আমার ছেলেবেলায়ঃ জ্যোতি বসু

আমার বয়স এখন ৯৫ চলছে। ছেলেবেলার সব কথা এখন মনে না পড়াটাই স্বাভাবিক। গত ৬৮ বছর ধরে আমি কমিউনিষ্ট পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী। যদিও অল্পবয়সে এখানে স্কুল-কলেজের পাট চুক্‌লে আমার বাবা আমাকে বিলেতে ব‌্যারিস্টারি পড়তে পাঠিয়েছিলেন। বাবা চেয়েছিলেন ছেলে বিলেত থেকে ব‌্যারিস্টারি পাশ করে ফিরে এসে প্র্যাকটিস্‌ শুরু করুক, রোজগার করুক। 

কিন্তু বিলেতে থাকতেই আমি মার্কসবাদে আকৃষ্ট হই এবং গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিষ্ট পার্টির পরিচালনায় কাজ করা শুরু করেছিলাম। লন্ডনে থাকতেই আমি, ভূপেশ, এরকম আরো কয়েকজন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে দেশে ফেরার পর সর্বক্ষণের পার্টিকর্মী হিসাবে কাজ করবো। ১৯৪০ সালে বিলেত থেকে জাহাজে করে প্রথমে বোম্বাইতে নেমেই যোগাযোগ করেছিলাম কমিউনিষ্ট পার্টির নেতাদের সঙ্গে। কলকাতায় ফেরার পর কমরেড মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ আমাকে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ দেন। তখন থেকেই সবসময়ের রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে কাজ করা শুরু করেছি। 

স্বাভাবিকভাবেই আমার বাড়ির কেউ এই সিদ্ধান্তে খুশি হননি। আসলে রাজনীতির সঙ্গে আমাদের পরিবারের কোনও যোগাযোগ ছিল না। বাবা ডাক্তারি করতেন, দুই জ‌্যাঠামশাই করতেন ওকালতি। বাবা অবশ্য রাজনীতি করার বিরুদ্ধে ছিলেন না। সেদিক থেকে তিনি উদার ছিলেন। কিন্তু তিনি কিছুতেই বুঝতে পারছিলেন না যে ব‌্যারিস্টারি করেও কেন রাজনীতি করা যাবে না? দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ তো দু’টোই একসাথে করছেন, তাহলে আমি পারবো না কেন? সেজন্য কতকটা বাড়ির চাপেই আমি ব‌্যারিস্টার হিসাবে কলকাতা হাইকোর্টে নামও লিখিয়েছিলাম। কিন্তু প্র্যাকটিস্‌ করিনি কোনোদিনই। কারণ তখন তো সর্বক্ষণের রাজনৈতিক কর্মী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। 

মেয়েদের স্কুলে একা 

আমাদের পৈত্রিক বাড়ি ছিল বাংলাদেশের ঢাকা জেলার বারদিতে। যদিও আমার জন্ম কলকাতার হ‌্যারিসন রোডের একটি বাড়িতে, এখন যার নাম মহাত্মা গান্ধী রোড। অবশ্য আমার ছোটবেলায় অনেকদিন পর্যন্ত কেটেছে হিন্দুস্থান বিল্ডিঙে। ধর্মতলায় বাড়ি, বাবা আমাকে ভর্তিও করলেন ধর্মতলারই লরেটো কিন্ডারগার্টেনে। তখন আমার ছ’বছর বয়স। কিন্ডারগার্টেনে চার বছরের কোর্স। কিন্তু আমি একটা ডাবল্‌ প্রোমোশন পেয়ে গেলাম। তিন বছরে উঠে এলাম ফার্স্ট স্ট‌্যান্ডার্ডে। কিন্তু এবারই হলো মুশকিল। ধর্মতলা লরেটো তো ফার্স্ট স্ট‌্যান্ডার্ড থেকে সম্পূর্ণ মেয়েদের স্কুল। অন্য স্কুলে যেতে হবে। বাবা চেষ্টা করলেন সেন্ট জেভিয়ার্সে ভর্তি করাতে, কিন্তু ওখানে তখন সেবছরের মতো অ্যাডমিশন ক্লোজড্‌। মিডলটন রোডের লরেটোতে গিয়েও ফিরে আসতে হলো। ওখানেও  ফার্স্ট স্ট‌্যান্ডার্ডে ছেলেদের নেওয়া হয় না। অগত‌্যা ফিরে আসতে হলো ধর্মতলা লরেটোতেই। মাদার ইন-চার্জ আমার অবস্থাটা বুঝে রাজি হলেন ফার্স্ট স্ট‌্যান্ডার্ডে ওখানেই পড়তে দিতে। বাবা বললেন, শুধু শুধু একটা বছর নষ্ট হবে কেন? ওখানেই পড়ো। যাই হোক, সেবছর ওই ক্লাসে আমিই ছিলাম একমাত্র ছেলে, বাকি সবাই মেয়ে। পরের বছর সেন্ট জেভিয়ার্সে সেকেন্ড স্ট্যান্ডার্ডে ভর্তি হলাম। এবার আর ভুল হয়নি, বাবা আগেই নাম লিখিয়ে রেখেছিলেন। 

বাংলা নিয়ে বিভ্রাটে 

মিশনারীদের স্কুল সেন্ট জেভিয়ার্সে তখন বাংলা পড়ানোই হতো না। ফার্স্ট ল‌্যাঙ্গুয়েজ তো ইংরাজী আছেই, সেকেন্ড ল‌্যাঙ্গুয়েজ নিতে হতো ল‌্যাটিন, হিন্দি, এইরকম কিছু। আমি নিয়েছিলাম হিন্দি। তখন তো কোনো অসুবিধা হয়নি। কিন্তু  সমস‌্যায় পড়লাম সিনিয়র কেম্ব্রিজ (নাইনথ্‌ স্ট‌্যান্ডার্ড) পাশ করার পর। ইন্টারমিডিয়েটে বাবা আমাকে বললেন, বাংলা নিয়ে পড়তে হবে। তখন যিনি ইউনিভার্সিটির ভাইস-চ‌্যান্সেলর ছিলেন, তিনি বাবাকে বলেছিলেন, ও এবার বাংলা নিয়ে পড়তে পারে। এখন বাংলা তো নেওয়া হলো, কিন্তু আমি খুবই টেনশনে পড়ে গেলাম। বাবা আগেই বলে রেখেছিলেন, আই এ এবং বি এ-তে ভালোভাবে পাশ করলে বিলেতে পাঠাবেন। সেজন্য সব সাবজেক্টেই পাশ করতে হবে, একটাতেও ফেল করা যাবে না। তাহলেই বিলেত যাওয়া পন্ড হয়ে যাবে। আর বাড়ির সবারই ইচ্ছে ছিল, আমার নিজেরও খুবই ইচ্ছা ছিল যে বিলেতে  গিয়ে ব‌্যারিস্টারি পড়বো। অতএব বাংলায় সর্বক্ষণের একজন মাস্টার এলেন। আমিও অন‌্যান্য বিষয়ের থেকে বাংলায় সব থেকে বেশি জোর দিলাম। যাইহোক আই এ-তে ভালোভাবেই পাশ করলাম। সেদিন এটা আমি শুনে আশ্চর্য হয়ে গেলাম যে এখন অনেক বাবা-মা নাকি ছেলে-মেয়েদের  বাংলা পড়াতেই চান না। আমার নাতিও লা মার্টিনিয়ার্স-এ পড়ে। ওই আমাকে বললো, ওদের স্কুলে সেকেন্ড ল‌্যাঙ্গুয়েজে বাংলা নেওয়ার সুযোগ থাকলেও অধিকাংশই নাকি হিন্দি নিয়েছে। বাংলা নাকি পরে পড়বে। অবাক কান্ড!

 স্কুল কেন বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে

১৯৩০-৩১ সাল হবে। সেন্ট জেভিয়ার্সে আমি তখন এইটথ্‌ স্ট‌্যান্ডার্ডের ছাত্র। গোটা বাংলা জুড়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের বৈপ্লবিক জোয়ার চলছে। আমাদের পরিবারে কেউ তখন সরাসরি রাজনীতি না করলেও স্বাধীনতা সংগ্রামী, বিপ্লবীদের প্রতি যে শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা ছিল, তার পরিচয় নানাভাবে পেয়েছি। মা’র কাছেই শুনেছি, দ্বিতীয় বরিশাল ষড়যন্ত্র মামলায় সাজাপ্রাপ্ত বিপ্লবী মদনমোহন ভৌমিক আমাদের বারদির বাড়িতে অস্ত্রসহ বেশ কিছুদিন আত্মগোপন করেছিলেন। এসবের একটা প্রভাব মনের মধ্যে পড়েছিল। যাইহোক, ওইসময় একদিন স্কুলে গিয়ে শুনলাম চট্টগ্রামে বিপ্লবীরা ব্রিটিশ সৈন্যদের সঙ্গে লড়াই করে অস্ত্রাগার দখল করেছেন।

পালানো মানে ভয় পেয়েছি

ওই ১৯৩০ সালেই একদিন শুনলাম সুভাষ বসু অক্টারলোনি মনুমেন্টে (শহীদ মিনার ময়দান) ভাষণ দেবেন। আমি আর আমার এক জেঠতুতো ভাই ঠিক করলাম যাব। আমরা তখন খদ্দর পরতাম না। কিন্তু সেদিন একটা আবেগ পেয়ে বসল। দু’ভাই খদ্দর পরে গেলাম। গিয়ে দেখি ঘোড়সওয়ার পুলিশ, লাঠিধারী পুলিশ, সার্জেন্টে গোটা তল্লাট যেন রণক্ষেত্র। সার্জেন্টরা যখন তাড়া করল, আমরা ঠিক করলাম পালাব কেন? পালাব না। পালানো মানে ভয় পেয়েছি। আমাদের গায়ে দু-এক ঘা লাঠি পড়ল। আমরা দ্রুত হাঁটতে লাগলাম। চলে এলাম বাবার চেম্বারে। আমাদের এক জেঠতুতো দাদা আমেরিকায় জয় প্রকাশের সঙ্গে ছিলেন। ডেন্টিস্ট হয়ে তখন ফিরে এসেছেন। কাউকে না, এমনকি ওই দাদাকেও না কিছু বললাম না। বাড়িতে এসে মাকে বলতে মা চুন হলুদ লাগিয়ে দিলেন। 

বিপ্লবীদের পাশে 

১৯৩০-৩১ সালে আমি সেন্ট জেভিয়ার্সে এইটথ স্ট্যান্ডার্ডের ছাত্র। তখন গোটা বাংলাজুড়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের বৈপ্লবিক জোয়ার। খবর পাচ্ছি চট্টগ্রামে বিপ্লবীরা অস্ত্রাগার দখল করেছেন। দেশপ্রেমিকদের বিরুদ্ধে অত্যাচারের বদলা হিসেবে খুন হচ্ছে ব্রিটিশ রাজপুরুষরা। সে এক অসম যুদ্ধ চলছে। একদিকে সশস্ত্র ব্রিটিশ রাজশক্তি, আরেকদিকে সহায় সম্বলহীন দেশপ্রেমিক। তাদের শক্তি কেবল দেশপ্রেম এবং মৃত্যুকে জয় করার ইচ্ছা। এই যে ঘটনা, এর থেকে আমাদের মতো পরিবারও মুক্ত থাকতে পারেনি। দেশপ্রেমের চোরাস্রোত ক্রমশ প্রকাশ্য অবয়ব নিতে শুরু করেছে। তারিখটা মনে নেই, তবে ১৯৩০ সালের শুরু। একদিন শুনলাম গান্ধীজী অনশন শুরু করেছেন। মনটা কেমন ভার লাগল। বাবাকে বললাম, আজ স্কুলে যাব না। বাবা আপত্তি করলেন না। বাবার সঙ্গে চলে গেলাম তাঁর চেম্বারে। 

‘পথের দাবি’

ছোটবেলার অনেকটা  সময় কেটেছে সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে। আই এ পাশ করার পর ইংরাজীতে অনার্স নিয়ে ভর্তি হলাম প্রেসিডেন্সি কলেজে। আমাদের কলেজের কয়েকজন শিক্ষক এতো ভালো পড়াতেন যে তাঁদের কথা আজো মনে আছে। অনার্সের টিচার ছিলেন প্রফুল্ল ঘোষ। চমৎকার শেক্সপিয়ার পড়াতেন। সুবোধ সেনগুপ্ত, অপূর্ব চন্দ-ও ইংরাজী পড়িয়েছেন। জ্যোতিষ চন্দ্র ঘোষও খুব ভালো ইংরাজী পড়াতেন। উনি পড়ে রাজনীতিতেও এসেছিলেন। আমার কাছে এসে একদিন বললেন, ফরওয়ার্ড ব্লক আমাকে বিধানসভায় প্রার্থী হতে বলেছে। আমি বললাম, সে কি! আপনি তো কোনোদিন রাজনীতিই করেননি! যাই হোক, উনি পরে এম এল এ হয়েছিলেন। 

সুবোধ সেনগুপ্তের ক্লাসও ছিল মনে রাখার মতো। উনি আমাদের ‘এ টেল অব টু সিটিজ’ পড়িয়েছিলেন। আমার মনে আছে, ডিকেন্স পড়াতে গিয়ে উনি একবার আমাদের ‘পথের দাবি’ রেফার করেছিলেন। সেই সময় আমাদের কাছে এটা অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ঘটনা ছিল। কারণ, ‘পথের দাবি’ তখন ব্রিটিশ সরকার নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক ছাত্রদের নিষিদ্ধ বই পড়ার কথা বলছেন, এটা তখন উল্লেখ করার মতো ঘটনা ছিল। ক্লাসের বন্ধুদের মধ্যে ‘পথের দাবি’ পড়ার আগ্রহ দেখলাম। আমি অবশ্য আগেই এই বই পড়ে ফেলেছিলাম। জ্যাঠামশাই ট্রাইব্যুনালের জজ হওয়ার পর পুলিস রাজদ্রোহমূলক সাহিত্য হওয়ার অভিযোগে গাদা গাদা বাজেয়াপ্ত বই তাঁর কাছে পাঠাতো। সেগুলো জ্যাঠামশাই-এর টেবিলে সাজানো থাকতো। উনি ট্রাইব্যুনালের কাজে কোর্টে গেলে আমরা সেগুলো দেখতাম। পড়া হয়ে গেলে আবার সাজিয়ে রাখতাম। এইভাবে অনেক নিষিদ্ধ রাজদ্রোহমূলক সাহিত্য পড়া হয়ে গিয়েছিল। ‘পথের দাবি’-ও এভাবেই পড়েছিলাম। খুবই ভালো লেগেছিল। ছোটবেলা থেকেই আমার নভেল পড়ার অভ‌্যাস। বাংলা, ইংরাজী সাহিত্যের গল্প-উপন‌্যাস সময় পেলেই পড়ি। তবে এখন আর অতটা পারি না। প্রতিদিন সকালে  ৭-৮টা কাগজ তো পড়তেই হয়।

আমি তো মোহনবাগান

টেলিভিশনে চীনের অলিম্পিক দেখছিলাম। উদ্বোধন,ব্যবস্থাপনা, খেলা-ধূলা সমস্ত দিক থেকেই চীন পৃথিবীর নজর কেড়েছে। আমাদের ছেলে-মেয়েরা খুব একটা ভালো করতে পারছিল না দেখে মনটা বারেবারে খারাপ হয়ে যাচ্ছিলো। তবু পরে যাহোক আমরা কিছু অন্তত পদক পেয়েছি। 

আর এখন তো খেলা-ধূলার চর্চাও কমে গেছে। টি ভি-তে, খবরের কাগজে দেখি খালি ক্রিকেট নিয়েই যত আলোচনা। আমার বাড়িতে যিনি থাকেন, ওঁর মেদিনীপুরে বাড়ি। ওঁকে জিজ্ঞাসা করতেও বললেন, গ্রামের দিকে ফুটবল খেলা খুবই কম হচ্ছে। অথচ আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন সব জায়গাতেই ফুটবল খেলা হতে দেখতাম। পাড়ায় পাড়ায় ক্লাব ছিল। আর আমি তো ‘মোহনবাগান’। আমাদের সময় তখন অধিকাংশই মোহনবাগানের সমর্থক ছিলাম। ওঁরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে খালি পায়ে ফুটবল খেলে দেখিয়ে দিয়েছিল। তখন এই ঘটনা আমাদের মধ্যে খুবই চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। 

অবশ্য মহামেডান স্পোর্টিং-ও তখন উঠতি ক্লাবের মধ্যে ছিল। আমি তো গোষ্ঠ পাল, উমাপতি কুমারের খুবই ফ‌্যান ছিলাম। কুমারবাবু অত্যন্ত পরিছন্ন ফুটবল খেলতেন। গোষ্ঠ পালের সঙ্গে আমার কখনো সাক্ষাতে আলাপ হয়নি। তবে আমরা যখন সরকারে এলাম, তখন গোষ্ঠ পালের মূর্তি আমাদের  সরকার ময়দানে বসিয়েছে। কুমারবাবুর সঙ্গে পরে আমার বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে। উনি আমার সঙ্গে দেখা করতে একবার বিধানসভাতেও এসেছিলেন।   

‘ব্ল‌্যাক অ্যান্ড হোয়াইট’ 

আমরা তখন হিন্দুস্থান পার্কের বাড়িতে উঠে এসেছি। ১৯২৪-২৫ সাল হবে। তখন ওখানে চারদিকে ধানক্ষেত আর ফাঁকা জমি। নারকেল গাছ, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ডোবা। রাস্তাঘাট নেই, গাড়ি থেকে নেমে অনেকটা হেঁটে বাড়ি। ট্রাম লাইন বসানোর কাজ শুরু হয়েছে। ওখানে আমাদের বাড়ির পাশেই একটা ফাঁকা জমি ছিল। এলাকার ছেলেদের নিয়ে  একটা ক্লাব তৈরি করলাম। নাম দিলাম ‘ব্ল‌্যাক অ্যান্ড হোয়াইট’। আমাদের জার্সির রঙ্ ছিল সাদা-কালো, সেজন্যই ‘ব্ল‌্যাক অ্যান্ড হোয়াইট’। তখন মহামেডানের জার্সিও ছিল সাদা-কালো। ক্লাবের আমিই ছিলাম সেক্রেটারি। ফুটবল কিনে ওই জমিতে খেলা শুরু হলো। আমি নিজেও ফুটবল খেলতেই বেশি পছন্দ করতাম। তবে ক্রিকেটও খেলেছি। ওখানে আমরা প্রচুর খেলেছি। পরে অবশ্য আমাদের ক্লাবটাই উঠে গেলো। কারণ, যাঁর জমি ছিল, তিনি ভাবলেন জমিটা হয়তো হাতছাড়া হয়ে যাবে। জমিটা পাঁচিল দিয়ে ঘিরে দিলেন। ওখানে আমরা টেনিসও খেলতাম। ফুটবল খেলতে আমরা টিম নিয়ে ময়দানেও যেতাম, জেলাতেও যেতাম। তখন তো চারদিকে অসংখ্য ফুটবল টুর্নামেন্ট হতো। চার ফুট দশ, পাঁচ ফুট, বিভিন্ন হাইটের গ্রুপে প্রতিযোগিতা চলতো। আবার হাইট কমিয়ে ছোটো গ্রুপে ঢোকার জন্য অনেকে কোমরে বেল্‌ট বাঁধতো। ধরা পড়ে গেলে তা নিয়ে হই-চই চলতো।

ফুটবল খেলতে গিয়ে একবার তো আমার পা-টাই গেলো ভেঙে। সেটা অবশ্য স্কুলের টুর্নামেন্ট ছিল। আমাদের সেন্ট জেভিয়ার্সের সঙ্গে আর্মেনিয়ান স্কুলের খেলা ছিল। তখন ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে ছিল আর্মেনিয়ান স্কুল; ওদের ওখানে রাগবি, ফুটবল, বিভিন্ন ধরনের খেলা হতো।  পরে সাহেবদের এই স্কুলটা উঠে যায়। যাই হোক, সেদিন ওদের ছেলেরা সব বুট পায়ে খেলছিল। আমাদেরও কয়েকজনের পায়ে বুট ছিল। কিন্তু আমি খালি পায়েই খেলতাম। মাঠে আমার পজিশন ছিল রাইট উইং। তো, খেলার কিছুক্ষণের মধ্যেই ওদের দলের একটা ছেলে এমন জোরে আমার পায়ে মারলো যে পা-টাই গেলো ভেঙে! খেলতে গিয়ে শেষকালে ট‌্যাক্সি করে বাড়ি ফিরতে হলো। ব্যস! কিছুদিনের জন্য খেলা-ধূলা সব বন্ধ!  তবে খেলাধূলার প্রতি আমার আকর্ষণ বরাবরই ছিল। বিলেতে পড়তে যাওয়ার পরেও প্রথমদিকে ফুটবল,কাউন্টি ক্রিকেটও দেখেছি। ওখানে ইন্ডিয়া টিম ক্রিকেট খেলতে গেলে দেখতে যেতাম। উইম্বলডনে টেনিস খেলাও দেখেছি। পরের দিকে অবশ্য রাজনীতির প্রতি আগ্রহ এতো বেড়ে গেলো যে ওদিকটা কমে গেলো।         

টের পেয়েছি!

প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরাজী অনার্স নিয়ে মোটামুটি ভালোভাবেই বি এ পাস করলাম। বাংলা নিয়ে আগে আশঙ্কা থাকলেও পরিশ্রমের ফল পেলাম। সেবছরে ইংরাজীতে কেউ ফার্স্ট ক্লাস পায়নি। সেকেন্ড ক্লাসে ওপরের দিকেই আমার নম্বর ছিল। তখন তো মাথায় বিলেত যাওয়ার চিন্তা। বাবা বললেন, বিলেত যখন যাচ্ছো, আই সি এস-টাও একবার চেষ্টা কোরো। বিলেতে গিয়ে ব‌্যারিস্টারিতে ভর্তি হলাম। পরের বছর আই সি এস পরীক্ষায় বসলাম বটে, কিন্তু সফল হলাম না। ততদিনে তো রাজনীতির সংস্পর্শে এসে গেছি।

লন্ডনেই একটি বাড়িতে ভূপেশের সঙ্গে আলাপ। স্নেহাংশুও ওই সময় বিলেতে পড়তে এলো। মার্কসবাদী পাঠচক্রে দেখা হলো হ‌্যারি পলিট, রজনী পাম দত্ত, বেন ব্র্যাডলের মতো কমিউনিস্ট নেতাদের সঙ্গে। মার্কসবাদের প্রতি আকর্ষণ বাড়তে লাগলো। সংগঠনে যুক্ত হয়ে গেলাম। বিলেতে প্রবাসী ভারতীয় ছাত্রদের সংগঠিত করার কাজ আমরা করতাম। গড়ে উঠেছিল লন্ডন মজলিস, যার প্রথম সম্পাদক ছিলাম আমি। ভারতীয় ছাত্রদের নিয়ে তৈরি হয়েছিল কমিউনিষ্ট গ্রুপ। সকলের নাম আমার এখন মনে নেই। তবে ভূপেশ গুপ্ত, স্নেহাংশু আচার্য, ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত, পি এন হাক্‌সার, মোহন কুমারমঙ্গলম, রজনী প‌্যাটেল, এন কে কৃষ্ণান, নিখিল চক্রবর্তী, অরুণ বোস-এরা সব এতে ছিলেন বলে মনে পড়ছে। ভারতের স্বাধীনতার সপক্ষে মত গঠন ও অর্থসংগ্রহ করা ছিল আমাদের অন্যতম কাজ। স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতারা লন্ডনে এলে তাঁদের আমরা সংবর্ধনা জানাতাম। জওহরলাল নেহরু, বিজয়লক্ষ্মী পন্ডিত, ভূলাভাই দেশাই, সুভাষ চন্দ্র বসুর মতো স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রণী নেতাদের আমরা সংবর্ধনা দিয়েছিলাম। 

আমার মনে আছে, সুভাষ চন্দ্র বসু বিলেতে এলে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়ার পর আমাদের সঙ্গে অনেক বিষয়ে আলোচনা হলো। সুভাষ বসুকে জানালাম যে দেশে ফিরে সর্বক্ষণের রাজনৈতিক কর্মী হিসাবেই আমরা কয়েকজন কাজ করবো। সুভাষ বসু তাতে খুবই উৎসাহ দিলেন। তিনি এটাও বললেন, তবে মনে রেখো, Politics is not a bed of roses. এটা ঠিকই, সেটা পরে বেশ ভালোই টের পেয়েছি!

Advertisements
Published in: on জুন 27, 2010 at 6:40 অপরাহ্ন  মন্তব্য করুন  

The URI to TrackBack this entry is: https://jyotibasu.wordpress.com/2010/06/27/%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%9b%e0%a7%87%e0%a6%b2%e0%a7%87%e0%a6%ac%e0%a7%87%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a7%9f%e0%a6%83-%e0%a6%9c%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a7%8b%e0%a6%a4%e0%a6%bf-%e0%a6%ac/trackback/

RSS feed for comments on this post.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s

%d bloggers like this: