আর কোনোদিন কেউ জ্যোতি বসু হবেন না

প্রকাশ কারাত

যদিও তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৬, তবুও এক তীব্র বেদনাযন্ত্রণায় আজ আমরা ক্ষতবিক্ষত — কারণ, কোনওদিন আর কোনও জ্যোতি বসু হবেন না।

জ্যোতি বসু নেই। ঠিকই, প্রতিদিনই তাঁর শরীর ভাঙছিল, তবুও তাঁর বিদায়, সমগ্র পার্টির কাছে এক তীব্র মানসিক আঘাত। শোকাহত গোটা দেশ। পশ্চিমবঙ্গের মানুষের হৃদয়ে স্বজন হারানোর বেদনা। কারণ, কমিউনিস্ট আন্দোলনের বুননের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে তাঁর জীবন। যখন আমরা তেভাগা আন্দোলনকে স্মরণ করি, যখন আমরা দেশভাগের সময় সাম্প্রদায়িক গণহত্যার বিরুদ্ধে সংগ্রামকে ফিরে দেখি, কিংবা স্বাধীনতার পর যখন আমরা ১৯৫৯এ খাদ্য আন্দোলনের মতো মহান গণ-আন্দোলন, গত শতকের ছয়ের দশকের জমির আন্দোলন, আধা-ফ্যাসিস্ত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সংগ্রামের কথা স্মরণ করি, তখন দেখি এই সমস্ত ঘটনাক্রম, আন্দোলনের সঙ্গেই অবিচ্ছেদ্য রূপে জড়িয়ে রয়েছেন জ্যোতি বসু।

তাঁর জীবনাবসানের সঙ্গেই অবসান ঘটল একটি যুগের।

সি পি আই (এম) ১৯৬৪তে যেদিন গঠিত হয়েছিল, সেদিন পশ্চিমবঙ্গ ছিল না পার্টির শক্তিশালী ইউনিট। এটা পরে তৈরি হয়েছিল সঠিক রণনীতি ও রণকৌশল গ্রহণ করার কারণে, যাতে প্রমোদ দাশগুপ্তর সঙ্গে জ্যোতি বসু পালন করেছিলেন মুখ্য ভূমিকা। ইটের ওপর ইট গেঁথে যদি প্রমোদ দাশগুপ্ত পার্টি সংগঠন গড়ে তুলে থাকেন, তবে জ্যোতি বসু ছিলেন রাজনৈতিক প্রচারাভিযান, গণ-আন্দোলন এবং আইনসভায় নেতৃত্বে।

পলিট ব্যুরোতে অধিকাংশই তাঁর অভাব বোধ করবে, প্রায় ৪৫বছর যার সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন তিনি। আমাদের কাছে, আমরা যারা তিন দশক এবং তার পরে পার্টি নেতৃত্বে এসেছি, তাদের অনেক কিছু শেখার আছে তাঁর থেকে। এমনকি সাম্প্রতিক বছরগুলিতে যখন তিনি মিটিংয়ে আসতে পারতেন না, আমরা তাঁর পরামর্শ চাইতাম।

গত কয়েক বছর ধরে, জ্যোতি বসু প্রায়ই বলতেন পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা, ত্রিপুরা বাদ দিয়ে কেন পার্টির বিকাশ অন্যত্র হচ্ছে না। তিনি বরাবরই যেসব রাজ্যে আমরা দুর্বল, সেখানে পার্টি ও গণসংগঠন নির্মাণের ওপর জোর দিতেন।

জ্যোতি বসু ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন। কিন্তু, তিনি জীবিত থাকবেন মানুষের হৃদয়ে — শ্রমিক, কৃষক, খেতমজুর এবং কর্মচারী,  যাঁদের জন্য তিনি আজীবন কাজ করে গিয়েছেন, তাঁদের মননে। গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতার সৌধকে শক্তিশালী করতে তাঁর যে মহার্ঘ অবদান, স্বাধীন ভারতে খুব কম নেতাই তা দাবি করতে পারেন।

শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রামের সঙ্গী ছিলেন তিনি। শ্রমজীবী জনগণকে নিয়ে এসেছিলেন ভারতীয় রাজনীতির ভরকেন্দ্রে। হয়ে উঠেছিলেন বাম, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলির প্রতীক।

সি পি আই (এম)-র কাছে তিনি বরাবরের জন্য একজন খাঁটি কমিউনিস্ট হিসেবে অনুসরণীয় নেতা হিসেবে থাকবেন।

গণশক্তি, ১৮ই জানুয়ারি, ২০১০

Advertisements
Published in: on জুলাই 7, 2013 at 7:23 অপরাহ্ন  মন্তব্য করুন  

The URI to TrackBack this entry is: https://jyotibasu.wordpress.com/2013/07/07/%e0%a6%86%e0%a6%b0-%e0%a6%95%e0%a7%8b%e0%a6%a8%e0%a7%8b%e0%a6%a6%e0%a6%bf%e0%a6%a8-%e0%a6%95%e0%a7%87%e0%a6%89-%e0%a6%9c%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a7%8b%e0%a6%a4%e0%a6%bf-%e0%a6%ac%e0%a6%b8%e0%a7%81/trackback/

RSS feed for comments on this post.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: