উদ্যত প্রতিকূলতার সফল মোকাবিলারই অন্য নাম জ্যোতি বসু

অঞ্জন বেরা

জন্মশতবর্ষ পালন অনেক সময়ই দূর-স্মৃতিচারণার রকমফের । কিন্তু কমরেড জ্যোতি বসুর শতবর্ষ  তেমন নয়। মাত্র সাড়ে তিন বছর আগে তাঁকে আমরা হারিয়েছি । মৃত্যুর ঠিক আগে পর্যন্ত জনজীবনে ও রাজনৈতিক পরিসরে তিনি  প্রখরভাবে ব্যাপ্ত ছিলেন । অতি-দৃশ্যময়তার এই যুগেও সাড়ে তিন বছরের অনুপস্থিতি  ম্লান করতে পারেনি তাঁর স্মৃতি । শুধু আমাদের কাছেই সেই স্মৃতি অমলিন নয়,  তাঁর স্মৃতির দীপ্তিতে ভয় পেয়ে কমিউনিস্ট-বিরোধী স্বৈরশাসক অশ্লীল দ্রুততায় পাল্টে দেয় উপনগরীর নাম ।

শুধু কমিউনিস্ট ও বাম আন্দোলনের কাছেই নয়, তাঁর প্রায় সাড়ে সাত দশকের রাজনৈতিক জীবন, সাধারণ ভাবে এদেশের সমকালীন রাজনীতি ও সমাজ জীবনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে গেছে । ইতিহাসে এক একটা ক্ষেত্রে এমন হয় । সময় ব্যক্তিকে গড়ে পিটে নেয় । ব্যক্তি গড়ে পিটে নেয় সময়কে । প্রাক-দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ  পর্ব থেকে একুশ শতকের প্রথম দশক —- রাজনৈতিক-সামাজিক জীবনে এতগুলি সন্ধিক্ষণের সওয়ার হওয়া ইতিহাসে বিরল । কমরেড জ্যোতি বসু সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের অন্যতম ।

কমরেড জ্যোতি বসুর স্মৃতি আজকের প্রজন্মের বিরাট অংশের কাছেই হয়তো তাঁর তেইশ বছরের মুখ্যমন্ত্রিত্বের সময় ।  ১৯৭৭ থেকে ২০০০ সাল । এরকম আর কোনো নজির গণতন্ত্রে নেই । কিন্তু জ্যোতি বসু শুধু মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন না । তিনি যখন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তখন তিনি একই সঙ্গে জাতীয় রাজনীতিতে অন্যতম প্রধান বিরোধী নেতাও । দু’দফার যুক্তফ্রন্ট সরকারের কুড়ি মাস বাদ দিলে, ১৯৪৬ থেকে  ১৯৭২ পর্যন্ত  রাজ্যে তিনিই বিরোধী পক্ষের প্রধান কন্ঠ । স্বাধীনতা-উত্তর পশ্চিমবঙ্গে  ১৯৫৩ থেকে ১৯৬১ তিনি অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির রাজ্য সম্পাদক। বিধানসভায় বিরোধী নেতা । কমরেড জ্যোতি বসুর রাজনৈতিক জীবন তাই সামগ্রিক গণআন্দোলনের বিকাশের মধ্যেই বিস্তৃত ও বিন্যস্ত ।

১৯৪৩ সালের নিদারুণ দুর্ভিক্ষে অসংখ্য মানুষের অসহায় মৃত্যুর পর তেভাগা আন্দোলনের মধ্যে মানুষ যখন নতুন জীবন খুঁজছিল ঠিক তখনই কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী হিসেবে  অবিভক্ত বাংলার আইনসভায় পা দিয়েছিলেন  জ্যোতি বসু । ভবিষ্যতে কোন মানুষের জন্য কোন কন্ঠ তিনি হতে চলেছেন,  যেন সেদিনই ইতিহাস তাঁর ভবিষ্যৎ ভূমিকা নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল ।

আইন যখন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পরিসর প্রত্যাখ্যান করছে, আইনসভায় জ্যোতি বসু তখন সেই  বিকাশোন্মুখ গণআন্দোলনের মুখ । তিনি রুদ্ধকন্ঠের কন্ঠস্বর । গণআন্দোলনের কন্ঠস্বরের ক্রমব্যাপ্তিতে  প্রসারিত হয়েছে জ্যোতি বসুর ভূমিকা । তাঁর জীবনীপঞ্জীই পশ্চিমবঙ্গে গণতান্ত্রিক  অগ্রগতির গতিপথ ।

একজন কমিউনিস্ট কীভাবে বুর্জোয়া সংসদীয় রাজনীতিতে শ্রেণী রাজনীতির লক্ষ্য নিয়ে  হস্তক্ষেপ করবে , তা সে  বিরোধী পক্ষ বা   এবং সরকার পরিচালনা , যাই হোক না কেন, কমরেড জ্যোতি বসুর জীবন  তাঁর এক অনন্য উদাহরণ। খুব নির্দিষ্টভাবে বললে, একটি বুর্জোয়া আইনসভায় শ্রমজীবী মানুষের দাবিদাওয়া, এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কমরেড জ্যোতি বসুর ভূমিকা ইতিহাসকে বহুদিন মনে রাখতে হবে । গণতান্ত্রিক অধিকারের আন্দোলন, ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন, সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন, খাদ্য আন্দোলন, মধ্যবিত্ত কর্মচারী আন্দোলন, শরণার্থী আন্দোলন, স্বাধীন অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য আন্দোলন, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কে গণতান্ত্রিক পুনর্বিন্যাসের দাবিতে আন্দোলন—প্রতিটি গণতান্ত্রিক আকাঙ্খার যেন তিনি মূর্ত প্রতীক । একই সঙ্গে তিনি আন্দোলনের নেতা, সংগঠক, প্রোপাগান্ডিস্ট, অ্যাজিটেটর। প্লেখানভ ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকা প্রসঙ্গে চমৎকার বলেছেন, মহান ব্যক্তিমাত্রই পথিকৃৎ । জ্যোতি বসু তাঁর বহু ভূমিকাতেই পথিকৃৎ ।

জ্যোতি বসু সবসময়ই ইতিবাচক । কি বিরোধী, কি সরকারে, দুটো  ভূমিকাতেই জ্যোতি বসু স্পষ্ট, নির্দ্বিধ । বিরোধী নেতা হিসেবে সরকারের তীব্র সমালোচক । কিন্তু নেতিবাচক, ধ্বংসাত্মক নয় । রাজনীতির লক্ষ্য যেহেতু মানুষ  তাই সরকার-বিরোধিতার নামে আলোচনা বন্ধ করে শিল্পপ্রকল্প আটকে উদ্বাহু হতে হয়নি জ্যোতি বসুকে, বামপন্থীদের ।

গণতন্ত্রে  গভীর আস্থার চমৎকার প্রতিফলন পড়েছে তাঁর ভাষণের বয়ানেও । সাত দশক ধরে তাঁর রাজনৈতিক ভাষণগুলি দেখুন, তথ্য ও যুক্তিবিহীন কোনো মতামত নেই ।  নেই  কোনো আস্ফালন। কথোপকথোনই তাই তাঁর বাচনভঙ্গী । শ্রোতার প্রতি  শ্রদ্ধার ভিত্তি  প্রোথিত  তাঁর রাজনৈতিক দর্শনেই ।  উল্টোদিকে গণতন্ত্রে অবিশ্বাসের কারণেই  স্বৈরাচারীর ভাষণ  অগোছালো বাগাড়ম্বর ।

বিরোধী নেতা জ্যোতি বসুকে বিনা বিচারে আটক করা হয়েছে বার বার । তীব্রভাবে প্রতিবাদ করেছেন, আইন অমান্য করেছেন । কিন্তু নিজে মুখ্যমন্ত্রী হয়ে মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সব রাজনৈতিক বন্দীর মুক্তির । বিনা বিচারে আটকের সরকারী অভ্যাস ইতিহাসের আস্তাকুঁড়েতে স্থান পেয়েছে বামফ্রন্ট সরকারের ৩৪ বছরেই  ।

চীন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষের সময় ভারত রক্ষা আইনে জ্যোতি বসুকে গ্রেপ্তার করেছিল কংগ্রেস সরকার । আবার ১৯৮৮ সালে প্রধানমন্ত্রী রাজীব  গান্ধী চীনে সরকারী  সফরের আগে তাঁর সঙ্গে আলোচনা করতে চাইলে  জ্যোতি বসু অনায়াসে আলোচনায় বসেছেন । কোনো রাজনৈতিক ভূমিকাই তাঁর কাছে ব্যক্তিসর্বস্ব ছিলনা । কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাম্মানিক ডক্টর অফ ল উপাধি নেওয়ার সময় তাঁর সেই অসামান্য ভাষণের কথা মনে আছে ? পার্টি, আন্দোলন এবং মানুষের মাঝখানে নিজের অবস্থানটুকু  নির্দিষ্ট করার বিনীত নৈর্ব্যক্তিকতা – তাঁর মজ্জায়।

অন্তত তিনটি  বিষয়ে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার  সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে  নীতি নির্ধারণে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছে । প্রভাব ফেলেছে বিকল্প মডেল তুলে ধরে ।  প্রথমেই বলতে হবে  ভূমিসংস্কারের কথা । যুক্তফ্রন্ট সরকার জোতদারদের লুকিয়ে রাখা জমি চিহ্নিত করা ও দখল করার প্রাথমিক কাজ শুরু করেছিল । বামফ্রন্ট সরকারের আমলে যা রূপ নিল সুনির্দিষ্ট স্থায়ী কর্মসূচীর ।  উদ্বৃত্ত জমি উদ্ধার, ভূমিহীনদের মধ্যে জমির পুনর্বন্টন এবং বর্গাদারের অধিকার রক্ষার কাজ পশ্চিমবঙ্গে যা হয়েছে তার তুলনা নেই । ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকের হাতেই কৃষিজমির ৯০ শতাংশের মালিকানা । গোটা দেশে যদি এর ভগ্নাংশও হতো তাহলে সত্তর শতাংশ ভারতবাসীর দিনে খরচের সামর্থ্য ২০টাকা থাকতো না । অর্থনৈতিক অগ্রগতির লক্ষে ভূমিসংস্কারের গুরুত্ব মৌলিক । ভূমিসংস্কারের উপর ভিত্তি করেই কৃষিফসল উৎপাদনে বিপুল সাফল্য পেয়েছে আমাদের রাজ্য । খাদ্যে ঘাটতি রাজ্য থেকে দেশের সেরা চাল উৎপাদনে । সবজি উৎপাদনে । গ্রামীণ উন্নয়নে, গ্রামীণ দারিদ্র মোচনে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গের তুলনাহীন সাফল্যের কোনো পূর্ব নজির ছিল ? ছিলনা । এটাই একটা নতুন মডেল । সময় পার হবার সঙ্গে সঙ্গে ভুমিসংস্কার কর্মসূচীকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজেও বামফ্রন্ট সরকার ঢিলে দেয় নি । নারী-পুরুষ যৌথ পাট্টা, মহিলাদের পাট্টা, চাষ ও বসবাসের জন্য ভূমিদান প্রকল্প, দেশের মধ্যে প্রথম বনাধিকার আইন কার্যকর করা বা শহরেও গরীব মানুষকে মাথা গোঁজার ঠাঁই দেওয়ার উদ্যোগ – এসব কেউ আগে ভেবেছিল নাকি?

ভূমিসংস্কার যদি রাজ্যের গ্রামীন মানুষের আর্থিক উন্নয়নে অবদান রেখে থাকে তাহলে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার পত্তন সেই মানুষের সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে নজিরবিহীন অবদান রেখেছে । গণতন্ত্রের নতুন আঙিনা হয়ে উঠল ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত । মুখ্যন্ত্রীর  দায়িত্ব নিয়েই বলেছিলেন, বামফ্রন্ট সরকার শুধুমাত্র মহাকরণ থেকে কাজ করবে না । চাই গ্রামের সরকার । এর চেয়ে সহজ করে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মোদ্দা কথাটা ,মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব ছিল না । যে পঞ্চায়েত আইন হাতে ছিল তার উপর দাঁড়িয়েই কাজ শুরু করলেন । কংগ্রেস সরকার আইন করেছিল  । কিন্তু ,স্বৈরাচার আর ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ যেহেতু একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ , তাই কাজটা শুরু করার রাজনৈতিক সদিচ্ছা  তাদের ছিলনা। প্রথম পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে বামফ্রন্ট ডাক দিয়েছিল — ‘বাস্তুঘুঘুর বাসা ভাঙো’ । কারণ সেটাই ছিল গণতন্ত্রকে মানুষের মাঝে প্রসারিত করার প্রথম ধাপ । কাজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই বামফ্রন্ট সরকার পঞ্চায়েত আইনকে সংশোধন করেছে বারবার । শুধু গ্রাম নয়, ক্রমশ স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন বিধিকে পোক্ত করেছে শহরাঞ্চলে । নির্বাচিত পৌরব্যবস্থার প্রকৃত স্বাদ রাজ্যবাসী বামফ্রন্ট সরকারের আমলেই পেয়েছেন । পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েতের অভিজ্ঞতাই  সংবিধান সংশোধন করে জাতীয়স্তরে  পঞ্চায়েত ব্যবস্থা গড়ে তোলার অনুপ্রেরণা যোগায় । বামফ্রন্টের বিরোধী হলেও প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী একথা স্বীকার করেছিলেন ।

নির্বাচিত পঞ্চায়েত ও পুরসভা শুধু কী বামপন্থী সমর্থদের নতুন মর্যাদা ও ক্ষমতায় অভিষিক্ত করেছিল ? না-সব মানুষকে করেছিল । এমন কি বিরোধী দলের কর্মী সমর্থকদেরও । তৃণমূলের টিকিটে জেতা পঞ্চায়েত প্রধানও  যে ক্ষমতা ভোগ করছেন তা বামফ্রন্ট সরকারেরই দেওয়া । কংগ্রেস শাসনে তা ছিলনা ।  তৃণমূল রাজ্য সরকার সেই অধিকার কাড়তে উদ্যত । নতুন বাস্তুঘুঘুরা মাথা তুলতে চাইছে তৃণমূলের কন্ঠলগ্ন হয়ে ।

খুব বেশি আলোচনা হয় না , কিন্তু ১৯৭৮-র সর্বনাশা  বন্যার সফল মোকাবিলা জ্যোতি বসুর নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকার করতে পেরেছিল নতুন অধিকারবোধে উদ্দীপ্ত জনতার মুখরিত সখ্যের সূত্রেই । সরকারী প্রশাসনের সঙ্গে জনতার  অনবদ্য সংযোগ অসাধ্যসাধন করেছিল । ভেঙে যাওয়া স্কুলবাড়ি আবার মাথা তুলেছিল, ভেসে যাওয়া বসতবাটি উঠলো গড়ে । বাঁধ হলো নতুন করে । সরল খেতের বালি । গ্রামের সাধারণ মানুষের সুবিপুল উদ্ভাবনী ক্ষমতা  সেই প্রথম প্রত্যক্ষ করলো গোটা রাজ্য ।

বন্যার পর কেন্দ্রীয় সাহায্য চেয়েছিলেন জ্যোতি বসু, কিন্তু কোনো আকুতি নয়, কোনো হতাশা নয় । মানুষের প্রতি অকপট আস্থা । তাঁর আত্মবিশ্বাসের মর্মকথা । যে সাহস নিয়ে তিনি দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকারের উপমুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে বিধানসভায় নিজের অফিস ঘরে লেলিয়া দেওয়া উন্মত্ত পুলিশ বাহিনীর সামনে অচঞ্চল, সেই আত্মবিশ্বাসেরই অন্য মাত্রা তাঁর মধ্যে দেখেছেন পশ্চিমবঙ্গের মানুষ  পুনর্গঠনের সেই মহান গণঅভিযানে ।

গণতান্ত্রিক অধিকারের বহুমাত্রিক বিস্তার বামফ্রন্ট সরকারের সময়কে বিশিষ্টতা দিয়েছে । বামপন্থী আন্দোলনের কাছে এটা একটা বড় অভিজ্ঞতা । মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারবোধই সুরক্ষিত করেছে বামপন্থীদের । প্রতিটি নির্বাচনী জয়ের পর তিনি  নিয়ম করে  বলতেন, ‘‘আমাদের দায়িত্ব বাড়লো’’ । একবারের জন্যও মনে করাতে ভোলেননি, মানুষই শেষ কথা বলবেন । গণতন্ত্র  মানে মানুষের শেষ কথা বলার অধিকার । আজ কামদুনির সেই ভদ্রমহিলাদের নিজের কথা বলার আকুতি আদতে বামফ্রন্ট সরকারের আমলে গড়ে উঠা নতুন পশ্চিমবঙ্গের অভিজ্ঞতাজাত । তাঁরা কোন দলের ভোটার বড় কথা নয় । বিকেন্দ্রীকৃত ক্ষমতার  গণতান্ত্রিক পরিসরই জন্ম দিয়েছে নতুনতর চেতনার, দাবির ।

গণতন্ত্রই  সাধারণ মানুষের উদ্ভাবনী ক্ষমতার উৎসমুখ খুলে দিয়েছিল । উৎসারিত হচ্ছিল নতুন জীবনের চাহিদা, সংস্কৃতির চাহিদা, নতুন শিক্ষার চাহিদা, সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও পরিকাঠামোগত পুণর্বিন্যাসের নতুন পৃষ্ঠপট ।  পুলিস দিয়ে নাটকের স্ক্রিপ্ট অনুমোদনের দিন শেষ হয়েছিল বামফ্রন্ট সরকারী প্রশাসনে আসতেই । লোকসংস্কৃতি চর্চার পৃথক প্রতিষ্ঠানের পরিকাঠামো রাজ্য সরকার করছে, তা  ১৯৭৭ সালের আগে কেউ কখনো ভাবেনি, করা তো দূরের কথা । নতুন নতুন স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয়েছিল নতুন পরিস্থিতির চাহিদায় সাড়া দিয়েই । সপ্তম বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে ৯৯.২৭ শতাংশেরও বেশি বাচ্ছা স্কুলে নাম লেখাতো । মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর সংখ্যা শুধু ১০ লাখ ছাড়ায়নি, তাদের অর্ধেকেরও বেশি ছাত্রী । কী ছিল ১৯৭৭ সালের আগে, কী হয়েছিল ? এই মেলানোতেই বাম-বিরোধীদের আপত্তি ।

পশ্চিমবঙ্গে বিকাশের এই মডেলের উপর দাঁড়িয়েই কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের  গণতান্ত্রিক পুণর্বিন্যাসের দাবিতে বসু সরব হয়েছিলেন । শুধু সরব হননি, একদিকে জনগণকে সচেতন করতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, অন্যদিকে গোটা দেশে সমস্ত রাজনৈতিক শক্তিকে সমবেত করার চেষ্টা করেছিলেন তাঁর ব্যক্তিত্ব এবং সঠিক সময়ে সঠিক ইস্যুতে সর্বাধিক শক্তিকে সমবেত করার দক্ষতা দিয়ে । জাতীয় রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক চেতনাকে গভীরতা দিতে সেই উদ্যোগের তাৎপর্য অপরিসীম। ইন্দিরা গান্ধীর সরকার বাধ্য হয়েছিল সারকারিয়া কমিশন গঠন করতে । কমিশন খুব ভালো কিছু রিপোর্ট না দিলেও রাজনৈতিক পরিসরে অপরিবর্তনীয় কিছু পরিবর্তন ঘটে যায় ।  কিছু গণতান্ত্রিক মানদন্ড এখন অস্বীকার করতে পারবেনা কেউই ।

ভারতীয় রাজনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতার এবং জাতীয় ঐক্য ও সংহতির প্রশ্নেও দৃঢ় নীতিনিষ্ঠ অবস্থান নেওয়ার একটি মানদন্ড তৈরি করেছিলেন কমরেড  জ্যোতি বসু । । অ-বামপন্থী দল বা জোট পরিচালিত রাজ্য সরকারগুলি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যখন রাজনৈতিক সুবিধাবাদকে প্রশ্রয় দিয়েছে ,তখন বামফ্রন্ট সরকারের  অবস্থান ছিল একেবারে বিপরীত মেরুতে । প্রশাসনিক কাঠামো থেকে  সাম্প্রদায়িক প্রবণতা দূর করা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও আর্থিক সামাজিক উন্নয়নে পদক্ষেপ গ্রহণ — কাজটা সহজ ছিলনা মোটেই । রাজ্যের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার  রূপান্তরে তাঁর দূরদৃষ্টি রাজনৈতিক বিরোধীদের শত কুৎসাতেও চাপা পড়েনা । সংখ্যালঘু কল্যাণে ধারাবাহিক পদক্ষেপের  সূত্র ধরেই সপ্তম বামফ্রন্ট সরকার চাকরির ক্ষেত্রে সংরক্ষণের মতো ঐতিহাসিক ব্যবস্থা চালু করে । ঠিক একাজেই এখন গুরুত্ব দিচ্ছেনা তৃণমূল সরকার । পশ্চিমবঙ্গ সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও বিত্ত নিগম মাত্র দুবছরেই হাঁটু মুড়ে বসে পড়েছে । তৎকালীন পরিস্থিতিতে গোটা দেশের প্রেক্ষাপটে বিচার করলে বোঝা যায় দার্জিলিঙে গোর্খা হিল কাউন্সিল গঠনের পদক্ষেপের গুরুত্ব।  স্বভাবতই জাতীয় স্তরেও এই পদক্ষেপগুলি প্রভাব ফেলেছে । বামফ্রন্ট সরকার  বিকল্পের কী লক্ষ্য নিয়ে চলেছে তা স্পষ্ট হয়েছে তার কাজের মধ্য দিয়েই ।

রাজনৈতিক বিরোধীদের অনেকে ভুলতে ভালোবাসেন , কিন্তু, রাজ্যবাসী কী করে ভুলবেন, পশ্চিমবঙ্গে শিল্পের বিকাশে বিশেষত বড় শিল্পের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের কী চরম  বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হয়েছিল জ্যোতি বসুর নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকারকে । বক্রেশ্বর তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ার বা হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসের অনুমতি দিতে দশক পার করে দিয়েছিল কেন্দ্র। শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণে । সল্টলেকে ইলেকট্রনিক্স শিল্প স্থাপনে অনুমতি না দেওয়ার কী অজুহাত দিয়েছিল কেন্দ্র ? আজ হাস্যকর মনে হতে পারে , কিন্তু এটাই সত্যি যে ইন্দিরা গান্ধীর সরকার বলেছিল , অনুমতি হবেনা,কারণ, সল্টলেক সীমান্তবর্তী ! রাজনৈতিক কারণেই পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রে নতুন করে বিনিয়োগ করেনি কেন্দ্রীয় সরকার । একদিকে জ্যোতি বসু এর বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত করার উপর জোর দিয়েছেন , অন্যদিকে হাতে যে সুযোগ আছে তা কাজে লাগানোর উপর জোর দিয়েছেন । ক্ষুদ্র শিল্পে পশ্চিমবঙ্গ এক নম্বর হয়েছে । নয়া অর্থনীতি চালু হওয়ার পর শত সমস্যার মধ্যেও শিল্প বিনিয়োগে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ কাজে লাগানোর নির্দিষ্ট পদক্ষেপ  গ্রহণ করতে তিনি উদ্যোগ নিয়েছিলেন । সেখানেও জোর দিয়েছেন সাধারণ মানুষকে নতুন উদ্যোগ সম্পর্কে সচেতন করতে । কিন্তু কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতেই হবে এবং তা বিদ্যমান বাস্তবতার উপর দাঁড়িয়েই শিল্পের নানাবিধ  উদ্যোগের মাধ্যমেই করতে হবে । কৃষির সাফল্যের উপর দাঁড়িয়ে এবং সেই সাফল্য ধরে রেখে কর্মসংস্থানমুখী শিল্পায়নের পথ যে অপরিহার্য তা কমরেড জ্যোতি বসু স্পষ্ট করেই বলেছিলেন । বামবিরোধী রাজনীতির যেহেতু একটা স্বভাব নৈরাজ্য আছে  তাই সাধারণ মানুষের স্বার্থ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার দায়িত্বজ্ঞানহীনতায় তারা দ্বিধাহীন । রাজ্যে ‘পরিবর্তন’-র দুবছর বুঝিয়ে দিয়েছে শিল্পায়ন নিয়ে রাজনৈতিক মিথ্যাচার  রাজ্যবাসীর ভবিষ্যৎকে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে এক  অন্ধগলির সামনে । বামফ্রন্ট সরকার সব সমস্যার সমাধান করে দিতে পেরেছিল এমন কথা জ্যোতি বসু বা বামফ্রন্ট কখনও  বলেননি । কারণ সেটা  সম্ভব নয় । কিন্তু বিদ্যমান পরিস্থির সামনে জনমুখী উন্নয়নের  বিকল্প একটা মডেল  তুলে ধরতে পেরেছিল বামফ্রন্ট সরকার। যার তাৎপর্য শুধু এরাজ্যে নয় , গোটা দেশে।

আশ্চর্য নয় যে, সীমাবদ্ধ ক্ষমতার মধ্যেও বামফ্রন্ট সরকারের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কাজগুলির উপরই সবচেয়ে বেশি আক্রমণ নামিয়ে আনছে তৃণমূল সরকার । প্রতিটি গণতান্ত্রিক বিধি ও প্রতিষ্ঠান এই সরকারের চক্ষুশূল । পঞ্চায়েত নির্বাচন করতে তারা বাধ্য হলো বহু চাপে পড়ে । পুরসভা নির্বাচনেও তাদের আপত্তি । সমবায়গুলির গণতান্ত্রিক পরচালনবিধি তারা মানছেনা । শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে নির্বাচিত ব্যবস্থা,নির্বাচিত ছাত্র ইউনিয়ন,  তাদের ভীষণ অপছন্দ । কারণ, মনোনয়ন মানেই ‘রাজনীতি–মুক্তি’র অজুহাতে  তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের নিরুঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ  এ-কদিনেই স্পষ্ট । জনগণের অধিকারবোধে যারা বিপন্ন , গণতান্ত্রিক কাঠামো তাদের কাছেই বোঝা । সেকারণেই ‘পরিবর্তন’ আসলে গণতন্ত্রের অজস্র সৌধের উপর কালাপাহাড়ী অভিযানের রূপ নিয়েছে । ‘চৌত্রিশ’ বছরের উপর ওদের এত ক্রোধ কি এমনি !

ঘটনাক্রমে কমরেড জ্যোতি বসুর জন্মশতবর্ষ এসেছে  এমন একটা সময়ে যখন রাজ্যে বামপন্থীরা এক প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি । তিনি যখন জীবিত ছিলেন তখনও তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে প্রতিকূলতার মোকাবিলা করতে হয়, এখন জন্মশতবর্ষে  তাঁর জীবন ও কর্ম  বামপন্থী আন্দোলন ও গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষের  কাছে শিক্ষনীয় বহু উপাদান নিয়ে উপস্থিত হয়েছে । কারণ, উদ্যত প্রতিকূলতার সফল মোকাবিলারই অন্য নাম জ্যোতি বসু ।

গণশক্তি, ৭ই জুলাই, ২০১৩

Advertisements
Published in: on জুলাই 10, 2013 at 7:44 অপরাহ্ন  মন্তব্য করুন  

The URI to TrackBack this entry is: https://jyotibasu.wordpress.com/2013/07/10/%e0%a6%89%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%a4-%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a7%82%e0%a6%b2%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a6%ab%e0%a6%b2-%e0%a6%ae%e0%a7%8b/trackback/

RSS feed for comments on this post.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: