স্মৃতির পাতা থেকে কিছু কথা : জ্যোতি বসু

আমার বয়স এখন ৯৪ চলছে। পুরনো অনেককিছুই এখন মনে পড়ে না। গত ৬৭ বছর ধরে আমি কমিউনিষ্ট পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী। ১৯৪০ সালে বিলেত থেকে ফিরে আসার পর কমরেড মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ আমাকে পার্টি সদস্যপদ দেন। তখন থেকেই সবসময়ের রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে কাজ করা শুরু করেছি।

অবশ্য তার আগে বিলেতে থাকতেই আমি মার্কসবাদে আকৃষ্ট হই এবং গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিষ্ট পার্টির পরিচালনায় কাজ করা শুরু করেছিলাম। সেখানে প্রবাসী ভারতীয় ছাত্রদের সংগঠিত করার কাজ আমরা করতাম। গড়ে উঠেছিল লন্ডন মজলিস, যার প্রথম সম্পাদক ছিলাম আমি। ভারতীয় ছাত্রদের নিয়ে তৈরি হয়েছিল কমিউনিষ্ট গ্রুপ। সকলের নাম আমার মনে নেই। তবে ভূপেশ গুপ্ত, স্নেহাংশু আচার্য, ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত, পি এন হাক্‌সার, মোহন কুমারমঙ্গলম, রজনী প‌্যাটেল, এন কে কৃষ্ণান, নিখিল চক্রবর্তী, অরুণ বোস প্রমুখ এতে ছিলেন বলে মনে পড়ছে। লন্ডনে থাকতেই আমরা কয়েকজন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে দেশে ফেরার পর সর্বক্ষণের পার্টিকর্মী হিসাবে কাজ করবো। ১৯৪০ সালে বিলেত থেকে জাহাজে করে প্রথমে বোম্বাইতে এসে নামলাম। নেমেই যোগাযোগ করলাম কমিউনিষ্ট পার্টির নেতাদের সঙ্গে।

আমার বাড়ির কেউ অবশ্য এই সিদ্ধান্তে খুশি হননি। বাবা চেয়েছিলেন ছেলে বিলেত থেকে যখন ব‌্যারিস্টারি পাশ করে এসেছে, তখন প্র্যাকটিস্‌ শুরু করুক, রোজগার করুক। আসলে রাজনীতির সঙ্গে আমাদের পরিবারের কোনও যোগাযোগ ছিল না। বাবা ডাক্তারি করতেন, দুই জ‌্যাঠামশাই করতেন ওকালতি। আমাদের পৈত্রিক বাড়ি ছিল বাংলাদেশের ঢাকা জেলার বারদিতে। যদিও আমার জন্ম কলকাতার হ‌্যারিসন রোডের একটি বাড়িতে, এখন যার নাম মহাত্মা গান্ধী রোড। তবে আমাদের পরিবারে স্বাধীনতা সংগ্রামী, বিপ্লবীদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা ছিল, যার পরিচয় নানাভাবে পেয়েছি।

দেশে ফিরে সর্বক্ষণের কর্মী হিসাবে কাজ শুরু করার পর থেকে পার্টির ডাকা বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিয়েছি। বিধানসভার ভেতরে এবং বাইরে পার্টি যখন যে দায়িত্ব দিয়েছে, তা পালন করার চেষ্টা করেছি। পার্টির কাজ করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হতে হয়েছে, জেল খাটতে হয়েছে, এমনকি বেশ কয়েকবার আত্মগোপনেও থাকতে হয়েছে। স্বাধীনতার আগে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের নিপীড়ন যেরকম কমিউনিষ্ট পার্টিকে সহ্য করতে হয়েছে, তেমনি স্বাধীনতার পরেও আমরা বারেবারে অত‌্যাচার-নিপীড়নের মুখোমুখি হয়েছি।

আমি দেশে ফিরে যখন কাজ শুরু করি, তখনও পার্টি বেআইনী ছিলো। ব্রিটিশ শাসনে বেআইনী ঘোষিত পার্টির সারাক্ষণের কর্মী হিসাবে আমার একটি অন্যতম কাজ ছিল আত্মগোপনকারী পার্টিনেতা ও কর্মীদের গোপন বৈঠকের স্থান,আশ্রয় ঠিক করা, বাইরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা, অর্থসংগ্রহ ইত‌্যাদি। আমাকে বিভিন্ন সভায় বক্তৃতা দিতে এবং পার্টি ক্লাস নিতেও পাঠানো হতো। সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি (এফ এস ইউ) ও ফ‌্যাসিবিরোধী লেখক সঙ্ঘের কাজেও আমাকে বিভিন্ন জায়গায় যেতে হতো। আমিই ছিলাম এফ এস ইউ-র প্রথম সম্পাদক।

১৯৪২ সালের শেষদিকে পার্টিকে আইনী করতে বাধ্য হলো ব্রিটিশরা। আমাদের পার্টির প্রথম কংগ্রেস এরপরেই অনুষ্ঠিত হলো। ১৯৪৩ সালে বোম্বাইতে হওয়া প্রথম কংগ্রেসে অবশ্য আমি প্রতিনিধি ছিলাম না। আমার যতদূর মনে পড়ছে, এরপরের বছর থেকেই আমাকে শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করতে পাঠানো হলো। প্রথমে বন্দর ও ডক শ্রমিক, পরে রেলশ্রমিকদের মধ্যে আমি কাজ শুরু করলাম। হাওড়া, শিয়ালদহ ছাড়াও পূর্ববঙ্গ, আসামের বিভিন্ন জায়গায় এই কাজে যেতে হতো। রেলে আমরা ভালোই সংগঠন গড়ে তুলতে পেরেছিলাম। পরে ১৯৪৬ সালে এই রেলশ্রমিক কেন্দ্র থেকেই আমি প্রথমবার বিধায়ক নির্বাচিত হই।সেবার দার্জিলিঙ থেকে রতনলাল ব্রাহ্মণ এবং দিনাজপুর থেকে রূপনারায়ণ রায়ও কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী হিসাবে নির্বাচিত হন।

 তখন তেভাগা আন্দোলন চলছে। এজন্য সভা করতে আমার জেলায় জেলায় ডাক পড়তো। আমার মনে আছে, একবার আমি আর স্নেহাংশু (আচার্য) ময়মনসিংহ জেলায় গেলাম। হাজং এলাকায় ঢোকামাত্র দু’জন ব্রিটিশ পুলিশ অফিসার এসে আমাদের গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে গেলো। স্নেহাংশু ছিল ময়মনসিংহ মুক্তাগাছার মহারাজার ছেলে। ফলে থানায় আমাদের বেশিক্ষণ রাখতে সাহস করলো না। ডি এম মিঃ বাস্তিন আমাদের জেলা থেকে বহিস্কারের নির্দেশ দিলো। তখন মুসলিম লিগের সরকার, মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন শহীদ সুরাবর্দি। আমি পরে তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তেভাগার বিলটা ধামাচাপা দিলেন কেন? সুরাবর্দি আমায় বলেছিলেন, আমার দলে যে এতো জোতদার আছে, তা আমি জানতাম না।

এর কিছুদিন বাদে দেশ স্বাধীন হলো। কিন্তু আমাদের লড়াই শেষ হলো না। আমার মনে পড়ছে, স্বাধীনতার অল্পদিনের মধ্যেই কংগ্রেস সরকার কমিউনিষ্ট পার্টিকে বেআইনী ঘোষণা করলো। আমাদের নেতাদের গ্রেপ্তার করা হলো। আমার বাড়িতে তখন সবাই গভীর ঘুমে, খুব ভোরে পুলিস এলো, আমাকে গ্রেপ্তার করে প্রথমে নিয়ে গেলো ইলিসিয়াম রো’তে এস বি অফিসে, তারপর প্রেসিডেন্সি জেলে নিয়ে রাখলো। আমার বিরুদ্ধে হাস্যকর সব অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল। আমাকে নাকি বার্মার কৃষকসভা আমন্ত্রণ জানিয়েছে (যে আমন্ত্রণপত্র আমি আদৌ পাইনি), আমি ট্রেড ইউনিয়ন করি ইত‌্যাদি। তখন হেবিয়াস কর্পাস মামলা করা যেত না। হাইকোর্টের তিনজন বিচারপতিকে নিয়ে একটা কমিটি ছিল। তাঁদের কাছে আপীল করলাম। তিন মাস বাদে আমায় ছেড়ে দিতে হলো। অবশ্য পরে অন্য অভিযোগে আবার গ্রেপ্তার করলো আমাকে। কংগ্রেস সরকার নিজে থেকে কমিউনিষ্ট পার্টিকে আইনী করেনি। দেশের সংবিধান ঘোষিত হলে তার ধারা অনুসারে আমরা মামলা করলাম। ভারত সরকার কমিউনিষ্ট পার্টির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে বাধ্য হলো।আমরাও হেবিয়াস কর্পাসে আবেদন করলে ১৯৫১ সালে জেল থেকে মুক্তি পেলাম। সে বছরই কলকাতায় পার্টির গোপন সর্বভারতীয় সম্মেলন হলো। আমি সেখানে প্রতিনিধি ছিলাম। সম্মেলন থেকে অজয় ঘোষ সাধারণ সম্পাদক হলেন।

পার্টি আইনী হওয়ার ‍সুযোগ নিয়ে আমরা সংগঠনকে ব্যাপকভাবে প্রসারিত করার জন্য ঝ‌াঁপিয়ে পড়লাম। বন্দীমুক্তি আন্দোলন, উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের দাবিতে আন্দোলন প্রভৃতির মধ্যে দিয়ে পার্টি বেড়ে উঠলো, গণসংগঠনগুলিতেও অনেক মানুষ এলেন। এর মধ্যেই প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। ১৯৫২ সালের সেই নির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টিই পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সবচেয়ে বড় বিরোধী দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করলো। আমরা ২৮টা আসন পেলাম, আমাদের সমর্থনে আরো ২ জন নির্দল সদস্য জিতলেন। কিন্তু আমাদের পার্টিকে বিধানসভায় বিরোধীপক্ষ হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হলো না। অনেক টালবাহানার পর আমাদের ‘প্রধান’ বিরোধী পার্টি এবং পার্টির পরিষদীয় দলের নেতাকে ‘প্রধান’ বিরোধী পার্টির নেতা হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হলো। আসলে ওরা আমাদের প্রভাব যাতে না বাড়ে, তার জন্য যে কোনভাবে আটকাতে চাইছিল। যাই হোক, যে পার্টিকে স্বাধীনতার পরেই কয়েক বছর ধরে কংগ্রেস সরকার বেআইনী করে রেখেছিল, সেই পার্টিরই প্রধান বিরোধী দল হিসাবে স্বীকৃতি পাওয়া একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।

১৯৫৪ সালে মাদুরাইয়ে পার্টির তৃতীয় কংগ্রেসে আমাকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে নেওয়া হলো। তার আগে অবশ্য প্রাদেশিক সম্মেলন থেকে আমাকে সর্বসম্মতিক্রমে রাজ্য সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। একদিকে, প্রধান বিরোধী দলের নেতা হিসাবে বিধানসভায় পরিষদীয় কাজ এবং অন্যদিকে পার্টির রাজ্য সম্পাদকের কাজ, বিরাট দায়িত্ব এসে পড়লো আমার কাঁধে। এই সময় ট্রাম ভাড়া বৃদ্ধির বিরুদ্ধে আন্দোলন, শিক্ষক আন্দোলনের মতো কয়েকটি বড় আন্দোলন সংগঠিত হয়। ১৯৫৬ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে যৌথভাবে হঠাৎ বঙ্গ-বিহার সংযুক্তিকরণের একটি প্রস্তাব নিয়ে আসেন, যা নিয়ে সারা রাজ্যে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হলো। ওই সময়ই কেরালার পালঘাটে পার্টির চতুর্থ কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু আমি, কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্তসহ আরো অনেকেই চতুর্থ কংগ্রেসে এজন্য যেতে পারিনি। অনেকে গ্রেপ্তার হলেন। অবশেষে কলকাতা উত্তর-পশ্চিম লোকসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে কংগ্রেস প্রার্থী পরাজিত হলে বিধান রায় পিছু হঠলেন।

এদিকে, পার্টির ভেতরে মতাদর্শগত বিতর্ক তখন ক্রমশ মাথাচাড়া  দিচ্ছিল। ১৯৬১ সালে বিজয়ওয়াদা কংগ্রেসে সেটা চরম আকার ধারণ করে। সেবারে ভাঙন কোনমতে আটকানো গেলেও পরে তা বাড়তে লাগলো। অবশেষে আমরা ৩২ জন জাতীয় পরিষদের সদস্য বের হয়ে এলাম। রাষ্ট্রের শ্রেণীচরিত্র, বিপ্লবের স্তর ইত্যাদি নিয়ে আমাদের মতের ফারাক ছিল, সেকথা সবাই জানেন। কলকাতাতে সপ্তম পার্টি কংগ্রেস থেকে আমরা স্বাধীন কর্মপন্থা নিলাম, নতুন পার্টি কর্মসূচী গৃহীত হলো। তারপরে তো দেখা গেলো আমরাই প্রধান বামপন্থী হয়ে গেলাম। মানুষের সমর্থনও আমাদের দিকেই বেশি ছিল। ১৯৬৭ এবং ১৯৬৯ সালে এরাজ্যে যুক্তফ্রন্ট সরকার গড়ার ক্ষেত্রেও জোটের মধ্যে একক বৃহত্তম দল আমরাই ছিলাম। ১৯৭১ সালে আমরা আলাদাভাবেই একক বৃহত্তম দল হলাম, কিন্তু আমাদের সরকার গড়তে দেওয়া হলো না। এরপরে এলো বাহাত্তরের রিগিং নির্বাচন। সকাল ১১টার মধ্যে সমস্ত বুথে ভোট পড়ে গেলো। আমরা এই নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে গঠিত বিধানসভা বয়কট করেছিলাম। তারপরে আধা-ফ্যাসিস্ত সন্ত্রাসের কথা জরুরী অবস্থার অন্ধকারাচ্ছন্ন দিনগুলির কথা সবারই মনে আছে।

কিন্তু মানুষ যে কংগ্রেসকে ক্ষমা করেনি, তা ১৯৭৭ সালে প্রথম সুযোগেই প্রমাণিত হলো। কংগ্রেস গোটা দেশে ধরাশায়ী হলো, এরাজ্যে তো বটেই। এরাজ্যে প্রথম বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হলো। তারপর থেকে টানা সাতবার এরাজ্যের মানুষ বামফ্রন্টকে জয়ী করে সংসদী‌য় গণতন্ত্রের ইতিহাসে ন‍‌জির তৈরি করেছেন। আজ এটা প্রতিষ্ঠিত, এই সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার মানুষের স্বার্থে অনেক কাজ করতে পেরেছে। আমরা যে এতদিন সরকারে রয়েছি, তা মানুষের ইতিবাচক রায়েই রয়েছি। পাশাপাশি, বামফ্রন্ট সরকার গোটা দেশের সামনে মানুষের স্বার্থে বিকল্প কর্মসূচীর একটা নজির তুলে ধরতে পেরেছে। জাতীয় রাজনীতিতেও বিভিন্নভাবে আমাদের সাফল্যের ছাপ পড়েছে। দেশ এখন জোট রাজনীতির যুগে প্রবেশ করেছে। পশ্চিমবঙ্গে একটানা ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ৯ দলের একটি দৃঢ় জোট হিসাবে বামফ্রন্ট সরকারের প্রভাব এক্ষেত্রে অস্বীকার করা যায় না। কারণ জোট সরকার মানেই যখন অস্থিতিশীল, বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বলে প্রমাণ হচ্ছিলো, তখন এরাজ্যে এই জোট স্থিতিশীল, শান্তির পরিবেশ এবং জনমুখী উন্নয়নের নজির তৈরি করে  গোটা দেশের সামনে একটি উজ্জ্বল ব্যাতিক্রম তুলে ধরেছে।

শুধু জোট রাজনীতির প্রশ্নই নয়, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকেও সামনে তুলে এনেছিল বামফ্রন্ট সরকারই। আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং তৃণমূলস্তরে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটানোর ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ গোটা দেশের সামনে মডেল হিসাবে স্বীকৃত। একথা আজ সকলেরই জানা যে এরাজ্যের ত্রিস্তর পঞ্চায়েতী ব্যবস্থাকে অনুকরণ করেই গোটা দেশে তা রূপায়ণের জন্য আইন তৈরি করা হয়েছে। ভূমি সংস্কার, কৃষি ও গ্রামোন্নয়নের ক্ষেত্রেও এই সরকারের সাফল্য সর্বজনস্বীকৃত। পাশাপাশি, গণতান্ত্রিক পরিবেশ, শান্তি-সুস্থিতি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিরবচ্ছিন্নভাবে বজায় ক্ষেত্রেও দেশের সামনে এরাজ্য উদাহরণ।                                                             

শিল্পবিকাশের প্রশ্নেও আমরা বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই কাজ করছি। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গ আর্থিক ও অন্যান্য ক্ষেত্রে কেন্দ্রের চরম বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হয়েছে। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার তৈরি হওয়ার পরে কেন্দ্রের এইসব বাধা অতিক্রম করেই আমরা শিল্পস্হাপনের নীতি নিই। নয়ের দশকের গোড়ায় যখন মাসুল সমীকরণ নীতি ও লাইসেন্স প্রথা তুলে নেওয়া হলো, তখন আমাদের সামনে আরও সুযোগ এলো। আমরা যখন বণিকসভাগুলিতে গিয়ে এরাজ্যে বিনিয়োগের আবেদন জানাচ্ছিলাম, তখন তাঁরা আমাদের বললেন, আপনারা যে নীতির ভিত্তিতে এখানে শিল্প গড়ার কথা বলছেন, সেটা লিখিতভাবে দিলে সুবিধা হয়। তখন ১৯৯৪ সালে আমরা বিধানসভায় বর্তমান শিল্পনীতি ঘোষণা করি। পরে ১৯৯৫ সালে চন্ডীগড়ে অনুষ্ঠিত আমাদের পার্টির পঞ্চদশ কংগ্রেসেও এটা অনুমোদিত হয়েছে।

তবে এটাও মনে রাখা দরকার, পশ্চিমবঙ্গ,‍ কেরালা, ত্রিপুরায় আমরা যে বাম সরকারগুলি চালাচ্ছি তা এই বুর্জোয়া সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই। আমরা এই পুঁজিবাদী সাংবিধানিক কাঠামোতে কখনও বলতে পারি না, এই সরকারগুলি সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচী রূপায়ণ করবে। সাম্যবাদ, সমাজতন্ত্র আমাদের লক্ষ্য; শ্রেণীহীন, শোষণহীন সমাজব্যবস্থা আমরা গড়তে চাই। সেটা আমাদের লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যে আমাদের পৌঁছোতে হবে।

একটা জটিল রাজনৈতিক অবস্থার মধ্যে দিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি। আমাদের ১৯তম পার্টি কংগ্রেস সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হলো। প্রতিনিধিরা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে পার্টিকে, গণ-সংগঠনগুলিকে আরো প্রসারিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমি শুধু একটা কথাই বলবো, মানুষের ওপরে আমরা যেন বিশ্বাস না হারাই। মানুষের কাছে বারবার যেতে হবে, ত‌াঁদের ভালোবাসা আমাদের পেতে হবে। এই পুঁজিবাদী শোষণের ব্যবস্থা কখনও টিকতে পারে না, এটা দৃঢ়তার সঙ্গে আমরা বলতে পারি। তবে তাতে সময় লাগ‍‌বে। কিন্তু লক্ষ্যে আমরা পৌঁছবোই।

Advertisements
Published in: on জুন 26, 2010 at 5:18 অপরাহ্ন  মন্তব্য করুন  

The URI to TrackBack this entry is: https://jyotibasu.wordpress.com/2010/06/26/%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a7%83%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%b0-%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%a5%e0%a7%87%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%95%e0%a6%bf%e0%a6%9b%e0%a7%81-%e0%a6%95%e0%a6%a5/trackback/

RSS feed for comments on this post.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s

%d bloggers like this: