ইতিহাস গড়েছেন পশ্চিমবাংলার মানুষ

(নিরুপম সেন-এর লেখা ‘বিকল্পের সন্ধানে’ বইয়ের ভূমিকা)

পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রণ্ট সরকার তিরিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে বারবার এরাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের রায়ে নির্বাচিত হয়ে আসছে। শুধু ভারতেই নয়, সারা পৃথিবীর সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসেও এটা একটা নজিরবিহীন ঘটনা। এজন্য কৃতিত্ব প্রাপ্য এরাজ্যের সচেতন, সংগ্রামী মানুষের।

আমরা যে কখনও সরকার গঠন করতে পারবো, আর সেই সরকার যে এতদিন টিঁকবে, তা আগে কখনো ভাবতেও পারিনি। ১৯৫৭ সালে কেরালায় যখন প্রথম কমিউনিস্ট সরকার গঠিত হলো, তখনও আমাদের সামনে অতটা পরিষ্কার ধারণা ছিল না যে এই পূঁজিবাদী সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে একটি অঙ্গরাজ্যে কমিউনিস্টরা সরকার গঠন করলে কী করা সম্ভব, কতখানি করা সম্ভব। সেসব আমরা পরে ভেবেছি। ১৯৬৪ সালে সি পি আই (এম) যখন গঠিত হলো, তখন পার্টি কর্মসূচীতে আমরা বললাম, এরকম সরকারে গেলে সমাজব্যবস্থার খুব বড় কিছু অদল-বদল হয়তো আমরা করতে পারবো না। কিন্তু এই সংবিধানে যে অধিকার দেওয়া আছে, তাকে কাজে লাগাতে হবে। মানুষের স্বার্থে এই সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার আমাদের করতে হবে। মানুষকে কিছু রিলিফ আমরা নিশ্চয়ই দিতে পারবো এইসব সরকারকে ব্যবহার করে। পার্টি কর্মসূচী সময়োপযোগী করা হলে আমরা বলেছি, সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে এই সরকারগুলি বিকল্প নীতি তুলে ধরবে ও প্রয়োগ করার চেষ্টা করবে।

অবশ্য পশ্চিমবঙ্গে রিলিফের থেকে বেশি কিছুই আমরা মানুষকে দিতে পেরেছি। এটা ঠিকই, আমাদের লক্ষ্য হলো শ্রেণীহীন, শোষনহীন সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা। কিন্তু সেকাজ এখনও অনেক বাকি। তাই এখনকার যা কাজ, তা এখনই করতে হবে।  আজ এটা প্রতিষ্ঠিত, এই সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার মানুষের স্বার্থে অনেক কাজ করতে পেরেছে। আমরা যে এতদিন সরকারে রয়েছি, তা মানুষের ইতিবাচক রায়েই রয়েছি। পাশাপাশি, বামফ্রন্ট সরকার গোটা দেশের সামনে মানুষের স্বার্থে বিকল্প কর্মসূচীর একটা নজির তুলে ধরতে পেরেছে। জাতীয় রাজনীতিতে বিভিন্নভাবে আমাদের সাফল্যের ছাপ পড়েছে।     

 দেশ এখন জোট রাজনীতির যুগে প্রবেশ করেছে। পশ্চিমবঙ্গে একটানা ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ৯ দলের একটি দৃঢ় জোট হিসাবে বামফ্রন্ট সরকারের প্রভাব এক্ষেত্রে অস্বীকার করা যায় না। কারণ জোট সরকার মানেই যখন অস্থিতিশীল, বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বলে প্রমাণ হচ্ছিলো, তখন এরাজ্যে এই জোট স্থিতিশীল, শান্তির পরিবেশ এবং জনমুখী উন্নয়নের নজির তৈরি করে গোটা দেশের সামনে একটি উজ্জ্বল ব্যাতিক্রম তুলে ধরেছে। শুধু জোট রাজনীতির প্রশ্নই নয়, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকেও সামনে তুলে এনেছিল বামফ্রন্ট সরকারই। আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং তৃণমূলস্তরে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটানোর ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ গোটা দেশের সামনে মডেল হিসাবে স্বীকৃত। একথা আজ সকলেরই জানা যে এরাজ্যের ত্রিস্তর পঞ্চায়েতী ব্যবস্থাকে অনুকরণ করেই গোটা দেশে তা রূপায়ণের জন্য আইন তৈরি করা হয়েছে। ভূমি সংস্কার, কৃষি ও গ্রামোন্নয়নের ক্ষেত্রেও এই সরকারের সাফল্য সর্বজনস্বীকৃত। পাশাপাশি, গণতান্ত্রিক পরিবেশ, শান্তি-সুস্থিতি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিরবচ্ছিন্নভাবে বজায় ক্ষেত্রেও দেশের সামনে এরাজ্য উদাহরণ ।

শিল্পবিকাশের প্রশ্নেও আমরা বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই কাজ করছি । স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গ আর্থিক ও অন্যান্য ক্ষেত্রে কেন্দ্রের চরম বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হয়েছে । ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার তৈরি হওয়ার পরে কেন্দ্রের এইসব বাধা অতিক্রম করেই আমরা শিল্পস্হাপনের নীতি নিই। নয়ের দশকের গোড়ায় যখন মাসুল সমীকরণ নীতি ও লাইসেন্স প্রথা তুলে নেওয়া হলো, তখন আমাদের সামনে আরও সুযোগ এলো। আমরা যখন বণিকসভাগুলিতে গিয়ে এরাজ্যে বিনিয়োগের আবেদন জানাচ্ছিলাম, তখন তারা আমাদের বললেন, আপনারা যে নীতির ভিত্তিতে এখানে শিল্প গড়ার কথা বলছেন, সেটা লিখিতভাবে দিলে সুবিধা হয় । তখন ১৯৯৪ সালে আমরা বিধানসভায় বর্তমান শিল্পনীতি ঘোষণা করি। পরে ১৯৯৫ সালে চন্ডীগড়ে অনুষ্ঠিত আমাদের পার্টির পঞ্চদশ কংগ্রেসেও এটা অনুমোদিত হয়েছে।

শিল্পনীতিতে সুস্পষ্টভাবেই আমরা বলেছিলাম, প্রয়োজনে বিদেশী বিনিয়োগও আমাদের নিতে হবে। কিন্তু তা অবশ্যই হবে পারস্পরিক উপযোগিতার ভিত্তিতে। গত পার্টি কংগ্রেসেও আমরা বলেছি, সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ(এফ ডি আই) নিতে হবে উন্নততর প্রযুক্তি, বাড়তি উৎপাদনশীলতা এবং অতিরিক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, এমন ক্ষেত্রেই। সপ্তম বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হওয়ার পর এই নীতির ভিত্তিতেই কৃষির সাফল্যকে সংহত করে ব্যাপকভাবে শিল্পায়নের কর্মসূচী নিয়েছে। বামফ্রন্টের নির্বাচনী ইশ্‌তেহারেই একথা আমরা বলেছিলাম। অথচ, এখন এ নিয়ে বিতর্ক তুলছে বিরোধীরা। কিন্তু রাজ্যের উন্নয়নের স্বার্থে, বেকার ছেলে-মেয়েদের কাজের সুযোগ বাড়ানোর জন্যই একাজ আমাদের করতে হবে। আমাদের ভালো কাজে বিরোধীরা সমর্থন করবে না কেন। শিল্প  আমাদের করতে হবেই। পাশাপাশি, শিল্পের উন্নয়নের সঙ্গে আমাদের রাজ্যে কৃষিক্ষেত্রেও অনেক উন্নতির সুযোগ রয়েছে। কৃষিতে উন্নততর প্রযুক্তির প্রয়োগ, অকৃষি জমিকে চাষযোগ্য করা, একফসলী জমিকে বহুফসলী করা, উচ্চ ফলনশীল বীজের ব্যবহার বাড়ানো, ফসলের বৈচিত্র্যকরণ প্রভৃতি কাজ আমাদের করতে হবে।

পশ্চিমবঙ্গের সাথে কেরালা এবং ত্রিপুরাতেও আমাদের পার্টির নেতৃত্বে পরিচালিত সরকারগুলি বিকল্প দিশা দেখাতে সক্ষম হয়েছে।  প্রতিটি ক্ষেত্রেই সরকারের মূল কর্মসূচীগুলি আমাদের পার্টিতে, পার্টি কংগ্রেসে অথবা পার্টি পলিট ব্যুরোতে অনুমোদন করেই আমরা রূপায়ণ করেছি। কিন্তু আমার কথা হলো, পার্টি সংগঠনের ক্ষেত্রে আমাদের এই সাফল্যের প্রতিফলন গোটা দেশে যেভাবে হওয়া উচিত ছিল, তা হয়নি। সি পি আই (এম)-র অষ্টাদশ কংগ্রেসে এবিষয়ে আমরা আলোচনা করেছি এবং নিজস্ব উদ্যোগের পাশাপাশি অন্যান্য বামপন্থী ও গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলির সঙ্গে, অন্যদিকে ট্রেড ইউনিয়ন ও গণসংগঠনগুলি মিলে এই সময়ে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তোলা হয়েছে। আগামী মার্চ মাসে পার্টির উনিশতম কংগ্রেসে আমরা তার পর্যালোচনা করবো। 

 কমরেড নিরুপম সেন এরাজ্যে বামফ্রন্ট সরকার যে জনমুখী বিকল্প অভিমুখ নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে, এই পুস্তকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তার তাত্ত্বিক ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ করেছেন। এরকম একটি বই খুবই জরুরী ছিল। পার্টির নেতা-কর্মীরা তো বটেই, বামফ্রন্ট সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে যারা জানতে চান, তারাও এরফলে উপকৃত হবেন। ইংরাজিতে অথবা অন্যান্য ভাষাতেও এবিষয়ে বই প্রকাশ করা প্রয়োজন, যাতে দেশের এবং বিদেশের মানুষও জানতে পারেন কিভাবে আমরা এই নজির গড়ে তুলতে পারলাম, জনগণের এই দূর্গ অব্যাহত রাখতে পারলাম। বইটির ব্যাপক প্রচার হবে, আশা রাখছি।             

 জ্যোতি বসু

২৫শে ডিসেম্বর, ২০০৭                                                                              

Advertisements
Published in: on জুন 30, 2010 at 4:29 অপরাহ্ন  মন্তব্য করুন  

The URI to TrackBack this entry is: https://jyotibasu.wordpress.com/2010/06/30/%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%aa%e0%a6%ae-%e0%a6%b8%e0%a7%87%e0%a6%a8-%e0%a6%8f%e0%a6%b0-%e0%a6%b2%e0%a7%87%e0%a6%96%e0%a6%be-%e2%80%98%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a6%b2%e0%a7%8d/trackback/

RSS feed for comments on this post.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: