জ্যোতি বসুকে খুনের চেষ্টাও হয়েছিলো

প্রবাদপ্রতিম কমিউনিস্ট নেতা, জনগণের নেতা জ্যোতি বসুকে সারা জীবন ধরেই নানা আক্রমণের মোকাবিলা করতে হয়েছে। এমনকি তাঁকে খুনেরও চেষ্টা হয়েছিলো। পাটনায়।

সেটা ১৯৭০ সাল। ৩১শে মার্চ। আততায়ীর গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে জ্যোতি বসুর আঙুল ছুঁয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলো। আততায়ীর লক্ষ্যভ্রষ্ট গুলি তাঁর বদলে প্রাণ কেড়ে নিয়েছিলো তাঁরই পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা কমরেড আলি ইমামের। পাটনায় এই আলি ইমামের বাড়িতেই সেদিন থাকার কথা ছিলো জ্যোতি বসুর। এর ঠিক একদিন বাদে কলকাতার শহীদ মিনার ময়দানে এক বিশাল সমাবেশে জ্যোতি বসু বলেছিলেন, মানব মুক্তির সংগ্রামে জীবন পণ করতে হবে। জয় আমাদের সুনিশ্চিত।

এই হামলার প্রেক্ষাপটের গুরুত্ব বুঝতে হলে যে সময়ে এই ঘটনা ঘটেছিলো সেই সময় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। পাটনায় জ্যোতি বসুর উপরে এই হামলার কিছুদিন আগেই সি পি আই (এম)-র বিরুদ্ধে এক হীন চক্রান্তের মধ্যে দিয়ে দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতন ঘটানো হয়েছিলো। সেই যুক্তফ্রন্ট সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ছিলেন জ্যোতি বসু। সি পি আই(এম) বিরোধী চক্রান্তের অঙ্গ হিসাবে সেই সময় যুক্তফ্রন্ট সরকারের এই স্বরাষ্ট্র দপ্তর এবং ওই দপ্তরের মন্ত্রী জ্যোতি বসুই ছিলেন আক্রমণের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিলো । এরকম পরিস্থিতিতে বিশ্বাসঘতকতার এক প্রেক্ষাপটে ১৯৭০ সালের ১৬ই মার্চ যুক্তফ্রন্টের মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখার্জি পদত্যাগ করেন। ২৯শে মার্চ রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়। জ্যোতি বসু তাঁর লেখা যতদূর মনে পড়ে বইটিতে লিখেছিলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে এইভাবে ঘৃণ্য উপায়ে ১৩ মাস শাসনকালেই দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতন ঘটানো হলো।’’

পাটনার হামলা সম্পর্কে এই বইটিতেই জ্যোতি বসু লিখেছেন, ‘‘এর দুই দিন পর আমার উপর আক্রমণ হলো। এবার একেবারে হত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে। এটা অবশ্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ও কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিহত্যার যে রাজনীতি কায়েমী স্বার্থবাহী মহলের থেকে শুরু হয়েছিলো, এটা তারই আরেকটি ঘটনা।’’

সেই হামলার ঘটনা স্মরণ করে জ্যোতি বসু লিখেছেন, ‘‘আমি পাটনা গিয়েছিলাম এক কর্মসূচী উপলক্ষে। দিনটি ছিলো, ১৯৭০ সালের ৩১শে মার্চ। পাটনা স্টেশনে নেমে দেখি, হাজার হাজার মানুষ লাল ঝান্ডা এবং ফেস্টুন হাতে স্টেশনে এসেছেন অভর্থ্যনা জানাতে। তখন সকাল আটটা মতো হবে। অত সকালে এত জমায়েত দেখে বেশ ভালো লাগলো। মনে হলো, বিহারে আমাদের পার্টির প্রভাব বাড়ছে। তাঁদের প্রবল স্লোগানের মধ্যে হেঁটে এসে স্টেশনের বাইরে সবে দাঁড়িয়েছি। হটাৎ ফুট দশেক দূরে বাঁদিক থেকে এক ঝলক আগুনের হলকা দেখি। মুহূর্তে মনে হলো, কী একটা যেন তীর বেগে আমার হাতের আঙ্গুল ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল। কিছু বুঝবার আগেই একটা আর্তনাদ। দেখি আমার একটু পেছনে একজনের জামা রক্তে লাল হয়ে গেছে। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে পড়েছিলাম। সেই রক্তাল্পুত ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। পরমুহূর্তে ঘোর কাটলো প্রচন্ড চিৎকারের মধ্যে। চারদিকে তখন ‘ধর্‌ ধর্‌’ আওয়াজ। কিন্তু ওই প্রবল ভিড়ের মধ্যে আততায়ী তখন মিলিয়ে গেছে।

জানলাম গুলিবিদ্ধ ব্যক্তির নাম আলি ইমাম। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। আরো জানলাম কমরেড আলি ইমাম আমাদের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সমর্থক। জীবন বীমা কর্পোরেশনে চাকরী করতেন। কিছুদিন আগে ই এম এস নাম্বুদিরিপাদ পাটনায় এসে তাঁর বাড়িতে উঠেছিলেন। আমারও সেদিন ওঁর বাড়িতেই ওঠার কথা ছিলো। আমাকে নিতেই তিনি পাটনা স্টেশনে এসেছিলেন। কিন্তু তাঁর বদলে নিজের জীবন দিয়ে গেলেন। আমার আঙ্গুলে শুধুমাত্র একটা ক্ষত সৃষ্টি হলো।’’

এই হামলার প্রতিবাদে সেদিন উত্তাল হয়ে উঠেছিলো পাটনা শহর। হামলার পরেই প্রায় ২০ হাজার মানুষের এক বিশাল ধিক্কার মিছিল স্লোগান দিতে দিতে বিহার বিধানসভার সামনে গিয়ে বিক্ষোভ দেখায়। বিকেলে পাটনা শহরে অনুষ্ঠিত হয় এক বিশাল সমাবেশ। সেই সমাবেশে ভাষণও দেন জ্যোতি বসু। তিনি বসু কমরেড আলি ইমামের বাড়িতেও যান। পরবর্তী সময়েও তিনি কমরেড আলি ইমামের পরিবারের খোঁজখবর নিতেন।

পাটনায় এই আক্রমণের তীব্র নিন্দা করে সেইদিনই সি পি আই(এম) পলিটব্যুরো পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, জ্যোতি বসুকে হত্যার এই নিষ্ঠুর ও কাপুরুষোচিত চেষ্টা একটা ভয়ঙ্কর রাজনৈতিক অপরাধ। এই অপরাধের জন্য সম্পূর্ণ দায়ী আমাদের পার্টির ঘৃণ্য শ্রেণী শত্রু। এরা আমাদের পার্টি ও পার্টি নেতাদের বিরুদ্ধে অবিশ্রান্ত বিদ্বেষমূলক এবং হিংসাত্মক প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের পার্টির বিরুদ্ধে জঘন্যতম প্রচার চালাতে এবং নেতাদের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক উত্তেজনা ছড়াতে বৃহৎ ব্যবসায়ের কুক্ষিগত তথাকথিত মুক্ত সংবাদপত্রগুলির ভূমিকাও মোটেই কম নয়। আমাদের পার্টির অন্যতম বিশিষ্ট নেতা, পশ্চিমবাংলার লক্ষ লক্ষ মেহনতী জনগনের প্রিয় ও শ্রদ্ধাভাজন জ্যোতি বসুকে হত্যার এই চেষ্টার জন্য দায়িত্বের ভাগ কোনমতেই তারা এড়াতে পারে না।

জ্যোতি বসুর উপর গুলি চালানোর খবর কলকাতায় পৌঁছানোর সাথে সাথেই বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছিলো এই মহানগর। রাজ্যের অন্যান্য প্রান্তেও হাজার হাজার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে পথে নেমে বিক্ষোভে দেখান। ৩১শে মার্চ সকাল ৯টা থেকে জ্যোতি বসুর উপর হামলার খবর প্রচারিত হওয়ার সাথে সাথেই কলকাতা এবং শহরতলীর যানবাহন, হাটবাজার বন্ধ হয়ে যায়। পাড়ায় পাড়ায় হাজার হাজার মানুষ পথে নেমে বিক্ষোভ মিছিল করেন। বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে গোটা ডালহৌসি চত্বর। ট্রাম, বাস কর্মীরাও ট্রাম-বাস প্রত্যহার করে বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ মিছিলে যোগ দেন। শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলি বন্ধ হয়ে যায়। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলি ফাঁকা করে দিয়ে বেরিয়ে আসেন ছাত্র-ছাত্রীরা। এমনকি কয়েকটি জায়গায় উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়। কলকাতাসহ রাজ্যের প্রায় সর্বত্র পালিত হয় অঘোষিত হরতাল।

সেই ঘটনার কথা উল্লেখ করে জ্যোতি বসু যত দূর মনে পড়ে বইয়ে তাঁর স্মৃতি চারণায় বলেছেন, ‘‘দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতন ঘটানোর জন্য আমাদের বিরুদ্ধে যা নয় তাই বলা হয়েছে। পার্টির ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে আটকানোর জন্য আমাদের বিরুদ্ধে কুৎসা, মিথ্যা, ব্যক্তিগত চরিত্রহননের বেপরোয়া ন্যক্কারজনক প্রচার চালানো হয়েছে। দিনের পর দিন আমাদের পার্টির বিরুদ্ধে হেট ক্যাম্পেন চালানো হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার নামে সি পি আই(এম)-কে নিষিদ্ধ করার, খতম করার চেষ্টা হয়েছে। বিভিন্ন বুর্জোয়া কাগজ ও অন্যান্য কমিউনিস্ট বিরোধী শক্তিগুলি মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রনোদিত হয়ে উচ্চ পর্যায়ের কুৎসার পরিবেশ তৈরি করেছে। সেই পরিবেশের মধ্যেই আমাদের জন্য সাধারণ মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত উৎকন্ঠা ও ভালবাসার প্রকাশ দেখে আমরা যেন নতুনভাবে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম। মানুষের ভালবাসা পাওয়ার চেয়ে বড় সম্পদ আর কিছু নেই।’’

পাটনায় হামলার প্রতিবাদে ১৯৭০ সালের ১লা এপ্রিল শহীদ মিনারে কেন্দ্রীয়ভাবে এক সুবিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। প্রমোদ দাসগুপ্তের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেই সমাবেশে জ্যোতি বসু বলেন, ‘‘জীবন দেওয়ার জন্য আমাদের প্রস্তুৎ থাকতে হবে প্রতি মুহূর্তে। কিন্তু মৃত্যু যখন আসবে তখন যেন জীবনের বৃথা অপচয়ের জন্য আমাদের অনুতাপ না করতে হয়। যেন বলতে পারি, পৃথিবীর মহত্তর সংগ্রাম, মানব মুক্তির জন্য আমার জীবন দিয়ে গেলাম।’’

Advertisements
Published in: on জুন 26, 2010 at 5:52 অপরাহ্ন  মন্তব্য করুন  

The URI to TrackBack this entry is: https://jyotibasu.wordpress.com/2010/06/26/%e0%a6%9c%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a7%8b%e0%a6%a4%e0%a6%bf-%e0%a6%ac%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%96%e0%a7%81%e0%a6%a8%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%9a%e0%a7%87%e0%a6%b7%e0%a7%8d%e0%a6%9f/trackback/

RSS feed for comments on this post.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: