সংসদীয় গণতন্ত্র : অদ্বিতীয় জ্যোতি বসু

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য 

জ্যোতি বসুর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন কোনো স্বল্প পরিসরে আলোচনা করতে যাওয়া সম্ভব না। চল্লিশের দশক থেকে তিনি রাজনীতি শুরু করেছেন এবং তাঁর জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর সঙ্গে কাজ করতে পারা, তাঁর পাশে থেকে কাজ শেখা আমার জীবনের এক দুর্লভ অভিজ্ঞতা। এই প্রবন্ধে আমি মূলত সংসদীয় গণতন্ত্রে তাঁর অবদান সম্পর্কে সংক্ষেপে কয়েকটি কথা বলব।

তিনি বিধানসভার সদস্য হয়ে এসেছিলেন প্রথম ১৯৪৬ সালে। পরাধীন দেশে যুক্ত বাংলার বিধানসভায় তিনি রেলওয়ে শ্রমিক কনস্টিটিউয়েন্সির প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। সেই ১৯৪৬ সাল থেকে বিধানসভা তাঁর কণ্ঠস্বর শুনেছে। তখন বাংলাদেশে গ্রামে-গ্রামে চলছে তেভাগা আন্দোলন। তেভাগা সম্পর্কে বিধানসভায় বক্তৃতার মধ্য দিয়ে তিনি সারা দেশের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন — কিভাবে বাংলার গ্রামে-গ্রামে কৃষকদের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রাম চলেছে, তাদের ফসলের ভাগের জন্য এবং তৎকালীন সরকার কিভাবে সেই কৃষকদের আন্দোলনকে দমন করার জন্য পুলিস এবং মিলিটারি ব্যবহার করছে। পরবর্তীতে স্বাধীনতার পরেও তিনি এ‍‌ই সভায় রাজ্যের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধী নেতা হিসাবে কঠিন দায়িত্ব পালন করে গেছেন। ১৯৫২ সালে তিনি বরানগর বিধানসভা থেকে নির্বাচিত হয়ে পরে এই সভায় আসেন এবং আবার বিরোধী দলের নেতা হন। স্বাধীনতার পরবর্তীতে আমাদের রাজ্যে উদ্বাস্তু আন্দোলন, খাদ্য আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন — বহুমুখী আন্দোলনে তাঁর অনবদ্য ভূমিকা ছিল বিধানসভার ভিতরে এবং বিধানসভার বাইরেও। তিনি এই সমস্ত আন্দোলনকে সংগঠিত করতে প্রথম সারির নেতা হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিরোধী দলের যে ভূমিকা আছে সংসদীয় গণতন্ত্রে তা তিনি তাঁর জীবন দিয়ে, তাঁর কর্মপন্থা দিয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বিরোধী দলের নেতা হিসাবে তিনি সফলভাবে সেই দায়িত্ব পালন করেছেন।

পরবর্তীকালে আমরা তাঁকে দেখেছি তাকে দু’টি স্বল্পকালীন যুক্তফ্রন্ট সরকারের — (একটা ৯ মাস, একটা ১৩ মাস), উপমুখ্যমন্ত্রী হিসাবে। পরবর্তীতে বাম সরকার আসার পরে তিনি হলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং একটানা ২৩ বছর তিনি সাফল্যের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে গেছেন। সংসদীয় রাজনীতির তাঁর কয়েকটি মূল সাফল্য উল্লেখ করতে চাই। সমস্ত কর্মপন্থার মধ্য দিয়ে তিনি রাজ্যের, দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রকে সংহত করা, উন্নত করার চেষ্টা সর্বতোভাবে চালিয়ে গেছেন। তিনি আন্তরিকভাবে গণতন্ত্রকে বিশ্বাস করতেন। তাঁর নিজের জীবনে যদিও তিনি বিনাবিচারে জেল খেটেছেন কিন্তু তিনি কখনও অন্যকে বিনাবিচারে জেল খাটাননি — এটাই ছিল তাঁর বৈশিষ্ট্য। তিনি কোনো কালা আইন হাতে নেননি। তিনি সংবাদপত্রের স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ করেননি। তিনি আন্তরিকভাবে প্রচার মাধ্যমের স্বাধীনতা‌‌য় বিশ্বাস করতেন। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, গণতান্ত্রিক অধিকারগুলি, ব্যক্তি স্বাধীনতা, ট্রেড ইউনিয়নের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে তিনি আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করেছেন এবং সেটি প্রমাণ করেছেন। আমরা এটাও ভুলতে পারি না পশ্চিমবাংলা এমন একটা রাজ্য, যেখানে তাঁর নেতৃত্বে সারা দেশের মধ্যে প্রথম হিউম্যান রাইটস কমিশন গঠিত হয়। জাতীয় কমিশন তৈরি হওয়ার পর আমাদের রাজ্যে পশ্চিমবাংলায় সারা দেশের মধ্যে প্রথম। এই কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয় তাঁর নেতৃত্বে। কারণ তিনি আন্তরিকভাবে যা বিশ্বাস করতেন, সেই কাজ তিনি হাতে-কলমে প্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছেন। সারা জীবন ধরে তিনি সংসদীয় গণতন্ত্রকে এইভাবেই প্রস্ফুটিত করার চেষ্টা করেছেন।

তাঁর আর একটি দিক সম্পর্কে উল্লেখ করতেই হয় তাঁর জীবন চিন্তায়, তাঁর কর্মধারায়, তাঁর রাজনীতিতে তিনি সর্বাঙ্গীণভাবেই ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ। কোনো অবস্থাতেই কোনো ধার্মিক সাম্প্রদায়িক চিন্তা তাঁকে গ্রাস করতে পারেনি, স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি বড় বড় দু’টি ঘটনায় তার প্রমাণ রেখেছেন এই রাজ্যে। শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর সারা দেশে দুর্ভাগ্যজনকভাবে হলেও শিখ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে একটা সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা ছড়িয়ে পড়েছিল। আমাদের রাজ্যে সেই আগুনের উত্তেজনার আঁচ আমরা পেয়েছিলাম কিন্তু এই রাজ্যে কোনো অশান্তি হয়নি। তাঁর নেতৃত্বে আমাদের রাজ্য সেই অবস্থাটা পেরিয়ে আসতে পেরেছিল। ঠিক একইভাবে যখন বাবরি মসজিদ ধ্বংস হয় তখন সারা দেশে অনেক কাণ্ড হয়েছে, অবাঞ্ছিত কাণ্ড। আমাদের রাজ্যে সেই আগুনের হলকা এসেছে, কিন্তু শান্তির পরিবেশ রাখতে মূলত সক্ষম হয়েছে। নিশ্চয়ই এতে আমাদের রাজ্যের মানুষের কৃতিত্ব আছে। কিন্তু সবার উপরে ছিলেন জ্যোতি বসু, একজন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি সেই দায়িত্ব পালন করতে পেরেছিলেন বলে আমাদের রাজ্যে অশান্তি নেমে আসেনি। আজকে সারা দেশের মানুষ জানেন পশ্চিমবাংলায় ধর্মনিরপেক্ষতা সুরক্ষিত। পশ্চিমবাংলায় সাম্প্রদায়িক শক্তির জায়গা নেই। তিনি এই ঐতিহ্যকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন।

সংসদীয় রাজনীতিতে তাঁর বিশেষ ভূমিকা রাজনৈতিক নেতা হিসেবে কি? শ্রমিক আন্দোলন এবং কৃষক আন্দোলনকে তিনি রাজনৈতিক আন্দোলনের মঞ্চের মধ্যস্থলে দাঁড় করিয়েছিলেন। এই দুই শ্রেণী আমাদের দেশে বৈপ্লবিক শক্তি। তাদের চিন্তা, তাদের মুক্তি সেই রাজনীতিকেই তিনি সারা জীবন বিশ্বাস করেছিলেন। তাঁর মুখে শোনা তাঁর ভাষায় একটা ঘটনা এখনও মনে পড়ে জলপাইগুড়ি থেকে আসাম যাচ্ছিলাম ট্রেনে, গোটা ট্রেন অন্ধকার। কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে, জাপানিজরা বোমা ফেলতে পারে। অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে চলেছি জলপাইগুড়ি থেকে আসামে শ্রমিকদের মিটিং করার জন্য, অন্ধকার রাতে এই বিপদের মধ্যে যেতেই হবে। বিশ্বাস করেছি শ্রমিক‍‌শ্রেণীর মুক্তি। সেই কাজ করে গেছি, কেউ বাধা দিতে পারেনি। শ্রমিকদের এবং কৃষকদের তিনি রাজনৈতিক আন্দোলনের মাঝখানে দাঁড় করিয়েছিলেন।

(বিধানসভায় ১০ই মার্চ ২০১০ তারিখের বক্তৃতাকে ভিত্তি করে লিখিত) 

গণশক্তি, ৭ই জুলাই, ২০১৩ 

Advertisements

জ্যোতি বসুর জন্মশতবর্ষ

বিমান বসু 

কমরেড জ্যোতি বসুর আজ থেকে জন্ম শতবর্ষ শুরু হলো। তিনি ১৯১৪ সালের ৮ই জুলাই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আর আমা‍দের ছেড়ে চলে গেছেন ২০১০ সালের ১৭ই জানুয়ারি। জ্যোতি বসু দীর্ঘ সাত দশক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকে তাঁর জীবদ্দশায় আমাদের দে‍‌শের কমিউনিস্ট ও বামপন্থী আন্দোলনের সব থেকে বেশি পরিচিত নেতা ছিলেন। এমনকি ভারতের কমিউনিস্ট ও বামপন্থী নেতা হিসেবে বিদেশেও তিনি পরিচিত ছিলেন। জ্যোতিবাবু দেশে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন একজন কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী হিসেবে। ১৯৪০ সালে বিলেত থেকে দেশে ফিরে কমরেড মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের সঙ্গে দেখা করে পার্টিতে সর্বক্ষণের কর্মী হিসেবে কাজ করার ইচ্ছে প্রকাশ করলে তা তখন পূরণ করা হয়েছিলো।

শ্রমিক সংগঠনের কাজের মধ্য দিয়েই জ্যোতিবাবুর রাজনৈতিক কার্যকলাপ শুরু হয়েছিলো। কমরেড মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের নির্দেশে তিনি বন্দর (পোর্ট) শ্রমিকদের মধ্যে এবং রেল শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে সংগঠন গড়ার কাজে যুক্ত হন। কিন্তু জ্যোতিবাবু রেল শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে কাজ করায় বেশি স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করতেন। তাই ধীরে ধীরে রেলওয়ে ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের নেতা হয়ে উঠেছিলেন। উল্লেখ্য, ১৯৪৬ সালে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভায় রেল কেন্দ্র থেকে কমিউনিস্ট প্রার্থী হিসেবে জ্যোতিবাবু কংগ্রেসের ড. হুমায়ুন কবীরকে পরাস্ত করে জয়ী হয়ে‍‌ছিলেন।

শ্রমিক সংগঠনে কাজের সঙ্গে জ্যোতিবাবু ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হয়ে গেলেও দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মানবতার শত্রু ফ্যাসিবাসী আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে অন্যান্যদের সঙ্গে সমানভাবে সোচ্চার হয়েছিলেন। তাই সবাই মিলে ১৯৪১ সালে ‘সো‍ভিয়েত সুহৃদ সমিতির’ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত করেছিলেন কমরেড জ্যোতি বসুকে। ধীরে ধীরে জ্যোতিবাবু সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষের জীবন-যন্ত্রণা লাঘব করার আন্দোলন সংগ্রামে একজন বিশিষ্ট প্রচারক ও সংগঠক হিসেবে গড়ে ওঠেন। জ্যোতিবাবু বিধায়ক হিসেবে প্রাদেশিক আইনসভার ভিতরে শ্রমিক-কৃষক আন্দোলন, খাদ্য সমস্যা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, বন্দীমুক্তি, ব্রিটিশ পুলিসের নির্যাতন প্রভৃতি বিষয় নিয়ে আলোচনা করে আইনসভার বাইরে আলোড়ন সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন। এইভা‍‌বে নানা কাজে যুক্ত থাকার ফলে ’৪৬ সালের ১৬ই আগস্ট কলকাতায় ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা শুরু হলে তা বন্ধ করতে রাস্তায় নেমে ইতিবাচক ভূমিকা পালন ক‍‌রেছিলেন।আবার বাংলার কৃষকসমাজ ‘তেভাগা আন্দোলন’ শুরু করলে তাঁদের ন্যায্য দাবি আদায়ের কথা বারবার আইনসভার অভ্যন্তরে জোরালো ভাষায় পেশ করেছেন। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৬ মাসের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ করা হয়। যেদিন নিষিদ্ধ করা হলো অর্থাৎ ২৬শে মার্চ, সেইদিনই জ্যোতিবাবুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো। এটাই তাঁর প্রথম কারাজীবন। এরপর অনেকবারই তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন, মুক্ত হয়েছেন। আবার একবার গ্রেপ্তার থাকাকালীন সময়ে ‘হেবিয়াস কর্পাস’-এ আবেদন করে হাইকোর্টের আদেশে তিনি ১৯৫১ সালে মুক্তি পান। এরপর পার্টি আবার বৈধ হয়।

১৯৫২ সালে প্রথম সাধারণ নির্বাচনে জ্যোতিবাবু পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় কমিউনিস্ট সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত টানা তিনি বিধানসভার সদস্য ছিলেন। ব্যতিক্রম ছিলো ১৯৭২ সালে জাল-জোচ্চুরি করে সাজানো বিধানসভা তৈরি করার সময়। কমিউনিস্ট পার্টির কাজে দক্ষতা অর্জন করার ফলশ্রুতিতে ১৯৫৩-৫৪ সালে জ্যোতিবাবু পার্টির পশ্চিমবঙ্গ প্রাদেশিক কমিটির সম্পাদক নির্বাচিত হন। এই পদে তিনি ছিলেন ১৯৬০-৬১ সাল পর্যন্ত। তখনকার দিনে প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে জ্যোতিবাবু বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন। যেমন ১৯৫৩ সালে ট্রামভাড়া বৃদ্ধির বিরুদ্ধে আন্দোলন, ১৯৫৪ সালে দুর্ভিক্ষ-বিরোধী আন্দোলন, ১৯৫৬ সালে বঙ্গ-বিহার সংযুক্তি বিরোধী আন্দোলন, ১৯৫৯ সালে ঐতিহাসিক খাদ্য আন্দোলন, ১৯৬৫-৬৬ সালের আন্দোলন সহ সমস্ত আন্দোলনে জ্যোতিবাবু সামনের সারিতে থেকে লড়াই সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৬৫ সালে জ্যোতিবাবু গ্রেপ্তার হয়ে পরে ১৯৬৬ সালে মুক্ত হন, কিন্তু জ্যোতিবাবু কোনো কো‍নো সময়ে গ্রেপ্তারী এড়ানোর জন্য আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

জ্যোতিবাবু আন্দোলন সংগ্রামে যেমন যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন, ঠিক তেমন প্রশাসনের যখন যেখানে যে পদে আসীন ছিলেন, সেখানেও তিনি তাঁর দক্ষতার ছাপ ফেলেছিলেন। যেমন ১৯৬৭-৬৯-এর স্বল্পস্থায়ী যুক্তফ্রন্ট সরকারের উপ-মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করলেও রাজ্যের জনগণের কাছে মুখ্য আকর্ষণ ছিলেন আবার জ্যোতিবাবু। এ-রাজ্যে জ্যোতিবাবুই প্রথম ঘোষণা করেছিলেন যে ন্যায়সঙ্গত শ্রমিক-কৃষক আন্দোলন দমন করতে পুলিসকে ব্যবহার করা হবে না। যদিও সেই সময়ে মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বাংলা কংগ্রেসের অজয় মুখোপাধ্যায়। এরপর কংগ্রেস রাজত্বে নৈরাজ্য, সন্ত্রাস, আধা-ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসের রাজত্বের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন বিকাশের ক্ষেত্রে ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার লড়াইতে জ্যোতিবাবু মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। দেশব্যাপী জরুরী অবস্থার বিরুদ্ধে জনমত সংগঠিত করার কাজেও জ্যোতিবাবু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আর জরুরী অবস্থা অবসানের পর লোকসভা নির্বাচন ঘোষিত হলে রাজ্যে সমস্ত বামপন্থী দলসমূহকে নিয়ে বামফ্রন্ট গড়ে তোলার কাজে কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্তর সহযোগী হিসেবে কমরেড জ্যোতি বসু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

১৯৭৭ সালে প্রথমে সারা ‍‌দেশে লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং কেন্দ্রে কংগ্রেসের পরাজয়ে প্রথম অকংগ্রেসী সরকার গড়ে ওঠে। পরে রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বামফ্রন্ট জয়ী হয় এবং কমরেড জ্যোতি বসু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেই তিনি রাজ্যে নৈরাজ্যের অবসান ঘটিয়ে শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন। প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে সিদ্ধান্ত করেন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সর্বত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং সমস্ত রাজবন্দীদের মুক্তি দিতে হবে। তাই অল্প কয়েকমাসের মধ্যে ১৭০০ রাজবন্দী মুক্তি পান। এবং ১০,০০০ মিথ্যা ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহৃত হয়। এই রাজবন্দী ও মিথ্যা মামলার আসামীদের মধ্যে প্রায় সব রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা যুক্ত ছিলেন।

নির্বাচনী ইশ্‌তেহারে ৩৬ দফা কর্মসূচীর প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবে রূপায়িত করার লক্ষ্যে জ্যোতি বসু ঐকান্তিক ছিলেন। তাই সম্ভব হয়েছিলো এক বছরের কম সময়তে ত্রিস্তর পঞ্চায়েতী নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে এই নতুন পঞ্চায়েতী ব্যবস্থা নির্বাচনের মাধ্যমে সারা ভারতে প্রথম পশ্চিমবঙ্গে বাস্তবায়িত করা। ধীরে ধীরে নির্বাচনের মাধ্যমে পৌরসভা ও সমবায় সমিতি গড়ে ওঠার কাজ শুরু হলো। আসলে জ্যোতিবাবু বামফ্রন্টের ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের নীতিকে সরকারী ব্যবস্থাপনায় কার্যকরীভাবে রূপায়ণ করার কাজে একশ’ ভাগ আন্তরিক ছিলেন। গণতন্ত্রকে গ্রাসরুট লেভেলে পৌঁছে দিয়ে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেছেন।

শপথ গ্রহণ করেই জ্যোতিবাবু ঘোষণা করেছিলেন ন্যায়সঙ্গত গণ-আন্দোলন দমন করতে পুলিস ব্যবহার করা হবে না। ঘোষণা করেছিলেন সমাজের সব অংশের মানুষ, যাঁরা বিভিন্ন পেশায় যুক্ত রয়েছেন তাঁদের সকলেরই নিজের নিজের ক্ষেত্রে সংগঠিত হওয়া ও ইউনিয়ন করার অধিকার থাকবে। ফলে, রাজ্য সরকারী কর্মচারী যাঁদের কংগ্রেস আমলে চাকরি থেকে অন্যায়ভাবে বরখাস্ত করা হয়েছিলো বা সাসপেন্ড করা হয়েছিলো তাঁদের সবাইকে নিজের নিজের কর্মক্ষেত্রে পুনর্বহাল করা হয়। কলে-কারখানায় শ্রমিকদের ইউনিয়ন করার অধিকারের ওপর যে বিধিনিষেধ ছিলো তা প্রত্যাহার করা হয়। ছাত্রসংসদ নির্বাচন যা আগে বন্ধ করা হয়েছিলো, তা পুনরায় চালু করা হয়। একইসঙ্গে ভূমিসংস্কারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। ফলে ভূমিহীন চাষীদের মধ্যে সরকার অধিকৃত জমি বিলিবণ্টন করা শুরু হয়ে যায়। পরবর্তীতে পুরোনো জমিদার-জোতদারদের সিলিং বহির্ভূত জমি অধিগ্রহণ করে গরিব কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। এমনকি বর্গাচাষীর স্বার্থরক্ষা করতে ‘অপারেশন বর্গা’ চালু করা হয়।

শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে একবছরের মধ্যে এক হাজার নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয় এবং শিক্ষাকে ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত অবৈতনিক ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীসময়ে সমগ্র স্কুলশিক্ষা অবৈতনিক হয়েছে। পরিকল্পনা করে প্রাথমিক, জুনিয়র, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, কলেজের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফলে ব্যাপক ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষার অঙ্গনে এসে শিক্ষালাভের সুযোগ পেয়েছে। জ্যোতিবাবু সবসময়ে শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে উৎসাহ দিতেন। নিচের ক্লাসগুলোতে বিনামূল্যে পাঠ্যবই সরবরাহ করার নিয়মও চালু করা হয়। ফলশ্রুতিতে প্রথম প্রজন্মের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে শিক্ষালাভের সুযোগ বৃদ্ধি পেল। স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রসারিত করে প্রতিষেধকমূলক থেকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা শ্রেয় তা প্রচারে গুরুত্ব পেয়েছিলো। এইসব কাজে জ্যোতিবাবুর তদারকি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং জ্যোতিবাবুকে একজন দক্ষ প্রশাসকের আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করেছে। আবার সব দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রিসভার সদস্যদের জ্যোতিবাবু স্বাধীনভাবে কাজ করতে উৎসাহিত করতেন।

আমি লক্ষ্য করেছি, জ্যোতিবাবু রাজনৈতিক দিক থেকে প্রতিকূল পরিস্থিতি গড়ে উঠলেও আন্দোলন-সংগ্রাম ও সংগঠনের কাজ করতে কখনো দিশেহারা হতেন না। আবার প্রশাসন পরিচালনা করার সময়ও দৃঢ় মনোভাব নিয়ে তা মোকাবিলা করতেন। ১৯৬৯ সালে দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময়ে পুলিসে অসন্তোষ দেখা দিলে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে তাঁর কাছে পুলিসী পোশাকে বিক্ষোভ দেখাতে গেলে ধীরস্থিরভাবে বলেছিলেন — আপনারা বাইরে যান, পরে কথা বলবো। তিনি বিশ্বাস করতেন রাজনৈতিক কাজ করলে সমস্যা দেখা দিতে পারে কিন্তু তা ধীরস্থিরভাবে সমাধা করতে হবে। আবার তিনি মানুষের উপর আস্থা রাখতেন এবং বলতেন ‘মানুষ, একমাত্র মানুষই ইতিহাস রচনা করে। এটা ঠিকই যে মানুষ কখনো কখনো ভুলও করে। কিন্তু নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে শেষপর্যন্ত মানুষের জয়ই অবশ্যম্ভাবী।’

রাজ্যে নৈরাজ্যের অবসান ঘটিয়ে শান্তি—শৃঙ্খলার প্রতিষ্ঠা ও গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার কাজসহ নানা উন্নয়নমূলক কাজ করেই জ্যোতিবাবু সন্তুষ্ট হয়ে বসে থাকতেন না। তাই ভারতের মতো যুক্তরাষ্ট্রীয় রাষ্ট্র কাঠামোতে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক যুক্তিসঙ্গত পুনর্বিন্যাসের দাবিতে আন্দোলন পরিচালনা করার ক্ষেত্রে জ্যোতিবাবু ভারতের যে কোন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর থেকে একটু অগ্রণী অবস্থানে ছিলেন। কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক নিয়ে নানা জায়গায় অসংখ্য আলোচনাসভা হয়েছে। শ্রীনগর কনক্লেভ, কলকাতা কনক্লেভ, দিল্লি কনক্লেভ প্রভৃতি সফলভাবে আয়োজিত হয়েছে। জাতীয় বিভিন্ন বিষয়ের ওপর জ্যোতিবাবুর যুক্তিশীল বক্তব্য তাঁকে সর্বভারতীয় নেতার আসনে বসিয়েছে। স্বাভাবিকভাবে, প্রবাদপ্রতিম এই কমিউনিস্ট নেতার শতবর্ষে তাঁর কর্ম ও জীবনের নানা শিক্ষণীয় দিক বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে আমাদের পার্টির পক্ষ থেকে একবছর ধরে নানা কর্মসূচীর রূপায়ণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

কমরেড জ্যোতি বসু কমিউনিস্ট আন্দোলন ও বামপন্থী আন্দোলনের নেতা ও কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করে বিকল্পের সন্ধানে অনেক পথ হেঁটেছেন। রাজ্যে বহুবছর ধরে কোয়ালিশন সরকার চালিয়ে বর্তমান সময় যে কোয়ালিশনের সময় তা নিজের কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে জ্যোতিবাবু মূর্ত করে তুলেছেন। স্বাভাবিকভাবে ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জ্যোতিবাবুর কমিউনিস্ট ও বাম আন্দোলন সংগ্রাম ‍‌থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে তাকে বাস্তবে রূপায়িত করার অঙ্গীকার আমাদের নিতে হবে। 

গণশক্তি, ৮ই জুলাই, ২০১৩

অসম সাহসী

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য

জ্যোতি বসু দেশের বামপন্থী আন্দোলনের মূর্ত প্রতীক। তাঁকে পার্টির নেতা হিসাবে দেখেছি। শ্রমিক, মধ্যবিত্ত কর্মচারীদের প্রিয় নেতা ছিলেন তিনি। ছিলেন কৃষিজীবী সমাজের ভালোবাসার মানুষ। তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা ছিল বিতর্কের ঊর্ধ্বে। আমাদের বর্তমান শিল্পনীতিও তাঁরই চিন্তাপ্রসূত। দেখেছি, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে তিনি কখনো দেরি করতেন না। এছাড়াও জ্যোতিবাবুকে আমি দেখেছি এক অসম সাহসী মানুষ হিসাবে। তাঁর কথা মনে করলেই এক লহমায় হাজির হয় অসংখ্য উজ্জ্বল স্মৃতি। সেই সব স্মৃতির মধ্যে থেকে উঠে আসে স্ফুলিঙ্গ সব মুহূর্ত  আর অসম সাহসী জ্যোতিবাবু।

এই মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে একটি দিনের কথা। বিরাটি যাচ্ছিলেন জ্যোতিবাবু। আমি সঙ্গে ছিলাম। পার্টির একটি সভা ছিল সেখানে। ১৯৭১ সাল। আমাদের আটকাতে, সভা ভাঙতে প্রচুর বোমা পড়ছিল। খুব গণ্ডগোল হচ্ছিল। আমাদের গাড়ির চালক কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়লেন। জ্যোতিবাবু শুধু বললেন— থামলে চলবে না। আমাদের এগোতেই হবে। গাড়ি এগোলো। বোমাবাজি, হাঙ্গামার মধ্যে দিয়েই আমরা সভায় গিয়ে পৌঁছালাম। সভা হলো। এই রকম আরো ঘটনার সাক্ষী আছেন আরো অনেকে। আমারই কত স্মৃতি আছে। অনেক।

কত সহজে জ্যোতি বসু প্রকাশ করতেন নিজেকে, পরিস্থিতিকে। কী সাবলীল ছিল তাঁর প্রকাশভঙ্গি। মনে পড়ছে, সেটি ছিল ১৯৭২সাল। সেই সময় আজকের প্রজন্ম দেখেনি। খুব গণ্ডগোল, ভাঙচুর চলছে রাজ্যে। একটা অস্থিরতা চারিদিকে। একদিন মৃণাল সেন বললেন, জ্যোতিবাবুর সাথে দেখা করতে চাই। আমি এসে জ্যোতিবাবুকে বললাম। জ্যোতিবাবু বললেন, ঠিক আছে। আসতে বলো। মৃণাল সেন এলেন। এসে জ্যোতিবাবুকে বললেন, কী হচ্ছে বলুন তো ? কিছুই বুঝতে পারছি না। জ্যোতিবাবু বললেন, আপনি কী করে বুঝবেন ? আমিই বুঝতে পারছি না কী হচ্ছে।

শ্রদ্ধেয় জ্যোতি বসুর জীবনাবসানে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। রাজনীতিতে তাঁকে জীবন্ত কিংবদন্তী বলা হতো। দেশ বিদেশে তিনি শ্রদ্ধার আসন অর্জন করেছিলেন। গত শতকের চল্লিশের দশক থেকে তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। জনসাধারণের ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা সবসময় তাঁর সঙ্গে ছিলো। বাম ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে সারাদেশে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে জ্যোতিবাবু অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের গঠনে তাঁর ভূমিকা সুবিদিত। পরপর পাঁচবার বামফ্রন্ট সরকারের তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন আমাদের অভিভাবক। দীর্ঘদিন শ্রমিক আন্দোলন করেছেন। আবার গ্রামের মানুষ, কৃষিজীবীরা তাঁকে ভালোবাসতেন। তাঁর মৃত্যুতে পার্টি, বামপন্থী আন্দোলন ও দেশের বিরাট ক্ষতি হলো। কমিউনিস্ট নেতা হিসাবে জ্যোতি বসু মানুষের মন জয় করতে পারতেন।

তাঁর জীবনাবসানে দেশ হারালো এক মহান নেতাকে। দেশের বাম ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলো। এই মুহূর্তে তাঁকে দেশ ও রাজ্যের বিশেষ প্রয়োজন ছিলো। তাঁর ভূমিকা ভারতের ইতিহাসে অম্লান থাকবে।

গণশক্তি, ১৮ই জানুয়ারি, ২০১০

Published in: on জুলাই 7, 2013 at 7:14 অপরাহ্ন  মন্তব্য করুন  

মানুষের ওপরে বিশ্বাস রাখতে হবে,তাঁদের ভালোবাসার যোগ্য হতে হবেঃ জ্যোতি বসু

১৯৭৭ সালে এরাজ্যে যখন বিধানসভা নির্বাচনের দিন ঘোষণা হলো, তার আগে একটানা পাঁচ-ছয় বছর ধরে কংগ্রেস সরকার এবং কংগ্রেস দলের পক্ষ থেকে ভয়াবহ সন্ত্রাস নামিয়ে আনা হয়েছে। ১৯৭২ সাল থেকে প্রায় ১২০০ সি পি আই (এম) নেতা-কর্মীকে খুন করা হয়েছে, হাজার হাজার নেতা-কর্মী বাড়ি ছাড়া, পার্টি অফিস, ট্রেড ইউনিয়ন অফিস দখল হয়ে গেছে। দেশে জরুরী অবস্হা কায়েম হয়েছে। আধা-ফ‌্যাসিস্ট সন্ত্রাসের সেই শ্বাসরোধকারী অবস্হার মধ্যে যখন নির্বাচন হলো, তখন আমরা ভাবিনি যে মানুষ আমাদেরই বিপুলভাবে জয়ী করবেন এবং পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হবে।

কিন্তু মানুষ যে কংগ্রেসকে ক্ষমা করেনি, ১৯৭৭ সালে তা প্রথম সুযোগেই প্রমাণিত হলো। কংগ্রেস গোটা দেশেই ধরাশায়ী হলো, এরাজ্যে তো বটেই। পশ্চিমবঙ্গে প্রথম বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হলো। তারপর থেকে টানা সাতবার এরাজ্যের মানুষ বামফ্রন্টকে জয়ী করে শুধু ভারতেই নয়, গোটা পৃথিবীর সংসদী‌য় গণতন্ত্রের ইতিহাসে ন‍‌জির তৈরি করেছেন। আজ এরাজ্যে বামফ্রন্ট সরকার ৩২ বছরে পড়লো। এই উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গের সংগ্রামী মানুষকে আমি আরেকবার অভিনন্দন জানাচ্ছি।

আমরা যখন সরকারে এলাম, খুবই সীমিত আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা নিয়ে কাজ শুরু করতে হয়েছিলো। তা সত্ত্বেও আজ এটা স্বীকৃত, এই সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার মানুষের স্বার্থে অনেক কাজ করতে পেরেছে।  আমরা যে এতদিন সরকারে রয়েছি, তা মানুষের ইতিবাচক রায়েই রয়েছি।  পাশাপাশি, বামফ্রন্ট সরকার গোটা দেশের সামনে মানুষের স্বার্থে বিকল্প কর্মসূচীর একটা নজিরও তুলে ধরতে পেরেছে । জাতীয় রাজনীতিতেও বিভিন্নভাবে আমাদের সাফল্যের ছাপ পড়েছে। জোট সরকার মানেই যখন অস্হিতিশীল, বিশৃঙ্খল পরিস্হিতি বলে প্রমাণ হচ্ছিলো, তখন এরাজ্যে  বামফ্রন্ট সরকার স্হিতিশীল, শান্তির পরিবেশ এবং জনমুখী উন্নয়নের নজির তৈরি করে গোটা দেশের সামনে একটি উজ্জ্বল ব্যাতিক্রম তুলে ধরেছে ।

শুধু জোট রাজনীতির প্রশ্নেই নয়, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকেও সামনে তুলে এনেছিল বামফ্রন্ট সরকারই। আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং একেবারে নিচুতলায় অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটানোর ক্ষেত্রে  পশ্চিমবঙ্গ গোটা দেশের সামনের সারিতে।  একথা আজ সকলেরই জানা যে এরাজ্যের ত্রিস্তর পঞ্চায়েতী ব্যবস্হাকে মডেল করেই গোটা দেশে তা রূপায়ণের জন্য আইন তৈরি করা হয়েছে। ভূমি সংস্কার, কৃষি ও গ্রামোন্নয়নের ক্ষেত্রেও এই সরকারের সাফল্য সর্বজনস্বীকৃত। পাশাপাশি, গণতান্ত্রিক পরিবেশ, শান্তি-সুস্হিতি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিরবছ্ছিন্নভাবে বজায় রাখার ক্ষেত্রেও দেশের সামনে এরাজ্য উদাহরণ।

১৯৭৭ সালের ২১শে জুন, সরকারে আসার প্রথম দিনই আমরা ঘোষণা করেছিলাম, শুধু মহাকরণ থেকে এই বামফ্রন্ট সরকার চলবে না। আমরা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করবো। পঞ্চায়েত এবং পৌরসভার মাধ্যমে সেই কাজও  করা  হয়েছে। আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করে আমরা গ্রামের গরিব মানুষের হাতে ক্ষমতা পৌঁছে দিয়েছি। বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হওয়ার এক বছরের মধ্যেই  ১৯৭৮ সালে প্রথম পঞ্চায়েত নির্বাচন হয়। সেবছর ভয়াবহ বন‌্যার ত্রাণ ও পুনর্গঠনে পঞ্চায়েতের মাধ্যমে যে অসাধারণ কাজ হয়েছিল, তাতেই মানুষ বুঝেছিলেন এই ব্যবস্হা আমাদের প্রয়োজন। তখনই শুরু হয় জমি বিলি, অপারেশন বর্গা ইত‌্যাদির কাজ। শুনলাম, এবারে পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে আমাদের বিরুদ্ধে প্রচার করা হয়েছে, বামফ্রন্ট সরকার নাকি কৃষকের জমি কেড়ে নেবে। এসব ডাহা মিথ‌্যা কথা। এরাজ্যে গ্রামের লক্ষ লক্ষ ভূমিহীন গরিব মানুষকে আমরাই জমি দিয়েছি। এরাজ্যে এপর্যন্ত ১১ লক্ষ  একর জমি বিলি হয়েছে, এখনও বিলির কাজ চলছে। এই জমি পেয়েছেন ২৯ লক্ষ ৮১ হাজার ভূমিহীন ক্ষেতমজুর, গরিব কৃষক। সারা দেশে মোট জমি বিলির ২২ শতাংশই এরাজ্যে হয়েছে, মোট উপকৃতের ৫৪ শতাংশও এরাজ্যেই। জোতদার-জমিদারদের স্বার্থে এই কংগ্রেস দলই সেই সময় একাজে বাধা দিয়েছিল, অনেক মামলাও করেছিল। কিন্তু আমরা পিছু হঠিনি। অপারেশন বর্গার মাধ্যমে বর্গাদারদের নাম নথিভুক্ত করে তাঁদের জীবিকার নিরাপত্তাও দেওয়া হয়েছে।

কৃষিতেও আমরা অনেক সাফল্য পেয়েছি, খাদ্যে স্বনির্ভর হয়েছি। সারা দেশে কৃষি উৎপাদনে আমরাই শীর্ষে। কিন্তু কৃষিক্ষেত্রে আরো উন্নতির সুযোগ রয়েছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহায্য নিয়ে আমাদের কৃষির মান আরো উন্নত করতে হবে। কৃষিতে উন্নততর প্রযুক্তির প্রয়োগ, অকৃষি জমিকে চাষযোগ্য করা, একফসলী জমিকে বহুফসলী করা, উচ্চ ফলনশীল বীজের ব্যবহার বাড়ানো, ফসলের বৈচিত্র্যকরণ প্রভৃতি কাজ আমাদের করতে হবে ।

শিল্পেও আমাদের এগোতে হবে। সপ্তম বামফ্রন্ট সরকার সেই লক্ষ্যে পদক্ষেপ নিয়েছে। শিল্পবিকাশের প্রশ্নেও আমরা বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই কাজ করছি। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গ আর্থিক ও অন্যান্য ক্ষেত্রে কেন্দ্রের চরম বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হয়েছে।  ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার তৈরি হওয়ার পরে কেন্দ্রের এইসব বাধা অতিক্রম করেই আমরা শিল্পস্হাপনের নীতি নিই। নয়ের দশকের গোড়ায় যখন মাসুল সমীকরণ নীতি ও লাইসেন্স প্রথা তুলে নেওয়া হলো, তখন আমাদের সামনে আরও সুযোগ এলো। আমরা যখন বণিকসভাগুলিতে গিয়ে এরাজ্যে বিনিয়োগের আবেদন জানাচ্ছিলাম, তখন তাঁরা আমাদের বললেন, আপনারা যে নীতির ভিত্তিতে এখানে শিল্প গড়ার কথা বলছেন, সেটা লিখিতভাবে দিলে সুবিধা হয়। তখন ১৯৯৪ সালে আমরা বিধানসভায় বর্তমান শিল্পনীতি ঘোষণা করি। সেই নীতি অনুসারেই সরকার কাজ করছে।

কিছুদিন আগে রাজ্যে সপ্তম পঞ্চায়েত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। নির্বাচনে আমাদের ফল কিছুটা খারাপ হয়েছে। অনেক মানুষ আমাদের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। কেন তাঁরা আমাদের বিরুদ্ধে গেলেন তা খুঁজে বের করতে হবে। পর্যালোচনার সেই কাজ এখন জেলায় জেলায় চলছে।  তবে এবারে আমাদের বিরুদ্ধে যে একটা সুবিধাবাদী মহাজোট হয়েছিল, সেটা এই ফলাফলে বোঝা গেলো।  চরম দক্ষিণপন্হী শক্তির সঙ্গে যারা নিজেদের বামপন্হী বলে, তারাও আমাদের বিরুদ্ধে একজোট হয়েছিল। আর অস্ত্র নিয়ে যারা আমাদের পার্টির নেতা-কর্মীদের খুন করছে, তারাও এদের সাহায্য করছে। এটা অত্যন্ত দূর্ভাগ্যজনক যে কংগ্রেসও খোলাখুলি বলেছে এদের ভোট দিতে। এমন একটা জোট, যার কোনও নীতি-নৈতিকতা নেই, কোনও কর্মসূচী নেই, খালি বামফ্রন্ট এবং বিশেষকরে সি পি আই (এম) বিরোধিতাই যার একমাত্র লক্ষ্য। আমাদের বিরুদ্ধে অসম্ভব মাত্রায় মিথ‌্যা প্রচার ও কুৎসাও হয়েছে গত এক-দেড়বছর ধরে। এই অপপ্রচার কিছু মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পেরেছে।   

তাছাড়া এবারে বামফ্রন্টে আমাদের পুরো ঐক্য হয়নি। কিন্তু এটাও ঠিক যে গতবারেও বামফ্রন্টে আমরা সার্বিক ঐক্য করতে পারিনি। তিনটি স্তরেই অনেক জায়গায় বিরোধ ছিল। গতবার ফরওয়ার্ড ব্লক ও আর এস পি-র সঙ্গে বেশ কিছু জায়গায় ঐক্য হয়নি, প্রায় ১০ হাজার আসনে। যাতে সার্বিক ঐক্য হয়, তার জন্য খুবই চেষ্টা করা হয়েছিল আমাদের পার্টির পক্ষ থেকে। এবারেও আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে ইশতেহার প্রকাশ করেছি। আমরা চেষ্টা করেছি যতখানি সম্ভব বেশি আসনে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করতে। আমাদের পার্টির কথা বলতে পারি, আমরা আগেও ত‌্যাগ স্বীকার করেছি, এখনও রাজি আছি। আমরা এবারেও অনেক আসন ছেড়ে ঐক্য করার চেষ্টা করেছি। আমাদের সকলকেই এর থেকে শিক্ষা নিতে হবে। আমাদের পার্টি, ফরওয়ার্ড ব্লক, আর এস পি, সকলকেই। বামফ্রন্টের ঐক্যকে যাতে আরো দৃঢ় করতে পারি, তার জন্য আমাদের সকলকে উদ্যোগ নিতে হবে। আমার কথা হলো, আমরা এরাজ্যে বামফ্রন্টের যে নজির সৃষ্টি করেছি, তার উদাহরণ গোটা দেশে কোথাও নেই। একে রক্ষা করতে হবে।

আমার বিশ্বাস আছে, রাজ্যের মানুষ কখনই কোনও সুবিধাবাদী জোট বা সুবিধাবাদী দলকে মেনে নেবেন না। পশ্চিমবঙ্গের মানুষের চেতনা আছে, তাঁরা  অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে উপলব্ধি করেছেন কে শত্রু, কে মিত্র।  আমি শুধু একটা কথাই বলবো, মানুষের ওপরে আমরা যেন বিশ্বাস না হারাই। মানুষের কাছে বারবার যেতে হবে, ত‌াঁদের ভালোবাসা আমাদের পেতে হবে। পঞ্চায়েত নির্বাচনে আমাদের বিরুদ্ধে যারা চলে গেছেন তাঁদেরকে আবার আমাদের দিকে টেনে আনতে হবে। শুধু তাঁদেরকেই নয়, আরো নতুন নতুন মানুষকেও টেনে আনতে হবে। পাশাপাশি নিজেদের যে ভুল আছে তাও শুধরে নিতে হবে।

একটা জটিল রাজনৈতিক অবস্থার মধ্যে দিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি। আমাদের এটাও মনে রাখা দরকার,পশ্চিমবঙ্গ,‍ কেরালা, ত্রিপুরায় আমরা যে বাম সরকারগুলি চালাচ্ছি তা এই বুর্জোয়া সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই। আমরা এই পুঁজিবাদী সাংবিধানিক কাঠামোতে কখনও বলতে পারি না, এই সরকারগুলি সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচী রূপায়ণ করবে। সাম্যবাদ, সমাজতন্ত্র আমাদের লক্ষ্য; শ্রেণীহীন, শোষণহীন সমাজব্যবস্থা আমরা গড়তে চাই।  সেটা আমাদের লক্ষ্য।  সেই লক্ষ্যে আমাদের পৌঁছোতে হবে।  

২১শে জুন, ২০০৮, গণশক্তি

Published in: on জুন 30, 2010 at 4:42 অপরাহ্ন  মন্তব্য করুন  

ইতিহাস গড়েছেন পশ্চিমবাংলার মানুষ

(নিরুপম সেন-এর লেখা ‘বিকল্পের সন্ধানে’ বইয়ের ভূমিকা)

পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রণ্ট সরকার তিরিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে বারবার এরাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের রায়ে নির্বাচিত হয়ে আসছে। শুধু ভারতেই নয়, সারা পৃথিবীর সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসেও এটা একটা নজিরবিহীন ঘটনা। এজন্য কৃতিত্ব প্রাপ্য এরাজ্যের সচেতন, সংগ্রামী মানুষের।

আমরা যে কখনও সরকার গঠন করতে পারবো, আর সেই সরকার যে এতদিন টিঁকবে, তা আগে কখনো ভাবতেও পারিনি। ১৯৫৭ সালে কেরালায় যখন প্রথম কমিউনিস্ট সরকার গঠিত হলো, তখনও আমাদের সামনে অতটা পরিষ্কার ধারণা ছিল না যে এই পূঁজিবাদী সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে একটি অঙ্গরাজ্যে কমিউনিস্টরা সরকার গঠন করলে কী করা সম্ভব, কতখানি করা সম্ভব। সেসব আমরা পরে ভেবেছি। ১৯৬৪ সালে সি পি আই (এম) যখন গঠিত হলো, তখন পার্টি কর্মসূচীতে আমরা বললাম, এরকম সরকারে গেলে সমাজব্যবস্থার খুব বড় কিছু অদল-বদল হয়তো আমরা করতে পারবো না। কিন্তু এই সংবিধানে যে অধিকার দেওয়া আছে, তাকে কাজে লাগাতে হবে। মানুষের স্বার্থে এই সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার আমাদের করতে হবে। মানুষকে কিছু রিলিফ আমরা নিশ্চয়ই দিতে পারবো এইসব সরকারকে ব্যবহার করে। পার্টি কর্মসূচী সময়োপযোগী করা হলে আমরা বলেছি, সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে এই সরকারগুলি বিকল্প নীতি তুলে ধরবে ও প্রয়োগ করার চেষ্টা করবে।

অবশ্য পশ্চিমবঙ্গে রিলিফের থেকে বেশি কিছুই আমরা মানুষকে দিতে পেরেছি। এটা ঠিকই, আমাদের লক্ষ্য হলো শ্রেণীহীন, শোষনহীন সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা। কিন্তু সেকাজ এখনও অনেক বাকি। তাই এখনকার যা কাজ, তা এখনই করতে হবে।  আজ এটা প্রতিষ্ঠিত, এই সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার মানুষের স্বার্থে অনেক কাজ করতে পেরেছে। আমরা যে এতদিন সরকারে রয়েছি, তা মানুষের ইতিবাচক রায়েই রয়েছি। পাশাপাশি, বামফ্রন্ট সরকার গোটা দেশের সামনে মানুষের স্বার্থে বিকল্প কর্মসূচীর একটা নজির তুলে ধরতে পেরেছে। জাতীয় রাজনীতিতে বিভিন্নভাবে আমাদের সাফল্যের ছাপ পড়েছে।     

 দেশ এখন জোট রাজনীতির যুগে প্রবেশ করেছে। পশ্চিমবঙ্গে একটানা ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ৯ দলের একটি দৃঢ় জোট হিসাবে বামফ্রন্ট সরকারের প্রভাব এক্ষেত্রে অস্বীকার করা যায় না। কারণ জোট সরকার মানেই যখন অস্থিতিশীল, বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বলে প্রমাণ হচ্ছিলো, তখন এরাজ্যে এই জোট স্থিতিশীল, শান্তির পরিবেশ এবং জনমুখী উন্নয়নের নজির তৈরি করে গোটা দেশের সামনে একটি উজ্জ্বল ব্যাতিক্রম তুলে ধরেছে। শুধু জোট রাজনীতির প্রশ্নই নয়, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকেও সামনে তুলে এনেছিল বামফ্রন্ট সরকারই। আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং তৃণমূলস্তরে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটানোর ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ গোটা দেশের সামনে মডেল হিসাবে স্বীকৃত। একথা আজ সকলেরই জানা যে এরাজ্যের ত্রিস্তর পঞ্চায়েতী ব্যবস্থাকে অনুকরণ করেই গোটা দেশে তা রূপায়ণের জন্য আইন তৈরি করা হয়েছে। ভূমি সংস্কার, কৃষি ও গ্রামোন্নয়নের ক্ষেত্রেও এই সরকারের সাফল্য সর্বজনস্বীকৃত। পাশাপাশি, গণতান্ত্রিক পরিবেশ, শান্তি-সুস্থিতি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিরবচ্ছিন্নভাবে বজায় ক্ষেত্রেও দেশের সামনে এরাজ্য উদাহরণ ।

শিল্পবিকাশের প্রশ্নেও আমরা বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই কাজ করছি । স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গ আর্থিক ও অন্যান্য ক্ষেত্রে কেন্দ্রের চরম বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হয়েছে । ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার তৈরি হওয়ার পরে কেন্দ্রের এইসব বাধা অতিক্রম করেই আমরা শিল্পস্হাপনের নীতি নিই। নয়ের দশকের গোড়ায় যখন মাসুল সমীকরণ নীতি ও লাইসেন্স প্রথা তুলে নেওয়া হলো, তখন আমাদের সামনে আরও সুযোগ এলো। আমরা যখন বণিকসভাগুলিতে গিয়ে এরাজ্যে বিনিয়োগের আবেদন জানাচ্ছিলাম, তখন তারা আমাদের বললেন, আপনারা যে নীতির ভিত্তিতে এখানে শিল্প গড়ার কথা বলছেন, সেটা লিখিতভাবে দিলে সুবিধা হয় । তখন ১৯৯৪ সালে আমরা বিধানসভায় বর্তমান শিল্পনীতি ঘোষণা করি। পরে ১৯৯৫ সালে চন্ডীগড়ে অনুষ্ঠিত আমাদের পার্টির পঞ্চদশ কংগ্রেসেও এটা অনুমোদিত হয়েছে।

শিল্পনীতিতে সুস্পষ্টভাবেই আমরা বলেছিলাম, প্রয়োজনে বিদেশী বিনিয়োগও আমাদের নিতে হবে। কিন্তু তা অবশ্যই হবে পারস্পরিক উপযোগিতার ভিত্তিতে। গত পার্টি কংগ্রেসেও আমরা বলেছি, সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ(এফ ডি আই) নিতে হবে উন্নততর প্রযুক্তি, বাড়তি উৎপাদনশীলতা এবং অতিরিক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, এমন ক্ষেত্রেই। সপ্তম বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হওয়ার পর এই নীতির ভিত্তিতেই কৃষির সাফল্যকে সংহত করে ব্যাপকভাবে শিল্পায়নের কর্মসূচী নিয়েছে। বামফ্রন্টের নির্বাচনী ইশ্‌তেহারেই একথা আমরা বলেছিলাম। অথচ, এখন এ নিয়ে বিতর্ক তুলছে বিরোধীরা। কিন্তু রাজ্যের উন্নয়নের স্বার্থে, বেকার ছেলে-মেয়েদের কাজের সুযোগ বাড়ানোর জন্যই একাজ আমাদের করতে হবে। আমাদের ভালো কাজে বিরোধীরা সমর্থন করবে না কেন। শিল্প  আমাদের করতে হবেই। পাশাপাশি, শিল্পের উন্নয়নের সঙ্গে আমাদের রাজ্যে কৃষিক্ষেত্রেও অনেক উন্নতির সুযোগ রয়েছে। কৃষিতে উন্নততর প্রযুক্তির প্রয়োগ, অকৃষি জমিকে চাষযোগ্য করা, একফসলী জমিকে বহুফসলী করা, উচ্চ ফলনশীল বীজের ব্যবহার বাড়ানো, ফসলের বৈচিত্র্যকরণ প্রভৃতি কাজ আমাদের করতে হবে।

পশ্চিমবঙ্গের সাথে কেরালা এবং ত্রিপুরাতেও আমাদের পার্টির নেতৃত্বে পরিচালিত সরকারগুলি বিকল্প দিশা দেখাতে সক্ষম হয়েছে।  প্রতিটি ক্ষেত্রেই সরকারের মূল কর্মসূচীগুলি আমাদের পার্টিতে, পার্টি কংগ্রেসে অথবা পার্টি পলিট ব্যুরোতে অনুমোদন করেই আমরা রূপায়ণ করেছি। কিন্তু আমার কথা হলো, পার্টি সংগঠনের ক্ষেত্রে আমাদের এই সাফল্যের প্রতিফলন গোটা দেশে যেভাবে হওয়া উচিত ছিল, তা হয়নি। সি পি আই (এম)-র অষ্টাদশ কংগ্রেসে এবিষয়ে আমরা আলোচনা করেছি এবং নিজস্ব উদ্যোগের পাশাপাশি অন্যান্য বামপন্থী ও গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলির সঙ্গে, অন্যদিকে ট্রেড ইউনিয়ন ও গণসংগঠনগুলি মিলে এই সময়ে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তোলা হয়েছে। আগামী মার্চ মাসে পার্টির উনিশতম কংগ্রেসে আমরা তার পর্যালোচনা করবো। 

 কমরেড নিরুপম সেন এরাজ্যে বামফ্রন্ট সরকার যে জনমুখী বিকল্প অভিমুখ নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে, এই পুস্তকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তার তাত্ত্বিক ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ করেছেন। এরকম একটি বই খুবই জরুরী ছিল। পার্টির নেতা-কর্মীরা তো বটেই, বামফ্রন্ট সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে যারা জানতে চান, তারাও এরফলে উপকৃত হবেন। ইংরাজিতে অথবা অন্যান্য ভাষাতেও এবিষয়ে বই প্রকাশ করা প্রয়োজন, যাতে দেশের এবং বিদেশের মানুষও জানতে পারেন কিভাবে আমরা এই নজির গড়ে তুলতে পারলাম, জনগণের এই দূর্গ অব্যাহত রাখতে পারলাম। বইটির ব্যাপক প্রচার হবে, আশা রাখছি।             

 জ্যোতি বসু

২৫শে ডিসেম্বর, ২০০৭                                                                              

Published in: on জুন 30, 2010 at 4:29 অপরাহ্ন  মন্তব্য করুন  

মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে বামফ্রন্ট সরকারঃ জ্যোতি বসু

পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের কার্যকালের মেয়াদ পাঁচ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। এই সরকারের কার্যধারা পরিচালনার ক্ষেত্রে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র কর্মসূচী সম্পর্কে আমাদের উপলদ্ধির প্রতিফলন রয়েছে। দেশের বিভিন্ন রাজ্যে এই ধরনের সরকার গঠনের সম্ভাবনার কথা পার্টির কর্মসূচীতে বলা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে কর্মসূচীর ১১২নং অনুচ্ছেদ স্মরণ করা যেতে পারে।

পার্টির কর্মসূচী

১১২নং অনুচ্ছেদে তিনটি প্রধান বক্তব্য রাখা হয়েছে। প্রথমত বলা হয়েছে, ভারতীয় রাষ্ট্রের পুঁজিবাদী-সামন্ততান্ত্রিক শ্রেণী চরিত্র সত্ত্বেও বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তির পক্ষে গণ-আন্দোলনের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিভিন্ন রাজ্যে সরকার গঠন করা সম্ভব। দ্বিতীয়ত, এই ধরনের সরকার যদিও বর্তমান সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে কোন মৌলিক পরিবর্তন সাধনে সক্ষম হবে না, তথাপি এমন কিছু সংস্কারমূলক কাজের উদ্যোগ নিতে ও সেগুলি রূপায়িত করতে পারে। যার ফলে জনগণের জীবনযাত্রার মানের কিছুটা উন্নতি সম্ভব এবং আরো উন্নত ভবিষ্যতের জন্য জনগণের সংগ্রামে সেই কার্যধারা নিশ্চিতভাবেই সহায়কশক্তি হিসাবে কাজ করে যেতে পারে। তৃতীয়ত এই ধরনের সরকারের কর্মসূচী রূপায়ণের অভিজ্ঞতা থেকে জনগণ পুঁজিবাদী জমিদারী ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠেন ও এই রকম ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করতে গিয়ে একটি রাজ্যের বামপন্থী সরকার কী ধরনের চরম বাধা ও সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হয় সে বিষয়ে শিক্ষালাভ করার প্রভূত সুযোগ পান। পরিস্থিতি সম্পর্কে যথার্থ ধারণা জন্মালেই জনগণ মৌলিক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে নিশ্চিত প্রত্যয়ে পৌঁছবেন এবং তখনই বাঞ্ছিত পরিবর্তনের জন্য শ্রেণীশক্তিকে সংহত করে তোলা সম্ভব হয়ে উঠবে।

বাধা

দলীয় কর্মসূচীর উপরোক্ত ধারাগুলির দ্বারা নির্দেশিত হয়ে এবং পশ্চিমবঙ্গের ১৯৬৭ ও ১৯৬৯-৭০ সালের স্বল্পস্থায়ী দুটি যুক্তফ্রন্ট সরকারের আমলে অর্জিত অভিজ্ঞতার দ্বারা পুষ্ট হয়ে ১৯৭৭ সালের জুন মাস থেকে আমরা বামফ্রন্ট সরকারে কাজ করে চলেছি। এই সময়ের মধ্যে রাজ্যের জনগণের বিপুল অংশের অনুকূলে বেশ কিছু পরিবর্তন সাধনে আমরা সমর্থ হয়েছি। এবং সঙ্গে সঙ্গে সরকার পরিচালনা করার অভিজ্ঞতা থেকে আমরা এও বু‍‌ঝেছি যে আমাদের ক্ষমতা অত্যন্ত সীমাবদ্ধ এবং আমাদের কর্মসূচী রূপায়ণের পথে বিপুল বাধা রয়েছে।

পুঁজিবাদী-জমিদারী ব্যবস্থাই যে একটি বামফ্রন্ট সরকারের কর্মসূচী রূপায়ণের পক্ষে মূল বাধা সে সম্পর্কে আমরা অবহিত। তারই পাশাপা‍শি অন্যান্য বাধাগুলিও লক্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, আমাদের সংবিধানে যেভাবে কেন্দ্র ও রাজ্যের আইন-প্রণয়ন ক্ষমতার সীমানা বেঁধে দেওয়া হয়েছে তারই দৃষ্টান্ত ধরা যেতে পারে। কেন্দ্র ও রাজ্যের ক্ষমতা বিন্যাস প্রসঙ্গ ছাড়াও সংবিধানের সে সব ধারাও কম আপত্তিকর নয় যেগুলি কেন্দ্রকে রাজ্যের এক্তিয়ারভুক্ত বিষয়গুলিতেও নাক গলাবার অধিকার দিয়েছে। রাজ্য আইনসভা কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন আইনে রাষ্ট্রপতির সম্মতির সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কথা এখানে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখতে পাচ্ছি, ভূমি, শ্রম, শিক্ষা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বিধানসভায় প্রণীত আইনগুলি রাষ্ট্রপতির সম্মতির অপেক্ষায় আটকে পড়ে আছে। সংবিধানের রাজ্য তালিকার তাৎপর্য তাহলে কোথায় যদি কেন্দ্র রাজ্য-বিধানসভায় অনুমোদিত আইনগুলিকে বলবৎ করতে এভাবে বিলম্ব ঘটায় অথবা সেগুলির প্রয়োগই করতে না দেয়? আমরা মনে করি এ ধরনের সরকার কর্তৃক সংগঠিত সংস্কারসমূহ জনগণের পক্ষে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানের পুঁজিবাদী-জমিদারী সামাজিক কাঠামোর এই সংস্কারগুলি যে শেষ কথা নয় এ বিষয়ে অবশ্য সম্যক উপলব্ধি দরকার। কায়েমী স্বার্থের বিরুদ্ধে খেটে-খাওয়া মানুষের সংগ্রামে বামপন্থী সরকারের সমর্থন নিশ্চিতভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। সরকার ও পার্টির অবিরাম উদ্দেশ্য হলো বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহকে মজবুত করা এবং রাজ্যের জনগণকে তাঁদের অর্জিত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এভাবে সচেতন করে তোলা যাতে তাঁরা অনুধাবন করতে পারেন যে শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের উন্নতিতেই তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা সীমাবদ্ধ নয়। তাঁরা সারা ভারতবর্ষের সংগ্রামী মানুষকে সাহায্য করছেন তাঁদের বলিষ্ঠ দৃষ্টান্তের মাধ্যমে। এই ধরনের সরকার স্বৈরতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেই শুধুমাত্র জনগণকে সাহায্য করে না, পুঁজিবাদী জমিদারী বন্ধন থেকে মুক্তির জন্য মানুষের চূড়ান্ত সংগ্রামে সহায়ক হয়।

একটি রাজ্যের বামপন্থী সরকারকে এমনভাবে কাজ করতে হয় যাতে বোঝা যায় যে এই সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি কায়েমী স্বার্থের পরিপোষক কোনো সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। জনগণ তখন বামপন্থী সরকারের নীতি ও কর্মসূচীর সঙ্গে ধনিক ও ভূস্বামীশ্রেণীর প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারগুলির কার্যকলাপের তুলনা করতে সক্ষম হন। আমাদের বামফ্রন্ট সকারের কর্মসূচী রূপায়ণের ক্ষেত্রে এবং কার্যধারার মধ্যে যে ভিন্ন ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি বিরাজ করে এবং সেই দৃষ্টিভঙ্গি যে উচ্চতর মানের এবিষয়ে রাজ্যের তথা অন্য রাজ্যের মানুষও বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন। আর জনগণের এই বিশ্বাসের প্রবর্তনার মধ্যেই আমাদের কাজের যথার্থ সাফল্য। বর্তমানের নানান সীমাবদ্ধতা ও বাধা সত্ত্বেও জনগণের আস্থা আমাদের সম্বন্ধে যত দৃঢ় হবে ততই তাঁদের রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়বে এবং এই সব সীমাবদ্ধতা ও বাধা অপসারণের জরুরী প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তাঁরা সজাগ হবেন। এ ধরনের একটা পরিস্থিতি অন্য রাজ্যের সাধারণ মানুষের চেতনা বৃদ্ধিতে খুবই সহায়ক হবে এবং সমাজ-কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তনের প্রয়োজনকে দ্রুততর করবে। এমন অবস্থা যদি না আসে তাহলে আমাদের পার্টির কর্মসূচীর পরিপ্রেক্ষিতে কোনো বামফ্রন্ট সরকারের প্রতিষ্ঠা ও কার্যক্রমের যৌক্তিকতা থাকে না।

বামফ্রন্ট সরকার ও গণ-সংগঠন

বামফ্রন্টের ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে গণ-সংগঠনগুলির কাজের রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতও পালটে গেছে। কংগ্রেসী আমলে জনগণের বিভিন্ন অংশের দাবি-দাওয়া পূরণের জন্য এই সব গণ-সংগঠনের তরফে নানা ধরনের আন্দোলনের ও প্রচারাভিযানের প্রয়োজন হতো। তখন বিশেষ কিছু ধরনের আন্দোলন অনিবার্য হয়ে পড়েছিল যেহেতু এরকম ধারণা দৃঢ় ছিল যে তদানীন্তন সরকার জনগণের দাবি সম্পর্কে সহানুভূতিশীল নয় এবং ধারাবাহিক আন্দোলন ছাড়া দাবি আদায়ে তাদের মোটেই সম্মত করা যাবে না। সঙ্গে সঙ্গে এটাও ভাবা হয়েছিল যে প্রশাসন ও পুলিসের পক্ষে কী জোতজমির ক্ষেত্রে, কী শিল্প ব্যবসার ক্ষেত্রে কায়েমী স্বার্থের অনুকূলেই হস্তক্ষেপ করা হবে। তখনকার পরিস্থিতিতে গণ-সংগঠনের কাজের সাফল্য নিরূপিত হতো ধর্মঘটের সময়ে তারা কতগুলি শ্রম দিবস নষ্ট করতে সমর্থ হয়েছে তার ভিত্তিতে।

পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অতীত আমলের সঙ্গত ধারণা ও আন্দোলনের প্রকৃতি পালটে গেছে। বর্তমানে এই রাজ্যে শোষিত শ্রমিকশ্রেণীর প্রতি দরদী একটি সরকার ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত আছে। সরকারী সমর্থন পিছনে থাকার জন্য এবং শ্রমজীবী মানুষ সংগঠিত থাকার দরুন এখন জনগণের বিভিন্ন অংশের অনুকূলে এবং কায়েমী স্বার্থের বিরুদ্ধে বহু বিরোধের নিষ্পত্তি সম্ভব হচ্ছে। ধর্মঘট বা অন্যান্য সে ধরনের সংগ্রামের পথে সব সময়ে যেতে হচ্ছে না। কায়েমী স্বার্থের লোকেরাও একথা বুঝেছেন যে বর্তমান সরকার শোষিত মানুষের সমর্থনপুষ্ট হয়েই ক্ষমতায় এসেছে এবং তাঁদের স্বার্থ দেখে চলেছে। সুতরাং সরকারী যন্ত্রকে আর এমনভাবে ব্যবহার করা হবে না যাতে কায়েমী স্বার্থের মুখের দিকে তাকিয়ে শোষিত মানুষের স্বার্থ জলাঞ্জলি দেওয়া হয়। বিরোধের মীমাংসার সময়ে সরকারের পুরোপুরি সমর্থন শ্রমিকশ্রেণীর ন্যায়সঙ্গত দাবির পিছনেই থাকছে।

এই নতুন পরিস্থিতিতে শ্রেণী সংঘর্ষের তীব্রতা অথবা প্রচারাভিযানের সাফল্য পরিমাপ করার জন্য কেবলমাত্র ক’টি ধর্মঘট সংগঠিত হলো অথবা কতগুলি শ্রম দিবস নষ্ট হলো তার হিসেব নিলে চলে না। এখন দেখতে হবে তাদের দাবি কতটা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বিবেচিত হচ্ছে অথবা আন্দোলনের ফলে তাদের ন্যায্য পাওনা কতটা মেটানো যাচ্ছে। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে, সরকার তাদের পক্ষে থাকার জন্য শ্রমিকশ্রেণী চুক্তির সময়ে নিজেদের শর্ত অধিক মাত্রায় প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছে। একথা শিল্প-বিরোধের ক্ষেত্রে যেমন প্রযোজ্য তেমনি গ্রামাঞ্চলে কৃষি মজুরির ক্ষেত্রেও সমভাবে বলা যায়। সেখানেও অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটেছে। জমি থেকে উৎখাতের ভয় কাটছে। সে ব্যাপারে নিরাপত্তার সূচনা হয়েছে এবং বর্গাদাররা ফসলের ভাগ উচ্চহারে পাচ্ছেন। বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগে এবং দরিদ্র মানুষের অনুকূলে সরকারী হস্তক্ষেপের দরুন শ্রমজীবী সম্প্রদায়ের বেশির ভাগ মানুষ তাদের উপার্জন, চাকরির শর্ত এবং নিরাপত্তা উন্নত করতে পেরেছেন। জনগণের আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়েছে। কিন্তু কায়েমী স্বার্থবাদীদের মধ্যে কিছু কিছু অংশ শ্রমিকশ্রেণীর ন্যায়সঙ্গত ও ন্যূনতম দাবি মেনে নেননি এবং সরকারের পরামর্শও শোনেনি। তার ফলে বিরোধের মীমাংসার পূর্বে কোন কোন ক্ষেত্রে ধর্মঘট অথবা লক-আউট হয়েছে।

নতুন পরিস্থিতির মূল্যায়নগত ত্রুটি থেকে কিন্তু দু’ধরনের বিভ্রান্তি দেখা দিতে পারে। সেই দুই বিভ্রান্তির ফাঁদ থেকে আমাদের দূরে থাকতে হবে। প্রথমত, গণ-সংগঠনের দাবি পূরণের জন্য রাষ্ট্রের আইনগত ও প্রশাসনিক যন্ত্রের উপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করলে চলবে না। দ্বিতীয়ত, মন্ত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগের সূত্রেই সব কাজ সমাধা হয়ে যাবে এরকম ধারণা করাও ভুল। বিগত চার বছরের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বুঝেছি গরিব মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য বিধিগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাদি রূপায়িত করতে গেলে রাষ্ট্রযন্ত্রের উপর অধিক নির্ভরতা ভ্রমাত্মক। শ্রেণী বিভক্ত সমাজে কেবলমাত্র একটি রাজ্যে বামফ্রন্ট সরকার অধিষ্ঠিত হলেই শ্রেণী সংঘর্ষের দিন ফুরিয়ে যায় না। বস্তুত পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও ধারাবাহিক সংগ্রাম ও আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা থাকে। অপারেশন বর্গার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এলাকা ভিত্তিক কৃষক আন্দোলনের জোরের উপর বর্গাদারদের নাম রেকর্ডের সংখ্যাও আনুপাতিক হারে নির্ভর করছে। সাফল্য সেই ভাবেই এসেছে। আবার যেখানে আন্দোলনের ধার দুর্বল, সেখানে সরকারের তরফে যতই শুভেচ্ছা থাক না কেন বর্গাদার ও ভূমিহীন খেতমজুরদের আইনগত ও ন্যায়সঙ্গত অধিকার প্রতিষ্ঠা বা রক্ষা করা যায়নি। যে সব এলাকায় আন্দোলন দৃ‌ঢ় সেখানে তলার থেকে চাপে এবং উপর থেকে সরকারী নির্দেশে ফল লাভ সম্ভব হয়েছে। এমন অনেক দৃষ্টান্ত আছে যেখানে এই বামফ্রন্ট সরকারের আমলেও শ্রমিকশ্রেণীকে পরিচালকবর্গের অনমনীয়তার জন্য সংগ্রামের পথে নামতে হয়েছে। গণ-আন্দোলনের পথ এই সরকার যে পরিহার করেনি, বরং তাকে আরো মদত দিয়ে চলেছে তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ দেখা গেছে গত বছরের (১৯৮০) ২৭শে নভেম্বর ও বর্তমান বছরের (১৯৮১) ১১ই সেপ্টেম্বর দিন দু’টিতে। এই দুই দিনে কেন্দ্রীয় সরকারের বৈষম্যমূলক ও স্বৈরতান্ত্রিক নীতির বিরুদ্ধে বামফ্রন্ট যে সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেয় রাজ্যের বামফ্রন্ট সরকার তাকে সমর্থন জানায়। জনগণকে আমরা আহ্বান জানাই, এখানে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় থাকার পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করে তাঁরা তাঁদের সংগঠনগুলিকে সম্প্রসারিত ও মজবুত করুন এবং তাদের ন্যায্য দাবির সমর্থনে সংগ্রাম চালিয়ে যান। সরকার গণ-সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন আছে।

দ্বিতীয় ধরনের বিভ্রান্তি দেখা দেয় আন্দোলন শুরু করার সময় দু’ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে যদি ভুল হয়। দু’ধরনের পরিস্থিতি হলো যেখানে বামফ্রন্ট সরকার চালাচ্ছে সেখানকার অবস্থা এবং শাসকদল যে জায়গায় সরকারী ক্ষমতায় আসীন সেই  জায়গায় অবস্থা। এই দুই পরিস্থিতির মধ্যে প্রভেদ বুঝতে হবে। এই দুই ধরনের পরিস্থিতিতে আন্দোলনের পদ্ধতি ও প্রকৃতি এবং দাবি-দাওয়ার চরিত্র ভিন্ন রকমের হওয়াই সঙ্গত। যেখানে বামফ্রন্ট সরকারে আছে সেখানে সংগ্রামের হাতিয়ার ধর্মঘটকে বিশেষ করে তখনই ব্যবহার করতে হবে যখন সরকারী প্রচেষ্টা সত্ত্বেও দাবিগুলি আদায় করা সম্ভব হলো না। যেসব দাবি পূরণের জন্য সরকারী বাজেট থেকে সাহায্যের প্রয়োজন হয় সেই সব ক্ষেত্রে সরকারের সীমাবদ্ধ সামর্থ্যের কথা আন্দোলনকারীদের বিচার-বিবেচনা করতে হবে। এবং এমন কোনো দাবি তাঁদের উপস্থিত করা উচিত নয় যা পূরণ করা কঠিন অথবা যা পূরণ করতে সরকারী সহায় সম্পদের উপর খুবই চাপ সৃষ্টি করা হবে। অনেক ক্ষেত্র আছে যেগুলিতে দাবি আদায় হওয়া বেশি দরকার কিন্তু সে ক্ষেত্রগুলিতে আদায় করিয়ে নেওয়ার জন্য তেমন লোক নেই — এইসব ক্ষেত্রগুলির অগ্রাধিকারের বিনিময়ে অন্যেরা যেন তাঁদের দাবির ওপর অধিক গুরুত্ব না দেন। কোনো পরিস্থিতিতেই আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ইউনিয়ন বা গণ-সংগঠনগুলির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার উদ্দেশ্য নিয়ে যেন দাবিগুলি খাড়া না করা হয়। আমি একথা বলছি এই কারণে যে গত চার বছরে কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখেছি দাবি-দাওয়াগুলি তুলে ধরা হয়েছে একশ্রেণীর মানুষের সীমিত ও স্বল্পমেয়াদী চাহিদার কথা মনে রেখে। এ দাবিগুলি পেশ করার সময় রাজ্য সরকারের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং দাবিদ্র্য, অসাম্যের মতো সাধারণ সমস্যার গুরুত্বের কথা বিবেচনা করা হয় না। জনসাধারণের একটি দাবি হলো যখনই কোন ফ্যাক্টরি বা শিল্প প্রতিষ্ঠান পরিচালন কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতার জন্য বা অন্য কোনো কারণে রুগ্‌ণ হয়ে পড়ে তখনই যেন রাজ্য সরকার সেটি অধিগ্রহণ করে। এই ব্যাপারে যেটা প্রায়শই উপলব্ধি করা হয় না সেটি হলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অধিগ্রহণের পর সেই কোম্পানির কাজকর্মের জন্য রাজ্য সরকারের সীমিত বাজেট থেকে প্রচুর পরিমাণে ভরতুকি (সাবসিডি) দিতে হয়। তাছাড়া টাকা-পয়সা যখন সীমিত তখন সরকারী ভরতুকির জন্য বিভিন্ন প্রতিযোগী দাবির মধ্যে বাছাইয়ের প্রশ্ন দেখা দেয় এবং কোন একটি বিষয়ের জন্য ভরতুকি অবশ্যই অন্যান্য বিষয়গুলিকে উপেক্ষা করেই দিতে হয়। সরকারের একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো যে, একটা অগ্রাধিকারের নিয়মের ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রয়োজন মেটানোর ব্যবস্থা করা। এটা করতে হয় একথা স্বীকার করে নিয়েই যে অনেক জরুরী প্রয়োজনই এখুনি মেটানো সম্ভব নয়। গত সাড়ে চার বছরে সরকারী তহবিল থেকে নানারকম বিষয়ের জন্য ভরতুকি দেওয়া হয়েছে যেমন, গরিব চাষীদের জন্য ভূমি রাজস্ব রেহাই, সেচের জলের জন্য সেস-এর হার কমানো, কিছু কিছু দুর্বলতর শ্রেণীর জন্য সস্তাদরে রাসায়নিক সার সরবরাহ, বেকারভাতা প্রদান প্রভৃতি। কিন্তু সে সরকারের কর ধার্য করার ক্ষমতা সংবিধান দ্বারাই সীমিত এবং যে রাজ্যের জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন তার পক্ষে ভরতুকি প্রদানের পরিমাণের একটা সীমা আছে। সুতরাং, রাজ্য পর্যায়ে ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং যাতে জনগণের মৌল সমস্যাগুলির সমাধান করা যায় সেজন্য জাতীয় পর্যায়ে বামপন্থী শক্তিগুলি কর্তৃক ক্ষমতা দখলের প্রয়োজনীয়তা — এইগুলিই আমাদের প্রচারাভিযানের প্রধান বিষয়বস্তু হওয়া উচিত। এমন এক ধরনের প্রচারাভিযান হয়ে থাকে যার দ্বারা জনগণ তাঁদের নিজস্ব গোষ্ঠী স্বার্থের বাইরে আর কিছু দেখতে পান না এবং যার প্রধান উদ্দেশ্যই হলো নিজেদের স্বার্থে আরও বেশি করে অর্থ বরাদ্দের জন্য সরকারী বিভাগগুলির উপর কিছুটা চাপ সৃষ্টি করা। কিন্তু এই ধরনের প্রচারাভিযানের তুলনায় পূর্বোল্লিখিত প্রচারাভিযান জনগণের চেতনার মানকে উন্নীত করতে সাহায্য করে।

অর্থাৎ, আমাদের আন্দোলনের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যগুলি পূরণে সহায়তা করাই বিভিন্ন গণ-সংগঠনগুলির কাজকর্মের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। সমাজের শ্রেণী-সম্পর্কের পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে আরও সচেতন করাও হবে এই গণ-সংগঠনগুলির অন্যতম কাজ। যেসব কাজকর্মের ফলে জনগণের মনে বামফ্রন্টের ভাবমূর্তি ম্লান হতে পারে এবং আমাদের আন্দোলনের সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্যগুলির ক্ষতি হতে পারে সেইসব কাজকর্ম এড়িয়ে চলা উচিত। কেবল আমাদের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কেই নয়, আমাদের বদনাম দেওয়ার জন্য এবং সরকারের পতন ঘটানোর জন্য যেসব ষড়যন্ত্র চলছে সে সম্পর্কেও এইসব গণ-সংগঠনগুলির সদস্যদের সচেতন থাকতে হবে। বামফ্রন্টের শত্রুরা যখন সরকারের সুষ্ঠু কাজকর্মের পথে সর্ব প্রকারের বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করছেন, তখন আমাদের সহযোগী গণ-সংগঠনগুলির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত শত্রুদের এইসব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিয়ে সরকার পরিচালনার বলিষ্ঠ ও গতিশীল চরিত্রকে অব্যাহত রাখতে সাহায্য করা। বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হওয়ার ফলে জনগণের মনে কতকগুলি আশার সৃষ্টি হয়েছে এবং আমরাও একটি ৩৬ দফা কর্মসূচী পালনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, যার মধ্যে বেশিরভাগ কর্মসূচীই ইতোমধ্যে রূপায়িত হয়েছে। সেই জন্যই সরকারের মিত্রদের বিশেষ করে শ্রমিকদের পক্ষে তাঁদের শক্তি ও সংগঠনকে সংহত করে চালনা করা একটি অতি জরুরী ব্যাপার, যাতে আমাদের কাজকর্মের ইতো‌মধ্যেই অর্জিত চমৎকার রেকর্ডের আরও উন্নতি সাধন করা যায়। আমাদের কাজের মধ্যে দিয়ে আমরা জনগণের সেবাও করবো এবং বর্তমান বাধা-বিঘ্নের মধ্যে যতটা সম্ভব তাঁদের সমস্যার মোকাবিলাও করবো। একই সঙ্গে আমরা আমাদের সীমাবদ্ধতা ও বাধা-বিঘ্নের প্রতি তাঁদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবো। তাছাড়াও, জনগণের সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য বৃহত্তর ও দীর্ঘমেয়াদী সংগ্রামের উদ্দেশ্যে প্রস্তুত হওয়ার প্রয়োজনীয়তার প্রতিও আমরা তাঁদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবো। এই দুই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে চলতে হবে একই সঙ্গে এবং তাহলেই‍‌ কেবল আমরা আমাদের বক্তব্য ও নীতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সফল হবো।

গণ-সংগঠনগুলির আর একটি প্রধান কাজ হলো বামফ্রন্টের কৃতিত্বগুলি তুলে ধরা। এটা প্রয়োজন কারণ একথা ভালোভাবেই জানা আছে যে, সংবাদপত্র প্রভৃতি গণ-মাধ্যমের এক শক্তিশালী অংশকে বামফ্রন্টের শত্রুরা সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে অথবা সেগুলি প্রচণ্ডভাবে তাদের প্রভাবাধীন। এর ফলে প্রায়শই আমাদের কৃতিত্ব ও সাফল্যগুলি চেপে দেওয়া হয়। আর তার বদলে বিকৃত ও বিভ্রান্তিকর সব খবর শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয় ভারতের সর্বত্র পরিবেশন করা হয়। বামফ্রন্ট সরকারের প্রতি মিত্রভাবাপন্ন সংগঠনগুলির মাধ্যমে জনগণের মধ্যে প্রচারাভিযান চালিয়ে এতোদিন আমাদের বিরুদ্ধে এইসব বিদ্বেষপরায়ণ অপপ্রচার কার্যকরীভাবে প্রতিহত করা গেছে। ভবিষ্যতেও জনগণের মধ্যে আমাদের কাজের এই বিশেষ দিকটির জরুরী প্রয়োজনীয়তাকে যথাযথ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

বামফ্রন্ট সরকার এবং পার্টি

বামফ্রন্ট সরকারের ভূমিকা পরীক্ষা করার সময় আমাদের একথা ভুললে চলবে না যে, বর্তমান সামন্ততান্ত্রিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় পূর্বোল্লিখিত নানারকম প্রশাসনিক বাধা-বিঘ্নের মধ্যে সরকার সুষ্ঠুভাবে চালনা করার জন্যও পার্টির ভূমিকা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। পার্টি সতর্ক ও পরিপূর্ণভাবে সংহত থাকলে বামফ্রন্টের প্রতিশ্রুতিগুলির এবং সরকারের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থাসমূহের রূপায়ণ সহজতর হয়। অপর পক্ষে যদি এই ভূমিকা যথাযথভাবে উপলব্ধি করা ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করা না হয়, তাহলে ফল বিপরীত হতে পারে এবং একটি সরকার পরিচালনা করা-জনিত আমাদের সুবিধা বরং আমাদের পক্ষে গুরুতর অসুবিধায় পরিণত হতে পারে। সরকার যাতে ঠিক পথে থাকে এবং জনগণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে চলে ও তাদের স্বার্থ যথাযথভাবে রক্ষা করতে সমর্থ হয় সে দায়িত্ব সামগ্রিকভাবে গোটা পার্টির।

নতুন পরিস্থিতিতে আমরা যেখানে সরকারের মধ্যে রয়েছি সেখানে পার্টিকে দুরূহ ও জটিল ভূমিকা পালন করতে হয়। এব্যাপারে আমাদের হাতে কোনো বাঁধাধরা ছক বা নিয়ম কানুন নেই। পার্টি ও সরকারকে নিরন্তর চেষ্টা করতে হবে অনুন্নত শ্রেণীর মধ্যে সেই সব মানুষকে প্রভাবিত করতে, যারা যে কো‍নো কারণেই হোক এখনও আমাদের সঙ্গে নেই। বর্তমান সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পার্টির কর্মীরা সর্বদা সকল রকম দূষণীয় প্রভাব থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে চেষ্টা করবেন। তাঁরা উৎসর্গীকৃত মন নিয়ে ও নম্রতার সঙ্গে কাজ করে যাবেন। আমাদের প্রত্যেককে ধৈর্যশীল হতে হবে এবং কোনোরকম প্ররোচনার শিকার হলে চলবে না। জনগণ আমাদের উপর অধিকতর দায়িত্ব অর্পণ করেছেন এবং তাঁদের বিশ্বাসের মর্যাদা আমাদের রাখতেই হবে। বর্তমানে পার্টির তরফে কেবল যে সর্ব পর্যায়ে সরকারের সর্বনিম্ন কর্মসূচী রূপায়ণে এবং এর বিরুদ্ধে সমস্ত ষড়যন্ত্রের মোকাবিলায় সাহায্য করা দরকার তাই নয়, উপরন্তু একই সঙ্গে সরকারে আমাদের অংশগ্রহণের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটটিকেও তুলে ধরা প্রয়োজন। জনগণের রাজনৈতিক চেতনা ও উপলব্ধি যাতে আরও উন্নীত হয় এবং বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণের মাধ্যমে তাদের এই কর্মসূচীতে ব্যাপক অংশগ্রহণ ও জড়িত হওয়া যাতে সুনিশ্চিত হয় সেই ব্যবস্থাও পার্টিকে করতে হয়। একথা মুহূর্তের জন্যেও ভুললে চলবে না যে সরকার চালানো বা কিছু সংস্কার সাধন করাটা প্রকৃত লক্ষ্য নয়। এর মধ্যে দিয়ে আমরা আমাদের দীর্ঘমেয়াদী উদ্দেশ্য সম্পর্কে জনগণকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তুলতে চাই। এই সমস্ত কারণের জন্যই আমরা পার্টি এবং গণ-সংগঠনগুলিকে শক্তিশালী করার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীয়তার উপর ক্রমাগত জোর দি‍‌য়ে থাকি।

বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যাপারে জনগণকে পরিচালিত করে এবং প্রয়োজন মতো ঐক্যবদ্ধ গণ-সংগ্রাম গড়ে তুলে পার্টি সংগঠন সরকারের এযাবৎ অগ্রগতিতে যথেষ্ট অবদান রেখেছে। কিন্তু তবুও কিছু দুর্বলতা রয়েই গেছে এবং এই সব দুর্বলতা অতিক্রম করার জন্য আমাদের এখনও অনেক দূর অগ্রসর হতে হবে। জনগণকে আদর্শগত ও রাজনীতিগতভাবে উদ্বুব্ধ করার জন্যে ক্রমাগত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। পার্টিকর্মীরা বামফ্রন্টের কর্মসূচী রূপায়ণের কাজেই বা কতটা জড়িত হবে আর পার্টি গঠন এবং শ্রেণী সংগ্রামের প্রয়োজনে শ্রেণী সংগঠন গড়ে তোলা — এই কাজেই বা কতটা নিয়োজিত হবে সে বিষয়ে প্রায়ই বৃথা তর্কবিতর্ক হয়। যেন এই দুটি উদ্দেশ্য পরস্পর-বিরোধী। নতুন পরিস্থিতিতে পার্টির ভূমিকা সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণার ফলে দক্ষিণপন্থী ও বামপন্থী উভয় ধরনেরই বিচ্যুতি ঘটেছে। আমাদের যে কথা ভালোভাবে মনে রাখতে হবে সেটা হলো যে সরকারে আমাদের অংশগ্রহণের ফলে পার্টির কাজ খুবই জটিল ও বিচিত্র ধরনের হয়ে দাঁড়িয়েছে। পূর্বোক্ত ঐ দুটি কর্তব্যকে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে এবং এর একটিকে আর একটি থেকে পৃথক করা যাবে না।

একথা সত্য যে, বাস্তব কর্মসম্পাদনের পর্যায়ে প্রধান প্রধান কর্মীদের ঐ উভয় ধরনের কাজেরই ভার বহন করতে হয়, যার ফলে কোনটাই ভালোভাবে সম্পন্ন করা যায় না। এই সমস্যা সমাধানের জন্য কর্মী ও নেতাদের মধ্যে কাজ ও দায়িত্ব ভাগাভাগি করে দেওয়া প্রয়োজন হয়েছে এবং বহু সংখ্যক কর্মীর প্রশিক্ষণ জরুরী হয়ে পড়েছে। এই কাজ সম্প্রতি হাতে নেওয়া হয়েছে। তবে সাংগঠনিক কারণে প্রয়োজনীয় এই কর্ম বিভাজনের সঙ্গে সঙ্গে পূর্বোক্ত দুই উদ্দেশ্যের মধ্যে যে মূলগত ঐক্য রয়েছে সেটা কিন্তু আমাদের ভুললে চলবে না। একই লক্ষ্য অর্জনের জন্যই যে পার্টিকে এই উভয় দুটি কাজ করতে হয় সেটা সব সময় ভালোভাবে উপলব্ধি করা হয় না। কেবল যে সরকারের কাজকর্ম পরিচালনা পার্টি সংগঠনের ভূমিকার উপর দারুণভাবে নির্ভরশীল তাই নয়, একই সঙ্গে সরকারের মাধ্যমে আমাদের কাজকর্ম এমন অবস্থার সৃষ্টি করে যা পার্টি ও গণ-সংগঠন গড়ে তোলার পক্ষে অনুকূল। কর্মসূচী রূপায়ণে সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা, মেহনতী ও শোষিত মানুষের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন এবং রাজ্যের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও একটি গণতান্ত্রিক সুস্থ আবহাওয়া বজায় রাখার ব্যাপারে চমৎকার রেকর্ড আমাদের পার্টিকে জনগণের কাছে প্রিয় করেছে এবং পার্টির বৃদ্ধি ও অগ্রগতি ও জনগণের রাজনৈতিক চেতনা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করেছে। পূর্বোক্ত দুটি কাজকে যুক্ত করার উপায় খুঁজে বের করা এবং এই দুই কাজের ‌মধ্যে যে একই সাধারণ লক্ষ্য বর্তমান সে বিষয়ে সদস্যদের শিক্ষা দেওয়া এখন পার্টি সংগঠনের কাছে এক বড় চ্যালেঞ্জস্বরূপ।

মার্কসবাদী পথ, ৫ই আগস্ট, ১৯৮১

Published in: on জুন 27, 2010 at 6:33 অপরাহ্ন  মন্তব্য করুন  
%d bloggers like this: