মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে বামফ্রন্ট সরকারঃ জ্যোতি বসু

পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের কার্যকালের মেয়াদ পাঁচ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। এই সরকারের কার্যধারা পরিচালনার ক্ষেত্রে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র কর্মসূচী সম্পর্কে আমাদের উপলদ্ধির প্রতিফলন রয়েছে। দেশের বিভিন্ন রাজ্যে এই ধরনের সরকার গঠনের সম্ভাবনার কথা পার্টির কর্মসূচীতে বলা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে কর্মসূচীর ১১২নং অনুচ্ছেদ স্মরণ করা যেতে পারে।

পার্টির কর্মসূচী

১১২নং অনুচ্ছেদে তিনটি প্রধান বক্তব্য রাখা হয়েছে। প্রথমত বলা হয়েছে, ভারতীয় রাষ্ট্রের পুঁজিবাদী-সামন্ততান্ত্রিক শ্রেণী চরিত্র সত্ত্বেও বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তির পক্ষে গণ-আন্দোলনের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিভিন্ন রাজ্যে সরকার গঠন করা সম্ভব। দ্বিতীয়ত, এই ধরনের সরকার যদিও বর্তমান সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে কোন মৌলিক পরিবর্তন সাধনে সক্ষম হবে না, তথাপি এমন কিছু সংস্কারমূলক কাজের উদ্যোগ নিতে ও সেগুলি রূপায়িত করতে পারে। যার ফলে জনগণের জীবনযাত্রার মানের কিছুটা উন্নতি সম্ভব এবং আরো উন্নত ভবিষ্যতের জন্য জনগণের সংগ্রামে সেই কার্যধারা নিশ্চিতভাবেই সহায়কশক্তি হিসাবে কাজ করে যেতে পারে। তৃতীয়ত এই ধরনের সরকারের কর্মসূচী রূপায়ণের অভিজ্ঞতা থেকে জনগণ পুঁজিবাদী জমিদারী ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠেন ও এই রকম ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করতে গিয়ে একটি রাজ্যের বামপন্থী সরকার কী ধরনের চরম বাধা ও সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হয় সে বিষয়ে শিক্ষালাভ করার প্রভূত সুযোগ পান। পরিস্থিতি সম্পর্কে যথার্থ ধারণা জন্মালেই জনগণ মৌলিক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে নিশ্চিত প্রত্যয়ে পৌঁছবেন এবং তখনই বাঞ্ছিত পরিবর্তনের জন্য শ্রেণীশক্তিকে সংহত করে তোলা সম্ভব হয়ে উঠবে।

বাধা

দলীয় কর্মসূচীর উপরোক্ত ধারাগুলির দ্বারা নির্দেশিত হয়ে এবং পশ্চিমবঙ্গের ১৯৬৭ ও ১৯৬৯-৭০ সালের স্বল্পস্থায়ী দুটি যুক্তফ্রন্ট সরকারের আমলে অর্জিত অভিজ্ঞতার দ্বারা পুষ্ট হয়ে ১৯৭৭ সালের জুন মাস থেকে আমরা বামফ্রন্ট সরকারে কাজ করে চলেছি। এই সময়ের মধ্যে রাজ্যের জনগণের বিপুল অংশের অনুকূলে বেশ কিছু পরিবর্তন সাধনে আমরা সমর্থ হয়েছি। এবং সঙ্গে সঙ্গে সরকার পরিচালনা করার অভিজ্ঞতা থেকে আমরা এও বু‍‌ঝেছি যে আমাদের ক্ষমতা অত্যন্ত সীমাবদ্ধ এবং আমাদের কর্মসূচী রূপায়ণের পথে বিপুল বাধা রয়েছে।

পুঁজিবাদী-জমিদারী ব্যবস্থাই যে একটি বামফ্রন্ট সরকারের কর্মসূচী রূপায়ণের পক্ষে মূল বাধা সে সম্পর্কে আমরা অবহিত। তারই পাশাপা‍শি অন্যান্য বাধাগুলিও লক্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, আমাদের সংবিধানে যেভাবে কেন্দ্র ও রাজ্যের আইন-প্রণয়ন ক্ষমতার সীমানা বেঁধে দেওয়া হয়েছে তারই দৃষ্টান্ত ধরা যেতে পারে। কেন্দ্র ও রাজ্যের ক্ষমতা বিন্যাস প্রসঙ্গ ছাড়াও সংবিধানের সে সব ধারাও কম আপত্তিকর নয় যেগুলি কেন্দ্রকে রাজ্যের এক্তিয়ারভুক্ত বিষয়গুলিতেও নাক গলাবার অধিকার দিয়েছে। রাজ্য আইনসভা কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন আইনে রাষ্ট্রপতির সম্মতির সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কথা এখানে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখতে পাচ্ছি, ভূমি, শ্রম, শিক্ষা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বিধানসভায় প্রণীত আইনগুলি রাষ্ট্রপতির সম্মতির অপেক্ষায় আটকে পড়ে আছে। সংবিধানের রাজ্য তালিকার তাৎপর্য তাহলে কোথায় যদি কেন্দ্র রাজ্য-বিধানসভায় অনুমোদিত আইনগুলিকে বলবৎ করতে এভাবে বিলম্ব ঘটায় অথবা সেগুলির প্রয়োগই করতে না দেয়? আমরা মনে করি এ ধরনের সরকার কর্তৃক সংগঠিত সংস্কারসমূহ জনগণের পক্ষে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানের পুঁজিবাদী-জমিদারী সামাজিক কাঠামোর এই সংস্কারগুলি যে শেষ কথা নয় এ বিষয়ে অবশ্য সম্যক উপলব্ধি দরকার। কায়েমী স্বার্থের বিরুদ্ধে খেটে-খাওয়া মানুষের সংগ্রামে বামপন্থী সরকারের সমর্থন নিশ্চিতভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। সরকার ও পার্টির অবিরাম উদ্দেশ্য হলো বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহকে মজবুত করা এবং রাজ্যের জনগণকে তাঁদের অর্জিত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এভাবে সচেতন করে তোলা যাতে তাঁরা অনুধাবন করতে পারেন যে শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের উন্নতিতেই তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা সীমাবদ্ধ নয়। তাঁরা সারা ভারতবর্ষের সংগ্রামী মানুষকে সাহায্য করছেন তাঁদের বলিষ্ঠ দৃষ্টান্তের মাধ্যমে। এই ধরনের সরকার স্বৈরতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেই শুধুমাত্র জনগণকে সাহায্য করে না, পুঁজিবাদী জমিদারী বন্ধন থেকে মুক্তির জন্য মানুষের চূড়ান্ত সংগ্রামে সহায়ক হয়।

একটি রাজ্যের বামপন্থী সরকারকে এমনভাবে কাজ করতে হয় যাতে বোঝা যায় যে এই সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি কায়েমী স্বার্থের পরিপোষক কোনো সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। জনগণ তখন বামপন্থী সরকারের নীতি ও কর্মসূচীর সঙ্গে ধনিক ও ভূস্বামীশ্রেণীর প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারগুলির কার্যকলাপের তুলনা করতে সক্ষম হন। আমাদের বামফ্রন্ট সকারের কর্মসূচী রূপায়ণের ক্ষেত্রে এবং কার্যধারার মধ্যে যে ভিন্ন ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি বিরাজ করে এবং সেই দৃষ্টিভঙ্গি যে উচ্চতর মানের এবিষয়ে রাজ্যের তথা অন্য রাজ্যের মানুষও বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন। আর জনগণের এই বিশ্বাসের প্রবর্তনার মধ্যেই আমাদের কাজের যথার্থ সাফল্য। বর্তমানের নানান সীমাবদ্ধতা ও বাধা সত্ত্বেও জনগণের আস্থা আমাদের সম্বন্ধে যত দৃঢ় হবে ততই তাঁদের রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়বে এবং এই সব সীমাবদ্ধতা ও বাধা অপসারণের জরুরী প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তাঁরা সজাগ হবেন। এ ধরনের একটা পরিস্থিতি অন্য রাজ্যের সাধারণ মানুষের চেতনা বৃদ্ধিতে খুবই সহায়ক হবে এবং সমাজ-কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তনের প্রয়োজনকে দ্রুততর করবে। এমন অবস্থা যদি না আসে তাহলে আমাদের পার্টির কর্মসূচীর পরিপ্রেক্ষিতে কোনো বামফ্রন্ট সরকারের প্রতিষ্ঠা ও কার্যক্রমের যৌক্তিকতা থাকে না।

বামফ্রন্ট সরকার ও গণ-সংগঠন

বামফ্রন্টের ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে গণ-সংগঠনগুলির কাজের রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতও পালটে গেছে। কংগ্রেসী আমলে জনগণের বিভিন্ন অংশের দাবি-দাওয়া পূরণের জন্য এই সব গণ-সংগঠনের তরফে নানা ধরনের আন্দোলনের ও প্রচারাভিযানের প্রয়োজন হতো। তখন বিশেষ কিছু ধরনের আন্দোলন অনিবার্য হয়ে পড়েছিল যেহেতু এরকম ধারণা দৃঢ় ছিল যে তদানীন্তন সরকার জনগণের দাবি সম্পর্কে সহানুভূতিশীল নয় এবং ধারাবাহিক আন্দোলন ছাড়া দাবি আদায়ে তাদের মোটেই সম্মত করা যাবে না। সঙ্গে সঙ্গে এটাও ভাবা হয়েছিল যে প্রশাসন ও পুলিসের পক্ষে কী জোতজমির ক্ষেত্রে, কী শিল্প ব্যবসার ক্ষেত্রে কায়েমী স্বার্থের অনুকূলেই হস্তক্ষেপ করা হবে। তখনকার পরিস্থিতিতে গণ-সংগঠনের কাজের সাফল্য নিরূপিত হতো ধর্মঘটের সময়ে তারা কতগুলি শ্রম দিবস নষ্ট করতে সমর্থ হয়েছে তার ভিত্তিতে।

পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অতীত আমলের সঙ্গত ধারণা ও আন্দোলনের প্রকৃতি পালটে গেছে। বর্তমানে এই রাজ্যে শোষিত শ্রমিকশ্রেণীর প্রতি দরদী একটি সরকার ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত আছে। সরকারী সমর্থন পিছনে থাকার জন্য এবং শ্রমজীবী মানুষ সংগঠিত থাকার দরুন এখন জনগণের বিভিন্ন অংশের অনুকূলে এবং কায়েমী স্বার্থের বিরুদ্ধে বহু বিরোধের নিষ্পত্তি সম্ভব হচ্ছে। ধর্মঘট বা অন্যান্য সে ধরনের সংগ্রামের পথে সব সময়ে যেতে হচ্ছে না। কায়েমী স্বার্থের লোকেরাও একথা বুঝেছেন যে বর্তমান সরকার শোষিত মানুষের সমর্থনপুষ্ট হয়েই ক্ষমতায় এসেছে এবং তাঁদের স্বার্থ দেখে চলেছে। সুতরাং সরকারী যন্ত্রকে আর এমনভাবে ব্যবহার করা হবে না যাতে কায়েমী স্বার্থের মুখের দিকে তাকিয়ে শোষিত মানুষের স্বার্থ জলাঞ্জলি দেওয়া হয়। বিরোধের মীমাংসার সময়ে সরকারের পুরোপুরি সমর্থন শ্রমিকশ্রেণীর ন্যায়সঙ্গত দাবির পিছনেই থাকছে।

এই নতুন পরিস্থিতিতে শ্রেণী সংঘর্ষের তীব্রতা অথবা প্রচারাভিযানের সাফল্য পরিমাপ করার জন্য কেবলমাত্র ক’টি ধর্মঘট সংগঠিত হলো অথবা কতগুলি শ্রম দিবস নষ্ট হলো তার হিসেব নিলে চলে না। এখন দেখতে হবে তাদের দাবি কতটা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বিবেচিত হচ্ছে অথবা আন্দোলনের ফলে তাদের ন্যায্য পাওনা কতটা মেটানো যাচ্ছে। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে, সরকার তাদের পক্ষে থাকার জন্য শ্রমিকশ্রেণী চুক্তির সময়ে নিজেদের শর্ত অধিক মাত্রায় প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছে। একথা শিল্প-বিরোধের ক্ষেত্রে যেমন প্রযোজ্য তেমনি গ্রামাঞ্চলে কৃষি মজুরির ক্ষেত্রেও সমভাবে বলা যায়। সেখানেও অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটেছে। জমি থেকে উৎখাতের ভয় কাটছে। সে ব্যাপারে নিরাপত্তার সূচনা হয়েছে এবং বর্গাদাররা ফসলের ভাগ উচ্চহারে পাচ্ছেন। বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগে এবং দরিদ্র মানুষের অনুকূলে সরকারী হস্তক্ষেপের দরুন শ্রমজীবী সম্প্রদায়ের বেশির ভাগ মানুষ তাদের উপার্জন, চাকরির শর্ত এবং নিরাপত্তা উন্নত করতে পেরেছেন। জনগণের আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়েছে। কিন্তু কায়েমী স্বার্থবাদীদের মধ্যে কিছু কিছু অংশ শ্রমিকশ্রেণীর ন্যায়সঙ্গত ও ন্যূনতম দাবি মেনে নেননি এবং সরকারের পরামর্শও শোনেনি। তার ফলে বিরোধের মীমাংসার পূর্বে কোন কোন ক্ষেত্রে ধর্মঘট অথবা লক-আউট হয়েছে।

নতুন পরিস্থিতির মূল্যায়নগত ত্রুটি থেকে কিন্তু দু’ধরনের বিভ্রান্তি দেখা দিতে পারে। সেই দুই বিভ্রান্তির ফাঁদ থেকে আমাদের দূরে থাকতে হবে। প্রথমত, গণ-সংগঠনের দাবি পূরণের জন্য রাষ্ট্রের আইনগত ও প্রশাসনিক যন্ত্রের উপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করলে চলবে না। দ্বিতীয়ত, মন্ত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগের সূত্রেই সব কাজ সমাধা হয়ে যাবে এরকম ধারণা করাও ভুল। বিগত চার বছরের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বুঝেছি গরিব মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য বিধিগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাদি রূপায়িত করতে গেলে রাষ্ট্রযন্ত্রের উপর অধিক নির্ভরতা ভ্রমাত্মক। শ্রেণী বিভক্ত সমাজে কেবলমাত্র একটি রাজ্যে বামফ্রন্ট সরকার অধিষ্ঠিত হলেই শ্রেণী সংঘর্ষের দিন ফুরিয়ে যায় না। বস্তুত পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও ধারাবাহিক সংগ্রাম ও আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা থাকে। অপারেশন বর্গার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এলাকা ভিত্তিক কৃষক আন্দোলনের জোরের উপর বর্গাদারদের নাম রেকর্ডের সংখ্যাও আনুপাতিক হারে নির্ভর করছে। সাফল্য সেই ভাবেই এসেছে। আবার যেখানে আন্দোলনের ধার দুর্বল, সেখানে সরকারের তরফে যতই শুভেচ্ছা থাক না কেন বর্গাদার ও ভূমিহীন খেতমজুরদের আইনগত ও ন্যায়সঙ্গত অধিকার প্রতিষ্ঠা বা রক্ষা করা যায়নি। যে সব এলাকায় আন্দোলন দৃ‌ঢ় সেখানে তলার থেকে চাপে এবং উপর থেকে সরকারী নির্দেশে ফল লাভ সম্ভব হয়েছে। এমন অনেক দৃষ্টান্ত আছে যেখানে এই বামফ্রন্ট সরকারের আমলেও শ্রমিকশ্রেণীকে পরিচালকবর্গের অনমনীয়তার জন্য সংগ্রামের পথে নামতে হয়েছে। গণ-আন্দোলনের পথ এই সরকার যে পরিহার করেনি, বরং তাকে আরো মদত দিয়ে চলেছে তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ দেখা গেছে গত বছরের (১৯৮০) ২৭শে নভেম্বর ও বর্তমান বছরের (১৯৮১) ১১ই সেপ্টেম্বর দিন দু’টিতে। এই দুই দিনে কেন্দ্রীয় সরকারের বৈষম্যমূলক ও স্বৈরতান্ত্রিক নীতির বিরুদ্ধে বামফ্রন্ট যে সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেয় রাজ্যের বামফ্রন্ট সরকার তাকে সমর্থন জানায়। জনগণকে আমরা আহ্বান জানাই, এখানে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় থাকার পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করে তাঁরা তাঁদের সংগঠনগুলিকে সম্প্রসারিত ও মজবুত করুন এবং তাদের ন্যায্য দাবির সমর্থনে সংগ্রাম চালিয়ে যান। সরকার গণ-সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন আছে।

দ্বিতীয় ধরনের বিভ্রান্তি দেখা দেয় আন্দোলন শুরু করার সময় দু’ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে যদি ভুল হয়। দু’ধরনের পরিস্থিতি হলো যেখানে বামফ্রন্ট সরকার চালাচ্ছে সেখানকার অবস্থা এবং শাসকদল যে জায়গায় সরকারী ক্ষমতায় আসীন সেই  জায়গায় অবস্থা। এই দুই পরিস্থিতির মধ্যে প্রভেদ বুঝতে হবে। এই দুই ধরনের পরিস্থিতিতে আন্দোলনের পদ্ধতি ও প্রকৃতি এবং দাবি-দাওয়ার চরিত্র ভিন্ন রকমের হওয়াই সঙ্গত। যেখানে বামফ্রন্ট সরকারে আছে সেখানে সংগ্রামের হাতিয়ার ধর্মঘটকে বিশেষ করে তখনই ব্যবহার করতে হবে যখন সরকারী প্রচেষ্টা সত্ত্বেও দাবিগুলি আদায় করা সম্ভব হলো না। যেসব দাবি পূরণের জন্য সরকারী বাজেট থেকে সাহায্যের প্রয়োজন হয় সেই সব ক্ষেত্রে সরকারের সীমাবদ্ধ সামর্থ্যের কথা আন্দোলনকারীদের বিচার-বিবেচনা করতে হবে। এবং এমন কোনো দাবি তাঁদের উপস্থিত করা উচিত নয় যা পূরণ করা কঠিন অথবা যা পূরণ করতে সরকারী সহায় সম্পদের উপর খুবই চাপ সৃষ্টি করা হবে। অনেক ক্ষেত্র আছে যেগুলিতে দাবি আদায় হওয়া বেশি দরকার কিন্তু সে ক্ষেত্রগুলিতে আদায় করিয়ে নেওয়ার জন্য তেমন লোক নেই — এইসব ক্ষেত্রগুলির অগ্রাধিকারের বিনিময়ে অন্যেরা যেন তাঁদের দাবির ওপর অধিক গুরুত্ব না দেন। কোনো পরিস্থিতিতেই আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ইউনিয়ন বা গণ-সংগঠনগুলির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার উদ্দেশ্য নিয়ে যেন দাবিগুলি খাড়া না করা হয়। আমি একথা বলছি এই কারণে যে গত চার বছরে কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখেছি দাবি-দাওয়াগুলি তুলে ধরা হয়েছে একশ্রেণীর মানুষের সীমিত ও স্বল্পমেয়াদী চাহিদার কথা মনে রেখে। এ দাবিগুলি পেশ করার সময় রাজ্য সরকারের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং দাবিদ্র্য, অসাম্যের মতো সাধারণ সমস্যার গুরুত্বের কথা বিবেচনা করা হয় না। জনসাধারণের একটি দাবি হলো যখনই কোন ফ্যাক্টরি বা শিল্প প্রতিষ্ঠান পরিচালন কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতার জন্য বা অন্য কোনো কারণে রুগ্‌ণ হয়ে পড়ে তখনই যেন রাজ্য সরকার সেটি অধিগ্রহণ করে। এই ব্যাপারে যেটা প্রায়শই উপলব্ধি করা হয় না সেটি হলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অধিগ্রহণের পর সেই কোম্পানির কাজকর্মের জন্য রাজ্য সরকারের সীমিত বাজেট থেকে প্রচুর পরিমাণে ভরতুকি (সাবসিডি) দিতে হয়। তাছাড়া টাকা-পয়সা যখন সীমিত তখন সরকারী ভরতুকির জন্য বিভিন্ন প্রতিযোগী দাবির মধ্যে বাছাইয়ের প্রশ্ন দেখা দেয় এবং কোন একটি বিষয়ের জন্য ভরতুকি অবশ্যই অন্যান্য বিষয়গুলিকে উপেক্ষা করেই দিতে হয়। সরকারের একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো যে, একটা অগ্রাধিকারের নিয়মের ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রয়োজন মেটানোর ব্যবস্থা করা। এটা করতে হয় একথা স্বীকার করে নিয়েই যে অনেক জরুরী প্রয়োজনই এখুনি মেটানো সম্ভব নয়। গত সাড়ে চার বছরে সরকারী তহবিল থেকে নানারকম বিষয়ের জন্য ভরতুকি দেওয়া হয়েছে যেমন, গরিব চাষীদের জন্য ভূমি রাজস্ব রেহাই, সেচের জলের জন্য সেস-এর হার কমানো, কিছু কিছু দুর্বলতর শ্রেণীর জন্য সস্তাদরে রাসায়নিক সার সরবরাহ, বেকারভাতা প্রদান প্রভৃতি। কিন্তু সে সরকারের কর ধার্য করার ক্ষমতা সংবিধান দ্বারাই সীমিত এবং যে রাজ্যের জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন তার পক্ষে ভরতুকি প্রদানের পরিমাণের একটা সীমা আছে। সুতরাং, রাজ্য পর্যায়ে ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং যাতে জনগণের মৌল সমস্যাগুলির সমাধান করা যায় সেজন্য জাতীয় পর্যায়ে বামপন্থী শক্তিগুলি কর্তৃক ক্ষমতা দখলের প্রয়োজনীয়তা — এইগুলিই আমাদের প্রচারাভিযানের প্রধান বিষয়বস্তু হওয়া উচিত। এমন এক ধরনের প্রচারাভিযান হয়ে থাকে যার দ্বারা জনগণ তাঁদের নিজস্ব গোষ্ঠী স্বার্থের বাইরে আর কিছু দেখতে পান না এবং যার প্রধান উদ্দেশ্যই হলো নিজেদের স্বার্থে আরও বেশি করে অর্থ বরাদ্দের জন্য সরকারী বিভাগগুলির উপর কিছুটা চাপ সৃষ্টি করা। কিন্তু এই ধরনের প্রচারাভিযানের তুলনায় পূর্বোল্লিখিত প্রচারাভিযান জনগণের চেতনার মানকে উন্নীত করতে সাহায্য করে।

অর্থাৎ, আমাদের আন্দোলনের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যগুলি পূরণে সহায়তা করাই বিভিন্ন গণ-সংগঠনগুলির কাজকর্মের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। সমাজের শ্রেণী-সম্পর্কের পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে আরও সচেতন করাও হবে এই গণ-সংগঠনগুলির অন্যতম কাজ। যেসব কাজকর্মের ফলে জনগণের মনে বামফ্রন্টের ভাবমূর্তি ম্লান হতে পারে এবং আমাদের আন্দোলনের সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্যগুলির ক্ষতি হতে পারে সেইসব কাজকর্ম এড়িয়ে চলা উচিত। কেবল আমাদের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কেই নয়, আমাদের বদনাম দেওয়ার জন্য এবং সরকারের পতন ঘটানোর জন্য যেসব ষড়যন্ত্র চলছে সে সম্পর্কেও এইসব গণ-সংগঠনগুলির সদস্যদের সচেতন থাকতে হবে। বামফ্রন্টের শত্রুরা যখন সরকারের সুষ্ঠু কাজকর্মের পথে সর্ব প্রকারের বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করছেন, তখন আমাদের সহযোগী গণ-সংগঠনগুলির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত শত্রুদের এইসব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিয়ে সরকার পরিচালনার বলিষ্ঠ ও গতিশীল চরিত্রকে অব্যাহত রাখতে সাহায্য করা। বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হওয়ার ফলে জনগণের মনে কতকগুলি আশার সৃষ্টি হয়েছে এবং আমরাও একটি ৩৬ দফা কর্মসূচী পালনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, যার মধ্যে বেশিরভাগ কর্মসূচীই ইতোমধ্যে রূপায়িত হয়েছে। সেই জন্যই সরকারের মিত্রদের বিশেষ করে শ্রমিকদের পক্ষে তাঁদের শক্তি ও সংগঠনকে সংহত করে চালনা করা একটি অতি জরুরী ব্যাপার, যাতে আমাদের কাজকর্মের ইতো‌মধ্যেই অর্জিত চমৎকার রেকর্ডের আরও উন্নতি সাধন করা যায়। আমাদের কাজের মধ্যে দিয়ে আমরা জনগণের সেবাও করবো এবং বর্তমান বাধা-বিঘ্নের মধ্যে যতটা সম্ভব তাঁদের সমস্যার মোকাবিলাও করবো। একই সঙ্গে আমরা আমাদের সীমাবদ্ধতা ও বাধা-বিঘ্নের প্রতি তাঁদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবো। তাছাড়াও, জনগণের সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য বৃহত্তর ও দীর্ঘমেয়াদী সংগ্রামের উদ্দেশ্যে প্রস্তুত হওয়ার প্রয়োজনীয়তার প্রতিও আমরা তাঁদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবো। এই দুই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে চলতে হবে একই সঙ্গে এবং তাহলেই‍‌ কেবল আমরা আমাদের বক্তব্য ও নীতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সফল হবো।

গণ-সংগঠনগুলির আর একটি প্রধান কাজ হলো বামফ্রন্টের কৃতিত্বগুলি তুলে ধরা। এটা প্রয়োজন কারণ একথা ভালোভাবেই জানা আছে যে, সংবাদপত্র প্রভৃতি গণ-মাধ্যমের এক শক্তিশালী অংশকে বামফ্রন্টের শত্রুরা সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে অথবা সেগুলি প্রচণ্ডভাবে তাদের প্রভাবাধীন। এর ফলে প্রায়শই আমাদের কৃতিত্ব ও সাফল্যগুলি চেপে দেওয়া হয়। আর তার বদলে বিকৃত ও বিভ্রান্তিকর সব খবর শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয় ভারতের সর্বত্র পরিবেশন করা হয়। বামফ্রন্ট সরকারের প্রতি মিত্রভাবাপন্ন সংগঠনগুলির মাধ্যমে জনগণের মধ্যে প্রচারাভিযান চালিয়ে এতোদিন আমাদের বিরুদ্ধে এইসব বিদ্বেষপরায়ণ অপপ্রচার কার্যকরীভাবে প্রতিহত করা গেছে। ভবিষ্যতেও জনগণের মধ্যে আমাদের কাজের এই বিশেষ দিকটির জরুরী প্রয়োজনীয়তাকে যথাযথ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

বামফ্রন্ট সরকার এবং পার্টি

বামফ্রন্ট সরকারের ভূমিকা পরীক্ষা করার সময় আমাদের একথা ভুললে চলবে না যে, বর্তমান সামন্ততান্ত্রিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় পূর্বোল্লিখিত নানারকম প্রশাসনিক বাধা-বিঘ্নের মধ্যে সরকার সুষ্ঠুভাবে চালনা করার জন্যও পার্টির ভূমিকা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। পার্টি সতর্ক ও পরিপূর্ণভাবে সংহত থাকলে বামফ্রন্টের প্রতিশ্রুতিগুলির এবং সরকারের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থাসমূহের রূপায়ণ সহজতর হয়। অপর পক্ষে যদি এই ভূমিকা যথাযথভাবে উপলব্ধি করা ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করা না হয়, তাহলে ফল বিপরীত হতে পারে এবং একটি সরকার পরিচালনা করা-জনিত আমাদের সুবিধা বরং আমাদের পক্ষে গুরুতর অসুবিধায় পরিণত হতে পারে। সরকার যাতে ঠিক পথে থাকে এবং জনগণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে চলে ও তাদের স্বার্থ যথাযথভাবে রক্ষা করতে সমর্থ হয় সে দায়িত্ব সামগ্রিকভাবে গোটা পার্টির।

নতুন পরিস্থিতিতে আমরা যেখানে সরকারের মধ্যে রয়েছি সেখানে পার্টিকে দুরূহ ও জটিল ভূমিকা পালন করতে হয়। এব্যাপারে আমাদের হাতে কোনো বাঁধাধরা ছক বা নিয়ম কানুন নেই। পার্টি ও সরকারকে নিরন্তর চেষ্টা করতে হবে অনুন্নত শ্রেণীর মধ্যে সেই সব মানুষকে প্রভাবিত করতে, যারা যে কো‍নো কারণেই হোক এখনও আমাদের সঙ্গে নেই। বর্তমান সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পার্টির কর্মীরা সর্বদা সকল রকম দূষণীয় প্রভাব থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে চেষ্টা করবেন। তাঁরা উৎসর্গীকৃত মন নিয়ে ও নম্রতার সঙ্গে কাজ করে যাবেন। আমাদের প্রত্যেককে ধৈর্যশীল হতে হবে এবং কোনোরকম প্ররোচনার শিকার হলে চলবে না। জনগণ আমাদের উপর অধিকতর দায়িত্ব অর্পণ করেছেন এবং তাঁদের বিশ্বাসের মর্যাদা আমাদের রাখতেই হবে। বর্তমানে পার্টির তরফে কেবল যে সর্ব পর্যায়ে সরকারের সর্বনিম্ন কর্মসূচী রূপায়ণে এবং এর বিরুদ্ধে সমস্ত ষড়যন্ত্রের মোকাবিলায় সাহায্য করা দরকার তাই নয়, উপরন্তু একই সঙ্গে সরকারে আমাদের অংশগ্রহণের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটটিকেও তুলে ধরা প্রয়োজন। জনগণের রাজনৈতিক চেতনা ও উপলব্ধি যাতে আরও উন্নীত হয় এবং বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণের মাধ্যমে তাদের এই কর্মসূচীতে ব্যাপক অংশগ্রহণ ও জড়িত হওয়া যাতে সুনিশ্চিত হয় সেই ব্যবস্থাও পার্টিকে করতে হয়। একথা মুহূর্তের জন্যেও ভুললে চলবে না যে সরকার চালানো বা কিছু সংস্কার সাধন করাটা প্রকৃত লক্ষ্য নয়। এর মধ্যে দিয়ে আমরা আমাদের দীর্ঘমেয়াদী উদ্দেশ্য সম্পর্কে জনগণকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তুলতে চাই। এই সমস্ত কারণের জন্যই আমরা পার্টি এবং গণ-সংগঠনগুলিকে শক্তিশালী করার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীয়তার উপর ক্রমাগত জোর দি‍‌য়ে থাকি।

বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যাপারে জনগণকে পরিচালিত করে এবং প্রয়োজন মতো ঐক্যবদ্ধ গণ-সংগ্রাম গড়ে তুলে পার্টি সংগঠন সরকারের এযাবৎ অগ্রগতিতে যথেষ্ট অবদান রেখেছে। কিন্তু তবুও কিছু দুর্বলতা রয়েই গেছে এবং এই সব দুর্বলতা অতিক্রম করার জন্য আমাদের এখনও অনেক দূর অগ্রসর হতে হবে। জনগণকে আদর্শগত ও রাজনীতিগতভাবে উদ্বুব্ধ করার জন্যে ক্রমাগত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। পার্টিকর্মীরা বামফ্রন্টের কর্মসূচী রূপায়ণের কাজেই বা কতটা জড়িত হবে আর পার্টি গঠন এবং শ্রেণী সংগ্রামের প্রয়োজনে শ্রেণী সংগঠন গড়ে তোলা — এই কাজেই বা কতটা নিয়োজিত হবে সে বিষয়ে প্রায়ই বৃথা তর্কবিতর্ক হয়। যেন এই দুটি উদ্দেশ্য পরস্পর-বিরোধী। নতুন পরিস্থিতিতে পার্টির ভূমিকা সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণার ফলে দক্ষিণপন্থী ও বামপন্থী উভয় ধরনেরই বিচ্যুতি ঘটেছে। আমাদের যে কথা ভালোভাবে মনে রাখতে হবে সেটা হলো যে সরকারে আমাদের অংশগ্রহণের ফলে পার্টির কাজ খুবই জটিল ও বিচিত্র ধরনের হয়ে দাঁড়িয়েছে। পূর্বোক্ত ঐ দুটি কর্তব্যকে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে এবং এর একটিকে আর একটি থেকে পৃথক করা যাবে না।

একথা সত্য যে, বাস্তব কর্মসম্পাদনের পর্যায়ে প্রধান প্রধান কর্মীদের ঐ উভয় ধরনের কাজেরই ভার বহন করতে হয়, যার ফলে কোনটাই ভালোভাবে সম্পন্ন করা যায় না। এই সমস্যা সমাধানের জন্য কর্মী ও নেতাদের মধ্যে কাজ ও দায়িত্ব ভাগাভাগি করে দেওয়া প্রয়োজন হয়েছে এবং বহু সংখ্যক কর্মীর প্রশিক্ষণ জরুরী হয়ে পড়েছে। এই কাজ সম্প্রতি হাতে নেওয়া হয়েছে। তবে সাংগঠনিক কারণে প্রয়োজনীয় এই কর্ম বিভাজনের সঙ্গে সঙ্গে পূর্বোক্ত দুই উদ্দেশ্যের মধ্যে যে মূলগত ঐক্য রয়েছে সেটা কিন্তু আমাদের ভুললে চলবে না। একই লক্ষ্য অর্জনের জন্যই যে পার্টিকে এই উভয় দুটি কাজ করতে হয় সেটা সব সময় ভালোভাবে উপলব্ধি করা হয় না। কেবল যে সরকারের কাজকর্ম পরিচালনা পার্টি সংগঠনের ভূমিকার উপর দারুণভাবে নির্ভরশীল তাই নয়, একই সঙ্গে সরকারের মাধ্যমে আমাদের কাজকর্ম এমন অবস্থার সৃষ্টি করে যা পার্টি ও গণ-সংগঠন গড়ে তোলার পক্ষে অনুকূল। কর্মসূচী রূপায়ণে সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা, মেহনতী ও শোষিত মানুষের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন এবং রাজ্যের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও একটি গণতান্ত্রিক সুস্থ আবহাওয়া বজায় রাখার ব্যাপারে চমৎকার রেকর্ড আমাদের পার্টিকে জনগণের কাছে প্রিয় করেছে এবং পার্টির বৃদ্ধি ও অগ্রগতি ও জনগণের রাজনৈতিক চেতনা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করেছে। পূর্বোক্ত দুটি কাজকে যুক্ত করার উপায় খুঁজে বের করা এবং এই দুই কাজের ‌মধ্যে যে একই সাধারণ লক্ষ্য বর্তমান সে বিষয়ে সদস্যদের শিক্ষা দেওয়া এখন পার্টি সংগঠনের কাছে এক বড় চ্যালেঞ্জস্বরূপ।

মার্কসবাদী পথ, ৫ই আগস্ট, ১৯৮১

Advertisements
Published in: on জুন 27, 2010 at 6:33 অপরাহ্ন  মন্তব্য করুন  

The URI to TrackBack this entry is: https://jyotibasu.wordpress.com/2010/06/27/%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%b8%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%80-%e0%a6%a6%e0%a7%83%e0%a6%b7%e0%a7%8d%e0%a6%9f%e0%a6%bf%e0%a6%ad%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%97%e0%a6%bf%e0%a6%a4/trackback/

RSS feed for comments on this post.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s

%d bloggers like this: