জ্যোতি বসু, আমার কমরেড

অশোক ঘোষ

কমরেড জ্যোতি বসুর সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৪৮ সালে। বলা যায় এক দুর্যোগের সময়ে। তখন তিনি অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি, সি পি আই-এর প্রথম সারির নেতা। তখন ফরওয়ার্ড ব্লক এবং সি পি আই, দুই দলই খুব ঝড়-ঝাপটার মধ্য দিয়ে চলেছে। আমাদের পার্টি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছিল কিছুকালের জন্য, নিষিদ্ধ হয়েছিল সি পি আই-ও। ১৯৫২ সালের প্রথম বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনে তিনটি ইস্যু উঠে এসেছিল : রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তির জন্য আন্দোলন, উদ্বাস্তু আন্দোলন ও খাদ্য আন্দোলন। পরিস্থিতি এমনই যে আমরা বিরোধীরা প্রয়োজন অনুভব করছিলাম যে বামপন্থী দলগুলির মধ্যে কংগ্রেস-বিরোধী ঐক্য গড়ে তোলা দরকার। আর এই ঐক্যের বিষয়টিই পারস্পরিক সংগ্রামী বন্ধন গড়ে তুলল আমার এবং জ্যোতি বসুর মধ্যে। আমি তখন ফরওয়ার্ড ব্লকের বাংলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক। জ্যোতিবাবু তখন তাঁর পার্টির ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনের নেতা এবং পার্টির প্রধান মুখ। সেই সময়ে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর দাদা শরৎচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে বিভিন্ন ছোট ছোট বামপন্থী শক্তিকে নিয়ে গড়ে উঠেছিল ইউনাইটেড সোস্যালিস্ট অর্গানাইজেশন বা ইউ এস ও। আমাদের চেষ্টা ছিল তাদেরও সঙ্গে নেওয়া। শরৎচন্দ্র বসুর কাছে জ্যোতিবাবু এবং আমি গিয়েছিলাম। কিন্তু পুরোপুরি বাম ঐক্য হয়নি। আর এস পি সেই সংযুক্ত ফ্রন্টে যোগ দেয়নি। যাইহোক, ১৯৫১ সালের ২৩শে নভেম্বর আমাদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া হয় এবং একটি ঘোষণা প্রকাশ করা হয়। সেখানে সি পি আই-এর পক্ষে জ্যোতিবাবু এবং ফরওয়ার্ড ব্লকের পক্ষে আমার সই ছিল। সেই বিধানসভা নির্বাচনে সি পি আই ২৮টি আসনে জয়লাভ করে, ফরওয়ার্ড ব্লকের শক্তি দাঁড়ায় ১৪। স্পিকার পদে ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা জ্যোতিষ ঘোষের নাম প্রস্তাব করেছিলেন জ্যোতিবাবু স্বয়ং। এইভাবে গড়ে উঠেছিল কংগ্রেস-বিরোধী সংযুক্ত ফ্রন্ট।

তারপর অনেক ঘটনা, অনেক আন্দোলন। উদ্বাস্তু আন্দোলন, খাদ্য আন্দোলন ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত হয় ট্রামভাড়া বৃদ্ধি‍রোধ আন্দোলন। পরবর্তীতে আরও। যতদূর মনে পড়ে ১৯৫৩ সালে জ্যোতিবাবু তাঁর পার্টির প্রাদেশিক সম্পাদকের দায়িত্ব পান। তারপর ওঁর মূল ক্ষেত্র হয়ে ওঠে ‘সংসদীয় রাজনীতি’, অন্যদিকে আমি আমাদের পার্টির সাংগঠনিক কাজেই ব্যাপৃত থাকি। ১৯৬৭ সাল আমাদের আরও কাছাকাছি এনেছিল। নির্বাচনের আগে সার্বিক বাম ঐক্য না হলেও নির্বাচনের পরে বামপন্থীরা একজোট হন এবং রাজ্যে প্রথম অকংগ্রেসী যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হয়। এই পরিবর্তনে জ্যোতি বসুর ভূমিকা ছিল বিরাট। এই ভূমিকা আরও পরিব্যাপ্ত হয় দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠনের সময় ১৯৬৯ সালে, প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকারকে খারিজ করে দেওয়ার প্রেক্ষিতে, যদিও সকলেই জানেন দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকার স্থায়িত্ব লাভ করেনি। কেন করেনি, সে কথাও কারোর অজানা নয়।

এরপর পশ্চিমবঙ্গের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে ঝড়। তারপর জরুরী অবস্থা। এই পরিস্থিতি বামপন্থীদের কাছাকাছি আসতে বাধ্য করেছে, বলা যায় জ্যোতিবাবুর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতাও বেড়ে ওঠে এই সময়েই। ১৯৭৭ সালের উল্লেখের প্রয়োজন নেই। শুধু বলতে পারি, জ্যোতি বসু, সি পি আই (এম) রাজ্য সম্পাদক প্রমোদ দাশগুপ্ত, আর এস পি-র রাজ্য সম্পাদক মাখন পাল, আর আমি—আমাদের চারজনের সেই সময়ের প্রতিটি দিনের উত্তেজনাময় প্রবাহের কথা, যখন আমরা ভালোভাবেই বুঝতে পারছিলাম, জনগণই শেষ কথা এবং বামপন্থী ঐক্যই পারে জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়িত করতে। এছাড়া কোনোও পথ নেই। পরবর্তীকালে বামফ্রন্টের বিভিন্ন বৈঠকেও দেখেছি, মতের ভিন্নতা নিয়ে যখন কথা চালাচালি হচ্ছে, জ্যোতিবাবু বলে উঠেছেন, বামঐক্যকে রক্ষা করতে হবে সবার আগে, তারপর অন্য কথা। প্রশাসনিক দক্ষতার ক্ষেত্রে ক্রমশ অনন্য এক স্তরে চলে গিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু কোনো বিষয়ে যখন কিছু বলেছি, অপরিসীম গুরুত্ব দিয়েছেন। কাজে দক্ষতার জন্য, ব্যক্তিত্বের কারণে তাঁর আচরণে কিছু রাশভারী প্রকাশ এসেছে; কিন্তু আমি বহুবার প্রত্যক্ষ করেছি, সেই রাশভারী আচরণের পিছনে নিহিত থাকা এক সমব্যথী মানুষকে, যিনি দেশের মানুষের কথা বুঝতে পারতেন, বুঝতে চাইতেন। শুধু রাজ্যে নয়, জাতীয় স্তরেও বামঐক্য গড়ে তোলার ব্যাপারে তিনি যে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন, তা-ও মনে রাখার মতো।

অসুস্থ হওয়ার পর দেখা সাক্ষাৎ একেবারেই কমে যায়। জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানাতে যেতাম। আর কখনও কখনও হয়তো টেলিফোন। একটি মানুষের কণ্ঠস্বর শুনতে পেতাম, যাঁকে বন্ধু বলে, কমরেড বলে মানি। শতবর্ষে সেই বন্ধুজনকে প্রণাম জানাই।

গণশক্তি, ৭ই জুলাই, ২০১৩

 

 

Advertisements
Published in: on জুলাই 10, 2013 at 7:38 অপরাহ্ন  মন্তব্য করুন  

The URI to TrackBack this entry is: https://jyotibasu.wordpress.com/2013/07/10/%e0%a6%9c%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a7%8b%e0%a6%a4%e0%a6%bf-%e0%a6%ac%e0%a6%b8%e0%a7%81-%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%95%e0%a6%ae%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%a1/trackback/

RSS feed for comments on this post.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s

%d bloggers like this: