অকুস্থলে। শান্তি আন্দোলনের প্রধান সংগঠকদের অন্যতম। পঞ্চাশের দশকে এরাজ্যের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মোড় বদলাতে শুরু করে উদ্বাস্তু আন্দোলন, শিক্ষক আন্দোলন, খাদ্য আন্দোলনের ঢেউ। ১৯৫৪-র ঐতিহাসিক শিক্ষক আন্দোলনের সময় সভার ভিতরে আন্দোলনের দাবি তুলে ধরার স্বার্থেই গ্রেপ্তার এড়াতে বসু টানা সাতদিন আশ্রয় নিয়েছিলেন বিধানসভা ভবনেই। তাঁর বিরুদ্ধে সরকার‍‌ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল। কিন্তু বিধানসভা ভবনের ভিতর থেকে গ্রেপ্তার করার সাহস দেখায়নি। কমরেড জ্যোতি বসু এরই মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টির প্রাদেশিক কমিটির সম্পাদক নির্বাচিত হন ১৯৫৩ সালে। এই দায়িত্বে ছিলেন টানা ১৯৬১ সাল পর্যন্ত। তারপরই কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্ত পার্টির প্রাদেশিক কমিটির সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন।

পঞ্চাশের দশকে কুখ্যাত নিবর্তনমূলক আইনের বিরুদ্ধে, গোয়া মুক্তি আন্দোলনের সপক্ষে, চা-বাগিচা শ্রমিকদের আন্দোলনের সমর্থনে, পৌরসভাগুলিতে সর্বজনীন ভোটাধিকার চালু করার দাবিতে গণ-আন্দোলন গড়ে তুলতেও তাঁর অবদান অসামান্য। ১৯৫৯ সালের ঐতিহাসিক খাদ্য আন্দোলন সংগঠিত করার উদ্যোগেও তিনি রাস্তায় নেমেছেন। ১৯৫৭-র ১৭ই সেপ্টেম্বর মহাকরণের সামনে আইন অমান্য করে যাঁরা গ্রেপ্তারবরণ করেছিলেন কমরেড বসু তাঁদের অন্যতম। বাস্তুহারাদের পুনর্বাসনের দাবিতেও বিধানসভার ভিতরে ও বাইরে তিনি সমান সক্রিয়। ষাটের দশকে ছাত্র-যুব-মহিলা, কৃষক, মধ্যবিত্ত কর্মচারী, শ্রমিকদের সংগঠিত আন্দোলনের প্রতিটি পর্বে ঝলসে উঠেছেন কমরেড জ্যোতি বসু। যে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের সূত্র ধরেই গড়ে উঠেছে বামফ্রন্ট।

গণ-আন্দোলনের তরঙ্গশীর্ষেই ১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন। রাজ্যে প্রথম অকংগ্রেসী সরকার।আসন সংখ্যার বিচারে সি পি আই (এম)-রই মুখ্যমন্ত্রী পদ পাবার কথা। কিন্তু ঐক্যের স্বার্থেই পার্টি ছেড়ে দিয়েছিল মুখ্যমন্ত্রী পদ। জ্যোতি বসু হয়েছিলেন উপ-মুখ্যমন্ত্রী। ১৯৬৭-র প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার এবং ১৯৬৯-র দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকার রাজ্যের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কাছে এক বড় অভিজ্ঞতা। দুটি সরকারেরই মেয়াদ ছিল অল্প। কিন্তু জনস্বার্থবাহী গণতান্ত্রিক কর্মসূচীরূপায়ণের এক নতুন দিশা দেখিয়েছিল যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা। কমরেড জ্যোতি বসু তার অন্যতম প্রধান কারিগরের ভূমিকায়।

কংগ্রেস দল, কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকার, শাসকশ্রেণী প্রবল সন্ত্রাসে পশ্চিমবঙ্গের পালাবদলকে ঘুরিয়ে দিতে চাইছিল যখন, তখন গণতান্ত্রিক প্রতিরোধ জনগণকে সংগঠিত করার সংগ্রামেও বসু রাজপথে।

সত্তর দশকের আধা ফ্যাসিস্ত সন্ত্রাসের পর্বে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে রাজ্যের প্রতিটি প্রান্তে, দেশের নানা জায়গায়, তিনি ঘুরেছেন জনতার মাঝে। আন্দোলনকে সংগঠিত করেছেন। বামপন্থী আন্দোলনের, দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অকুতোভয় প্রতীক। ইতিহাস গড়াতেই ব্যক্তির ইতিহাস হয়ে ওঠার কাহিনী। একাধিকবার তাঁকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে। পাটনা স্টেশনে ১৯৭০ সালের ৩১শে মার্চ আততায়ীর ছোঁড়া গুলিটা বসুর আঙুল ছুঁয়ে গিয়েছিল। একটু এদিক-ওদিক হলেই সব শেষ হয়ে যেত সেদিনই। বসিরহাটে কংগ্রেসী দুষ্কৃতীরা তাঁকে আক্রমণ করেছিল। বেঁচেছিলেন কোনক্রমে গাড়ির চালকের দক্ষতায়।

কিন্তু কমরেড জ্যোতি বসু গণ-আন্দোলনের অকুতোভয় নেতা।

১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার দায়িত্বভার নেবার সময় তাঁর সেই দিকনির্দেশক উচ্চারণ — ‘‘বামফ্রন্ট সরকার শুধুমাত্র রাইটার্স বিল্ডিংস থেকে সরকার চালাবে না। ভূমিসংস্কারের দাবিতে সংগঠিত কৃষক আন্দোলন এবং বামফ্রন্ট সরকারের ভূমিসংস্কারের  কর্মসূচীর সফল রূপায়ণ — গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অগ্রবর্তী ঘাঁটি হয়ে ওঠাও এক ঐতিহাসিক পর্বান্তর।

মুখ্যমন্ত্রী‍‌ জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার গোটা দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কাছে আশা-আকাঙ্ক্ষার এক নতুন মাত্রা।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে শেষদিন পর্যন্ত গণ-আন্দোলনের তিনি নেতা। মুখ্যমন্ত্রীর ভূমিকারও যেন নতুন সজ্ঞায়ন ঘটেছে। আশির দশকের গোড়া থেকেই একদিকে স্বৈরতন্ত্র-বিরোধী আন্দোলনকে সংগঠিত করার কাজ। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে ভূমিসংস্কার ও পঞ্চায়েতের কাজের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক অধিকার ও গরিব মানুষের ক্ষমতার সম্প্রসারণ।

কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রশ্নগুলিকে সামনে টেনে গোটা দেশের রাজনীতিতে অনপনেয় প্রভাব ফেলার উদ্যোগেও তিনি নেতা। কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসের দাবি কমরেড বসুর নেতৃত্বে গোটা দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সামনে নতুন অভিমুখ এনে দেয়।

বিচ্ছিন্নতাবাদের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে সক্রিয় গণ-উদ্যোগেরও তিনি অন্যতম প্রধান সংগঠক, নেতা। একইভাবে সক্রিয় সাম্প্রদায়িকতা এবং ‍‌বিভেদকামীতার বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলনে সংগঠিত করার কর্মসূচীতেও। গোটা দেশের মানুষের কাছে ধর্মনিরপেক্ষতার অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর।

একদিকে যেমন লড়াই করেছেন কেন্দ্রের বৈষম্যের বিরুদ্ধে অন্যদিকে তেমনি পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণের পক্ষে গণ-সমাবেশ ঘটাতে তিনি জনতার মিছিলে।

নব্বইয়ের দশকে ইউরোপে সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পর্বে তাঁকে আমরা দেখেছি মার্কসবাদ-‍‌লেনিনবাদের পক্ষে মতাদর্শগত সংগ্রামের নেতৃত্ব দিতে।

মানুষের প্রতি অকুণ্ঠ বিশ্বাসই গভীর রাজনৈতিক প্রত্যয়ের ভিত্তিভূমি। শেষদিন পর্যন্ত তিনি বলে গেছেন — মানুষই ইতিহাস রচনা করেন। তাই মানুষকে সংগঠিত করতে হবে, সচেতন করতে হবে। সেই লড়াকু মানুষের মধ্যে কমরেড জ্যোতি বসু মৃত্যুহীন।

Published in: on জুন 26, 2010 at 5:39 অপরাহ্ন  মন্তব্য করুন  
%d bloggers like this: