মানুষের ওপরে বিশ্বাস রাখতে হবে,তাঁদের ভালোবাসার যোগ্য হতে হবেঃ জ্যোতি বসু

১৯৭৭ সালে এরাজ্যে যখন বিধানসভা নির্বাচনের দিন ঘোষণা হলো, তার আগে একটানা পাঁচ-ছয় বছর ধরে কংগ্রেস সরকার এবং কংগ্রেস দলের পক্ষ থেকে ভয়াবহ সন্ত্রাস নামিয়ে আনা হয়েছে। ১৯৭২ সাল থেকে প্রায় ১২০০ সি পি আই (এম) নেতা-কর্মীকে খুন করা হয়েছে, হাজার হাজার নেতা-কর্মী বাড়ি ছাড়া, পার্টি অফিস, ট্রেড ইউনিয়ন অফিস দখল হয়ে গেছে। দেশে জরুরী অবস্হা কায়েম হয়েছে। আধা-ফ‌্যাসিস্ট সন্ত্রাসের সেই শ্বাসরোধকারী অবস্হার মধ্যে যখন নির্বাচন হলো, তখন আমরা ভাবিনি যে মানুষ আমাদেরই বিপুলভাবে জয়ী করবেন এবং পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হবে।

কিন্তু মানুষ যে কংগ্রেসকে ক্ষমা করেনি, ১৯৭৭ সালে তা প্রথম সুযোগেই প্রমাণিত হলো। কংগ্রেস গোটা দেশেই ধরাশায়ী হলো, এরাজ্যে তো বটেই। পশ্চিমবঙ্গে প্রথম বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হলো। তারপর থেকে টানা সাতবার এরাজ্যের মানুষ বামফ্রন্টকে জয়ী করে শুধু ভারতেই নয়, গোটা পৃথিবীর সংসদী‌য় গণতন্ত্রের ইতিহাসে ন‍‌জির তৈরি করেছেন। আজ এরাজ্যে বামফ্রন্ট সরকার ৩২ বছরে পড়লো। এই উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গের সংগ্রামী মানুষকে আমি আরেকবার অভিনন্দন জানাচ্ছি।

আমরা যখন সরকারে এলাম, খুবই সীমিত আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা নিয়ে কাজ শুরু করতে হয়েছিলো। তা সত্ত্বেও আজ এটা স্বীকৃত, এই সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার মানুষের স্বার্থে অনেক কাজ করতে পেরেছে।  আমরা যে এতদিন সরকারে রয়েছি, তা মানুষের ইতিবাচক রায়েই রয়েছি।  পাশাপাশি, বামফ্রন্ট সরকার গোটা দেশের সামনে মানুষের স্বার্থে বিকল্প কর্মসূচীর একটা নজিরও তুলে ধরতে পেরেছে । জাতীয় রাজনীতিতেও বিভিন্নভাবে আমাদের সাফল্যের ছাপ পড়েছে। জোট সরকার মানেই যখন অস্হিতিশীল, বিশৃঙ্খল পরিস্হিতি বলে প্রমাণ হচ্ছিলো, তখন এরাজ্যে  বামফ্রন্ট সরকার স্হিতিশীল, শান্তির পরিবেশ এবং জনমুখী উন্নয়নের নজির তৈরি করে গোটা দেশের সামনে একটি উজ্জ্বল ব্যাতিক্রম তুলে ধরেছে ।

শুধু জোট রাজনীতির প্রশ্নেই নয়, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকেও সামনে তুলে এনেছিল বামফ্রন্ট সরকারই। আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং একেবারে নিচুতলায় অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটানোর ক্ষেত্রে  পশ্চিমবঙ্গ গোটা দেশের সামনের সারিতে।  একথা আজ সকলেরই জানা যে এরাজ্যের ত্রিস্তর পঞ্চায়েতী ব্যবস্হাকে মডেল করেই গোটা দেশে তা রূপায়ণের জন্য আইন তৈরি করা হয়েছে। ভূমি সংস্কার, কৃষি ও গ্রামোন্নয়নের ক্ষেত্রেও এই সরকারের সাফল্য সর্বজনস্বীকৃত। পাশাপাশি, গণতান্ত্রিক পরিবেশ, শান্তি-সুস্হিতি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিরবছ্ছিন্নভাবে বজায় রাখার ক্ষেত্রেও দেশের সামনে এরাজ্য উদাহরণ।

১৯৭৭ সালের ২১শে জুন, সরকারে আসার প্রথম দিনই আমরা ঘোষণা করেছিলাম, শুধু মহাকরণ থেকে এই বামফ্রন্ট সরকার চলবে না। আমরা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করবো। পঞ্চায়েত এবং পৌরসভার মাধ্যমে সেই কাজও  করা  হয়েছে। আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করে আমরা গ্রামের গরিব মানুষের হাতে ক্ষমতা পৌঁছে দিয়েছি। বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হওয়ার এক বছরের মধ্যেই  ১৯৭৮ সালে প্রথম পঞ্চায়েত নির্বাচন হয়। সেবছর ভয়াবহ বন‌্যার ত্রাণ ও পুনর্গঠনে পঞ্চায়েতের মাধ্যমে যে অসাধারণ কাজ হয়েছিল, তাতেই মানুষ বুঝেছিলেন এই ব্যবস্হা আমাদের প্রয়োজন। তখনই শুরু হয় জমি বিলি, অপারেশন বর্গা ইত‌্যাদির কাজ। শুনলাম, এবারে পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে আমাদের বিরুদ্ধে প্রচার করা হয়েছে, বামফ্রন্ট সরকার নাকি কৃষকের জমি কেড়ে নেবে। এসব ডাহা মিথ‌্যা কথা। এরাজ্যে গ্রামের লক্ষ লক্ষ ভূমিহীন গরিব মানুষকে আমরাই জমি দিয়েছি। এরাজ্যে এপর্যন্ত ১১ লক্ষ  একর জমি বিলি হয়েছে, এখনও বিলির কাজ চলছে। এই জমি পেয়েছেন ২৯ লক্ষ ৮১ হাজার ভূমিহীন ক্ষেতমজুর, গরিব কৃষক। সারা দেশে মোট জমি বিলির ২২ শতাংশই এরাজ্যে হয়েছে, মোট উপকৃতের ৫৪ শতাংশও এরাজ্যেই। জোতদার-জমিদারদের স্বার্থে এই কংগ্রেস দলই সেই সময় একাজে বাধা দিয়েছিল, অনেক মামলাও করেছিল। কিন্তু আমরা পিছু হঠিনি। অপারেশন বর্গার মাধ্যমে বর্গাদারদের নাম নথিভুক্ত করে তাঁদের জীবিকার নিরাপত্তাও দেওয়া হয়েছে।

কৃষিতেও আমরা অনেক সাফল্য পেয়েছি, খাদ্যে স্বনির্ভর হয়েছি। সারা দেশে কৃষি উৎপাদনে আমরাই শীর্ষে। কিন্তু কৃষিক্ষেত্রে আরো উন্নতির সুযোগ রয়েছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহায্য নিয়ে আমাদের কৃষির মান আরো উন্নত করতে হবে। কৃষিতে উন্নততর প্রযুক্তির প্রয়োগ, অকৃষি জমিকে চাষযোগ্য করা, একফসলী জমিকে বহুফসলী করা, উচ্চ ফলনশীল বীজের ব্যবহার বাড়ানো, ফসলের বৈচিত্র্যকরণ প্রভৃতি কাজ আমাদের করতে হবে ।

শিল্পেও আমাদের এগোতে হবে। সপ্তম বামফ্রন্ট সরকার সেই লক্ষ্যে পদক্ষেপ নিয়েছে। শিল্পবিকাশের প্রশ্নেও আমরা বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই কাজ করছি। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গ আর্থিক ও অন্যান্য ক্ষেত্রে কেন্দ্রের চরম বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হয়েছে।  ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার তৈরি হওয়ার পরে কেন্দ্রের এইসব বাধা অতিক্রম করেই আমরা শিল্পস্হাপনের নীতি নিই। নয়ের দশকের গোড়ায় যখন মাসুল সমীকরণ নীতি ও লাইসেন্স প্রথা তুলে নেওয়া হলো, তখন আমাদের সামনে আরও সুযোগ এলো। আমরা যখন বণিকসভাগুলিতে গিয়ে এরাজ্যে বিনিয়োগের আবেদন জানাচ্ছিলাম, তখন তাঁরা আমাদের বললেন, আপনারা যে নীতির ভিত্তিতে এখানে শিল্প গড়ার কথা বলছেন, সেটা লিখিতভাবে দিলে সুবিধা হয়। তখন ১৯৯৪ সালে আমরা বিধানসভায় বর্তমান শিল্পনীতি ঘোষণা করি। সেই নীতি অনুসারেই সরকার কাজ করছে।

কিছুদিন আগে রাজ্যে সপ্তম পঞ্চায়েত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। নির্বাচনে আমাদের ফল কিছুটা খারাপ হয়েছে। অনেক মানুষ আমাদের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। কেন তাঁরা আমাদের বিরুদ্ধে গেলেন তা খুঁজে বের করতে হবে। পর্যালোচনার সেই কাজ এখন জেলায় জেলায় চলছে।  তবে এবারে আমাদের বিরুদ্ধে যে একটা সুবিধাবাদী মহাজোট হয়েছিল, সেটা এই ফলাফলে বোঝা গেলো।  চরম দক্ষিণপন্হী শক্তির সঙ্গে যারা নিজেদের বামপন্হী বলে, তারাও আমাদের বিরুদ্ধে একজোট হয়েছিল। আর অস্ত্র নিয়ে যারা আমাদের পার্টির নেতা-কর্মীদের খুন করছে, তারাও এদের সাহায্য করছে। এটা অত্যন্ত দূর্ভাগ্যজনক যে কংগ্রেসও খোলাখুলি বলেছে এদের ভোট দিতে। এমন একটা জোট, যার কোনও নীতি-নৈতিকতা নেই, কোনও কর্মসূচী নেই, খালি বামফ্রন্ট এবং বিশেষকরে সি পি আই (এম) বিরোধিতাই যার একমাত্র লক্ষ্য। আমাদের বিরুদ্ধে অসম্ভব মাত্রায় মিথ‌্যা প্রচার ও কুৎসাও হয়েছে গত এক-দেড়বছর ধরে। এই অপপ্রচার কিছু মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পেরেছে।   

তাছাড়া এবারে বামফ্রন্টে আমাদের পুরো ঐক্য হয়নি। কিন্তু এটাও ঠিক যে গতবারেও বামফ্রন্টে আমরা সার্বিক ঐক্য করতে পারিনি। তিনটি স্তরেই অনেক জায়গায় বিরোধ ছিল। গতবার ফরওয়ার্ড ব্লক ও আর এস পি-র সঙ্গে বেশ কিছু জায়গায় ঐক্য হয়নি, প্রায় ১০ হাজার আসনে। যাতে সার্বিক ঐক্য হয়, তার জন্য খুবই চেষ্টা করা হয়েছিল আমাদের পার্টির পক্ষ থেকে। এবারেও আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে ইশতেহার প্রকাশ করেছি। আমরা চেষ্টা করেছি যতখানি সম্ভব বেশি আসনে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করতে। আমাদের পার্টির কথা বলতে পারি, আমরা আগেও ত‌্যাগ স্বীকার করেছি, এখনও রাজি আছি। আমরা এবারেও অনেক আসন ছেড়ে ঐক্য করার চেষ্টা করেছি। আমাদের সকলকেই এর থেকে শিক্ষা নিতে হবে। আমাদের পার্টি, ফরওয়ার্ড ব্লক, আর এস পি, সকলকেই। বামফ্রন্টের ঐক্যকে যাতে আরো দৃঢ় করতে পারি, তার জন্য আমাদের সকলকে উদ্যোগ নিতে হবে। আমার কথা হলো, আমরা এরাজ্যে বামফ্রন্টের যে নজির সৃষ্টি করেছি, তার উদাহরণ গোটা দেশে কোথাও নেই। একে রক্ষা করতে হবে।

আমার বিশ্বাস আছে, রাজ্যের মানুষ কখনই কোনও সুবিধাবাদী জোট বা সুবিধাবাদী দলকে মেনে নেবেন না। পশ্চিমবঙ্গের মানুষের চেতনা আছে, তাঁরা  অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে উপলব্ধি করেছেন কে শত্রু, কে মিত্র।  আমি শুধু একটা কথাই বলবো, মানুষের ওপরে আমরা যেন বিশ্বাস না হারাই। মানুষের কাছে বারবার যেতে হবে, ত‌াঁদের ভালোবাসা আমাদের পেতে হবে। পঞ্চায়েত নির্বাচনে আমাদের বিরুদ্ধে যারা চলে গেছেন তাঁদেরকে আবার আমাদের দিকে টেনে আনতে হবে। শুধু তাঁদেরকেই নয়, আরো নতুন নতুন মানুষকেও টেনে আনতে হবে। পাশাপাশি নিজেদের যে ভুল আছে তাও শুধরে নিতে হবে।

একটা জটিল রাজনৈতিক অবস্থার মধ্যে দিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি। আমাদের এটাও মনে রাখা দরকার,পশ্চিমবঙ্গ,‍ কেরালা, ত্রিপুরায় আমরা যে বাম সরকারগুলি চালাচ্ছি তা এই বুর্জোয়া সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই। আমরা এই পুঁজিবাদী সাংবিধানিক কাঠামোতে কখনও বলতে পারি না, এই সরকারগুলি সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচী রূপায়ণ করবে। সাম্যবাদ, সমাজতন্ত্র আমাদের লক্ষ্য; শ্রেণীহীন, শোষণহীন সমাজব্যবস্থা আমরা গড়তে চাই।  সেটা আমাদের লক্ষ্য।  সেই লক্ষ্যে আমাদের পৌঁছোতে হবে।  

২১শে জুন, ২০০৮, গণশক্তি

Advertisements
Published in: on জুন 30, 2010 at 4:42 অপরাহ্ন  মন্তব্য করুন  

The URI to TrackBack this entry is: https://jyotibasu.wordpress.com/2010/06/30/%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%81%e0%a6%b7%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%93%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%87-%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%b6%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b8-%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%96/trackback/

RSS feed for comments on this post.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s

%d bloggers like this: