জ্যোতি বসুর কাছ থেকে আমরা শিখতে পারি কি না

বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর

জ্যোতি বসুর সঙ্গে আমার প্রথম ও শেষ দেখা একবারই। মুজাফ্‌ফর আহমদ স্মৃতি পুরস্কার গ্রহণ করার জন্য ৫ আগস্ট ২০০৫ কলকাতা গিয়েছি। সঙ্গে আমার স্ত্রী। পুরস্কারের উদ্যোক্তা বামফ্রন্ট সরকার। আমার একটি ছোট ইতিহাসবিষয়ক বইয়ের জন্য পুরস্কার। বইটির নাম : ইতিহাস নির্মাণের ধারা। দুই বাংলার বাংলাভাষী বইয়ের মধ্যে যে বইটি শ্রেষ্ঠ, সে বইটিকে পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে পুরস্কার কমিটি। সে জন্যই আমাদের কলকাতায় আসা। এয়ারপোর্টে সরকারের পক্ষে ও দলের পক্ষে দুজন উপস্থিত, তাঁদের সঙ্গে অনমিত্র, গণশক্তির সিনিয়র সাংবাদিক। আমরা যত দিন কলকাতা থাকব, তত দিন অনমিত্র আমাদের সার্বক্ষণিক সহচর। অনমিত্র স্বল্পভাষী নন, বাকি দুজন স্বল্পভাষী। ট্যাক্সির চালক জানেন, আমরা কোথায় যাব। কলকাতার নিসর্গ দ্রুত পেছনে ফেলে ট্যাক্সি ছুটছে সল্টলেকের দিকে। যানজট কম।

অনমিত্র বললেন, আপনারা থাকবেন সল্টলেকের একটা হোটেলে। পরিচ্ছন্ন হোটেল। চারপাশে গাছপালা প্রচুর। চোখে শান্তি পাবেন। আমার স্ত্রীর চোখে সমস্যা আছে। বললাম সে-কথা। একজন ভালো চোখের ডাক্তারকে দেখাতে চাই। অনমিত্র বললেন, এসব সমস্যা আমার ওপর ছেড়ে দিন। সল্টলেকে একটা প্রথম শ্রেণীর আই ক্লিনিক আছে। সেখানেই বউদির চোখ পরীক্ষা করিয়ে দেব। পার্টি ব্যবস্থা করে দেবে।

হোটেলে পৌঁছানোর পর নির্দিষ্ট রুমে আমাদের জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখলাম।
অনমিত্র বললেন, আপনারা ফ্রেশ হয়ে নিন। তারপর খেতে যাবেন ডাইনিংয়ে। যা খেতে চান, তা-ই পাবেন। ইলিশ মাছসুদ্ধ। আমার স্ত্রী মাছের ভক্ত নন, তিনি মাংসাহারী। অনমিত্র বললেন, কোনো সমস্যা নেই। বউদি মুরগি খাবেন, দাদা আপনি ইলিশ মাছ। সাড়ে ৩টার সময় বের হব। ৪টায় অনুষ্ঠান। মহাজাতি সদনে। আপনাদের জন্য রাস্তা অনেকটাই ফাঁকা করা হয়েছে। আপনারা তো রাষ্ট্রীয় অতিথি। ডাইনিংয়ে আমাদের পৌঁছে দিয়ে অনমিত্র চলে গেলেন। ফাঁকা ডাইনিং রুম। আবাসিক হোটেল হলেও বাইরের লোক খেতে পারে।

যিনি পরিচারক তিনি হেসে বললেন, দাদা ঢাকার, তাই না? আমিও কোনো এক সময় ঢাকার লোক ছিলাম। কত দিন ঢাকা যাই না। দাদা তো ইলিশ মাছ খাবেন, সেভাবেই আমরা প্রস্তুত। বউদিকে দেব মুরগি। আমাদের কুক মুসলমান। ওর রান্নার তারিফ করতে হয়। এই যে সুলেমান। দাদা-বউদির ভার তোমার ওপর। যা খেতে চান, যেভাবে খেতে চান সেভাবে তুমি রান্না করবে।

মহাজাতি সদনে ৪টার মধ্যে পৌঁছে গেলাম। মঞ্চের মাঝখানে আমি এবং আমার স্ত্রী, দুপাশ ঘিরে জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, বিমান বসু, নিরুপম সেন, মোহাম্মদ সেলিম। মঞ্চের বাঁ কোণে মুজাফফর আহমদের তৈলচিত্র। আমি এক ফাঁকে অনমিত্রকে বললাম, আমি জ্যোতি বসু আর বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সঙ্গে কথা বলতে চাই। সম্ভব হবে কি? অনমিত্র বললেন, তাঁরাও আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান। একটু বাদে অনমিত্র উঠে গেলেন, ফিরে এসে বললেন, সিএম এখানেই আপনার সঙ্গে আলাপ করবেন। মঞ্চের পেছনে উনি আপনাকে ডেকে নেবেন। সল্টলেকে জ্যোতি বসু থাকেন। আপনার হোটেলের কাছেই। কাল সকাল ১০টা নাগাদ তিনি আপনাকে সময় দিয়েছেন। আপনার বরাদ্দ করা গাড়ি ঠিক সময়ে আপনাকে পৌঁছে দেবে।

নিরুপম সেন শিল্পমন্ত্রী এবং পুরস্কার কমিটির কনভেনর। তিনি অনেকক্ষণ ধরে বললেন, কেন আমার বইটিকে শ্রেষ্ঠ বই হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। আমি নিরুপম সেনের বক্তব্য শুনছিলাম আর ভাবছিলাম। কৃষি বিপ্লব বনাম শিল্প বিপ্লবের সমস্যা। জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, বিমান বসুদের ভাবনা : পশ্চিম বাংলায় কৃষি বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছে, এখন শিল্প বিপ্লবের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময়। সিঙ্গুরে তখন কৃষকদের খেপিয়ে তোলা হচ্ছে মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে। জমি নষ্ট করে কারখানা স্থাপন করা যাবে না এবং শিল্পপতিদের হাতে ধানি জমি তুলে দেওয়া যাবে না। যারা জোতদার, ভূমি সংস্কারের সময় মুখ লুকিয়েছে, সেই সব হিন্দু ও মুসলমান জোতদার মাটির তলা থেকে বেরিয়ে এসেছে, তারা কৃষকদের নিয়ে জোট বেঁধেছে শিল্প বিপ্লবের বিরুদ্ধে। তারা বাম দলগুলোর বিরুদ্ধে (সি পি আই এম, সিপিআই, ফরোয়ার্ড ব্লকের বিরুদ্ধে) একত্র হয়েছে। কৃষকদের অভুক্ত রেখে কলকারখানা স্থাপন করা যাবে না।

বামফ্রন্টের তিন পর্যায়ের ইতিহাস আমি ভাবছিলাম। প্রথম পর্যায়ে জ্যোতি বসু-বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বিরুদ্ধে কৃষক আন্দোলনের নেতা হরেকৃষ্ণ কোঙারের লড়াই। হরেকৃষ্ণ কোঙারের মত : কৃষি সংস্কার এখনো অসম্পূর্ণ অবস্থায়, এখান থেকে শিল্প বিপ্লবের উদ্যোগ গ্রহণ সুইসাইডাল। জ্যোতি বসু-বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বক্তব্য : কৃষি সংস্কার সফল হয়েছে, গ্রামাঞ্চলে কোয়াসি-ক্যাপিটালিস্ট ডায়নামিক তৈরি হয়েছে, শিল্পাঞ্চলে ধর্মঘট শ্রমিকরা নিজেরাই স্থগিত করেছে, এখন শিল্প বিপ্লবের দিকে অগ্রসর হওয়ার পালা। দ্বিতীয় পর্যায়ে হরেকৃষ্ণ কোঙাররা পেছনে হটে যান এবং জ্যোতি বসু-বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মত হচ্ছে : গ্রামাঞ্চলে কৃষকরা কৃষি সংস্কার করে যে বিপ্লব এনেছে তার সুবিধা পাওয়া শুরু হয়েছে। তৃতীয় পর্যায়ে জ্যোতি বসু ও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মধ্যে মতবিরোধ শুরু হয়। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য দ্রুত শিল্প বিপ্লবের দিকে অগ্রসর হতে চান, কিন্তু জ্যোতি বসু ধীরগতিতে অগ্রসর হতে চান। তাঁর বক্তব্য খুব সম্ভব এ রকম_পশ্চিমবঙ্গ অর্থনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিকভাবে অপেক্ষাকৃত বহুবাদী সমাজ। শিল্প বিপ্লবের জন্য দরকার ধৈর্য, সামাজিক শান্তি ও সমন্বয়। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের দ্রুত পথচলা তৈরি করেছে টেররের বিস্ফোরণ, যার সুবিধা নিচ্ছেন মমতা ব্যানার্জিরা। পার্টি ও সরকারের দ্বন্দ্ব এই পর্যায়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, গত শতকের বিশের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের এক পক্ষে ট্রটস্কি ও অন্য পক্ষে স্টালিন-বুখারিনের বিতর্ক থেকে আমরা শিখতে পারি কি না; এবং পরবর্তী সময়ে স্টালিন এবং বুখারিনের বিতর্ক থেকে সমাজ সংস্কার কিংবা সমাজ বিপ্লবের পাঠ নিতে পারি কি না। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য চুপ করে আবার কথা শুনলেন এবং মন্তব্য করলেন, এদিক থেকে আমরা ভাবিনি।

পরের দিন জ্যোতি বসুর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য আমি তৈরি। ঠিক ১০টায় গাড়ি এল। অনমিত্র গাড়ি থেকে নেমে বললেন, জ্যোতি বসু সাক্ষাৎকারের সময়টা দুদিন পিছিয়ে দিতে চান। তিনি বলেছেন, এ দুদিন আপনি সিঙ্গুর এবং অন্যান্য অঞ্চল থেকে ঘুরে আসুন। নিজের চোখে দেখুন কৃষকদের অবস্থা, কেন তারা কলকারখানা বিস্তারে বাধা দিচ্ছে। তারপর তিনি আপনার সঙ্গে আলাপ করবেন।

জ্যোতি বসুর সঙ্গে এ সাক্ষাৎ আমার আর হয়নি। স্ত্রীর চোখের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পরের দিন ঠিক হয়েছে। আমার আর যাওয়া হয়নি জ্যোতি বসুর কাছে।

হয়তো তাঁর কাছ থেকে শুনতে পেতাম পিছিয়ে পড়া দেশে শিল্প বিপ্লবের অন্য কোনো রণকৌশল আছে কি না। লড়াই করে যেতে হবে এবং লড়াইয়ের আবেদন : রাজনৈতিক এবং নৈতিক আবেদন শেষ পর্যন্তও রক্ষা করে যেতে হবে। জ্যোতি বসু হয়তো এ কথাটাই আমাকে বলতে চেয়েছেন।

লেখক : শিক্ষাবিদ

http://www.dailykalerkantho.com/index.php?view=details&archiev=yes&arch_date=30-01-2010&type=single&pub_no=62&cat_id=1&menu_id=23&news_type_id=1&index=0

ব্লগারের নোট:  মুজফ্‌ফর আহমদ স্মৃতি পুরস্কারের উদ্যোক্তা বামফ্রন্ট সরকার নয়। এই পুরস্কার দেয় সি পি আই (এম) পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির পক্ষে গঠিত মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ স্মৃতি পুরস্কার কমিটি। লেখক সম্ভবত অনবধনতাবশত এটি লিখেছেন।

Advertisements
Published in: on জুলাই 7, 2013 at 6:55 অপরাহ্ন  মন্তব্য করুন  

The URI to TrackBack this entry is: https://jyotibasu.wordpress.com/2013/07/07/%e0%a6%9c%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a7%8b%e0%a6%a4%e0%a6%bf-%e0%a6%ac%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%b0-%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%9b-%e0%a6%a5%e0%a7%87%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%b0%e0%a6%be/trackback/

RSS feed for comments on this post.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s

%d bloggers like this: