একটি গৌরবময় ও অনুকরণীয় জীবন

বর্তমান আক্রমণের মোকাবিলা  জ্যোতি বসুর দেখানো পথেই 

প্রকাশ কারাত

জ্যোতি বসুর মতো একজন অসাধারণ কমিউনিস্ট নেতার জন্মশতবর্ষ, সারা জীবন ও কাজের মধ্যে দিয়ে তিনি যে উল্লেখ্যযোগ্য অবদানগুলি রেখে গেছেন, তার মূল‌্যায়ন করা এবং রাজনৈতিক জীবনে তিনি যে কৃতিত্ব অর্জন করেছেন ও যে শিক্ষা দিয়েছেন, তার হিসাব টানার একটি উপলক্ষ হতে পারে। নতুন প্রজন্মের কমিউনিস্ট ও প্রগতিশীলদের শিক্ষিত করতে এই মূল‌্যায়ন অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে, যাতে তাদের সামাজিক রূপান্তরের লক্ষ্যে নিরবচ্ছিন্নভাবে উদ্যমী হওয়ার ক্ষেত্রে এই শিক্ষা সাহায্য করতে পারে।

জ্যোতি বসু তাঁর জীবদ্দশাতেই একজন কিংবদন্তী কমিউনিস্ট নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। কমিউনিস্ট আন্দোলনে জ্যোতি বসুর মতো আর এমন কোনো নেতা নেই যাকে গোটা দেশের মানুষ জানতেন এবং  শ্রদ্ধা করতেন। কিভাবে এটা সম্ভব হলো?

জ্যোতি বসুর নাম বামপন্থী রাজনীতি ও সমস্ত মৌলিক আন্দোলনের মূল স্রোতের সঙ্গে সমার্থক হয়ে উঠেছিল। একজন কমিউনিস্ট হিসাবে তাঁর গোটা জীবনকাল জুড়েই তিনি শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ব্রিটেন থেকে ফেরার পরেই তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন এবং সরাসরি রেল শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নে কাজ শুরু করেন। জীবনের শেষ বছরগুলিতেও তিনি সি আই টি ইউ-র একজন নেতা হিসাবে থেকে গিয়েছিলেন।

জ্যোতি বসু কৃষক আন্দোলনেরও একজন প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন, যখন তিনি ১৯৬৭-৭০ সালের মধ্যে দুটি যুক্তফ্রন্ট সরকারকে জমির আন্দোলনকে বিকশিত করার কাজে ব্যবহার করেছিলেন। একইভাবে বামফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবেও তিনি ব্যাপক ভূমি সংস্কারের লক্ষ্যে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। সুতরাং, তাঁর রাজনৈতিক কার্যকলাপ শ্রমিক ও কৃষক, উভয় আন্দোলনের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল।

আইনসভার ভেতরে কাজের সঙ্গে বাইরের গণ-আন্দোলন ও শ্রমিক আন্দোলনের যেভাবে তিনি সম্পৃক্তি ঘটিয়েছিলেন, তা ছিল জ্যোতি বসুর স্বাতন্ত্র্যসূচক অবদানগুলির মধ্যে একটি।  স্বাধীনতার আগেই, ১৯৪৬ সালে বাংলার আইনসভায় জ্যোতি বসু নির্বাচিত হয়েছিলেন। তখন থেকে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি আইনসভায় তাঁর উপস্থিতিকে বাইরে গণ-আন্দোলন ও পার্টির প্রভাবকে শক্তিশালী  এবং আরও উন্নত করতে কাজে লাগিয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালে বাংলার কৃষকদের তেভাগা আন্দোলন যখন শুরু হলো, তখন প্রাথমিক রিপোর্ট সংগ্রহের জন্য জ্যোতি বসু সেই সব জেলাগুলিতে ব‌্যাপকভাবে ঘুরেছিলেন এবং বিধানসভায় তা কার্যকরীভাবে উত্থাপন করেছিলেন।

১৯৫৩সালে জ্যোতি বসু অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির প্রাদেশিক কমিটির সম্পাদক হন এবং ১৯৬১সাল পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বে ছিলেন। এই আট বছরে ১৯৫৯সালের খাদ্য আন্দোলনের মতো বড় বড় আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল, যেখানে পুলিসী আক্রমণে ৮০জনের মৃত্যু হয়েছিল। পার্টির সম্পাদক হিসাবে জ্যোতি বসু যেমন এই আন্দোলনের সম্মুখভাগে ছিলেন, তেমনি জনগণের খাদ্যের দাবিকে নিরলসভাবে বিধানসভার ভেতরে উত্থাপন করেছিলেন।

এর আগে, ১৯৫৪সালের ফেব্রুয়ারিতে যখন স্কুল শিক্ষকদের ধর্মঘট হলো, তখন পার্টি ও শিক্ষক সংগঠনের অনেক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। জ্যোতি বসুকেও গ্রেপ্তারের জন্য পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল এবং তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য বিধানসভার অধিবেশনের প্রথম দিন ভবনের বাইরে পুলিস কড়া নজর রেখেছিল। জ্যোতি বসু কৌশলে বিধানসভা ভবনের ভেতরে ঢুকে পড়েন এবং প্রায় এক সপ্তাহ ধরে এই ভবনের ভেতরেই থেকে যান, যেহেতু পুলিস এর ভেতরে ঢুকতে পারে না। বিধানসভার ভেতরে শিক্ষক ধর্মঘটের বিষয়টি তিনি সফলভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হন। পরে শিক্ষকদের সমাবেশে যোগ দেওয়ার জন্য তিনি বের হন এবং পুলিসের কাছে গ্রেপ্তার হন। একজন বিধায়ক হিসাবে, শ্রমজীবী জনগণের স্বার্থকে উর্ধ্বে তুলে ধরতে কিভাবে জ্যোতি বসু বিধানসভাকে ব্যবহার করেছিলেন, এটা তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

ব্যক্তিগতভাবেও জ্যোতি বসু অসীম সাহসের অধিকারী ছিলেন। ১৯৬৯সালের জুলাই মাসে, তিনি যখন রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন, একটি সংঘর্ষে একজন পুলিস নিহত হওয়ায় প্ররোচিত হয়ে এক দঙ্গল পুলিস বিধানসভা ভবন আক্রমণ করতে ভেতরে ঢুকে পড়ে।  তারা বিধানসভার আসবাবপত্র ভাঙচুর করতে করতে জ্যোতি বসুর ঘরে ঢুকে পড়ে। জ্যোতি বসু শান্তভাবে এই তান্ডবরত পুলিসবাহিনীকে মোকাবিলা করেন এবং অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে তাদের এধরণের আচরণ বন্ধ করতে বলেন। তাঁর স্থৈর্য দেখে হতচকিত হয়ে উত্তেজিত পুলিসের দলটি ধীরে ধীরে তাঁর ঘর ছেড়ে চলে যায়।

রাজ্য সরকারে কমিউনিস্টদের অংশগ্রহণের মধ্যে দিয়ে কিভাবে গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে শক্তিশালী করার কাজে ব্যবহার করা উচিত, তা জ্যোতি বসুই দেখিয়েছিলেন।  ১৯৬৭-৭০ সালের মধ্যে দু’টি স্বল্পকালস্থায়ী যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে তিনি পুলিসকে শ্রমিক ও কৃষকদের আন্দোলনে হস্তক্ষেপ করতে দেননি। জমির আন্দোলনে বাংলা যখন ভেসে গিয়েছিল, তখন জ্যোতি বসু ঘোষণা করেছিলেন যে সমস্ত কৃষক বেনাম জমি চিহ্নিত করছেন এবং তা দখল করছেন, তাদের কাজে সরকার বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। এই সব অভিজ্ঞতাই রাজ্য সরকারে কাজ করতে গিয়ে সি পি আই (এম)-র দৃষ্টিভঙ্গি ও কৌশল কী হবে, তা প্রণয়ন করতে সাহায্য করেছে।

জ্যোতি বসুর জীবনের সবচেয়ে বড় অবদান ১৯৭৭ সালে পশ্চিমবাংলায় বামফ্রন্ট সরকার গঠনের মধ্যে দিয়েই এসেছে, যার তিনি মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তিন দশকের বেশি সময় ধরে বামফ্রন্ট সরকার টিঁকে থাকার উল্লেখযোগ্য রেকর্ড গড়ার পিছনে এই সরকারের নেতৃত্বে একটানা ২৩ বছর জ্যোতি বসুর থাকার অবদানও অনেক। তাঁর নেতৃত্বেই ভূমি-সংস্কারের পরিকল্পনা তৈরি হয়েছিল এবং রূপায়িত হয়েছে। গোটা দেশে পথ-দেখানো এই সংস্কারের ফলে ১১লক্ষ একর জমি ২৫লক্ষ ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষকের মধ্যে বন্টন করা সম্ভব হয়েছে এবং ১৫ লক্ষ ৩০ হাজার বর্গাদার বা ভাগচাষী নথিভূক্ত হয়েছেন ও নির্দিষ্ট সময়ের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা হয়েছে।

ভূমি-সংস্কারের পাশাপাশি ত্রিস্তর পঞ্চায়েতী ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে। ৭৩তম ও ৭৪তম সংবিধান সংশোধনের অনেক আগেই পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েতী ব্যবস্থার গণতান্ত্রিকীকরণের পথ দেখিয়েছে। রাজ্যে ধর্মনিরপেক্ষ বাতাবরণ তৈরির মতো একটি কৃতিত্বকে আজকাল এমনিই হয়ে গেছে বলে ধরে নেওয়া হয়। অথচ, স্বাধীনতার আগে, বাংলা সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে প্রত্যক্ষ করেছে এবং দেশভাগের মধ্যে দিয়ে বিরাট আকারের সাম্প্রদায়িক হিংসার সাক্ষী থেকেছে। কিন্তু বামপন্থী রাজনীতির উত্থান এবং বামফ্রন্টের সরকার গঠন একটি বড় রকমের রূপান্তরের ভিত্তি স্থাপন করে। জ্যোতি বসু শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, গোটা দেশেই ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি দৃঢ় আনুগত্যকে প্রতীক হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন। সমস্ত অংশের সংখ‌্যালঘু মানুষ নিজেদের সুরক্ষিত এবং সাম্প্রদায়িক আক্রমণ থেকে মুক্ত জীবন উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী নিহত হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গে সংখ‌্যালঘু শিখদের ওপর যে কোনো ধরণের আক্রমণ প্রতিহত করতে তিনি যে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন তা সারা দেশে প্রশংসিত হয়েছিল।

সত্তরের দশকে পশ্চিমবঙ্গে আধা-ফ‌্যাসিবাদী সন্ত্রাস নামিয়ে আনা হয়েছিল। ১২০০-র বেশি কমরেড এই সময়ে খুন হন এবং আরো কয়েক হাজার কমরেডকে বলপূর্বক ঘর ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। কমিউনিস্ট আন্দোলন বিভিন্ন সময়ে শাসকশ্রেণীর দমন-নিপীড়নের মোকাবিলা করেছে। কতটা সাফল্যের সঙ্গে এই নিপীড়ন ও হিংসাকে মোকাবিলা করা হচ্ছে, তার ওপর আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়। জ্যোতি বসু ও প্রমোদ দাশগুপ্তের নেতৃত্বে পার্টি এই তীব্র আক্রমণকে প্রতিরোধ করেছিল এবং কখনো মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি। আজকে পশ্চিমবঙ্গে পার্টি ও বামফ্রন্ট যখন আবার ভয়াবহ আক্রমণের মুখে, তখন এই সন্ধিক্ষণে জ্যোতি বসুর পরিণত নেতৃত্বের উদাহরণ আমাদের সামনে পথের দিশা হওয়া উচিত।

দীর্ঘ সাত দশক ধরে, একজন কমিউনিস্ট হিসাবে জ্যোতি বসু আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের নানা ওঠাপড়াকে প্রত‌্যক্ষ করেছেন। কিন্তু মার্কসবাদের প্রতি তাঁর প্রত্যয় কখনো দোদুল্যমান হয়নি। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি বিশ্বাস করতেন যে সমাজতন্ত্রই মানব সভ‌্যতার সামনে একমাত্র বিকল্প।

ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনে প্রয়োগ ও বিকাশের বেশ কয়েকটি দৃষ্টিভঙ্গিগত প্রশ্নে জ্যোতি বসু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। যেমন, কিভাবে কমিউনিস্টরা আইনসভায় কাজ করবেন; ভূমি সংস্কার কর্মসূচীর রূপায়ণে; পঞ্চায়েতী রাজ ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের ক্ষেত্রে; ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রকে রক্ষা করার প্রশ্নে কমিউনিস্টদের দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার রক্ষায়, গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে জ্যোতি বসু যে অবদান রেখেছেন, স্বাধীন ভারতের খুব কম নেতাই সে দাবি করতে পারেন।

গোটা বছর ধরে জন্মশতবর্ষ উদ্‌যাপন করতে গিয়ে তাঁর এই গৌরবময় জীবন ও কর্মধারারই স্মৃতিচারণা করা উচিত।

গণশক্তি, ৭ই জুলাই, ২০১৩

Advertisements
Published in: on জুলাই 10, 2013 at 7:59 অপরাহ্ন  মন্তব্য করুন  

মানুষের প্রতি অবিচল আস্থাই ছিল তাঁর শক্তির উৎস

সীতারাম ইয়েচুরি 

আগামী ৮ই জুলাই কমরেড জ্যোতি বসুর জন্মশতবর্ষের সূচনা হবে।

যদিও আমরা সবাই জানি প্রকৃতির নিয়মেই জন্ম হলে একদিন মৃত্যু আসবেই। কিন্তু এই অনিবার্য ঘটনাকে মেনে নেওয়াটা সবার পক্ষেই অত্যন্ত কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যখন বর্তমান পরিস্থিতির প্রতিটি বাঁক ও মোড়ে কমরেড জ্যোতি বসুর অনুপস্থিতি আমরা অনুভব করছি। সারাজীবন তিনি ভারতে এবং অবশ্যই সারা বিশ্বে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করেছেন। তাঁর সেই অসমাপ্ত কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব তাঁর অনুপস্থিতিতে আমাদের ওপর বর্তেছে।

ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার 

জ্যোতি বসুর সাত দশকের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন এবং আধুনিক ভারতের বিবর্তন একই গতিতে চলেছে। এই বিশেষ কারণে, তিনি সবসময়ই অনুপ্রেরণার উৎস এবং নবীন প্রজন্মের কাছে আদর্শস্থানীয়। তাঁর উত্তরাধিকার একইভাবে এই প্রেরণার উৎস হয়েই থাকবে। প্রকৃতপক্ষে শুধুই কমিউনিস্ট আন্দোলনের নয়, তিনি আধুনিক ভারতের একজন অন্যতম প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব। ইংল্যান্ডে গিয়ে ব্যারিস্টার হওয়ার সময় তিনি কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রতি আকৃষ্ট হন ও এই মতাদর্শকে বরণ করেন। ১৯৪০ সালে ভারতে ফিরে আইনজীবীর কালো কোট না পরে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করে সরাসরি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কার্ল মার্কস একসময় বলেছিলেন যে যখন একটি ভাবনা জনগণের মনকে আলোড়িত করে, তখন তা এক বাস্তব শক্তি হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনতার ইচ্ছা যখন ভারতের মানুষকে আলোড়িত করছে, তখন জ্যোতি বসু কমিউনিস্ট আন্দোলনে যোগদান করেছিলেন। যদিও স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্র চরিত্র এবং তার উপাদান কী হবে তা নিয়ে তাঁর চিন্তা আরও অগ্রসর ছিল। তাঁরা মনে করতেন, যে রাজনৈতিক স্বাধীনতা আসবে তাকে প্রতিটি ভারতবাসীর সত্যিকারের অর্থনৈতিক স্বাধীনতাতে রূপান্তরিত করা প্রয়োজন। এর অর্থ হচ্ছে একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজ তৈরি করা যেখানে মানুষের উপর মানুষের শোষণ বিলুপ্ত হবে। তাঁর এই ইচ্ছা-আবেগ কখনও লঘু হয়ে যায়নি। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি ভারতের জনগণের জন্য কাজ করে গেছেন। তাঁর দীর্ঘ ও বর্ণময় জীবনে তিনি বহু ঝড়-ঝঞ্ঝার সম্মুখীন হয়েছেন, কিন্তু আদর্শের প্রতি তিনি ছিলেন অবিচল। মতাদর্শের সঙ্গে দায়বদ্ধতার মেলবন্ধনের কারণেই জ্যোতি বসু একজন ‘আদর্শ মানুষ’ হয়ে উঠেছেন।

স্বাধীনোত্তর ভারত বড় বড় সংগ্রামের মধ্যে আবর্তিত হচ্ছিল, যার ফলশ্রুতিতে সামন্তবাদী রাজশক্তি শাসিত রাজ্যগুলি ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়। কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে সংগ্রামগুলি ভূমি সংস্কারের দাবিতে এবং সামন্ততান্ত্রিক জমিদারব্যবস্থাগুলি বিলোপ করার বিষয়টিকে সামনে নিয়ে আসে। এই সময়েই ভারতের বিভিন্ন ভাষাভাষী জাতি, যারা স্বাধীনতা সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন, তারা নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় পেতে চাইছিলেন। এই প্রক্রিয়ায় শেষপর্যন্ত ১৯৫৬ সালে ভারতের রাজ্যগুলির ভাষাভিত্তিক পুনর্গঠন হয়।

আমাদের দেশের ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক চরিত্র এবং প্রশাসনিক কাঠামোর প্রতি জ্যোতি বসুর দৃঢ় প্রত্যয় তাঁর কর্মপদ্ধতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত থেকেছে। সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলি সর্বদাই আধুনিক ভারতের বিবর্তনের বিরোধী শক্তির প্রতিভূ হয়ে থেকেছে। জ্যোতি বসু এই সাম্প্রদায়িক শক্তিকে বিচ্ছিন্ন এবং পরাস্ত করা ও ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিকে শক্তিশালী করার জন্য কাজ করে গেছেন। পাশাপাশি, ভারতের রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে জনগণের অর্থনৈতিক স্বাধীনতায় রূপান্তরিত করার জন্য, সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে তিনি সম্পূর্ণভাবে মনোনিবেশ করেছিলেন। কীভাবে তা অর্জিত হবে এই বিষয়ে ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ভেতরে এক তীব্র মতাদর্শগত লড়াই শুরু হয়। বাম ও দক্ষিণপন্থী এই দুই বিচ্যুতির বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই করে অন্যান্য কমরেডদের সাথে জ্যোতি বসু সি পি আই (এম) গঠন করেছিলেন। যাঁরা লক্ষ্যপূরণে সংসদীয় এবং সংসদ- বহির্ভূত কার্যক্রমকে একত্রিত করে লড়াই করার সঠিক পথ গ্রহণ করেছিলেন। সংসদীয় গণতন্ত্র, তার প্রতিষ্ঠান এবং মঞ্চগুলিকে ব্যবহার করে আন্দোলন এবং একইসাথে জনগণের কাছে আরও বেশি সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার সংগ্রামে জ্যোতি বসু ছিলেন অনবদ্য। আধুনিক ভারতের সংহতির লক্ষ্যে ভূমি সংস্কার রূপায়ণ, পঞ্চায়েতীরাজ প্রতিষ্ঠানগুলির উন্নতিসাধন করে গণতন্ত্রকে শিকড়ের গভীরে পৌঁছে দেওয়া, ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে শক্তিশালী করার জন্য কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি বিষয়গুলি জ্যোতি বসুর বিশেষ অবদান হিসাবে স্বীকৃত। এই সমস্ত বিষয়গুলি ছাড়া, জ্যোতি বসুর ব্যক্তিত্বের প্রধান দিক যা জনগণকে আকৃষ্ট করতো তা হলো মানুষের প্রতি তাঁর অবিচল আস্থা। তিনি সবসময় পার্টি ও কর্মীদের মানুষের কাছে যাওয়ার কথা বলতেন, আমরা কি করছি তা ব্যাখ্যা করতে বলতেন এবং মানুষের প্রতি বিশ্বাস রাখতে বলতেন। মানুষের প্রতি  এই বিশ্বাসই ছিল তাঁর শক্তি। মানুষ তাই তাঁর সততা নিয়ে কোনোদিন প্রশ্ন তোলেননি, এমনকি সন্দেহ প্রকাশও করেননি। 

মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু 

একটানা ২৩ বছর ধরে মুখ্যমন্ত্রী থাকার পর ২০০০ সালে স্বেচ্ছায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে সরে আসেন জ্যোতি বসু, যা ভারতের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং নৈতিকতায় এক নতুন মাত্রা যোগ করে। আগের মতো প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে সক্ষম হচ্ছিলেন না বলে তাঁর নিজের মধ্যেই অসন্তুষ্টি ছিল এবং তাই মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে তাঁর সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছায় সি পি আই (এম) পলিট ব্যুরো সম্মতি দিয়েছিল।

১৯৭৭ সালে যখন জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন তখন পশ্চিমবঙ্গের দারিদ্র্যের অনুপাত ছিল প্রায় ৫২ শতাংশ। ১৯৯৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২৬ শতাংশ, প্রতি বছর ৪.২ শতাংশ হারে হ্রাস। এভাবে ভারতের রাজ্যগুলির মধ্যে দারিদ্র্য দূরীকরণে পশ্চিমবঙ্গ প্রথম স্থান লাভ করে। কেরালা ছিল দ্বিতীয় স্থানে প্রতি বছর ৩.৭ শতাংশ দারিদ্র্য হারে হ্রাস করে (সূত্র: ভারত-দারিদ্র্য হ্রাসের নীতিগুলি—বিশ্বব্যাঙ্ক, ২০০০)। তুলনামূলকভাবে, মহারাষ্ট্রে ১৯৯৪ সালে দারিদ্র্যের অনুপাত ছিল ৪৩.৫ শতাংশ। কৃষিক্ষেত্রে একইভাবে উন্নতি ঘটে। খাদ্যে ঘাটতি রাজ্য থেকে এই সময়েই পশ্চিমবঙ্গ উদ্বৃত্ত রাজ্যে পরিণত হয়। ধান উৎপাদনে শীর্ষস্থানে পৌঁছায় এই রাজ্য। অপারেশন বর্গার সাফল্যের ফলশ্রুতিতে রাজ্যের ৯০ শতাংশ কৃষিজমির মালিক হন প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষীরা। জ্যোতি বসুর মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়ে ভূমিহীনদের মধ্যে ১৩ লক্ষ একর জমি বণ্টন করা হয়েছে। অতীতে কায়েমী স্বার্থ বেআইনীভাবে এই জমি দখলে রেখেছিল।

জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে বামফ্রন্ট সরকার অন্ধভাবে উদারনৈতিক অর্থনীতিকে আঁকড়ে ধরে থাকেনি। বরং উদারনীতির প্রবক্তা যারা অর্থনীতির পরিধি থেকে রাষ্ট্রকে সরিয়ে রাখার কথা বলেছিলেন এবং রাষ্ট্রের সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি বিসর্জন দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন—তাদের বিরুদ্ধে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার অর্থনৈতিক উন্নয়নে এবং ভূমিসংস্কারের ক্ষেত্রে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছে।

অনবদ্য ব্যক্তিগত গুণাবলী 

২৫ বছরের বেশি সময় আমাদের পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে জ্যোতি বসুর সাথে কাজ করতে গিয়ে তাঁর অনেক প্রশংসনীয় গুণ দেখেছি যা অনুসরণযোগ্য। একটি হলো, মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে যুক্তির শক্তির উপর তাঁর অবিচল আস্থা। আবেগের আশ্রয় নিয়ে কোনোদিন কোনো তর্কেই তাঁকে হারানো যায়নি। বসুর ব্যক্তিত্বের একটি প্রধান দিক হলো তাঁর মানসিকতা। তাঁর মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন আমি কয়েকবার তাঁর সাথে বিদেশ ভ্রমণ করেছি। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে স্বাভাবিকভাবেই তিনি কিছু বিশেষ সুবিধা পাওয়ার অধিকারী ছিলেন। কিন্তু ‍‌তিনি সবসময়ই অন্য কমরেডদের সাথে ভ্রমণ করতে পছন্দ করতেন এবং মুখ্যমন্ত্রী থাকার শেষদিন পর্যন্ত তিনি ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের ‘ইকনমি ক্লাস’-এই ভ্রমণ করেছেন। এই সময়গুলিতে তিনি কিন্তু তাঁর সঙ্গী কমরেডদের বিষয়ে সজাগ থাকতেন, তাঁদের সুবিধা এবং প্রয়োজন সম্বন্ধে খবর রাখতেন। আমি একবারও তাঁকে ধৈর্য হারাতে দে‍খিনি।

জ্যোতি বসুর আর একটি গুণ হলো স্বেচ্ছাপ্রণোদিত শৃঙ্খলা, যা তাঁর ব্যক্তি ও রাজনৈতিক জীবনে তিনি সর্বদা মেনে চলেছেন। ১৯৯৬ সালে সংযুক্ত ফ্রন্ট সরকারের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাবের সপক্ষে তিনি মত দেন কিন্তু কেন্দ্রীয় কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠের মতে প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যায়। সেই সময় তিনি শৃঙ্খলাবদ্ধ সৈনিকের মতো মনোভাব দেখিয়েছিলেন। ১৯৯৮ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত পার্টি কংগ্রেসে কেন্দ্রীয় কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠের মত গৃহীত হয়। তাঁর ব্যক্তিগত মতামত যাই থাকুক তিনি শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠের মতকেই তুলে ধরেছেন এবং তাঁর দায়িত্ব পালন করে গেছেন। কমিউনিস্ট পার্টির লৌহদৃঢ় শৃঙ্খলা এবং সাংগঠনিক নীতিগুলির প্রতি তাঁর আনুগত্য অনুসরণযোগ্য। তরুণ প্রজন্মের কাছে এগুলি শিক্ষণীয় গুণাবলী।

১৯৯৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমরা দুজনে কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে ফিদেল কাস্ত্রো এবং পার্টি নেতাদের সাথে আলোচনার জন্য কিউবা যাই। স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদ হয়ে ফেরার সময় আমাদের প্রায় একদিন মাদ্রিদে থাকতে হয় দেশে ফেরার বিমানের জন্য। স্পেনে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত কিউবা যাওয়ার পথে আমাদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, আমরা কোনো বিশেষ দ্রষ্টব্য স্থানে যেতে চাই কি না। জ্যোতি বসু আমার দিকে তাকান। আমি বলি পিকাসোর ‘গুয়ের্নিকা’-র মূল ছবিটি যেহেতু মাদ্রিদের একটি মিউজিয়ামে আছে, তা দেখা যেতে পারে। কিন্তু কিউবা থেকে ফেরার সময় জ্যোতি বসু ঐ মিউজিয়ামে আর যেতে চাইলেন না শারীরিক কারণেই। তিনি আমাকে যেতে বললেন। এই কথায় ভারতের রাষ্ট্রদূত বললেন, মিউজিয়ামটি ঐদিন বন্ধ থাকার কথা। কিন্তু জ্যোতি বসুর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করে তা খোলা রাখা হয়েছে। এই কথা শুনে জ্যোতি বসু বললেন, ‘ওরা জ্যোতি বসুকে কোনোদিন দেখেননি, তাই চিনবেন কি করে কে জ্যোতি বসু। সীতারাম যাক, ওরা বুঝবেন না কে গেছেন।’ শেষ পর্যন্ত আমি গেলাম, মিউজিয়াম খোলা ছিল এবং আমি ‘গুয়ের্নিকা’ দেখলাম।

সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে চলো 

আধুনিক ভারতের সংহতি, রাজনৈতিক নৈতিকতা জ্যোতি বসুর জীবন এবং কাজের মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে এবং এই গুণাবলী অর্জিত হতে পারে তাঁর জীবনধারাকে অনুসরণ করার মধ্যে দিয়ে। ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করা, রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে জনগণের প্রকৃত অর্থনৈতিক উন্নয়নে রূপান্তরিত করার অসমাপ্ত কাজ এই সংহতির রূপরেখাকে সূত্রায়িত করবে। দেশ এবং জনগণের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করার মর্মবাণীকে আমাদের শক্তিশালী করতে হবে।

২০০৩ সালের ৪ঠা এপ্রিল চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য তাঁর মরণোত্তর দেহদানের অঙ্গীকারপত্রে সই করতে গিয়ে জ্যোতি বসু লিখেছিলেন, ‘একজন কমিউনিস্ট হিসাবে, জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত মানবজাতির সেবায় নিয়োজিত থাকার জন্য আমি অঙ্গীকারবদ্ধ। আমি খুশি যে এখন এমনকি মৃত্যুর পরেও আমি এই সেবা করতে পারবো।’

লড়াই করার অদম্য ক্ষমতা সারা জীবন ধরে দেখিয়েছেন জ্যোতি বসু। মৃত্যুর সময়ও তিনি লড়াই চালিয়ে গেছেন। তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করার পর সবাই যখন আশা ছেড়ে দিয়েছেন, তখনও সবাইকে অবাক করে তিনি ১৭ দিন লড়াই চালিয়ে গেছেন। ‘কখনও ছেড়ে দাও বলবে না’ এই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত।

তিনি পলিট ব্যুরোর প্রথম ৯ জন সদস্যের অন্যতম এবং ঐ ঝোড়ো দিনগুলিতে সি পি আই (এম) প্রতিষ্ঠার সময় নবরত্নের শেষ ব্যক্তি হিসাবে তিনি বিদায় নিয়েছেন। মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে আমাদের সংগ্রামকে আরও শক্তিশালী করার মাধ্যমে আমরা জ্যোতি বসুর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারবো।

গণশক্তি, ৭ই জুলাই, ২০১৩

Published in: on জুলাই 10, 2013 at 7:48 অপরাহ্ন  মন্তব্য করুন  

উদ্যত প্রতিকূলতার সফল মোকাবিলারই অন্য নাম জ্যোতি বসু

অঞ্জন বেরা

জন্মশতবর্ষ পালন অনেক সময়ই দূর-স্মৃতিচারণার রকমফের । কিন্তু কমরেড জ্যোতি বসুর শতবর্ষ  তেমন নয়। মাত্র সাড়ে তিন বছর আগে তাঁকে আমরা হারিয়েছি । মৃত্যুর ঠিক আগে পর্যন্ত জনজীবনে ও রাজনৈতিক পরিসরে তিনি  প্রখরভাবে ব্যাপ্ত ছিলেন । অতি-দৃশ্যময়তার এই যুগেও সাড়ে তিন বছরের অনুপস্থিতি  ম্লান করতে পারেনি তাঁর স্মৃতি । শুধু আমাদের কাছেই সেই স্মৃতি অমলিন নয়,  তাঁর স্মৃতির দীপ্তিতে ভয় পেয়ে কমিউনিস্ট-বিরোধী স্বৈরশাসক অশ্লীল দ্রুততায় পাল্টে দেয় উপনগরীর নাম ।

শুধু কমিউনিস্ট ও বাম আন্দোলনের কাছেই নয়, তাঁর প্রায় সাড়ে সাত দশকের রাজনৈতিক জীবন, সাধারণ ভাবে এদেশের সমকালীন রাজনীতি ও সমাজ জীবনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে গেছে । ইতিহাসে এক একটা ক্ষেত্রে এমন হয় । সময় ব্যক্তিকে গড়ে পিটে নেয় । ব্যক্তি গড়ে পিটে নেয় সময়কে । প্রাক-দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ  পর্ব থেকে একুশ শতকের প্রথম দশক —- রাজনৈতিক-সামাজিক জীবনে এতগুলি সন্ধিক্ষণের সওয়ার হওয়া ইতিহাসে বিরল । কমরেড জ্যোতি বসু সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের অন্যতম ।

কমরেড জ্যোতি বসুর স্মৃতি আজকের প্রজন্মের বিরাট অংশের কাছেই হয়তো তাঁর তেইশ বছরের মুখ্যমন্ত্রিত্বের সময় ।  ১৯৭৭ থেকে ২০০০ সাল । এরকম আর কোনো নজির গণতন্ত্রে নেই । কিন্তু জ্যোতি বসু শুধু মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন না । তিনি যখন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তখন তিনি একই সঙ্গে জাতীয় রাজনীতিতে অন্যতম প্রধান বিরোধী নেতাও । দু’দফার যুক্তফ্রন্ট সরকারের কুড়ি মাস বাদ দিলে, ১৯৪৬ থেকে  ১৯৭২ পর্যন্ত  রাজ্যে তিনিই বিরোধী পক্ষের প্রধান কন্ঠ । স্বাধীনতা-উত্তর পশ্চিমবঙ্গে  ১৯৫৩ থেকে ১৯৬১ তিনি অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির রাজ্য সম্পাদক। বিধানসভায় বিরোধী নেতা । কমরেড জ্যোতি বসুর রাজনৈতিক জীবন তাই সামগ্রিক গণআন্দোলনের বিকাশের মধ্যেই বিস্তৃত ও বিন্যস্ত ।

১৯৪৩ সালের নিদারুণ দুর্ভিক্ষে অসংখ্য মানুষের অসহায় মৃত্যুর পর তেভাগা আন্দোলনের মধ্যে মানুষ যখন নতুন জীবন খুঁজছিল ঠিক তখনই কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী হিসেবে  অবিভক্ত বাংলার আইনসভায় পা দিয়েছিলেন  জ্যোতি বসু । ভবিষ্যতে কোন মানুষের জন্য কোন কন্ঠ তিনি হতে চলেছেন,  যেন সেদিনই ইতিহাস তাঁর ভবিষ্যৎ ভূমিকা নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল ।

আইন যখন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পরিসর প্রত্যাখ্যান করছে, আইনসভায় জ্যোতি বসু তখন সেই  বিকাশোন্মুখ গণআন্দোলনের মুখ । তিনি রুদ্ধকন্ঠের কন্ঠস্বর । গণআন্দোলনের কন্ঠস্বরের ক্রমব্যাপ্তিতে  প্রসারিত হয়েছে জ্যোতি বসুর ভূমিকা । তাঁর জীবনীপঞ্জীই পশ্চিমবঙ্গে গণতান্ত্রিক  অগ্রগতির গতিপথ ।

একজন কমিউনিস্ট কীভাবে বুর্জোয়া সংসদীয় রাজনীতিতে শ্রেণী রাজনীতির লক্ষ্য নিয়ে  হস্তক্ষেপ করবে , তা সে  বিরোধী পক্ষ বা   এবং সরকার পরিচালনা , যাই হোক না কেন, কমরেড জ্যোতি বসুর জীবন  তাঁর এক অনন্য উদাহরণ। খুব নির্দিষ্টভাবে বললে, একটি বুর্জোয়া আইনসভায় শ্রমজীবী মানুষের দাবিদাওয়া, এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কমরেড জ্যোতি বসুর ভূমিকা ইতিহাসকে বহুদিন মনে রাখতে হবে । গণতান্ত্রিক অধিকারের আন্দোলন, ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন, সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন, খাদ্য আন্দোলন, মধ্যবিত্ত কর্মচারী আন্দোলন, শরণার্থী আন্দোলন, স্বাধীন অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য আন্দোলন, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কে গণতান্ত্রিক পুনর্বিন্যাসের দাবিতে আন্দোলন—প্রতিটি গণতান্ত্রিক আকাঙ্খার যেন তিনি মূর্ত প্রতীক । একই সঙ্গে তিনি আন্দোলনের নেতা, সংগঠক, প্রোপাগান্ডিস্ট, অ্যাজিটেটর। প্লেখানভ ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকা প্রসঙ্গে চমৎকার বলেছেন, মহান ব্যক্তিমাত্রই পথিকৃৎ । জ্যোতি বসু তাঁর বহু ভূমিকাতেই পথিকৃৎ ।

জ্যোতি বসু সবসময়ই ইতিবাচক । কি বিরোধী, কি সরকারে, দুটো  ভূমিকাতেই জ্যোতি বসু স্পষ্ট, নির্দ্বিধ । বিরোধী নেতা হিসেবে সরকারের তীব্র সমালোচক । কিন্তু নেতিবাচক, ধ্বংসাত্মক নয় । রাজনীতির লক্ষ্য যেহেতু মানুষ  তাই সরকার-বিরোধিতার নামে আলোচনা বন্ধ করে শিল্পপ্রকল্প আটকে উদ্বাহু হতে হয়নি জ্যোতি বসুকে, বামপন্থীদের ।

গণতন্ত্রে  গভীর আস্থার চমৎকার প্রতিফলন পড়েছে তাঁর ভাষণের বয়ানেও । সাত দশক ধরে তাঁর রাজনৈতিক ভাষণগুলি দেখুন, তথ্য ও যুক্তিবিহীন কোনো মতামত নেই ।  নেই  কোনো আস্ফালন। কথোপকথোনই তাই তাঁর বাচনভঙ্গী । শ্রোতার প্রতি  শ্রদ্ধার ভিত্তি  প্রোথিত  তাঁর রাজনৈতিক দর্শনেই ।  উল্টোদিকে গণতন্ত্রে অবিশ্বাসের কারণেই  স্বৈরাচারীর ভাষণ  অগোছালো বাগাড়ম্বর ।

বিরোধী নেতা জ্যোতি বসুকে বিনা বিচারে আটক করা হয়েছে বার বার । তীব্রভাবে প্রতিবাদ করেছেন, আইন অমান্য করেছেন । কিন্তু নিজে মুখ্যমন্ত্রী হয়ে মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সব রাজনৈতিক বন্দীর মুক্তির । বিনা বিচারে আটকের সরকারী অভ্যাস ইতিহাসের আস্তাকুঁড়েতে স্থান পেয়েছে বামফ্রন্ট সরকারের ৩৪ বছরেই  ।

চীন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষের সময় ভারত রক্ষা আইনে জ্যোতি বসুকে গ্রেপ্তার করেছিল কংগ্রেস সরকার । আবার ১৯৮৮ সালে প্রধানমন্ত্রী রাজীব  গান্ধী চীনে সরকারী  সফরের আগে তাঁর সঙ্গে আলোচনা করতে চাইলে  জ্যোতি বসু অনায়াসে আলোচনায় বসেছেন । কোনো রাজনৈতিক ভূমিকাই তাঁর কাছে ব্যক্তিসর্বস্ব ছিলনা । কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাম্মানিক ডক্টর অফ ল উপাধি নেওয়ার সময় তাঁর সেই অসামান্য ভাষণের কথা মনে আছে ? পার্টি, আন্দোলন এবং মানুষের মাঝখানে নিজের অবস্থানটুকু  নির্দিষ্ট করার বিনীত নৈর্ব্যক্তিকতা – তাঁর মজ্জায়।

অন্তত তিনটি  বিষয়ে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার  সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে  নীতি নির্ধারণে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছে । প্রভাব ফেলেছে বিকল্প মডেল তুলে ধরে ।  প্রথমেই বলতে হবে  ভূমিসংস্কারের কথা । যুক্তফ্রন্ট সরকার জোতদারদের লুকিয়ে রাখা জমি চিহ্নিত করা ও দখল করার প্রাথমিক কাজ শুরু করেছিল । বামফ্রন্ট সরকারের আমলে যা রূপ নিল সুনির্দিষ্ট স্থায়ী কর্মসূচীর ।  উদ্বৃত্ত জমি উদ্ধার, ভূমিহীনদের মধ্যে জমির পুনর্বন্টন এবং বর্গাদারের অধিকার রক্ষার কাজ পশ্চিমবঙ্গে যা হয়েছে তার তুলনা নেই । ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকের হাতেই কৃষিজমির ৯০ শতাংশের মালিকানা । গোটা দেশে যদি এর ভগ্নাংশও হতো তাহলে সত্তর শতাংশ ভারতবাসীর দিনে খরচের সামর্থ্য ২০টাকা থাকতো না । অর্থনৈতিক অগ্রগতির লক্ষে ভূমিসংস্কারের গুরুত্ব মৌলিক । ভূমিসংস্কারের উপর ভিত্তি করেই কৃষিফসল উৎপাদনে বিপুল সাফল্য পেয়েছে আমাদের রাজ্য । খাদ্যে ঘাটতি রাজ্য থেকে দেশের সেরা চাল উৎপাদনে । সবজি উৎপাদনে । গ্রামীণ উন্নয়নে, গ্রামীণ দারিদ্র মোচনে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গের তুলনাহীন সাফল্যের কোনো পূর্ব নজির ছিল ? ছিলনা । এটাই একটা নতুন মডেল । সময় পার হবার সঙ্গে সঙ্গে ভুমিসংস্কার কর্মসূচীকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজেও বামফ্রন্ট সরকার ঢিলে দেয় নি । নারী-পুরুষ যৌথ পাট্টা, মহিলাদের পাট্টা, চাষ ও বসবাসের জন্য ভূমিদান প্রকল্প, দেশের মধ্যে প্রথম বনাধিকার আইন কার্যকর করা বা শহরেও গরীব মানুষকে মাথা গোঁজার ঠাঁই দেওয়ার উদ্যোগ – এসব কেউ আগে ভেবেছিল নাকি?

ভূমিসংস্কার যদি রাজ্যের গ্রামীন মানুষের আর্থিক উন্নয়নে অবদান রেখে থাকে তাহলে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার পত্তন সেই মানুষের সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে নজিরবিহীন অবদান রেখেছে । গণতন্ত্রের নতুন আঙিনা হয়ে উঠল ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত । মুখ্যন্ত্রীর  দায়িত্ব নিয়েই বলেছিলেন, বামফ্রন্ট সরকার শুধুমাত্র মহাকরণ থেকে কাজ করবে না । চাই গ্রামের সরকার । এর চেয়ে সহজ করে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মোদ্দা কথাটা ,মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব ছিল না । যে পঞ্চায়েত আইন হাতে ছিল তার উপর দাঁড়িয়েই কাজ শুরু করলেন । কংগ্রেস সরকার আইন করেছিল  । কিন্তু ,স্বৈরাচার আর ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ যেহেতু একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ , তাই কাজটা শুরু করার রাজনৈতিক সদিচ্ছা  তাদের ছিলনা। প্রথম পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে বামফ্রন্ট ডাক দিয়েছিল — ‘বাস্তুঘুঘুর বাসা ভাঙো’ । কারণ সেটাই ছিল গণতন্ত্রকে মানুষের মাঝে প্রসারিত করার প্রথম ধাপ । কাজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই বামফ্রন্ট সরকার পঞ্চায়েত আইনকে সংশোধন করেছে বারবার । শুধু গ্রাম নয়, ক্রমশ স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন বিধিকে পোক্ত করেছে শহরাঞ্চলে । নির্বাচিত পৌরব্যবস্থার প্রকৃত স্বাদ রাজ্যবাসী বামফ্রন্ট সরকারের আমলেই পেয়েছেন । পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েতের অভিজ্ঞতাই  সংবিধান সংশোধন করে জাতীয়স্তরে  পঞ্চায়েত ব্যবস্থা গড়ে তোলার অনুপ্রেরণা যোগায় । বামফ্রন্টের বিরোধী হলেও প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী একথা স্বীকার করেছিলেন ।

নির্বাচিত পঞ্চায়েত ও পুরসভা শুধু কী বামপন্থী সমর্থদের নতুন মর্যাদা ও ক্ষমতায় অভিষিক্ত করেছিল ? না-সব মানুষকে করেছিল । এমন কি বিরোধী দলের কর্মী সমর্থকদেরও । তৃণমূলের টিকিটে জেতা পঞ্চায়েত প্রধানও  যে ক্ষমতা ভোগ করছেন তা বামফ্রন্ট সরকারেরই দেওয়া । কংগ্রেস শাসনে তা ছিলনা ।  তৃণমূল রাজ্য সরকার সেই অধিকার কাড়তে উদ্যত । নতুন বাস্তুঘুঘুরা মাথা তুলতে চাইছে তৃণমূলের কন্ঠলগ্ন হয়ে ।

খুব বেশি আলোচনা হয় না , কিন্তু ১৯৭৮-র সর্বনাশা  বন্যার সফল মোকাবিলা জ্যোতি বসুর নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকার করতে পেরেছিল নতুন অধিকারবোধে উদ্দীপ্ত জনতার মুখরিত সখ্যের সূত্রেই । সরকারী প্রশাসনের সঙ্গে জনতার  অনবদ্য সংযোগ অসাধ্যসাধন করেছিল । ভেঙে যাওয়া স্কুলবাড়ি আবার মাথা তুলেছিল, ভেসে যাওয়া বসতবাটি উঠলো গড়ে । বাঁধ হলো নতুন করে । সরল খেতের বালি । গ্রামের সাধারণ মানুষের সুবিপুল উদ্ভাবনী ক্ষমতা  সেই প্রথম প্রত্যক্ষ করলো গোটা রাজ্য ।

বন্যার পর কেন্দ্রীয় সাহায্য চেয়েছিলেন জ্যোতি বসু, কিন্তু কোনো আকুতি নয়, কোনো হতাশা নয় । মানুষের প্রতি অকপট আস্থা । তাঁর আত্মবিশ্বাসের মর্মকথা । যে সাহস নিয়ে তিনি দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকারের উপমুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে বিধানসভায় নিজের অফিস ঘরে লেলিয়া দেওয়া উন্মত্ত পুলিশ বাহিনীর সামনে অচঞ্চল, সেই আত্মবিশ্বাসেরই অন্য মাত্রা তাঁর মধ্যে দেখেছেন পশ্চিমবঙ্গের মানুষ  পুনর্গঠনের সেই মহান গণঅভিযানে ।

গণতান্ত্রিক অধিকারের বহুমাত্রিক বিস্তার বামফ্রন্ট সরকারের সময়কে বিশিষ্টতা দিয়েছে । বামপন্থী আন্দোলনের কাছে এটা একটা বড় অভিজ্ঞতা । মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারবোধই সুরক্ষিত করেছে বামপন্থীদের । প্রতিটি নির্বাচনী জয়ের পর তিনি  নিয়ম করে  বলতেন, ‘‘আমাদের দায়িত্ব বাড়লো’’ । একবারের জন্যও মনে করাতে ভোলেননি, মানুষই শেষ কথা বলবেন । গণতন্ত্র  মানে মানুষের শেষ কথা বলার অধিকার । আজ কামদুনির সেই ভদ্রমহিলাদের নিজের কথা বলার আকুতি আদতে বামফ্রন্ট সরকারের আমলে গড়ে উঠা নতুন পশ্চিমবঙ্গের অভিজ্ঞতাজাত । তাঁরা কোন দলের ভোটার বড় কথা নয় । বিকেন্দ্রীকৃত ক্ষমতার  গণতান্ত্রিক পরিসরই জন্ম দিয়েছে নতুনতর চেতনার, দাবির ।

গণতন্ত্রই  সাধারণ মানুষের উদ্ভাবনী ক্ষমতার উৎসমুখ খুলে দিয়েছিল । উৎসারিত হচ্ছিল নতুন জীবনের চাহিদা, সংস্কৃতির চাহিদা, নতুন শিক্ষার চাহিদা, সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও পরিকাঠামোগত পুণর্বিন্যাসের নতুন পৃষ্ঠপট ।  পুলিস দিয়ে নাটকের স্ক্রিপ্ট অনুমোদনের দিন শেষ হয়েছিল বামফ্রন্ট সরকারী প্রশাসনে আসতেই । লোকসংস্কৃতি চর্চার পৃথক প্রতিষ্ঠানের পরিকাঠামো রাজ্য সরকার করছে, তা  ১৯৭৭ সালের আগে কেউ কখনো ভাবেনি, করা তো দূরের কথা । নতুন নতুন স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয়েছিল নতুন পরিস্থিতির চাহিদায় সাড়া দিয়েই । সপ্তম বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে ৯৯.২৭ শতাংশেরও বেশি বাচ্ছা স্কুলে নাম লেখাতো । মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর সংখ্যা শুধু ১০ লাখ ছাড়ায়নি, তাদের অর্ধেকেরও বেশি ছাত্রী । কী ছিল ১৯৭৭ সালের আগে, কী হয়েছিল ? এই মেলানোতেই বাম-বিরোধীদের আপত্তি ।

পশ্চিমবঙ্গে বিকাশের এই মডেলের উপর দাঁড়িয়েই কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের  গণতান্ত্রিক পুণর্বিন্যাসের দাবিতে বসু সরব হয়েছিলেন । শুধু সরব হননি, একদিকে জনগণকে সচেতন করতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, অন্যদিকে গোটা দেশে সমস্ত রাজনৈতিক শক্তিকে সমবেত করার চেষ্টা করেছিলেন তাঁর ব্যক্তিত্ব এবং সঠিক সময়ে সঠিক ইস্যুতে সর্বাধিক শক্তিকে সমবেত করার দক্ষতা দিয়ে । জাতীয় রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক চেতনাকে গভীরতা দিতে সেই উদ্যোগের তাৎপর্য অপরিসীম। ইন্দিরা গান্ধীর সরকার বাধ্য হয়েছিল সারকারিয়া কমিশন গঠন করতে । কমিশন খুব ভালো কিছু রিপোর্ট না দিলেও রাজনৈতিক পরিসরে অপরিবর্তনীয় কিছু পরিবর্তন ঘটে যায় ।  কিছু গণতান্ত্রিক মানদন্ড এখন অস্বীকার করতে পারবেনা কেউই ।

ভারতীয় রাজনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতার এবং জাতীয় ঐক্য ও সংহতির প্রশ্নেও দৃঢ় নীতিনিষ্ঠ অবস্থান নেওয়ার একটি মানদন্ড তৈরি করেছিলেন কমরেড  জ্যোতি বসু । । অ-বামপন্থী দল বা জোট পরিচালিত রাজ্য সরকারগুলি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যখন রাজনৈতিক সুবিধাবাদকে প্রশ্রয় দিয়েছে ,তখন বামফ্রন্ট সরকারের  অবস্থান ছিল একেবারে বিপরীত মেরুতে । প্রশাসনিক কাঠামো থেকে  সাম্প্রদায়িক প্রবণতা দূর করা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও আর্থিক সামাজিক উন্নয়নে পদক্ষেপ গ্রহণ — কাজটা সহজ ছিলনা মোটেই । রাজ্যের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার  রূপান্তরে তাঁর দূরদৃষ্টি রাজনৈতিক বিরোধীদের শত কুৎসাতেও চাপা পড়েনা । সংখ্যালঘু কল্যাণে ধারাবাহিক পদক্ষেপের  সূত্র ধরেই সপ্তম বামফ্রন্ট সরকার চাকরির ক্ষেত্রে সংরক্ষণের মতো ঐতিহাসিক ব্যবস্থা চালু করে । ঠিক একাজেই এখন গুরুত্ব দিচ্ছেনা তৃণমূল সরকার । পশ্চিমবঙ্গ সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও বিত্ত নিগম মাত্র দুবছরেই হাঁটু মুড়ে বসে পড়েছে । তৎকালীন পরিস্থিতিতে গোটা দেশের প্রেক্ষাপটে বিচার করলে বোঝা যায় দার্জিলিঙে গোর্খা হিল কাউন্সিল গঠনের পদক্ষেপের গুরুত্ব।  স্বভাবতই জাতীয় স্তরেও এই পদক্ষেপগুলি প্রভাব ফেলেছে । বামফ্রন্ট সরকার  বিকল্পের কী লক্ষ্য নিয়ে চলেছে তা স্পষ্ট হয়েছে তার কাজের মধ্য দিয়েই ।

রাজনৈতিক বিরোধীদের অনেকে ভুলতে ভালোবাসেন , কিন্তু, রাজ্যবাসী কী করে ভুলবেন, পশ্চিমবঙ্গে শিল্পের বিকাশে বিশেষত বড় শিল্পের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের কী চরম  বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হয়েছিল জ্যোতি বসুর নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকারকে । বক্রেশ্বর তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ার বা হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসের অনুমতি দিতে দশক পার করে দিয়েছিল কেন্দ্র। শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণে । সল্টলেকে ইলেকট্রনিক্স শিল্প স্থাপনে অনুমতি না দেওয়ার কী অজুহাত দিয়েছিল কেন্দ্র ? আজ হাস্যকর মনে হতে পারে , কিন্তু এটাই সত্যি যে ইন্দিরা গান্ধীর সরকার বলেছিল , অনুমতি হবেনা,কারণ, সল্টলেক সীমান্তবর্তী ! রাজনৈতিক কারণেই পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রে নতুন করে বিনিয়োগ করেনি কেন্দ্রীয় সরকার । একদিকে জ্যোতি বসু এর বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত করার উপর জোর দিয়েছেন , অন্যদিকে হাতে যে সুযোগ আছে তা কাজে লাগানোর উপর জোর দিয়েছেন । ক্ষুদ্র শিল্পে পশ্চিমবঙ্গ এক নম্বর হয়েছে । নয়া অর্থনীতি চালু হওয়ার পর শত সমস্যার মধ্যেও শিল্প বিনিয়োগে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ কাজে লাগানোর নির্দিষ্ট পদক্ষেপ  গ্রহণ করতে তিনি উদ্যোগ নিয়েছিলেন । সেখানেও জোর দিয়েছেন সাধারণ মানুষকে নতুন উদ্যোগ সম্পর্কে সচেতন করতে । কিন্তু কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতেই হবে এবং তা বিদ্যমান বাস্তবতার উপর দাঁড়িয়েই শিল্পের নানাবিধ  উদ্যোগের মাধ্যমেই করতে হবে । কৃষির সাফল্যের উপর দাঁড়িয়ে এবং সেই সাফল্য ধরে রেখে কর্মসংস্থানমুখী শিল্পায়নের পথ যে অপরিহার্য তা কমরেড জ্যোতি বসু স্পষ্ট করেই বলেছিলেন । বামবিরোধী রাজনীতির যেহেতু একটা স্বভাব নৈরাজ্য আছে  তাই সাধারণ মানুষের স্বার্থ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার দায়িত্বজ্ঞানহীনতায় তারা দ্বিধাহীন । রাজ্যে ‘পরিবর্তন’-র দুবছর বুঝিয়ে দিয়েছে শিল্পায়ন নিয়ে রাজনৈতিক মিথ্যাচার  রাজ্যবাসীর ভবিষ্যৎকে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে এক  অন্ধগলির সামনে । বামফ্রন্ট সরকার সব সমস্যার সমাধান করে দিতে পেরেছিল এমন কথা জ্যোতি বসু বা বামফ্রন্ট কখনও  বলেননি । কারণ সেটা  সম্ভব নয় । কিন্তু বিদ্যমান পরিস্থির সামনে জনমুখী উন্নয়নের  বিকল্প একটা মডেল  তুলে ধরতে পেরেছিল বামফ্রন্ট সরকার। যার তাৎপর্য শুধু এরাজ্যে নয় , গোটা দেশে।

আশ্চর্য নয় যে, সীমাবদ্ধ ক্ষমতার মধ্যেও বামফ্রন্ট সরকারের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কাজগুলির উপরই সবচেয়ে বেশি আক্রমণ নামিয়ে আনছে তৃণমূল সরকার । প্রতিটি গণতান্ত্রিক বিধি ও প্রতিষ্ঠান এই সরকারের চক্ষুশূল । পঞ্চায়েত নির্বাচন করতে তারা বাধ্য হলো বহু চাপে পড়ে । পুরসভা নির্বাচনেও তাদের আপত্তি । সমবায়গুলির গণতান্ত্রিক পরচালনবিধি তারা মানছেনা । শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে নির্বাচিত ব্যবস্থা,নির্বাচিত ছাত্র ইউনিয়ন,  তাদের ভীষণ অপছন্দ । কারণ, মনোনয়ন মানেই ‘রাজনীতি–মুক্তি’র অজুহাতে  তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের নিরুঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ  এ-কদিনেই স্পষ্ট । জনগণের অধিকারবোধে যারা বিপন্ন , গণতান্ত্রিক কাঠামো তাদের কাছেই বোঝা । সেকারণেই ‘পরিবর্তন’ আসলে গণতন্ত্রের অজস্র সৌধের উপর কালাপাহাড়ী অভিযানের রূপ নিয়েছে । ‘চৌত্রিশ’ বছরের উপর ওদের এত ক্রোধ কি এমনি !

ঘটনাক্রমে কমরেড জ্যোতি বসুর জন্মশতবর্ষ এসেছে  এমন একটা সময়ে যখন রাজ্যে বামপন্থীরা এক প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি । তিনি যখন জীবিত ছিলেন তখনও তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে প্রতিকূলতার মোকাবিলা করতে হয়, এখন জন্মশতবর্ষে  তাঁর জীবন ও কর্ম  বামপন্থী আন্দোলন ও গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষের  কাছে শিক্ষনীয় বহু উপাদান নিয়ে উপস্থিত হয়েছে । কারণ, উদ্যত প্রতিকূলতার সফল মোকাবিলারই অন্য নাম জ্যোতি বসু ।

গণশক্তি, ৭ই জুলাই, ২০১৩

Published in: on জুলাই 10, 2013 at 7:44 অপরাহ্ন  মন্তব্য করুন  

মানুষের ওপরে বিশ্বাস রাখতে হবে,তাঁদের ভালোবাসার যোগ্য হতে হবেঃ জ্যোতি বসু

১৯৭৭ সালে এরাজ্যে যখন বিধানসভা নির্বাচনের দিন ঘোষণা হলো, তার আগে একটানা পাঁচ-ছয় বছর ধরে কংগ্রেস সরকার এবং কংগ্রেস দলের পক্ষ থেকে ভয়াবহ সন্ত্রাস নামিয়ে আনা হয়েছে। ১৯৭২ সাল থেকে প্রায় ১২০০ সি পি আই (এম) নেতা-কর্মীকে খুন করা হয়েছে, হাজার হাজার নেতা-কর্মী বাড়ি ছাড়া, পার্টি অফিস, ট্রেড ইউনিয়ন অফিস দখল হয়ে গেছে। দেশে জরুরী অবস্হা কায়েম হয়েছে। আধা-ফ‌্যাসিস্ট সন্ত্রাসের সেই শ্বাসরোধকারী অবস্হার মধ্যে যখন নির্বাচন হলো, তখন আমরা ভাবিনি যে মানুষ আমাদেরই বিপুলভাবে জয়ী করবেন এবং পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হবে।

কিন্তু মানুষ যে কংগ্রেসকে ক্ষমা করেনি, ১৯৭৭ সালে তা প্রথম সুযোগেই প্রমাণিত হলো। কংগ্রেস গোটা দেশেই ধরাশায়ী হলো, এরাজ্যে তো বটেই। পশ্চিমবঙ্গে প্রথম বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হলো। তারপর থেকে টানা সাতবার এরাজ্যের মানুষ বামফ্রন্টকে জয়ী করে শুধু ভারতেই নয়, গোটা পৃথিবীর সংসদী‌য় গণতন্ত্রের ইতিহাসে ন‍‌জির তৈরি করেছেন। আজ এরাজ্যে বামফ্রন্ট সরকার ৩২ বছরে পড়লো। এই উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গের সংগ্রামী মানুষকে আমি আরেকবার অভিনন্দন জানাচ্ছি।

আমরা যখন সরকারে এলাম, খুবই সীমিত আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা নিয়ে কাজ শুরু করতে হয়েছিলো। তা সত্ত্বেও আজ এটা স্বীকৃত, এই সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার মানুষের স্বার্থে অনেক কাজ করতে পেরেছে।  আমরা যে এতদিন সরকারে রয়েছি, তা মানুষের ইতিবাচক রায়েই রয়েছি।  পাশাপাশি, বামফ্রন্ট সরকার গোটা দেশের সামনে মানুষের স্বার্থে বিকল্প কর্মসূচীর একটা নজিরও তুলে ধরতে পেরেছে । জাতীয় রাজনীতিতেও বিভিন্নভাবে আমাদের সাফল্যের ছাপ পড়েছে। জোট সরকার মানেই যখন অস্হিতিশীল, বিশৃঙ্খল পরিস্হিতি বলে প্রমাণ হচ্ছিলো, তখন এরাজ্যে  বামফ্রন্ট সরকার স্হিতিশীল, শান্তির পরিবেশ এবং জনমুখী উন্নয়নের নজির তৈরি করে গোটা দেশের সামনে একটি উজ্জ্বল ব্যাতিক্রম তুলে ধরেছে ।

শুধু জোট রাজনীতির প্রশ্নেই নয়, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকেও সামনে তুলে এনেছিল বামফ্রন্ট সরকারই। আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং একেবারে নিচুতলায় অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটানোর ক্ষেত্রে  পশ্চিমবঙ্গ গোটা দেশের সামনের সারিতে।  একথা আজ সকলেরই জানা যে এরাজ্যের ত্রিস্তর পঞ্চায়েতী ব্যবস্হাকে মডেল করেই গোটা দেশে তা রূপায়ণের জন্য আইন তৈরি করা হয়েছে। ভূমি সংস্কার, কৃষি ও গ্রামোন্নয়নের ক্ষেত্রেও এই সরকারের সাফল্য সর্বজনস্বীকৃত। পাশাপাশি, গণতান্ত্রিক পরিবেশ, শান্তি-সুস্হিতি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিরবছ্ছিন্নভাবে বজায় রাখার ক্ষেত্রেও দেশের সামনে এরাজ্য উদাহরণ।

১৯৭৭ সালের ২১শে জুন, সরকারে আসার প্রথম দিনই আমরা ঘোষণা করেছিলাম, শুধু মহাকরণ থেকে এই বামফ্রন্ট সরকার চলবে না। আমরা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করবো। পঞ্চায়েত এবং পৌরসভার মাধ্যমে সেই কাজও  করা  হয়েছে। আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করে আমরা গ্রামের গরিব মানুষের হাতে ক্ষমতা পৌঁছে দিয়েছি। বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হওয়ার এক বছরের মধ্যেই  ১৯৭৮ সালে প্রথম পঞ্চায়েত নির্বাচন হয়। সেবছর ভয়াবহ বন‌্যার ত্রাণ ও পুনর্গঠনে পঞ্চায়েতের মাধ্যমে যে অসাধারণ কাজ হয়েছিল, তাতেই মানুষ বুঝেছিলেন এই ব্যবস্হা আমাদের প্রয়োজন। তখনই শুরু হয় জমি বিলি, অপারেশন বর্গা ইত‌্যাদির কাজ। শুনলাম, এবারে পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে আমাদের বিরুদ্ধে প্রচার করা হয়েছে, বামফ্রন্ট সরকার নাকি কৃষকের জমি কেড়ে নেবে। এসব ডাহা মিথ‌্যা কথা। এরাজ্যে গ্রামের লক্ষ লক্ষ ভূমিহীন গরিব মানুষকে আমরাই জমি দিয়েছি। এরাজ্যে এপর্যন্ত ১১ লক্ষ  একর জমি বিলি হয়েছে, এখনও বিলির কাজ চলছে। এই জমি পেয়েছেন ২৯ লক্ষ ৮১ হাজার ভূমিহীন ক্ষেতমজুর, গরিব কৃষক। সারা দেশে মোট জমি বিলির ২২ শতাংশই এরাজ্যে হয়েছে, মোট উপকৃতের ৫৪ শতাংশও এরাজ্যেই। জোতদার-জমিদারদের স্বার্থে এই কংগ্রেস দলই সেই সময় একাজে বাধা দিয়েছিল, অনেক মামলাও করেছিল। কিন্তু আমরা পিছু হঠিনি। অপারেশন বর্গার মাধ্যমে বর্গাদারদের নাম নথিভুক্ত করে তাঁদের জীবিকার নিরাপত্তাও দেওয়া হয়েছে।

কৃষিতেও আমরা অনেক সাফল্য পেয়েছি, খাদ্যে স্বনির্ভর হয়েছি। সারা দেশে কৃষি উৎপাদনে আমরাই শীর্ষে। কিন্তু কৃষিক্ষেত্রে আরো উন্নতির সুযোগ রয়েছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহায্য নিয়ে আমাদের কৃষির মান আরো উন্নত করতে হবে। কৃষিতে উন্নততর প্রযুক্তির প্রয়োগ, অকৃষি জমিকে চাষযোগ্য করা, একফসলী জমিকে বহুফসলী করা, উচ্চ ফলনশীল বীজের ব্যবহার বাড়ানো, ফসলের বৈচিত্র্যকরণ প্রভৃতি কাজ আমাদের করতে হবে ।

শিল্পেও আমাদের এগোতে হবে। সপ্তম বামফ্রন্ট সরকার সেই লক্ষ্যে পদক্ষেপ নিয়েছে। শিল্পবিকাশের প্রশ্নেও আমরা বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই কাজ করছি। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গ আর্থিক ও অন্যান্য ক্ষেত্রে কেন্দ্রের চরম বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হয়েছে।  ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার তৈরি হওয়ার পরে কেন্দ্রের এইসব বাধা অতিক্রম করেই আমরা শিল্পস্হাপনের নীতি নিই। নয়ের দশকের গোড়ায় যখন মাসুল সমীকরণ নীতি ও লাইসেন্স প্রথা তুলে নেওয়া হলো, তখন আমাদের সামনে আরও সুযোগ এলো। আমরা যখন বণিকসভাগুলিতে গিয়ে এরাজ্যে বিনিয়োগের আবেদন জানাচ্ছিলাম, তখন তাঁরা আমাদের বললেন, আপনারা যে নীতির ভিত্তিতে এখানে শিল্প গড়ার কথা বলছেন, সেটা লিখিতভাবে দিলে সুবিধা হয়। তখন ১৯৯৪ সালে আমরা বিধানসভায় বর্তমান শিল্পনীতি ঘোষণা করি। সেই নীতি অনুসারেই সরকার কাজ করছে।

কিছুদিন আগে রাজ্যে সপ্তম পঞ্চায়েত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। নির্বাচনে আমাদের ফল কিছুটা খারাপ হয়েছে। অনেক মানুষ আমাদের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। কেন তাঁরা আমাদের বিরুদ্ধে গেলেন তা খুঁজে বের করতে হবে। পর্যালোচনার সেই কাজ এখন জেলায় জেলায় চলছে।  তবে এবারে আমাদের বিরুদ্ধে যে একটা সুবিধাবাদী মহাজোট হয়েছিল, সেটা এই ফলাফলে বোঝা গেলো।  চরম দক্ষিণপন্হী শক্তির সঙ্গে যারা নিজেদের বামপন্হী বলে, তারাও আমাদের বিরুদ্ধে একজোট হয়েছিল। আর অস্ত্র নিয়ে যারা আমাদের পার্টির নেতা-কর্মীদের খুন করছে, তারাও এদের সাহায্য করছে। এটা অত্যন্ত দূর্ভাগ্যজনক যে কংগ্রেসও খোলাখুলি বলেছে এদের ভোট দিতে। এমন একটা জোট, যার কোনও নীতি-নৈতিকতা নেই, কোনও কর্মসূচী নেই, খালি বামফ্রন্ট এবং বিশেষকরে সি পি আই (এম) বিরোধিতাই যার একমাত্র লক্ষ্য। আমাদের বিরুদ্ধে অসম্ভব মাত্রায় মিথ‌্যা প্রচার ও কুৎসাও হয়েছে গত এক-দেড়বছর ধরে। এই অপপ্রচার কিছু মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পেরেছে।   

তাছাড়া এবারে বামফ্রন্টে আমাদের পুরো ঐক্য হয়নি। কিন্তু এটাও ঠিক যে গতবারেও বামফ্রন্টে আমরা সার্বিক ঐক্য করতে পারিনি। তিনটি স্তরেই অনেক জায়গায় বিরোধ ছিল। গতবার ফরওয়ার্ড ব্লক ও আর এস পি-র সঙ্গে বেশ কিছু জায়গায় ঐক্য হয়নি, প্রায় ১০ হাজার আসনে। যাতে সার্বিক ঐক্য হয়, তার জন্য খুবই চেষ্টা করা হয়েছিল আমাদের পার্টির পক্ষ থেকে। এবারেও আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে ইশতেহার প্রকাশ করেছি। আমরা চেষ্টা করেছি যতখানি সম্ভব বেশি আসনে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করতে। আমাদের পার্টির কথা বলতে পারি, আমরা আগেও ত‌্যাগ স্বীকার করেছি, এখনও রাজি আছি। আমরা এবারেও অনেক আসন ছেড়ে ঐক্য করার চেষ্টা করেছি। আমাদের সকলকেই এর থেকে শিক্ষা নিতে হবে। আমাদের পার্টি, ফরওয়ার্ড ব্লক, আর এস পি, সকলকেই। বামফ্রন্টের ঐক্যকে যাতে আরো দৃঢ় করতে পারি, তার জন্য আমাদের সকলকে উদ্যোগ নিতে হবে। আমার কথা হলো, আমরা এরাজ্যে বামফ্রন্টের যে নজির সৃষ্টি করেছি, তার উদাহরণ গোটা দেশে কোথাও নেই। একে রক্ষা করতে হবে।

আমার বিশ্বাস আছে, রাজ্যের মানুষ কখনই কোনও সুবিধাবাদী জোট বা সুবিধাবাদী দলকে মেনে নেবেন না। পশ্চিমবঙ্গের মানুষের চেতনা আছে, তাঁরা  অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে উপলব্ধি করেছেন কে শত্রু, কে মিত্র।  আমি শুধু একটা কথাই বলবো, মানুষের ওপরে আমরা যেন বিশ্বাস না হারাই। মানুষের কাছে বারবার যেতে হবে, ত‌াঁদের ভালোবাসা আমাদের পেতে হবে। পঞ্চায়েত নির্বাচনে আমাদের বিরুদ্ধে যারা চলে গেছেন তাঁদেরকে আবার আমাদের দিকে টেনে আনতে হবে। শুধু তাঁদেরকেই নয়, আরো নতুন নতুন মানুষকেও টেনে আনতে হবে। পাশাপাশি নিজেদের যে ভুল আছে তাও শুধরে নিতে হবে।

একটা জটিল রাজনৈতিক অবস্থার মধ্যে দিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি। আমাদের এটাও মনে রাখা দরকার,পশ্চিমবঙ্গ,‍ কেরালা, ত্রিপুরায় আমরা যে বাম সরকারগুলি চালাচ্ছি তা এই বুর্জোয়া সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই। আমরা এই পুঁজিবাদী সাংবিধানিক কাঠামোতে কখনও বলতে পারি না, এই সরকারগুলি সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচী রূপায়ণ করবে। সাম্যবাদ, সমাজতন্ত্র আমাদের লক্ষ্য; শ্রেণীহীন, শোষণহীন সমাজব্যবস্থা আমরা গড়তে চাই।  সেটা আমাদের লক্ষ্য।  সেই লক্ষ্যে আমাদের পৌঁছোতে হবে।  

২১শে জুন, ২০০৮, গণশক্তি

Published in: on জুন 30, 2010 at 4:42 অপরাহ্ন  মন্তব্য করুন  

কমরেড মণি সিংহকে স্মরণ করা জরুরীঃ জ্যোতি বসু

বিশিষ্ট কমিউনিসট নেতা মণি সিংহ স্মরণে গ্রন্থ প্রকাশিত হচ্ছে জেনে খুশি হলাম। এই উপমহাদেশে একেবারে গোড়ার যুগ থেকে যারা কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, মণি সিংহ তাদের অন্যতম। কৈশোরেই তিনি অনুশীলন সমিতির বিপ্লববাদী কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন। পরবর্তী কালে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদেন। বিশের দশকের শেষের দিকে তিনি কলকাতার মেটিয়াবুরুজ অঞ্চলে শ্রমিকদের সংগঠিত করার কাজে নেমে পড়েন। ঐ সময়ে কলকাতা ও তার আশপাশে বেশ কিছু শ্রমিক ধর্মঘটে তিনি সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন। ১৯২৮ সাল থেকে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী হন। সেই সময় মুজফ্ফর আহমদ, বঙ্কিম মুখার্জি, ধরণী গোস্বামী, আবদুর রেজ্জাক খাঁ, আবদুল মোমিন, রাধারমণ মিত্র, গোপেন চক্রবর্তী প্রমুখের সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন।

তখন কমিউনিস্ট পার্টি অব গ্রেট ব্রিটেনের (সিপিজিবি) পক্ষ থেকে যেসব নেতাকে ফিলিপ স্প্রোট, বেন ব্রাডলি ভারতে পাঠানো হয়েছিল তাদের সঙ্গেও মণি সিংহ শ্রমিকদের সংগঠিত করার কাজে যুক্ত ছিলেন। ১৯২৯ সালে মীরাট ষড়যন্ত্র মামলায় মণি সিংহ গ্রেফতার না হলেও পুলিশ তার বাসস্থান ও ইউনিয়ন অফিস দীর্ঘক্ষণ তল্লাশি করেছিল। ১৯৩০ সালে চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ সংগঠিত হওয়ার পর বাছবিচার না করে ব্রিটিশ সরকার শত শত রাজনৈতিক কর্মীকে গ্রেফতার করে এবং মণি সিংহও ঐ বছর গ্রেফতার হন। বিভিন্ন জেল, ক্যাম্প ঘুরিয়ে এনে ১৯৫৩ সালে ময়মনসিংহ জেলার সুসং-এ তার নিজের বাড়িতে তাকে নজরবন্দী করে রাখা হয়।

এই সময় থেকে মণি সিংহ কৃষক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়তে থাকেন। ১৯৩৭ সালে বাঁকুড়ার পত্রসায়রে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কৃষক সভায় প্রথম রাজ্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং কয়েক বছরের মধ্যেই কৃষক সভার সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পায় উল্লেযোগ্য হারে। এই অবস্থায় ময়মনসিংহের হাজং ও অন্যান্য দরিদ্র কৃষকরা শোষণমূলক টংক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হওয়ার সুযোগ পায় এবং সমগ্র জেলায় দীর্ঘস্থায়ী কৃষক আন্দোলনের সুত্রপাত ঘটে। সুসং ও সন্নিহিত অঞ্চলের হাজং ও মুসলমান কৃষকদের যে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল তার অন্যতম শীর্ষ নেতা ছিলেন মণি সিংহ।

এ প্রসঙ্গে স্মরণীয়, আমি ১৯৪০ সালে বিলেত থেকে দেশে ফিরি ও তখন থেকে কমিউনিস্ট পার্টির হয়ে কাজ করতে শুরু করি। ১৯৪২ সালে ময়মনসিংহের নেত্রকোনা শহরে ফ্যাসিবিরোধী সম্মেলন হয়। সেই সম্মেলনে বঙ্কিম মুখার্জি, ভুপেশ গুপ্ত, মণিকুন্তলা সেনের সঙ্গে আমিও নেত্রকোনায় গিয়েছিলাম। যতদূর মনে পড়ছে ঐ রকম সময়েই মণি সিংহের সঙ্গে আমার আলাপ হয়। তারপরেও আমি পূর্ববঙ্গে ও বিশেষত ময়মনসিংহে বেশ কয়েকবার গিয়েছি। তা’ছাড়া আমার দুই সহকর্মী ভুপেশ গুপ্ত ও স্নেহাংশু আচার্য-দু’জনেরই বাড়ি ছিল ময়মনসিংহে। তাঁদের বাড়িতে আমি গিয়েছি। সুসং যখন মুক্ত এলাকা ঘোষিত হয়, তখন মণি সিংহ সেই মুক্ত এলাকায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। স্নেহাংশু আমাকে নিয়ে খেত-মাঠ ভেঙ্গে জিপ চালিয়ে সেখানে গেল। যথার্থই মুক্ত এলাকা। চারদিকে লাল পতাকা উড়ছে। সেখান থেকে বক্তৃতা দিয়ে ফেরার সময়ে গাড়িতে আমাদের সঙ্গে আত্মগোপনকারী দু’জন কর্মী ছিলেন। ফেরার পথে মিলিটারি আমাদের ধরল। তাদের আলো দেখেই দু’জন কর্মী গাড়ি থেকে নেমে গা-ঢাকা দিলেন। আমাদের ধরে মিলিটারিরা থানায় নিয়ে গেল। স্নেহাংশু ময়মনসিংহ মহারাজার ছেলে বলে নিজের পরিচয় দেয়াতে আমাদের ছেড়ে দিল। আমি তখন বিধান সভার সদস্য। অবশ্য ময়মনসিংহে ফিরে আসার পরই তারা আমাকে এক ‘এক্সটার্নমেন্ট অর্ডার’ ধরিয়ে দিল। অগ্যতা আমাকে সেখান থেকে চলে আসতে হলো। 

যতদূর মনে পড়ছে তখন জনৈক মিস্টার বাস্টিন ছিলেন মৈমনসিংহের জেলাশাসক। তিনি ছিলেন অক্সফোর্ড থেকে পাস করে আসা ছাত্র। তিনিই আমাকে এক্সটার্নমেন্ট অর্ডার ধরিয়ে দেন। আমি কলকাতায় এসে বিধান সভায় পয়েন্ট অব অর্ডার তুলি। তখন সোহরাওয়ার্দী বাংলার প্রধান মন্ত্রী। তাকে বলি, ঐ জেলাশাসক কী করে আমাকে ময়মনসিংহ থেকে বহিষ্কার করলেন? তিনি নাকি আবার অক্সফোর্ডের পন্ডিত। তাই শুনে সোহরাওয়ার্দী বললেন, উনি আপনার প্রতি অন্যায় করেছেন। যাকগে যা হয়ে গেছে তা ভুলে যান আপনি। এ ঘটনা আমার পুঙ্খানুপুঙ্খ মনে নেই। তবে দেখলাম মণি সিংহ তার জীবন সংগ্রাম বইতে এ বিষয়ে লিখেছেন। তিনি লিখছেন, ” জ্যোতি বসু ও স্নেহাংশু আচার্য তার ময়মনসিংহ পৌঁছে জিপযোগে নালিতাবাড়ি যান। নালিতাবাড়ির প্যারামিলিটারির কমান্ডার তাদের আটক করেন এবং তাদের নিকট থেকে ক্যামেরা কেড়ে নেয়া হয়। কমান্ডার ছিলেন অবাঙালী। তাদের বলা হয়, তোমরা এখানে এসেছ কেন? তোমাদের আগামী কাল ময়মনসিংহ জেলে পাঠানো হবে। জ্যোতি বসু তখন একজন এমএলএ-আইন পরিষদের সদস্য, ব্যারিস্টারও বটে। জ্যোতি বসু ও স্নেহাংশু আচার্য দু’জনই ব্যারিস্টার। তারা দুই ঘণ্টা তর্ক-বিতর্ক করলেন, কিন্তু কাজ হলো না। তখন স্নেহাংশু আচার্য অন্য উপায় না দেখে শেষ অস্ত্র নিক্ষেপ করলেন। স্নেহাংশু বললেন, জান আমি কে? আমি ময়মনসিংহের রাজকুমার। একথা বলার পর ভোল পালটে গেল। ‘তুমি মহারাজকুমার!’ কমান্ডার বললেন, তোমাদের জন্য কি করতে পারি? চা প্রভৃতি এসে গেল, ক্যামেরা ফেরত দেয়া হলো। কমান্ডার বললেন, ‘জিপ লাগলে আর একটা জিপ নিয়ে যাও।’ সেখান থেকে ফিরে স্নেহাংশু আচার্য আমাকে বলেছিলেন, ‘দেখুন আপনারা সামন্ততন্ত্র উচ্ছেদের জন্য লড়াই করছেন কিন্তু মানুষের মধ্যে সামন্ততন্ত্রের উপর কি শ্রদ্ধা! এই তো দেশের অবস্থা।’ 

এ প্রসঙ্গে বলি, হাজং অঞ্চলে কৃষকদের উপর যে অত্যাচার হয়েছিল সে বিষয়ে ১৯৪৭ সালে আমি ও স্নেহাংশু আচার্য কমিউনিস্ট পার্টির তরফে রিপোর্ট সংগ্রহ করেছিলাম। রেইন অব টেরর ওভার দি হাজংস-এ ‘রিপোর্ট অব দি এনকোয়ারি কমিটি’ নামে ঐ দলিলটি জওহরলাল নেহরুর কাছে পাঠানো হয়েছিল। 

দেশ ভাগের পর যে অল্প কয়জন কমিউনিস্ট নেতা পূর্ব পাকিস্তানে থেকে যান মণি সিংহ তাদের অন্যতম। তারপর থেকে মণি সিংহের সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ আর ছিল না। যদিও পূর্ব পাকিস্তান তথা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের কৃষক, শ্রমিকসহ অজস্র গণ-আন্দোলনে, বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে মণি সিংহ নেতৃত্ব দিয়েছেন। কমিউনিস্ট আন্দোলনকে প্রসারিত করার কাজে তার প্রচেষ্টা, আত্মত্যাগ, ভোলার নয়। আজ তাকে স্মরণ করার মধ্যে দিয়ে আমাদের বুঝতে হবে ফেলে আসা দিনগুলিতে কমিউনিস্ট আন্দোলনে সাফল্য কি, তার ব্যর্থতাইবা কোথায়। এটা বুঝতে পারলে আমাদের ভবিষ্যত চলার পথ আমরা ঠিক করতে পারব। শুধু বাংলাদেশেই নয়, এই গোটা উপমহাদেশে খেটে-খাওয়া মানুষের জীবন যন্ত্রণার উপশম হয়নি বরং তা আরও বেড়েছে। 

সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমাদের এখনও অনেক পথ চলা বাকি। মণি সিংহদের মতো নেতাদের অবদানকে স্মরণ করা জরুরী। কত অসুবিধার মধ্যে কত অত্যাচারের মুখোমুখি হয়ে যে তাদের কাজ করতে হয়েছে তা আজকের প্রজন্মের অনেকের পক্ষে হয়তো আন্দাজ করাই সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা যদি তাদের কাছে মণি সিংহদের কথা তুলে ধরতে পারি তবে তারা লড়াই করার নতুন প্রেরণা পাবেন। গ্রন্থ প্রণয়নের উদ্যোক্তাদের আমি ধন্যবাদ জানাচিছ। 

www.sangbad.com.bd

ঢাকা বুধবার, ১৪ মাঘ ১৪১৬, ১০ সফর ১৪৩১, ২৭ জানুয়ারি ২০১০

Published in: on জুন 30, 2010 at 4:36 অপরাহ্ন  মন্তব্য করুন  

মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে বামফ্রন্ট সরকারঃ জ্যোতি বসু

পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের কার্যকালের মেয়াদ পাঁচ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। এই সরকারের কার্যধারা পরিচালনার ক্ষেত্রে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র কর্মসূচী সম্পর্কে আমাদের উপলদ্ধির প্রতিফলন রয়েছে। দেশের বিভিন্ন রাজ্যে এই ধরনের সরকার গঠনের সম্ভাবনার কথা পার্টির কর্মসূচীতে বলা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে কর্মসূচীর ১১২নং অনুচ্ছেদ স্মরণ করা যেতে পারে।

পার্টির কর্মসূচী

১১২নং অনুচ্ছেদে তিনটি প্রধান বক্তব্য রাখা হয়েছে। প্রথমত বলা হয়েছে, ভারতীয় রাষ্ট্রের পুঁজিবাদী-সামন্ততান্ত্রিক শ্রেণী চরিত্র সত্ত্বেও বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তির পক্ষে গণ-আন্দোলনের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিভিন্ন রাজ্যে সরকার গঠন করা সম্ভব। দ্বিতীয়ত, এই ধরনের সরকার যদিও বর্তমান সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে কোন মৌলিক পরিবর্তন সাধনে সক্ষম হবে না, তথাপি এমন কিছু সংস্কারমূলক কাজের উদ্যোগ নিতে ও সেগুলি রূপায়িত করতে পারে। যার ফলে জনগণের জীবনযাত্রার মানের কিছুটা উন্নতি সম্ভব এবং আরো উন্নত ভবিষ্যতের জন্য জনগণের সংগ্রামে সেই কার্যধারা নিশ্চিতভাবেই সহায়কশক্তি হিসাবে কাজ করে যেতে পারে। তৃতীয়ত এই ধরনের সরকারের কর্মসূচী রূপায়ণের অভিজ্ঞতা থেকে জনগণ পুঁজিবাদী জমিদারী ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠেন ও এই রকম ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করতে গিয়ে একটি রাজ্যের বামপন্থী সরকার কী ধরনের চরম বাধা ও সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হয় সে বিষয়ে শিক্ষালাভ করার প্রভূত সুযোগ পান। পরিস্থিতি সম্পর্কে যথার্থ ধারণা জন্মালেই জনগণ মৌলিক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে নিশ্চিত প্রত্যয়ে পৌঁছবেন এবং তখনই বাঞ্ছিত পরিবর্তনের জন্য শ্রেণীশক্তিকে সংহত করে তোলা সম্ভব হয়ে উঠবে।

বাধা

দলীয় কর্মসূচীর উপরোক্ত ধারাগুলির দ্বারা নির্দেশিত হয়ে এবং পশ্চিমবঙ্গের ১৯৬৭ ও ১৯৬৯-৭০ সালের স্বল্পস্থায়ী দুটি যুক্তফ্রন্ট সরকারের আমলে অর্জিত অভিজ্ঞতার দ্বারা পুষ্ট হয়ে ১৯৭৭ সালের জুন মাস থেকে আমরা বামফ্রন্ট সরকারে কাজ করে চলেছি। এই সময়ের মধ্যে রাজ্যের জনগণের বিপুল অংশের অনুকূলে বেশ কিছু পরিবর্তন সাধনে আমরা সমর্থ হয়েছি। এবং সঙ্গে সঙ্গে সরকার পরিচালনা করার অভিজ্ঞতা থেকে আমরা এও বু‍‌ঝেছি যে আমাদের ক্ষমতা অত্যন্ত সীমাবদ্ধ এবং আমাদের কর্মসূচী রূপায়ণের পথে বিপুল বাধা রয়েছে।

পুঁজিবাদী-জমিদারী ব্যবস্থাই যে একটি বামফ্রন্ট সরকারের কর্মসূচী রূপায়ণের পক্ষে মূল বাধা সে সম্পর্কে আমরা অবহিত। তারই পাশাপা‍শি অন্যান্য বাধাগুলিও লক্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, আমাদের সংবিধানে যেভাবে কেন্দ্র ও রাজ্যের আইন-প্রণয়ন ক্ষমতার সীমানা বেঁধে দেওয়া হয়েছে তারই দৃষ্টান্ত ধরা যেতে পারে। কেন্দ্র ও রাজ্যের ক্ষমতা বিন্যাস প্রসঙ্গ ছাড়াও সংবিধানের সে সব ধারাও কম আপত্তিকর নয় যেগুলি কেন্দ্রকে রাজ্যের এক্তিয়ারভুক্ত বিষয়গুলিতেও নাক গলাবার অধিকার দিয়েছে। রাজ্য আইনসভা কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন আইনে রাষ্ট্রপতির সম্মতির সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কথা এখানে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখতে পাচ্ছি, ভূমি, শ্রম, শিক্ষা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বিধানসভায় প্রণীত আইনগুলি রাষ্ট্রপতির সম্মতির অপেক্ষায় আটকে পড়ে আছে। সংবিধানের রাজ্য তালিকার তাৎপর্য তাহলে কোথায় যদি কেন্দ্র রাজ্য-বিধানসভায় অনুমোদিত আইনগুলিকে বলবৎ করতে এভাবে বিলম্ব ঘটায় অথবা সেগুলির প্রয়োগই করতে না দেয়? আমরা মনে করি এ ধরনের সরকার কর্তৃক সংগঠিত সংস্কারসমূহ জনগণের পক্ষে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানের পুঁজিবাদী-জমিদারী সামাজিক কাঠামোর এই সংস্কারগুলি যে শেষ কথা নয় এ বিষয়ে অবশ্য সম্যক উপলব্ধি দরকার। কায়েমী স্বার্থের বিরুদ্ধে খেটে-খাওয়া মানুষের সংগ্রামে বামপন্থী সরকারের সমর্থন নিশ্চিতভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। সরকার ও পার্টির অবিরাম উদ্দেশ্য হলো বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহকে মজবুত করা এবং রাজ্যের জনগণকে তাঁদের অর্জিত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এভাবে সচেতন করে তোলা যাতে তাঁরা অনুধাবন করতে পারেন যে শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের উন্নতিতেই তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা সীমাবদ্ধ নয়। তাঁরা সারা ভারতবর্ষের সংগ্রামী মানুষকে সাহায্য করছেন তাঁদের বলিষ্ঠ দৃষ্টান্তের মাধ্যমে। এই ধরনের সরকার স্বৈরতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেই শুধুমাত্র জনগণকে সাহায্য করে না, পুঁজিবাদী জমিদারী বন্ধন থেকে মুক্তির জন্য মানুষের চূড়ান্ত সংগ্রামে সহায়ক হয়।

একটি রাজ্যের বামপন্থী সরকারকে এমনভাবে কাজ করতে হয় যাতে বোঝা যায় যে এই সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি কায়েমী স্বার্থের পরিপোষক কোনো সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। জনগণ তখন বামপন্থী সরকারের নীতি ও কর্মসূচীর সঙ্গে ধনিক ও ভূস্বামীশ্রেণীর প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারগুলির কার্যকলাপের তুলনা করতে সক্ষম হন। আমাদের বামফ্রন্ট সকারের কর্মসূচী রূপায়ণের ক্ষেত্রে এবং কার্যধারার মধ্যে যে ভিন্ন ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি বিরাজ করে এবং সেই দৃষ্টিভঙ্গি যে উচ্চতর মানের এবিষয়ে রাজ্যের তথা অন্য রাজ্যের মানুষও বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন। আর জনগণের এই বিশ্বাসের প্রবর্তনার মধ্যেই আমাদের কাজের যথার্থ সাফল্য। বর্তমানের নানান সীমাবদ্ধতা ও বাধা সত্ত্বেও জনগণের আস্থা আমাদের সম্বন্ধে যত দৃঢ় হবে ততই তাঁদের রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়বে এবং এই সব সীমাবদ্ধতা ও বাধা অপসারণের জরুরী প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তাঁরা সজাগ হবেন। এ ধরনের একটা পরিস্থিতি অন্য রাজ্যের সাধারণ মানুষের চেতনা বৃদ্ধিতে খুবই সহায়ক হবে এবং সমাজ-কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তনের প্রয়োজনকে দ্রুততর করবে। এমন অবস্থা যদি না আসে তাহলে আমাদের পার্টির কর্মসূচীর পরিপ্রেক্ষিতে কোনো বামফ্রন্ট সরকারের প্রতিষ্ঠা ও কার্যক্রমের যৌক্তিকতা থাকে না।

বামফ্রন্ট সরকার ও গণ-সংগঠন

বামফ্রন্টের ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে গণ-সংগঠনগুলির কাজের রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতও পালটে গেছে। কংগ্রেসী আমলে জনগণের বিভিন্ন অংশের দাবি-দাওয়া পূরণের জন্য এই সব গণ-সংগঠনের তরফে নানা ধরনের আন্দোলনের ও প্রচারাভিযানের প্রয়োজন হতো। তখন বিশেষ কিছু ধরনের আন্দোলন অনিবার্য হয়ে পড়েছিল যেহেতু এরকম ধারণা দৃঢ় ছিল যে তদানীন্তন সরকার জনগণের দাবি সম্পর্কে সহানুভূতিশীল নয় এবং ধারাবাহিক আন্দোলন ছাড়া দাবি আদায়ে তাদের মোটেই সম্মত করা যাবে না। সঙ্গে সঙ্গে এটাও ভাবা হয়েছিল যে প্রশাসন ও পুলিসের পক্ষে কী জোতজমির ক্ষেত্রে, কী শিল্প ব্যবসার ক্ষেত্রে কায়েমী স্বার্থের অনুকূলেই হস্তক্ষেপ করা হবে। তখনকার পরিস্থিতিতে গণ-সংগঠনের কাজের সাফল্য নিরূপিত হতো ধর্মঘটের সময়ে তারা কতগুলি শ্রম দিবস নষ্ট করতে সমর্থ হয়েছে তার ভিত্তিতে।

পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অতীত আমলের সঙ্গত ধারণা ও আন্দোলনের প্রকৃতি পালটে গেছে। বর্তমানে এই রাজ্যে শোষিত শ্রমিকশ্রেণীর প্রতি দরদী একটি সরকার ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত আছে। সরকারী সমর্থন পিছনে থাকার জন্য এবং শ্রমজীবী মানুষ সংগঠিত থাকার দরুন এখন জনগণের বিভিন্ন অংশের অনুকূলে এবং কায়েমী স্বার্থের বিরুদ্ধে বহু বিরোধের নিষ্পত্তি সম্ভব হচ্ছে। ধর্মঘট বা অন্যান্য সে ধরনের সংগ্রামের পথে সব সময়ে যেতে হচ্ছে না। কায়েমী স্বার্থের লোকেরাও একথা বুঝেছেন যে বর্তমান সরকার শোষিত মানুষের সমর্থনপুষ্ট হয়েই ক্ষমতায় এসেছে এবং তাঁদের স্বার্থ দেখে চলেছে। সুতরাং সরকারী যন্ত্রকে আর এমনভাবে ব্যবহার করা হবে না যাতে কায়েমী স্বার্থের মুখের দিকে তাকিয়ে শোষিত মানুষের স্বার্থ জলাঞ্জলি দেওয়া হয়। বিরোধের মীমাংসার সময়ে সরকারের পুরোপুরি সমর্থন শ্রমিকশ্রেণীর ন্যায়সঙ্গত দাবির পিছনেই থাকছে।

এই নতুন পরিস্থিতিতে শ্রেণী সংঘর্ষের তীব্রতা অথবা প্রচারাভিযানের সাফল্য পরিমাপ করার জন্য কেবলমাত্র ক’টি ধর্মঘট সংগঠিত হলো অথবা কতগুলি শ্রম দিবস নষ্ট হলো তার হিসেব নিলে চলে না। এখন দেখতে হবে তাদের দাবি কতটা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বিবেচিত হচ্ছে অথবা আন্দোলনের ফলে তাদের ন্যায্য পাওনা কতটা মেটানো যাচ্ছে। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে, সরকার তাদের পক্ষে থাকার জন্য শ্রমিকশ্রেণী চুক্তির সময়ে নিজেদের শর্ত অধিক মাত্রায় প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছে। একথা শিল্প-বিরোধের ক্ষেত্রে যেমন প্রযোজ্য তেমনি গ্রামাঞ্চলে কৃষি মজুরির ক্ষেত্রেও সমভাবে বলা যায়। সেখানেও অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটেছে। জমি থেকে উৎখাতের ভয় কাটছে। সে ব্যাপারে নিরাপত্তার সূচনা হয়েছে এবং বর্গাদাররা ফসলের ভাগ উচ্চহারে পাচ্ছেন। বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগে এবং দরিদ্র মানুষের অনুকূলে সরকারী হস্তক্ষেপের দরুন শ্রমজীবী সম্প্রদায়ের বেশির ভাগ মানুষ তাদের উপার্জন, চাকরির শর্ত এবং নিরাপত্তা উন্নত করতে পেরেছেন। জনগণের আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়েছে। কিন্তু কায়েমী স্বার্থবাদীদের মধ্যে কিছু কিছু অংশ শ্রমিকশ্রেণীর ন্যায়সঙ্গত ও ন্যূনতম দাবি মেনে নেননি এবং সরকারের পরামর্শও শোনেনি। তার ফলে বিরোধের মীমাংসার পূর্বে কোন কোন ক্ষেত্রে ধর্মঘট অথবা লক-আউট হয়েছে।

নতুন পরিস্থিতির মূল্যায়নগত ত্রুটি থেকে কিন্তু দু’ধরনের বিভ্রান্তি দেখা দিতে পারে। সেই দুই বিভ্রান্তির ফাঁদ থেকে আমাদের দূরে থাকতে হবে। প্রথমত, গণ-সংগঠনের দাবি পূরণের জন্য রাষ্ট্রের আইনগত ও প্রশাসনিক যন্ত্রের উপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করলে চলবে না। দ্বিতীয়ত, মন্ত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগের সূত্রেই সব কাজ সমাধা হয়ে যাবে এরকম ধারণা করাও ভুল। বিগত চার বছরের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বুঝেছি গরিব মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য বিধিগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাদি রূপায়িত করতে গেলে রাষ্ট্রযন্ত্রের উপর অধিক নির্ভরতা ভ্রমাত্মক। শ্রেণী বিভক্ত সমাজে কেবলমাত্র একটি রাজ্যে বামফ্রন্ট সরকার অধিষ্ঠিত হলেই শ্রেণী সংঘর্ষের দিন ফুরিয়ে যায় না। বস্তুত পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও ধারাবাহিক সংগ্রাম ও আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা থাকে। অপারেশন বর্গার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এলাকা ভিত্তিক কৃষক আন্দোলনের জোরের উপর বর্গাদারদের নাম রেকর্ডের সংখ্যাও আনুপাতিক হারে নির্ভর করছে। সাফল্য সেই ভাবেই এসেছে। আবার যেখানে আন্দোলনের ধার দুর্বল, সেখানে সরকারের তরফে যতই শুভেচ্ছা থাক না কেন বর্গাদার ও ভূমিহীন খেতমজুরদের আইনগত ও ন্যায়সঙ্গত অধিকার প্রতিষ্ঠা বা রক্ষা করা যায়নি। যে সব এলাকায় আন্দোলন দৃ‌ঢ় সেখানে তলার থেকে চাপে এবং উপর থেকে সরকারী নির্দেশে ফল লাভ সম্ভব হয়েছে। এমন অনেক দৃষ্টান্ত আছে যেখানে এই বামফ্রন্ট সরকারের আমলেও শ্রমিকশ্রেণীকে পরিচালকবর্গের অনমনীয়তার জন্য সংগ্রামের পথে নামতে হয়েছে। গণ-আন্দোলনের পথ এই সরকার যে পরিহার করেনি, বরং তাকে আরো মদত দিয়ে চলেছে তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ দেখা গেছে গত বছরের (১৯৮০) ২৭শে নভেম্বর ও বর্তমান বছরের (১৯৮১) ১১ই সেপ্টেম্বর দিন দু’টিতে। এই দুই দিনে কেন্দ্রীয় সরকারের বৈষম্যমূলক ও স্বৈরতান্ত্রিক নীতির বিরুদ্ধে বামফ্রন্ট যে সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেয় রাজ্যের বামফ্রন্ট সরকার তাকে সমর্থন জানায়। জনগণকে আমরা আহ্বান জানাই, এখানে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় থাকার পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করে তাঁরা তাঁদের সংগঠনগুলিকে সম্প্রসারিত ও মজবুত করুন এবং তাদের ন্যায্য দাবির সমর্থনে সংগ্রাম চালিয়ে যান। সরকার গণ-সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন আছে।

দ্বিতীয় ধরনের বিভ্রান্তি দেখা দেয় আন্দোলন শুরু করার সময় দু’ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে যদি ভুল হয়। দু’ধরনের পরিস্থিতি হলো যেখানে বামফ্রন্ট সরকার চালাচ্ছে সেখানকার অবস্থা এবং শাসকদল যে জায়গায় সরকারী ক্ষমতায় আসীন সেই  জায়গায় অবস্থা। এই দুই পরিস্থিতির মধ্যে প্রভেদ বুঝতে হবে। এই দুই ধরনের পরিস্থিতিতে আন্দোলনের পদ্ধতি ও প্রকৃতি এবং দাবি-দাওয়ার চরিত্র ভিন্ন রকমের হওয়াই সঙ্গত। যেখানে বামফ্রন্ট সরকারে আছে সেখানে সংগ্রামের হাতিয়ার ধর্মঘটকে বিশেষ করে তখনই ব্যবহার করতে হবে যখন সরকারী প্রচেষ্টা সত্ত্বেও দাবিগুলি আদায় করা সম্ভব হলো না। যেসব দাবি পূরণের জন্য সরকারী বাজেট থেকে সাহায্যের প্রয়োজন হয় সেই সব ক্ষেত্রে সরকারের সীমাবদ্ধ সামর্থ্যের কথা আন্দোলনকারীদের বিচার-বিবেচনা করতে হবে। এবং এমন কোনো দাবি তাঁদের উপস্থিত করা উচিত নয় যা পূরণ করা কঠিন অথবা যা পূরণ করতে সরকারী সহায় সম্পদের উপর খুবই চাপ সৃষ্টি করা হবে। অনেক ক্ষেত্র আছে যেগুলিতে দাবি আদায় হওয়া বেশি দরকার কিন্তু সে ক্ষেত্রগুলিতে আদায় করিয়ে নেওয়ার জন্য তেমন লোক নেই — এইসব ক্ষেত্রগুলির অগ্রাধিকারের বিনিময়ে অন্যেরা যেন তাঁদের দাবির ওপর অধিক গুরুত্ব না দেন। কোনো পরিস্থিতিতেই আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ইউনিয়ন বা গণ-সংগঠনগুলির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার উদ্দেশ্য নিয়ে যেন দাবিগুলি খাড়া না করা হয়। আমি একথা বলছি এই কারণে যে গত চার বছরে কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখেছি দাবি-দাওয়াগুলি তুলে ধরা হয়েছে একশ্রেণীর মানুষের সীমিত ও স্বল্পমেয়াদী চাহিদার কথা মনে রেখে। এ দাবিগুলি পেশ করার সময় রাজ্য সরকারের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং দাবিদ্র্য, অসাম্যের মতো সাধারণ সমস্যার গুরুত্বের কথা বিবেচনা করা হয় না। জনসাধারণের একটি দাবি হলো যখনই কোন ফ্যাক্টরি বা শিল্প প্রতিষ্ঠান পরিচালন কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতার জন্য বা অন্য কোনো কারণে রুগ্‌ণ হয়ে পড়ে তখনই যেন রাজ্য সরকার সেটি অধিগ্রহণ করে। এই ব্যাপারে যেটা প্রায়শই উপলব্ধি করা হয় না সেটি হলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অধিগ্রহণের পর সেই কোম্পানির কাজকর্মের জন্য রাজ্য সরকারের সীমিত বাজেট থেকে প্রচুর পরিমাণে ভরতুকি (সাবসিডি) দিতে হয়। তাছাড়া টাকা-পয়সা যখন সীমিত তখন সরকারী ভরতুকির জন্য বিভিন্ন প্রতিযোগী দাবির মধ্যে বাছাইয়ের প্রশ্ন দেখা দেয় এবং কোন একটি বিষয়ের জন্য ভরতুকি অবশ্যই অন্যান্য বিষয়গুলিকে উপেক্ষা করেই দিতে হয়। সরকারের একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো যে, একটা অগ্রাধিকারের নিয়মের ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রয়োজন মেটানোর ব্যবস্থা করা। এটা করতে হয় একথা স্বীকার করে নিয়েই যে অনেক জরুরী প্রয়োজনই এখুনি মেটানো সম্ভব নয়। গত সাড়ে চার বছরে সরকারী তহবিল থেকে নানারকম বিষয়ের জন্য ভরতুকি দেওয়া হয়েছে যেমন, গরিব চাষীদের জন্য ভূমি রাজস্ব রেহাই, সেচের জলের জন্য সেস-এর হার কমানো, কিছু কিছু দুর্বলতর শ্রেণীর জন্য সস্তাদরে রাসায়নিক সার সরবরাহ, বেকারভাতা প্রদান প্রভৃতি। কিন্তু সে সরকারের কর ধার্য করার ক্ষমতা সংবিধান দ্বারাই সীমিত এবং যে রাজ্যের জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন তার পক্ষে ভরতুকি প্রদানের পরিমাণের একটা সীমা আছে। সুতরাং, রাজ্য পর্যায়ে ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং যাতে জনগণের মৌল সমস্যাগুলির সমাধান করা যায় সেজন্য জাতীয় পর্যায়ে বামপন্থী শক্তিগুলি কর্তৃক ক্ষমতা দখলের প্রয়োজনীয়তা — এইগুলিই আমাদের প্রচারাভিযানের প্রধান বিষয়বস্তু হওয়া উচিত। এমন এক ধরনের প্রচারাভিযান হয়ে থাকে যার দ্বারা জনগণ তাঁদের নিজস্ব গোষ্ঠী স্বার্থের বাইরে আর কিছু দেখতে পান না এবং যার প্রধান উদ্দেশ্যই হলো নিজেদের স্বার্থে আরও বেশি করে অর্থ বরাদ্দের জন্য সরকারী বিভাগগুলির উপর কিছুটা চাপ সৃষ্টি করা। কিন্তু এই ধরনের প্রচারাভিযানের তুলনায় পূর্বোল্লিখিত প্রচারাভিযান জনগণের চেতনার মানকে উন্নীত করতে সাহায্য করে।

অর্থাৎ, আমাদের আন্দোলনের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যগুলি পূরণে সহায়তা করাই বিভিন্ন গণ-সংগঠনগুলির কাজকর্মের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। সমাজের শ্রেণী-সম্পর্কের পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে আরও সচেতন করাও হবে এই গণ-সংগঠনগুলির অন্যতম কাজ। যেসব কাজকর্মের ফলে জনগণের মনে বামফ্রন্টের ভাবমূর্তি ম্লান হতে পারে এবং আমাদের আন্দোলনের সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্যগুলির ক্ষতি হতে পারে সেইসব কাজকর্ম এড়িয়ে চলা উচিত। কেবল আমাদের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কেই নয়, আমাদের বদনাম দেওয়ার জন্য এবং সরকারের পতন ঘটানোর জন্য যেসব ষড়যন্ত্র চলছে সে সম্পর্কেও এইসব গণ-সংগঠনগুলির সদস্যদের সচেতন থাকতে হবে। বামফ্রন্টের শত্রুরা যখন সরকারের সুষ্ঠু কাজকর্মের পথে সর্ব প্রকারের বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করছেন, তখন আমাদের সহযোগী গণ-সংগঠনগুলির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত শত্রুদের এইসব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিয়ে সরকার পরিচালনার বলিষ্ঠ ও গতিশীল চরিত্রকে অব্যাহত রাখতে সাহায্য করা। বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হওয়ার ফলে জনগণের মনে কতকগুলি আশার সৃষ্টি হয়েছে এবং আমরাও একটি ৩৬ দফা কর্মসূচী পালনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, যার মধ্যে বেশিরভাগ কর্মসূচীই ইতোমধ্যে রূপায়িত হয়েছে। সেই জন্যই সরকারের মিত্রদের বিশেষ করে শ্রমিকদের পক্ষে তাঁদের শক্তি ও সংগঠনকে সংহত করে চালনা করা একটি অতি জরুরী ব্যাপার, যাতে আমাদের কাজকর্মের ইতো‌মধ্যেই অর্জিত চমৎকার রেকর্ডের আরও উন্নতি সাধন করা যায়। আমাদের কাজের মধ্যে দিয়ে আমরা জনগণের সেবাও করবো এবং বর্তমান বাধা-বিঘ্নের মধ্যে যতটা সম্ভব তাঁদের সমস্যার মোকাবিলাও করবো। একই সঙ্গে আমরা আমাদের সীমাবদ্ধতা ও বাধা-বিঘ্নের প্রতি তাঁদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবো। তাছাড়াও, জনগণের সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য বৃহত্তর ও দীর্ঘমেয়াদী সংগ্রামের উদ্দেশ্যে প্রস্তুত হওয়ার প্রয়োজনীয়তার প্রতিও আমরা তাঁদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবো। এই দুই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে চলতে হবে একই সঙ্গে এবং তাহলেই‍‌ কেবল আমরা আমাদের বক্তব্য ও নীতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সফল হবো।

গণ-সংগঠনগুলির আর একটি প্রধান কাজ হলো বামফ্রন্টের কৃতিত্বগুলি তুলে ধরা। এটা প্রয়োজন কারণ একথা ভালোভাবেই জানা আছে যে, সংবাদপত্র প্রভৃতি গণ-মাধ্যমের এক শক্তিশালী অংশকে বামফ্রন্টের শত্রুরা সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে অথবা সেগুলি প্রচণ্ডভাবে তাদের প্রভাবাধীন। এর ফলে প্রায়শই আমাদের কৃতিত্ব ও সাফল্যগুলি চেপে দেওয়া হয়। আর তার বদলে বিকৃত ও বিভ্রান্তিকর সব খবর শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয় ভারতের সর্বত্র পরিবেশন করা হয়। বামফ্রন্ট সরকারের প্রতি মিত্রভাবাপন্ন সংগঠনগুলির মাধ্যমে জনগণের মধ্যে প্রচারাভিযান চালিয়ে এতোদিন আমাদের বিরুদ্ধে এইসব বিদ্বেষপরায়ণ অপপ্রচার কার্যকরীভাবে প্রতিহত করা গেছে। ভবিষ্যতেও জনগণের মধ্যে আমাদের কাজের এই বিশেষ দিকটির জরুরী প্রয়োজনীয়তাকে যথাযথ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

বামফ্রন্ট সরকার এবং পার্টি

বামফ্রন্ট সরকারের ভূমিকা পরীক্ষা করার সময় আমাদের একথা ভুললে চলবে না যে, বর্তমান সামন্ততান্ত্রিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় পূর্বোল্লিখিত নানারকম প্রশাসনিক বাধা-বিঘ্নের মধ্যে সরকার সুষ্ঠুভাবে চালনা করার জন্যও পার্টির ভূমিকা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। পার্টি সতর্ক ও পরিপূর্ণভাবে সংহত থাকলে বামফ্রন্টের প্রতিশ্রুতিগুলির এবং সরকারের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থাসমূহের রূপায়ণ সহজতর হয়। অপর পক্ষে যদি এই ভূমিকা যথাযথভাবে উপলব্ধি করা ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করা না হয়, তাহলে ফল বিপরীত হতে পারে এবং একটি সরকার পরিচালনা করা-জনিত আমাদের সুবিধা বরং আমাদের পক্ষে গুরুতর অসুবিধায় পরিণত হতে পারে। সরকার যাতে ঠিক পথে থাকে এবং জনগণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে চলে ও তাদের স্বার্থ যথাযথভাবে রক্ষা করতে সমর্থ হয় সে দায়িত্ব সামগ্রিকভাবে গোটা পার্টির।

নতুন পরিস্থিতিতে আমরা যেখানে সরকারের মধ্যে রয়েছি সেখানে পার্টিকে দুরূহ ও জটিল ভূমিকা পালন করতে হয়। এব্যাপারে আমাদের হাতে কোনো বাঁধাধরা ছক বা নিয়ম কানুন নেই। পার্টি ও সরকারকে নিরন্তর চেষ্টা করতে হবে অনুন্নত শ্রেণীর মধ্যে সেই সব মানুষকে প্রভাবিত করতে, যারা যে কো‍নো কারণেই হোক এখনও আমাদের সঙ্গে নেই। বর্তমান সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পার্টির কর্মীরা সর্বদা সকল রকম দূষণীয় প্রভাব থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে চেষ্টা করবেন। তাঁরা উৎসর্গীকৃত মন নিয়ে ও নম্রতার সঙ্গে কাজ করে যাবেন। আমাদের প্রত্যেককে ধৈর্যশীল হতে হবে এবং কোনোরকম প্ররোচনার শিকার হলে চলবে না। জনগণ আমাদের উপর অধিকতর দায়িত্ব অর্পণ করেছেন এবং তাঁদের বিশ্বাসের মর্যাদা আমাদের রাখতেই হবে। বর্তমানে পার্টির তরফে কেবল যে সর্ব পর্যায়ে সরকারের সর্বনিম্ন কর্মসূচী রূপায়ণে এবং এর বিরুদ্ধে সমস্ত ষড়যন্ত্রের মোকাবিলায় সাহায্য করা দরকার তাই নয়, উপরন্তু একই সঙ্গে সরকারে আমাদের অংশগ্রহণের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটটিকেও তুলে ধরা প্রয়োজন। জনগণের রাজনৈতিক চেতনা ও উপলব্ধি যাতে আরও উন্নীত হয় এবং বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণের মাধ্যমে তাদের এই কর্মসূচীতে ব্যাপক অংশগ্রহণ ও জড়িত হওয়া যাতে সুনিশ্চিত হয় সেই ব্যবস্থাও পার্টিকে করতে হয়। একথা মুহূর্তের জন্যেও ভুললে চলবে না যে সরকার চালানো বা কিছু সংস্কার সাধন করাটা প্রকৃত লক্ষ্য নয়। এর মধ্যে দিয়ে আমরা আমাদের দীর্ঘমেয়াদী উদ্দেশ্য সম্পর্কে জনগণকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তুলতে চাই। এই সমস্ত কারণের জন্যই আমরা পার্টি এবং গণ-সংগঠনগুলিকে শক্তিশালী করার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীয়তার উপর ক্রমাগত জোর দি‍‌য়ে থাকি।

বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যাপারে জনগণকে পরিচালিত করে এবং প্রয়োজন মতো ঐক্যবদ্ধ গণ-সংগ্রাম গড়ে তুলে পার্টি সংগঠন সরকারের এযাবৎ অগ্রগতিতে যথেষ্ট অবদান রেখেছে। কিন্তু তবুও কিছু দুর্বলতা রয়েই গেছে এবং এই সব দুর্বলতা অতিক্রম করার জন্য আমাদের এখনও অনেক দূর অগ্রসর হতে হবে। জনগণকে আদর্শগত ও রাজনীতিগতভাবে উদ্বুব্ধ করার জন্যে ক্রমাগত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। পার্টিকর্মীরা বামফ্রন্টের কর্মসূচী রূপায়ণের কাজেই বা কতটা জড়িত হবে আর পার্টি গঠন এবং শ্রেণী সংগ্রামের প্রয়োজনে শ্রেণী সংগঠন গড়ে তোলা — এই কাজেই বা কতটা নিয়োজিত হবে সে বিষয়ে প্রায়ই বৃথা তর্কবিতর্ক হয়। যেন এই দুটি উদ্দেশ্য পরস্পর-বিরোধী। নতুন পরিস্থিতিতে পার্টির ভূমিকা সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণার ফলে দক্ষিণপন্থী ও বামপন্থী উভয় ধরনেরই বিচ্যুতি ঘটেছে। আমাদের যে কথা ভালোভাবে মনে রাখতে হবে সেটা হলো যে সরকারে আমাদের অংশগ্রহণের ফলে পার্টির কাজ খুবই জটিল ও বিচিত্র ধরনের হয়ে দাঁড়িয়েছে। পূর্বোক্ত ঐ দুটি কর্তব্যকে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে এবং এর একটিকে আর একটি থেকে পৃথক করা যাবে না।

একথা সত্য যে, বাস্তব কর্মসম্পাদনের পর্যায়ে প্রধান প্রধান কর্মীদের ঐ উভয় ধরনের কাজেরই ভার বহন করতে হয়, যার ফলে কোনটাই ভালোভাবে সম্পন্ন করা যায় না। এই সমস্যা সমাধানের জন্য কর্মী ও নেতাদের মধ্যে কাজ ও দায়িত্ব ভাগাভাগি করে দেওয়া প্রয়োজন হয়েছে এবং বহু সংখ্যক কর্মীর প্রশিক্ষণ জরুরী হয়ে পড়েছে। এই কাজ সম্প্রতি হাতে নেওয়া হয়েছে। তবে সাংগঠনিক কারণে প্রয়োজনীয় এই কর্ম বিভাজনের সঙ্গে সঙ্গে পূর্বোক্ত দুই উদ্দেশ্যের মধ্যে যে মূলগত ঐক্য রয়েছে সেটা কিন্তু আমাদের ভুললে চলবে না। একই লক্ষ্য অর্জনের জন্যই যে পার্টিকে এই উভয় দুটি কাজ করতে হয় সেটা সব সময় ভালোভাবে উপলব্ধি করা হয় না। কেবল যে সরকারের কাজকর্ম পরিচালনা পার্টি সংগঠনের ভূমিকার উপর দারুণভাবে নির্ভরশীল তাই নয়, একই সঙ্গে সরকারের মাধ্যমে আমাদের কাজকর্ম এমন অবস্থার সৃষ্টি করে যা পার্টি ও গণ-সংগঠন গড়ে তোলার পক্ষে অনুকূল। কর্মসূচী রূপায়ণে সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা, মেহনতী ও শোষিত মানুষের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন এবং রাজ্যের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও একটি গণতান্ত্রিক সুস্থ আবহাওয়া বজায় রাখার ব্যাপারে চমৎকার রেকর্ড আমাদের পার্টিকে জনগণের কাছে প্রিয় করেছে এবং পার্টির বৃদ্ধি ও অগ্রগতি ও জনগণের রাজনৈতিক চেতনা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করেছে। পূর্বোক্ত দুটি কাজকে যুক্ত করার উপায় খুঁজে বের করা এবং এই দুই কাজের ‌মধ্যে যে একই সাধারণ লক্ষ্য বর্তমান সে বিষয়ে সদস্যদের শিক্ষা দেওয়া এখন পার্টি সংগঠনের কাছে এক বড় চ্যালেঞ্জস্বরূপ।

মার্কসবাদী পথ, ৫ই আগস্ট, ১৯৮১

Published in: on জুন 27, 2010 at 6:33 অপরাহ্ন  মন্তব্য করুন  

স্মৃতির পাতা থেকে কিছু কথা : জ্যোতি বসু

আমার বয়স এখন ৯৪ চলছে। পুরনো অনেককিছুই এখন মনে পড়ে না। গত ৬৭ বছর ধরে আমি কমিউনিষ্ট পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী। ১৯৪০ সালে বিলেত থেকে ফিরে আসার পর কমরেড মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ আমাকে পার্টি সদস্যপদ দেন। তখন থেকেই সবসময়ের রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে কাজ করা শুরু করেছি।

অবশ্য তার আগে বিলেতে থাকতেই আমি মার্কসবাদে আকৃষ্ট হই এবং গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিষ্ট পার্টির পরিচালনায় কাজ করা শুরু করেছিলাম। সেখানে প্রবাসী ভারতীয় ছাত্রদের সংগঠিত করার কাজ আমরা করতাম। গড়ে উঠেছিল লন্ডন মজলিস, যার প্রথম সম্পাদক ছিলাম আমি। ভারতীয় ছাত্রদের নিয়ে তৈরি হয়েছিল কমিউনিষ্ট গ্রুপ। সকলের নাম আমার মনে নেই। তবে ভূপেশ গুপ্ত, স্নেহাংশু আচার্য, ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত, পি এন হাক্‌সার, মোহন কুমারমঙ্গলম, রজনী প‌্যাটেল, এন কে কৃষ্ণান, নিখিল চক্রবর্তী, অরুণ বোস প্রমুখ এতে ছিলেন বলে মনে পড়ছে। লন্ডনে থাকতেই আমরা কয়েকজন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে দেশে ফেরার পর সর্বক্ষণের পার্টিকর্মী হিসাবে কাজ করবো। ১৯৪০ সালে বিলেত থেকে জাহাজে করে প্রথমে বোম্বাইতে এসে নামলাম। নেমেই যোগাযোগ করলাম কমিউনিষ্ট পার্টির নেতাদের সঙ্গে।

আমার বাড়ির কেউ অবশ্য এই সিদ্ধান্তে খুশি হননি। বাবা চেয়েছিলেন ছেলে বিলেত থেকে যখন ব‌্যারিস্টারি পাশ করে এসেছে, তখন প্র্যাকটিস্‌ শুরু করুক, রোজগার করুক। আসলে রাজনীতির সঙ্গে আমাদের পরিবারের কোনও যোগাযোগ ছিল না। বাবা ডাক্তারি করতেন, দুই জ‌্যাঠামশাই করতেন ওকালতি। আমাদের পৈত্রিক বাড়ি ছিল বাংলাদেশের ঢাকা জেলার বারদিতে। যদিও আমার জন্ম কলকাতার হ‌্যারিসন রোডের একটি বাড়িতে, এখন যার নাম মহাত্মা গান্ধী রোড। তবে আমাদের পরিবারে স্বাধীনতা সংগ্রামী, বিপ্লবীদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা ছিল, যার পরিচয় নানাভাবে পেয়েছি।

দেশে ফিরে সর্বক্ষণের কর্মী হিসাবে কাজ শুরু করার পর থেকে পার্টির ডাকা বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিয়েছি। বিধানসভার ভেতরে এবং বাইরে পার্টি যখন যে দায়িত্ব দিয়েছে, তা পালন করার চেষ্টা করেছি। পার্টির কাজ করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হতে হয়েছে, জেল খাটতে হয়েছে, এমনকি বেশ কয়েকবার আত্মগোপনেও থাকতে হয়েছে। স্বাধীনতার আগে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের নিপীড়ন যেরকম কমিউনিষ্ট পার্টিকে সহ্য করতে হয়েছে, তেমনি স্বাধীনতার পরেও আমরা বারেবারে অত‌্যাচার-নিপীড়নের মুখোমুখি হয়েছি।

আমি দেশে ফিরে যখন কাজ শুরু করি, তখনও পার্টি বেআইনী ছিলো। ব্রিটিশ শাসনে বেআইনী ঘোষিত পার্টির সারাক্ষণের কর্মী হিসাবে আমার একটি অন্যতম কাজ ছিল আত্মগোপনকারী পার্টিনেতা ও কর্মীদের গোপন বৈঠকের স্থান,আশ্রয় ঠিক করা, বাইরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা, অর্থসংগ্রহ ইত‌্যাদি। আমাকে বিভিন্ন সভায় বক্তৃতা দিতে এবং পার্টি ক্লাস নিতেও পাঠানো হতো। সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি (এফ এস ইউ) ও ফ‌্যাসিবিরোধী লেখক সঙ্ঘের কাজেও আমাকে বিভিন্ন জায়গায় যেতে হতো। আমিই ছিলাম এফ এস ইউ-র প্রথম সম্পাদক।

১৯৪২ সালের শেষদিকে পার্টিকে আইনী করতে বাধ্য হলো ব্রিটিশরা। আমাদের পার্টির প্রথম কংগ্রেস এরপরেই অনুষ্ঠিত হলো। ১৯৪৩ সালে বোম্বাইতে হওয়া প্রথম কংগ্রেসে অবশ্য আমি প্রতিনিধি ছিলাম না। আমার যতদূর মনে পড়ছে, এরপরের বছর থেকেই আমাকে শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করতে পাঠানো হলো। প্রথমে বন্দর ও ডক শ্রমিক, পরে রেলশ্রমিকদের মধ্যে আমি কাজ শুরু করলাম। হাওড়া, শিয়ালদহ ছাড়াও পূর্ববঙ্গ, আসামের বিভিন্ন জায়গায় এই কাজে যেতে হতো। রেলে আমরা ভালোই সংগঠন গড়ে তুলতে পেরেছিলাম। পরে ১৯৪৬ সালে এই রেলশ্রমিক কেন্দ্র থেকেই আমি প্রথমবার বিধায়ক নির্বাচিত হই।সেবার দার্জিলিঙ থেকে রতনলাল ব্রাহ্মণ এবং দিনাজপুর থেকে রূপনারায়ণ রায়ও কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী হিসাবে নির্বাচিত হন।

 তখন তেভাগা আন্দোলন চলছে। এজন্য সভা করতে আমার জেলায় জেলায় ডাক পড়তো। আমার মনে আছে, একবার আমি আর স্নেহাংশু (আচার্য) ময়মনসিংহ জেলায় গেলাম। হাজং এলাকায় ঢোকামাত্র দু’জন ব্রিটিশ পুলিশ অফিসার এসে আমাদের গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে গেলো। স্নেহাংশু ছিল ময়মনসিংহ মুক্তাগাছার মহারাজার ছেলে। ফলে থানায় আমাদের বেশিক্ষণ রাখতে সাহস করলো না। ডি এম মিঃ বাস্তিন আমাদের জেলা থেকে বহিস্কারের নির্দেশ দিলো। তখন মুসলিম লিগের সরকার, মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন শহীদ সুরাবর্দি। আমি পরে তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তেভাগার বিলটা ধামাচাপা দিলেন কেন? সুরাবর্দি আমায় বলেছিলেন, আমার দলে যে এতো জোতদার আছে, তা আমি জানতাম না।

এর কিছুদিন বাদে দেশ স্বাধীন হলো। কিন্তু আমাদের লড়াই শেষ হলো না। আমার মনে পড়ছে, স্বাধীনতার অল্পদিনের মধ্যেই কংগ্রেস সরকার কমিউনিষ্ট পার্টিকে বেআইনী ঘোষণা করলো। আমাদের নেতাদের গ্রেপ্তার করা হলো। আমার বাড়িতে তখন সবাই গভীর ঘুমে, খুব ভোরে পুলিস এলো, আমাকে গ্রেপ্তার করে প্রথমে নিয়ে গেলো ইলিসিয়াম রো’তে এস বি অফিসে, তারপর প্রেসিডেন্সি জেলে নিয়ে রাখলো। আমার বিরুদ্ধে হাস্যকর সব অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল। আমাকে নাকি বার্মার কৃষকসভা আমন্ত্রণ জানিয়েছে (যে আমন্ত্রণপত্র আমি আদৌ পাইনি), আমি ট্রেড ইউনিয়ন করি ইত‌্যাদি। তখন হেবিয়াস কর্পাস মামলা করা যেত না। হাইকোর্টের তিনজন বিচারপতিকে নিয়ে একটা কমিটি ছিল। তাঁদের কাছে আপীল করলাম। তিন মাস বাদে আমায় ছেড়ে দিতে হলো। অবশ্য পরে অন্য অভিযোগে আবার গ্রেপ্তার করলো আমাকে। কংগ্রেস সরকার নিজে থেকে কমিউনিষ্ট পার্টিকে আইনী করেনি। দেশের সংবিধান ঘোষিত হলে তার ধারা অনুসারে আমরা মামলা করলাম। ভারত সরকার কমিউনিষ্ট পার্টির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে বাধ্য হলো।আমরাও হেবিয়াস কর্পাসে আবেদন করলে ১৯৫১ সালে জেল থেকে মুক্তি পেলাম। সে বছরই কলকাতায় পার্টির গোপন সর্বভারতীয় সম্মেলন হলো। আমি সেখানে প্রতিনিধি ছিলাম। সম্মেলন থেকে অজয় ঘোষ সাধারণ সম্পাদক হলেন।

পার্টি আইনী হওয়ার ‍সুযোগ নিয়ে আমরা সংগঠনকে ব্যাপকভাবে প্রসারিত করার জন্য ঝ‌াঁপিয়ে পড়লাম। বন্দীমুক্তি আন্দোলন, উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের দাবিতে আন্দোলন প্রভৃতির মধ্যে দিয়ে পার্টি বেড়ে উঠলো, গণসংগঠনগুলিতেও অনেক মানুষ এলেন। এর মধ্যেই প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। ১৯৫২ সালের সেই নির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টিই পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সবচেয়ে বড় বিরোধী দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করলো। আমরা ২৮টা আসন পেলাম, আমাদের সমর্থনে আরো ২ জন নির্দল সদস্য জিতলেন। কিন্তু আমাদের পার্টিকে বিধানসভায় বিরোধীপক্ষ হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হলো না। অনেক টালবাহানার পর আমাদের ‘প্রধান’ বিরোধী পার্টি এবং পার্টির পরিষদীয় দলের নেতাকে ‘প্রধান’ বিরোধী পার্টির নেতা হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হলো। আসলে ওরা আমাদের প্রভাব যাতে না বাড়ে, তার জন্য যে কোনভাবে আটকাতে চাইছিল। যাই হোক, যে পার্টিকে স্বাধীনতার পরেই কয়েক বছর ধরে কংগ্রেস সরকার বেআইনী করে রেখেছিল, সেই পার্টিরই প্রধান বিরোধী দল হিসাবে স্বীকৃতি পাওয়া একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।

১৯৫৪ সালে মাদুরাইয়ে পার্টির তৃতীয় কংগ্রেসে আমাকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে নেওয়া হলো। তার আগে অবশ্য প্রাদেশিক সম্মেলন থেকে আমাকে সর্বসম্মতিক্রমে রাজ্য সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। একদিকে, প্রধান বিরোধী দলের নেতা হিসাবে বিধানসভায় পরিষদীয় কাজ এবং অন্যদিকে পার্টির রাজ্য সম্পাদকের কাজ, বিরাট দায়িত্ব এসে পড়লো আমার কাঁধে। এই সময় ট্রাম ভাড়া বৃদ্ধির বিরুদ্ধে আন্দোলন, শিক্ষক আন্দোলনের মতো কয়েকটি বড় আন্দোলন সংগঠিত হয়। ১৯৫৬ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে যৌথভাবে হঠাৎ বঙ্গ-বিহার সংযুক্তিকরণের একটি প্রস্তাব নিয়ে আসেন, যা নিয়ে সারা রাজ্যে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হলো। ওই সময়ই কেরালার পালঘাটে পার্টির চতুর্থ কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু আমি, কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্তসহ আরো অনেকেই চতুর্থ কংগ্রেসে এজন্য যেতে পারিনি। অনেকে গ্রেপ্তার হলেন। অবশেষে কলকাতা উত্তর-পশ্চিম লোকসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে কংগ্রেস প্রার্থী পরাজিত হলে বিধান রায় পিছু হঠলেন।

এদিকে, পার্টির ভেতরে মতাদর্শগত বিতর্ক তখন ক্রমশ মাথাচাড়া  দিচ্ছিল। ১৯৬১ সালে বিজয়ওয়াদা কংগ্রেসে সেটা চরম আকার ধারণ করে। সেবারে ভাঙন কোনমতে আটকানো গেলেও পরে তা বাড়তে লাগলো। অবশেষে আমরা ৩২ জন জাতীয় পরিষদের সদস্য বের হয়ে এলাম। রাষ্ট্রের শ্রেণীচরিত্র, বিপ্লবের স্তর ইত্যাদি নিয়ে আমাদের মতের ফারাক ছিল, সেকথা সবাই জানেন। কলকাতাতে সপ্তম পার্টি কংগ্রেস থেকে আমরা স্বাধীন কর্মপন্থা নিলাম, নতুন পার্টি কর্মসূচী গৃহীত হলো। তারপরে তো দেখা গেলো আমরাই প্রধান বামপন্থী হয়ে গেলাম। মানুষের সমর্থনও আমাদের দিকেই বেশি ছিল। ১৯৬৭ এবং ১৯৬৯ সালে এরাজ্যে যুক্তফ্রন্ট সরকার গড়ার ক্ষেত্রেও জোটের মধ্যে একক বৃহত্তম দল আমরাই ছিলাম। ১৯৭১ সালে আমরা আলাদাভাবেই একক বৃহত্তম দল হলাম, কিন্তু আমাদের সরকার গড়তে দেওয়া হলো না। এরপরে এলো বাহাত্তরের রিগিং নির্বাচন। সকাল ১১টার মধ্যে সমস্ত বুথে ভোট পড়ে গেলো। আমরা এই নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে গঠিত বিধানসভা বয়কট করেছিলাম। তারপরে আধা-ফ্যাসিস্ত সন্ত্রাসের কথা জরুরী অবস্থার অন্ধকারাচ্ছন্ন দিনগুলির কথা সবারই মনে আছে।

কিন্তু মানুষ যে কংগ্রেসকে ক্ষমা করেনি, তা ১৯৭৭ সালে প্রথম সুযোগেই প্রমাণিত হলো। কংগ্রেস গোটা দেশে ধরাশায়ী হলো, এরাজ্যে তো বটেই। এরাজ্যে প্রথম বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হলো। তারপর থেকে টানা সাতবার এরাজ্যের মানুষ বামফ্রন্টকে জয়ী করে সংসদী‌য় গণতন্ত্রের ইতিহাসে ন‍‌জির তৈরি করেছেন। আজ এটা প্রতিষ্ঠিত, এই সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার মানুষের স্বার্থে অনেক কাজ করতে পেরেছে। আমরা যে এতদিন সরকারে রয়েছি, তা মানুষের ইতিবাচক রায়েই রয়েছি। পাশাপাশি, বামফ্রন্ট সরকার গোটা দেশের সামনে মানুষের স্বার্থে বিকল্প কর্মসূচীর একটা নজির তুলে ধরতে পেরেছে। জাতীয় রাজনীতিতেও বিভিন্নভাবে আমাদের সাফল্যের ছাপ পড়েছে। দেশ এখন জোট রাজনীতির যুগে প্রবেশ করেছে। পশ্চিমবঙ্গে একটানা ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ৯ দলের একটি দৃঢ় জোট হিসাবে বামফ্রন্ট সরকারের প্রভাব এক্ষেত্রে অস্বীকার করা যায় না। কারণ জোট সরকার মানেই যখন অস্থিতিশীল, বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বলে প্রমাণ হচ্ছিলো, তখন এরাজ্যে এই জোট স্থিতিশীল, শান্তির পরিবেশ এবং জনমুখী উন্নয়নের নজির তৈরি করে  গোটা দেশের সামনে একটি উজ্জ্বল ব্যাতিক্রম তুলে ধরেছে।

শুধু জোট রাজনীতির প্রশ্নই নয়, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকেও সামনে তুলে এনেছিল বামফ্রন্ট সরকারই। আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং তৃণমূলস্তরে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটানোর ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ গোটা দেশের সামনে মডেল হিসাবে স্বীকৃত। একথা আজ সকলেরই জানা যে এরাজ্যের ত্রিস্তর পঞ্চায়েতী ব্যবস্থাকে অনুকরণ করেই গোটা দেশে তা রূপায়ণের জন্য আইন তৈরি করা হয়েছে। ভূমি সংস্কার, কৃষি ও গ্রামোন্নয়নের ক্ষেত্রেও এই সরকারের সাফল্য সর্বজনস্বীকৃত। পাশাপাশি, গণতান্ত্রিক পরিবেশ, শান্তি-সুস্থিতি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিরবচ্ছিন্নভাবে বজায় ক্ষেত্রেও দেশের সামনে এরাজ্য উদাহরণ।                                                             

শিল্পবিকাশের প্রশ্নেও আমরা বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই কাজ করছি। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গ আর্থিক ও অন্যান্য ক্ষেত্রে কেন্দ্রের চরম বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হয়েছে। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার তৈরি হওয়ার পরে কেন্দ্রের এইসব বাধা অতিক্রম করেই আমরা শিল্পস্হাপনের নীতি নিই। নয়ের দশকের গোড়ায় যখন মাসুল সমীকরণ নীতি ও লাইসেন্স প্রথা তুলে নেওয়া হলো, তখন আমাদের সামনে আরও সুযোগ এলো। আমরা যখন বণিকসভাগুলিতে গিয়ে এরাজ্যে বিনিয়োগের আবেদন জানাচ্ছিলাম, তখন তাঁরা আমাদের বললেন, আপনারা যে নীতির ভিত্তিতে এখানে শিল্প গড়ার কথা বলছেন, সেটা লিখিতভাবে দিলে সুবিধা হয়। তখন ১৯৯৪ সালে আমরা বিধানসভায় বর্তমান শিল্পনীতি ঘোষণা করি। পরে ১৯৯৫ সালে চন্ডীগড়ে অনুষ্ঠিত আমাদের পার্টির পঞ্চদশ কংগ্রেসেও এটা অনুমোদিত হয়েছে।

তবে এটাও মনে রাখা দরকার, পশ্চিমবঙ্গ,‍ কেরালা, ত্রিপুরায় আমরা যে বাম সরকারগুলি চালাচ্ছি তা এই বুর্জোয়া সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই। আমরা এই পুঁজিবাদী সাংবিধানিক কাঠামোতে কখনও বলতে পারি না, এই সরকারগুলি সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচী রূপায়ণ করবে। সাম্যবাদ, সমাজতন্ত্র আমাদের লক্ষ্য; শ্রেণীহীন, শোষণহীন সমাজব্যবস্থা আমরা গড়তে চাই। সেটা আমাদের লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যে আমাদের পৌঁছোতে হবে।

একটা জটিল রাজনৈতিক অবস্থার মধ্যে দিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি। আমাদের ১৯তম পার্টি কংগ্রেস সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হলো। প্রতিনিধিরা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে পার্টিকে, গণ-সংগঠনগুলিকে আরো প্রসারিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমি শুধু একটা কথাই বলবো, মানুষের ওপরে আমরা যেন বিশ্বাস না হারাই। মানুষের কাছে বারবার যেতে হবে, ত‌াঁদের ভালোবাসা আমাদের পেতে হবে। এই পুঁজিবাদী শোষণের ব্যবস্থা কখনও টিকতে পারে না, এটা দৃঢ়তার সঙ্গে আমরা বলতে পারি। তবে তাতে সময় লাগ‍‌বে। কিন্তু লক্ষ্যে আমরা পৌঁছবোই।

Published in: on জুন 26, 2010 at 5:18 অপরাহ্ন  মন্তব্য করুন  
%d bloggers like this: