কমরেড মণি সিংহকে স্মরণ করা জরুরীঃ জ্যোতি বসু

বিশিষ্ট কমিউনিসট নেতা মণি সিংহ স্মরণে গ্রন্থ প্রকাশিত হচ্ছে জেনে খুশি হলাম। এই উপমহাদেশে একেবারে গোড়ার যুগ থেকে যারা কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, মণি সিংহ তাদের অন্যতম। কৈশোরেই তিনি অনুশীলন সমিতির বিপ্লববাদী কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন। পরবর্তী কালে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদেন। বিশের দশকের শেষের দিকে তিনি কলকাতার মেটিয়াবুরুজ অঞ্চলে শ্রমিকদের সংগঠিত করার কাজে নেমে পড়েন। ঐ সময়ে কলকাতা ও তার আশপাশে বেশ কিছু শ্রমিক ধর্মঘটে তিনি সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন। ১৯২৮ সাল থেকে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী হন। সেই সময় মুজফ্ফর আহমদ, বঙ্কিম মুখার্জি, ধরণী গোস্বামী, আবদুর রেজ্জাক খাঁ, আবদুল মোমিন, রাধারমণ মিত্র, গোপেন চক্রবর্তী প্রমুখের সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন।

তখন কমিউনিস্ট পার্টি অব গ্রেট ব্রিটেনের (সিপিজিবি) পক্ষ থেকে যেসব নেতাকে ফিলিপ স্প্রোট, বেন ব্রাডলি ভারতে পাঠানো হয়েছিল তাদের সঙ্গেও মণি সিংহ শ্রমিকদের সংগঠিত করার কাজে যুক্ত ছিলেন। ১৯২৯ সালে মীরাট ষড়যন্ত্র মামলায় মণি সিংহ গ্রেফতার না হলেও পুলিশ তার বাসস্থান ও ইউনিয়ন অফিস দীর্ঘক্ষণ তল্লাশি করেছিল। ১৯৩০ সালে চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ সংগঠিত হওয়ার পর বাছবিচার না করে ব্রিটিশ সরকার শত শত রাজনৈতিক কর্মীকে গ্রেফতার করে এবং মণি সিংহও ঐ বছর গ্রেফতার হন। বিভিন্ন জেল, ক্যাম্প ঘুরিয়ে এনে ১৯৫৩ সালে ময়মনসিংহ জেলার সুসং-এ তার নিজের বাড়িতে তাকে নজরবন্দী করে রাখা হয়।

এই সময় থেকে মণি সিংহ কৃষক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়তে থাকেন। ১৯৩৭ সালে বাঁকুড়ার পত্রসায়রে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কৃষক সভায় প্রথম রাজ্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং কয়েক বছরের মধ্যেই কৃষক সভার সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পায় উল্লেযোগ্য হারে। এই অবস্থায় ময়মনসিংহের হাজং ও অন্যান্য দরিদ্র কৃষকরা শোষণমূলক টংক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হওয়ার সুযোগ পায় এবং সমগ্র জেলায় দীর্ঘস্থায়ী কৃষক আন্দোলনের সুত্রপাত ঘটে। সুসং ও সন্নিহিত অঞ্চলের হাজং ও মুসলমান কৃষকদের যে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল তার অন্যতম শীর্ষ নেতা ছিলেন মণি সিংহ।

এ প্রসঙ্গে স্মরণীয়, আমি ১৯৪০ সালে বিলেত থেকে দেশে ফিরি ও তখন থেকে কমিউনিস্ট পার্টির হয়ে কাজ করতে শুরু করি। ১৯৪২ সালে ময়মনসিংহের নেত্রকোনা শহরে ফ্যাসিবিরোধী সম্মেলন হয়। সেই সম্মেলনে বঙ্কিম মুখার্জি, ভুপেশ গুপ্ত, মণিকুন্তলা সেনের সঙ্গে আমিও নেত্রকোনায় গিয়েছিলাম। যতদূর মনে পড়ছে ঐ রকম সময়েই মণি সিংহের সঙ্গে আমার আলাপ হয়। তারপরেও আমি পূর্ববঙ্গে ও বিশেষত ময়মনসিংহে বেশ কয়েকবার গিয়েছি। তা’ছাড়া আমার দুই সহকর্মী ভুপেশ গুপ্ত ও স্নেহাংশু আচার্য-দু’জনেরই বাড়ি ছিল ময়মনসিংহে। তাঁদের বাড়িতে আমি গিয়েছি। সুসং যখন মুক্ত এলাকা ঘোষিত হয়, তখন মণি সিংহ সেই মুক্ত এলাকায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। স্নেহাংশু আমাকে নিয়ে খেত-মাঠ ভেঙ্গে জিপ চালিয়ে সেখানে গেল। যথার্থই মুক্ত এলাকা। চারদিকে লাল পতাকা উড়ছে। সেখান থেকে বক্তৃতা দিয়ে ফেরার সময়ে গাড়িতে আমাদের সঙ্গে আত্মগোপনকারী দু’জন কর্মী ছিলেন। ফেরার পথে মিলিটারি আমাদের ধরল। তাদের আলো দেখেই দু’জন কর্মী গাড়ি থেকে নেমে গা-ঢাকা দিলেন। আমাদের ধরে মিলিটারিরা থানায় নিয়ে গেল। স্নেহাংশু ময়মনসিংহ মহারাজার ছেলে বলে নিজের পরিচয় দেয়াতে আমাদের ছেড়ে দিল। আমি তখন বিধান সভার সদস্য। অবশ্য ময়মনসিংহে ফিরে আসার পরই তারা আমাকে এক ‘এক্সটার্নমেন্ট অর্ডার’ ধরিয়ে দিল। অগ্যতা আমাকে সেখান থেকে চলে আসতে হলো। 

যতদূর মনে পড়ছে তখন জনৈক মিস্টার বাস্টিন ছিলেন মৈমনসিংহের জেলাশাসক। তিনি ছিলেন অক্সফোর্ড থেকে পাস করে আসা ছাত্র। তিনিই আমাকে এক্সটার্নমেন্ট অর্ডার ধরিয়ে দেন। আমি কলকাতায় এসে বিধান সভায় পয়েন্ট অব অর্ডার তুলি। তখন সোহরাওয়ার্দী বাংলার প্রধান মন্ত্রী। তাকে বলি, ঐ জেলাশাসক কী করে আমাকে ময়মনসিংহ থেকে বহিষ্কার করলেন? তিনি নাকি আবার অক্সফোর্ডের পন্ডিত। তাই শুনে সোহরাওয়ার্দী বললেন, উনি আপনার প্রতি অন্যায় করেছেন। যাকগে যা হয়ে গেছে তা ভুলে যান আপনি। এ ঘটনা আমার পুঙ্খানুপুঙ্খ মনে নেই। তবে দেখলাম মণি সিংহ তার জীবন সংগ্রাম বইতে এ বিষয়ে লিখেছেন। তিনি লিখছেন, ” জ্যোতি বসু ও স্নেহাংশু আচার্য তার ময়মনসিংহ পৌঁছে জিপযোগে নালিতাবাড়ি যান। নালিতাবাড়ির প্যারামিলিটারির কমান্ডার তাদের আটক করেন এবং তাদের নিকট থেকে ক্যামেরা কেড়ে নেয়া হয়। কমান্ডার ছিলেন অবাঙালী। তাদের বলা হয়, তোমরা এখানে এসেছ কেন? তোমাদের আগামী কাল ময়মনসিংহ জেলে পাঠানো হবে। জ্যোতি বসু তখন একজন এমএলএ-আইন পরিষদের সদস্য, ব্যারিস্টারও বটে। জ্যোতি বসু ও স্নেহাংশু আচার্য দু’জনই ব্যারিস্টার। তারা দুই ঘণ্টা তর্ক-বিতর্ক করলেন, কিন্তু কাজ হলো না। তখন স্নেহাংশু আচার্য অন্য উপায় না দেখে শেষ অস্ত্র নিক্ষেপ করলেন। স্নেহাংশু বললেন, জান আমি কে? আমি ময়মনসিংহের রাজকুমার। একথা বলার পর ভোল পালটে গেল। ‘তুমি মহারাজকুমার!’ কমান্ডার বললেন, তোমাদের জন্য কি করতে পারি? চা প্রভৃতি এসে গেল, ক্যামেরা ফেরত দেয়া হলো। কমান্ডার বললেন, ‘জিপ লাগলে আর একটা জিপ নিয়ে যাও।’ সেখান থেকে ফিরে স্নেহাংশু আচার্য আমাকে বলেছিলেন, ‘দেখুন আপনারা সামন্ততন্ত্র উচ্ছেদের জন্য লড়াই করছেন কিন্তু মানুষের মধ্যে সামন্ততন্ত্রের উপর কি শ্রদ্ধা! এই তো দেশের অবস্থা।’ 

এ প্রসঙ্গে বলি, হাজং অঞ্চলে কৃষকদের উপর যে অত্যাচার হয়েছিল সে বিষয়ে ১৯৪৭ সালে আমি ও স্নেহাংশু আচার্য কমিউনিস্ট পার্টির তরফে রিপোর্ট সংগ্রহ করেছিলাম। রেইন অব টেরর ওভার দি হাজংস-এ ‘রিপোর্ট অব দি এনকোয়ারি কমিটি’ নামে ঐ দলিলটি জওহরলাল নেহরুর কাছে পাঠানো হয়েছিল। 

দেশ ভাগের পর যে অল্প কয়জন কমিউনিস্ট নেতা পূর্ব পাকিস্তানে থেকে যান মণি সিংহ তাদের অন্যতম। তারপর থেকে মণি সিংহের সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ আর ছিল না। যদিও পূর্ব পাকিস্তান তথা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের কৃষক, শ্রমিকসহ অজস্র গণ-আন্দোলনে, বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে মণি সিংহ নেতৃত্ব দিয়েছেন। কমিউনিস্ট আন্দোলনকে প্রসারিত করার কাজে তার প্রচেষ্টা, আত্মত্যাগ, ভোলার নয়। আজ তাকে স্মরণ করার মধ্যে দিয়ে আমাদের বুঝতে হবে ফেলে আসা দিনগুলিতে কমিউনিস্ট আন্দোলনে সাফল্য কি, তার ব্যর্থতাইবা কোথায়। এটা বুঝতে পারলে আমাদের ভবিষ্যত চলার পথ আমরা ঠিক করতে পারব। শুধু বাংলাদেশেই নয়, এই গোটা উপমহাদেশে খেটে-খাওয়া মানুষের জীবন যন্ত্রণার উপশম হয়নি বরং তা আরও বেড়েছে। 

সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমাদের এখনও অনেক পথ চলা বাকি। মণি সিংহদের মতো নেতাদের অবদানকে স্মরণ করা জরুরী। কত অসুবিধার মধ্যে কত অত্যাচারের মুখোমুখি হয়ে যে তাদের কাজ করতে হয়েছে তা আজকের প্রজন্মের অনেকের পক্ষে হয়তো আন্দাজ করাই সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা যদি তাদের কাছে মণি সিংহদের কথা তুলে ধরতে পারি তবে তারা লড়াই করার নতুন প্রেরণা পাবেন। গ্রন্থ প্রণয়নের উদ্যোক্তাদের আমি ধন্যবাদ জানাচিছ। 

www.sangbad.com.bd

ঢাকা বুধবার, ১৪ মাঘ ১৪১৬, ১০ সফর ১৪৩১, ২৭ জানুয়ারি ২০১০

Advertisements
Published in: on জুন 30, 2010 at 4:36 অপরাহ্ন  মন্তব্য করুন  

The URI to TrackBack this entry is: https://jyotibasu.wordpress.com/2010/06/30/%e0%a6%95%e0%a6%ae%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%a1-%e0%a6%ae%e0%a6%a3%e0%a6%bf-%e0%a6%b8%e0%a6%bf%e0%a6%82%e0%a6%b9%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%b0%e0%a6%a3-%e0%a6%95%e0%a6%b0/trackback/

RSS feed for comments on this post.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: