জীবিত অবস্থাতেই জ্যোতি বসু প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিলেন

হাসিম আবদুল হালিম 

জ্যোতি বসুর জন্মশতবর্ষ। ওঁকে নিয়ে অনেক লেখালেখি, আলোচনা হবে। আলোচনা যত হবে ততই ওঁকে জানা যাবে। জ্যোতি বসু জীবিত অবস্থাতেই নিজে একটা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিলেন। তাঁর মতো একজন বিরল প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব ভারতের রাজনীতিতে তুলনাহীন।

আমি ছাত্রাবস্থায় যাঁর আকর্ষণ সবচেয়ে বেশি করে বোধ করতাম, যাঁর আকর্ষণে রাজনীতিতে এসেছি পরবর্তীকালে — তিনি জ্যোতি বসু। ঐ সময় পঞ্চাশের দশকে সংবাদপত্রে কোনো আন্দোলনের খবর থাকলেই অবধারিতভাবে জ্যোতি বসুর নামটা থাকতো। বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসাবে তাঁর তীক্ষ্ণ ক্ষুরধার আলোচনা প্রকাশ পেতো। শিরোনামে থাকবেন জ্যোতি বসু। এত দীর্ঘ দিন বিধানসভার সদস্য এই উপমহাদেশে আর কেউ থাকেননি।

আমি কোনো দিন ভাবিনি বিধানসভার সদস্য হবো। জ্যোতি বাবুর ঘনিষ্ঠ হবো। মন্ত্রী হবো। ১৯৭৭ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) প্রার্থী হিসাবে বিধানসভায় নির্বাচিত হলাম। আইনমন্ত্রী হলাম। মন্ত্রিসভার প্রথম সিদ্ধান্ত ছিল — সব বন্দীদের মুক্তি দিতে হবে। দশ হাজারের মতো বিচারাধীন রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার করে নিতে হবে। যাঁদের চাকরি রাজনৈতিক কারণে গেছে, তাঁদের পুনর্বহাল করতে হবে। কোনোরকম সঙ্কীর্ণতা চলবে না। সব দলের নেতা-কর্মীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। জ্যোতি বাবু আমাকে বললেন, সব ব্যাপারটা আইনগত দিক দেখে নিয়ে ব্যবস্থা নিতে যাতে ভবিষ্যতে কোনো অসুবিধার সৃষ্টি না হয়। সে রকমই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। যদিও এ নিয়ে বামপন্থীদের মধ্যে কিছু ক্ষোভ-বিক্ষোভ ছিল। জ্যোতিবাবু সে কথা শোনেননি। পরবর্তীকালেও দেখা গেছে জ্যোতিবাবু বিরোধী দলের নেতাদের কথা শুনে এমন অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যা দলের অনেক নেতার মনঃপূত হয়নি। জ্যোতিবাবু মনে করতেন House Belongs to the opposition। সেই কথা ভেবে তিনি বিরোধী দলের নেতাকে বিশেষ মর্যাদা – পূর্ণমন্ত্রীর সমমর্যাদা, সুযোগ সুবিধে দিয়েছিলেন। এক্ষেত্রে জ্যোতিবাবু ভাবেননি যে, ১৫ বছর বিরোধী দলনেতা থাকার সময় কোনো সুযোগ সুবিধেই তিনি পাননি। বিরোধী দলের হুইপকে পর্যন্ত প্রতিমন্ত্রীর সমান মর্যাদা সুযোগ-সুবিধে দিয়েছিলেন। তাঁরই সময় প্রাক্তন বিধায়কদের পেনশন ব্যবস্থা, চিকিৎসার সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল।

জ্যোতিবাবু পাঁচবার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন — সর্বসম্মতিক্রমে বামফ্রন্টের নেতা হিসাবে। অন্য রাজ্যে এ জিনিস দেখা যায় না। কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা ন’টি দলকে নিয়ে এত দীর্ঘদিন ধরে পরিচালনা করার কৃতিত্ব তিনিই দেখিয়েছেন। তিনি কখনই বিরোধী দলের সুযোগ বিধানসভায় ক্ষুণ্ণ হোক, তা চাইতেন না। নিজের প্রশ্নোত্তরের দিন তিনি অবশ্যই হাজির থাকতেন। বিধানসভার মর্যাদাহানিকর কোনো কাজ করতেন না। বিধানসভায় কমিটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে বাজেট বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনার সুযোগ পাওয়া যায়, তা জ্যোতি বসুর আমলেই চালু হয়েছে।

সাংসদীয় রাজনীতিতে জ্যোতি বসুর অবদান তুলনাহীন। বিরোধীদল নেতা এবং মুখ্যমন্ত্রী, দু’ভাবেই জ্যোতি বসুর অবদানের কথা উল্লেখ করা যায়। তিনি সকলের কথা মন দিয়ে শুনতেন। সমস্যা হলে আলোচনা করে মীমাংসা করতেন। জ্যোতিবাবুর সংসদীয় জীবনে অনেক রথী-মহারথীর সঙ্গে থেকেছেন। সকলের প্রিয়ভাজন হয়েছেন, জাতীয় নেতা হিসাবে স্বীকৃত হয়েছেন। ছিলেন শৃঙ্খলাপরায়ণ। সময়ানুবর্তিতা মেনে চলতেন। বিরোধী দল অনেক সময় উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। ওঁকে আক্রমণ করেছে। কিন্তু ওঁকে কোনো সময় বিচলিত হতে দেখিনি। জ্যোতি বসু একজনই এসেছেন আর কোনো জ্যোতি বসু আসবেন না।

গণশক্তি, ৭ই জুলাই, ২০১৩

Advertisements
Published in: on জুলাই 10, 2013 at 7:41 অপরাহ্ন  মন্তব্য করুন  
Tags:

The URI to TrackBack this entry is: https://jyotibasu.wordpress.com/2013/07/10/%e0%a6%9c%e0%a7%80%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%a4-%e0%a6%85%e0%a6%ac%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%a5%e0%a6%be%e0%a6%a4%e0%a7%87%e0%a6%87-%e0%a6%9c%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a7%8b%e0%a6%a4%e0%a6%bf-%e0%a6%ac/trackback/

RSS feed for comments on this post.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: